কীসে এমন হাল করেছে ওটার? বন্ধ দরজা ডিঙিয়ে ঘরেই বা ঢুকল কেমন করে?
ঠিক তখনই ঘরের কোনায় হুটোপুটির আওয়াজ শুনতে পেল লতিফ মিয়া। নিমিষেই শরীরের সবক’টা লোম দাঁড়িয়ে গেল তার।
বিস্ফারিত নেত্রে কোণের জমাটবাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল সে। আর অপেক্ষায় রইল ভয়ানক কোন দানবকে চাক্ষুষ করার।
পরমুহূর্তেই তাকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়ে মাঝারী আকারের একটা ধেড়ে ইঁদুর বেরিয়ে এল ওখান থেকে! কয়েক কদম এগিয়ে মেঝের আলোকিত অংশে এসে থমকে দাঁড়াল ওটা।
চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা সশব্দে ছাড়ার অবকাশ পেল লতিফ মিয়া। সামান্য একটা ইঁদুরের কারণেই কি না আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল তার! এতটা ভীতুও বুঝি হয় কেউ?
তবে পরের দৃশ্যটা চোখে পড়া মাত্রই আবারও দম আটকে এল তার!
প্রথম ইঁদুরটার পিছু নিয়ে একে-একে অন্ধকার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করল ইঁদুরের পাল! সবক’টা বিশালাকার, দেখতে অবিকল একই রকম। শত- শত, হাজার-হাজার ইঁদুর! দেখতে-দেখতে পুরো মেঝেটাই ঢেকে গেল ইঁদুরের পালে!
বিদ্যুৎ চমকের মত সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল লতিফ মিয়ার কাছে। বুঝে গেল, কাঁথাটার এমন হাল কারা করেছে। সন্ধ্যায় কাদের কথা বলেছিল রহস্যময় লোকটা; কারা ছিল গতরাতের হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী!
পিছাতে-পিছাতে দেয়ালঘেঁষা খাটের একেবারে শেষ কোনায় চলে গেল লতিফ মিয়া। নিদারুণ আতঙ্কে সমস্ত অন্তরাত্মা কাঁপছে তার; নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘরভর্তি অগুনতি ইঁদুরের দিকে।
মেঝেতে এখন সমুদ্রের ঢেউয়ের মত ঢেউ উঠছে, একে অন্যের শরীরে ভর দিয়ে ধীরে-ধীরে উঁচু হচ্ছে খুনে ইঁদুরের দল। খাটের পায়া বেয়ে উঠতে শুরু করেছে বাকিরা, লতিফ মিয়ার নাগাল পেতে খুব বেশি বাকি নেই আর।
ঘোরলাগা চোখে পুরোটা সময় ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তার মন পড়ে আছে অতীতে। দৈববলে শৈশবের সবকিছু মনে পড়ে গেছে তার! মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে কাটানো সুখের খণ্ডচিত্রগুলো একে-একে ভাসছে তার চোখের সামনে। নিয়তির নিষ্ঠুর ছোবলে, চোখের পলকে বদলে গেল সবকিছু!
প্রথম ইঁদুরটা শরীরে কামড় বসাতেই ঘোর কেটে গেল লতিফ মিয়ার। সাহায্যের আশায় গলা ফাটিয়ে চেঁচানোর জন্য মুখ খুলল সে।
তবে চিৎকারটা আর কখনওই ওর গলা ছেড়ে বেরোনোর সুযোগ পায়নি। মুখ খোলা মাত্রই অন্তত গোটা পাঁচেক ইঁদুর একযোগে ঢুকে পড়ল তার মুখগহ্বরে!
লতিফ মিয়ার আলজিভের দখল পেতে একে অন্যের সঙ্গে লড়াই শুরু করল ওরা!
ছয়
মতি চেয়ারম্যানের সাকল্যে তিনজন বউ। তবে বেশিরভাগ সময় রাতটা সে ছোট বউ ময়নার ঘরেই কাটায়।
বাচ্চা-কাচ্চা জন্ম দিয়ে বড় দু’জনের দেহের বাঁধন ঢিলে হয়ে গেছে; ওতে আর আজকাল মন ভরে না মতির।
ময়নার বয়স সবে উনিশ, আগুনরঙা রূপ। পা থেকে মাথা পর্যন্ত উপচে পড়া যৌবন, এক দফায় খাঁই মেটানো কঠিন। অমন বউ ছেড়ে কী কারণে অন্য বউদের ঘরে রাত কাটাতে যাবে মতি? চেয়ারম্যানকে ঢুকতে দেখেই লণ্ঠনের আঁচটা খানিকটা কমিয়ে দিল ময়না। অর্ধেক সেলাই করা নকশী কাঁথাটা তুলে রাখল পাশের টেবিলে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সলজ্জ হাসি।
ঘরে ঢুকেই চটজলদি দরজাটা বন্ধ করে দিল মতি। পরনের পাঞ্জাবীটা আলনায় তুলে রেখে, ভুঁড়িতে হাত বুলাতে-বুলাতে বিছানায় এসে বসল। খুশিতে সবক’টা দাঁত বেরিয়ে পড়েছে তার, কিছুতেই ওদেরকে ঠোঁটের আড়ালে লুকোতে পারছে না সে।
ময়নার কাছে এলেই কী যেন হয় তার! নিজেকে বাচ্চা-বাচ্চা মনে হয়, আহ্লাদ করতে ইচ্ছে করে, ন্যাকামো করতে মন চায়।
‘কাইল রাইতে কই আছিলেন? বড় বুবুর ঘরে?’ অভিমানী গলায় জিজ্ঞেস করল ময়না। আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ এই প্রশ্নটাতেই ভয়ানক চমকে উঠল মতি। এক নিমিষে মুছে গেল মুখের দ্যুতি।
‘হ,’ কোনমতে বলল সে। তার জানা আছে, রাতে থাকা নিয়ে সতীনেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে না কখনওই। তাই ধরা পড়ার আশঙ্কা এক্ষেত্রে নেই বললেই চলে।
‘আইজও থাকতেন। আইলেন ক্যান?’ কণ্ঠে আরও খানিকটা আহ্লাদ ঢেলে বলল ময়না। নীচের দিকে মুখ নামিয়ে রেখেছে বলে আধো অন্ধকারে তার মুখের ভাব স্পষ্ট ঠাহর করতে পারল না মতি।
‘আমার ময়না পাখিডারে দেখতে মন চাইল। তাই চইলা আইলাম,’ যথাসম্ভব নরম গলায় বলল সে। তারপর এগিয়ে গেল ময়নার দিকে।
দ্রুত কাজে নেমে পড়ল চেয়ারম্যান। হাত বাড়িয়ে লণ্ঠনের আঁচটা আরও খানিকটা কমিয়ে দিল; তারপর অভ্যস্ত হাতে খুলতে শুরু করল ময়নার বসন।
‘ও, মা গো,’ আচমকা চেঁচিয়ে উঠল ময়না। ঝটকা মেরে মতিকে নিজের গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিল সে। উঠে বসে নিজের পায়ে হাত বুলাতে লাগল।
‘কী হইল আবার! চিল্লান দিলা ক্যান? অহনও তো শুরুই করি নাই কিছু, অবাক কণ্ঠে জানতে চাইল মতি।
‘কীয়ে জানি কামুড় দিল পায়ে…’
‘কও কী!’ লণ্ঠনটা, ময়নার পায়ের কাছে নিয়ে এল মতি। ‘দাঁতের দাগ দেহি। রক্তও তো বাইর হইতাসে!’
‘সাপে কামুড় দিলনি কোন? আমার অহন কী হইব? ও, আল্লা গো…’ আবারও চিৎকার শুরু করল ময়না।
তবে চেয়ারম্যানের কড়া ধমক খেয়ে আপাতত ক্ষান্ত দিল কাজটায়। ‘খাড়াও। বেহুদা চিল্লাইও না। দেইখা লই আগে।’
খাটের তলাটা ভাল করে দেখার জন্য আলোটা বাড়িয়ে দিল মতি। দামী লণ্ঠন, নিমিষেই দিনের আলোর মত ফকফকা হয়ে গেল জায়গাটা।
