‘কামডা ক্যান করলা, লতিপ?’ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল লোকটা।
‘কোন্ কাম?’
‘মাইয়াডারে মারলা ক্যান?’
উত্তেজনার বশে এক লাফে উঠে দাঁড়াল লতিফ মিয়া। ‘কোন্ মাইয়া? আমি মারুম ক্যান! এইগুলান আফনে কী কইতাসেন! কেডা আফনে? কেডা?’
‘শান্ত হইয়া বও, লতিপ। এমনে চিল্লাইলে তো মাইনষে হোন্ব। বিপদ তো আরও বাইড়া যাইব তাইলে।’
চট করে বসে পড়ল লতিফ মিয়া। ঘন-ঘন শ্বাস নিচ্ছে সে, বুক ধড়ফড় করছে। কে এই লোক? কতটুকু জানে সে?
‘কার কথা কইতাসি, হেইডা তুমি ভালই জান, লতিপ। সাধু সাইজ্জা ফয়দা কী? মাখনলালের বউডারে মারলা ক্যান?’
‘আমি মারুম ক্যান? আমি কাউরে মারি নাই।’
‘মারসো, লতিপ, মারসো। তুমি আর মইত্যা হারামজাদা মিল্লা মারসো। মাইয়াডা বহুত ভালা আছিল, লতিপ।’
‘মিছা কথা। আমি মারি নাই। কেউ দেহে নাই কেডা মারসে হেতিরে। কোন সাক্ষী নাই।’
‘সাক্ষী আছে, লতিপ মিয়া, সাক্ষী ঠিকই আছে। তোমরা দেহ নাই, কিন্তুক তোমাগোরে হেতারা ঠিকই দেখসে।’
‘কোন্ বেডারা দেখসে? কেডা? নাম কিতা হেতারার?’
এখনও এক নাগাড়ে হাসছে লোকটা। হাসিটা এখন আগের চেয়েও বেশি বিরক্তিকর লাগছে লতিফ মিয়ার কাছে।
‘বেডা দেখসে, কহন কইলাম? সাক্ষীরা কেউ মানুষ না, লতিপ।’
আরও ঘাবড়ে গেল লতিফ মিয়া। কী বলছে এসব লোকটা! কোত্থেকে এসেছে এই পাগলা? কোন্ গ্রামের লোক?
‘মাইয়াডা হাছাই খুব লক্ষ্মী আছিল, লতিপ,’ আবারও বলল লোকটা। ‘টানাটানির সংসার, নিজেরই ভাত জোটে না দুই বেলা। হের মইধ্যেই আমারে একবেলা ভাত খাওয়াইসিল। নিজের ভাগেরটাই দিয়া দিসিল মনে হয়। ওই অল্প একটু খানাতেই আমাগো সবার পেট ভইরা গেসিল, লতিপ। সবই খোদার ইচ্ছা।’
‘সবাই কেডা? আর কেডা-কেডা আছিল আফনের লগে?’
‘তাগো লগে খুব জলদিই তোমাগো মোলাকাত হইব, মিয়া। চিন্তা লইয়ো না।’ খিক্-খিক্ করে হেসে উঠল লোকটা।
কী বলবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে রইল লতিফ মিয়া। লোকটার কাছ থেকে আরও খানিকটা সরে বসল সে। ইতোমধ্যেই লোকটা তাকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
‘মানুষ বেঈমান হয়, নিমকহারাম হয়, কিন্তুক অন্য জন্তু-জানোয়ার কুনু সময় বেঈমানী করে না, লতিপ,’ কথা চালিয়ে গেল লোকটা। ‘মাইয়াডা জিন্দা থাকতেও বহুত জানোয়ারের খিদা মিটাইসে, মইরা লাশ হইয়াও কিছু জানোয়ারের খাওনের জোগান দিসে। অরা কিন্তুক ঠিকই হের প্রতিদান দিব, লতিপ। শোধ কইরা দিব বেবাক দেনা-ফাওনা।’
বলতে-বলতে নিজের ঝোলায় হাত বুলাল লোকটা, দৃষ্টিতে স্নেহ ঝরে পড়ছে। এই প্রথম লতিফ মিয়া খেয়াল করল, লোকটার ঝোলায় যা-ই থাকুক না কেন, ওগুলো জীবন্ত! তার চোখের সামনেই বার কয়েক নড়ে উঠল ঝোলাটা!
কী আছে ব্যাগটার ভিতরে? বিড়াল? কুকুর? নাকি মানুষের বাচ্চা?
তড়িৎ বেগে লাফিয়ে উঠল লতিফ মিয়া। ভীষণ ভয় পেয়েছে সে। কোথায় যেন শুনেছিল, প্রেত-সাধকেরা সাধনার জন্য মানুষের বাচ্চা বলি দেয়। সিদ্ধি লাভের জন্য কাজটা করতে হয় ওদের। এই লোকটা নিশ্চয়ই তাদেরই একজন, বাচ্চাটাকে বলি দিতে চলেছে শয়তানের উদ্দেশে। তবে লোকটার যে কিছুটা হলেও আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে, এটা নিশ্চিত। না হয় মাখনলালের বউয়ের কথাটা জানতে পারত না সে।
তাই অযথা লোকটাকে ঘাঁটানোর ঝুঁকি নিতে চাইল না লতিফ মিয়া। কোনমতে বলল, ‘শিগির বিদায় হন এহান থাইকা। আফনে পোলাচুর। বেশি ঝামেলা করলে চেরম্যান সাবরে ডাইকা আইনা থানায় চালান কইরা দেমু কইলাম।’
তাকে অবাক করে দিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে উঠে দাঁড়াল লোকটা। ঝোলাটা কাঁধে ঝুলিয়ে নেমে পড়ল বারান্দা ছেড়ে। এতটা সহজে এহেন উটকো ঝামেলা থেকে রেহাই পাবে, কল্পনাও করেনি লতিফ মিয়া। হতভম্ব হয়ে লোকটার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
বিড়বিড় করতে-করতে কয়েক কদম এগিয়ে গেল লোকটা, তারপর ঘাড়ের উপর দিয়ে ফিরে তাকাল। হাসি মুছে গেছে তার, দু’চোখ থেকে ছিটকে পড়ছে ক্রোধ।
‘সাবধানে থাইকো, লতিপ মিয়া। আজকের রাইতটা তেমন সুবিধার ঠেকতাসে না।’
পাঁচ
অন্যান্যদিনের তুলনায় সে রাতে খানিকটা আগেভাগেই শুয়ে পড়ল লতিফ মিয়া বুকটা ভারী হয়ে আছে তার, কিছুতেই অদ্ভুত লোকটাকে মাথা থেকে তাড়ানো যাচ্ছে না। লোকটার মধ্যে অশুভ কী যেন একটা আছে, মনের উপর চাপ ফেলে।
জীবনে এই প্রথম সত্যিকারের আতঙ্ক কাকে বলে টের পাচ্ছে লতিফ মিয়া। এতটাই ভয় পেয়েছে যে, নিজের ঘুপচি ঘরে শোয়ার সাহসটুকুও আজ হয়নি তার, বিছানা পেতেছে কাছারি ঘরে।
আগুন কেন জ্বেলে রেখেছে, নিভানোর সাহস নেই। তবে ভয়টা যে ঠিক কীসের, এটা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না সে। একারণে শঙ্কাটা আরও বেশি জাঁকিয়ে বসেছে তার মনে। কাছারি ঘরের বিছানায় জাজিম নেই, কাঠের পাটাতনের উপর পাতলা চাদর পাতা। বালিশটাও ইটের মত শক্ত, ঘাড়ের কাছটায় ব্যথা লাগে।
তাতেই কোনরকমে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ মুদল লতিফ মিয়া। ভারী কাঁথা টেনে দিয়েছে গলা পর্যন্ত। পরিশ্রান্ত মানুষ, গতরাতেও ঘুমোতে পারেনি; অচিরেই চোখের পাতা ভারী হয়ে এল তার।
খানিকক্ষণের মধ্যেই রীতিমত নাক ডাকতে শুরু করল সে। শীতের নিস্তব্ধ রাতে সে শব্দ ছড়িয়ে পড়ল অনেক দূর অবধি।
আচমকা চোখ খুলে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল লতিফ মিয়া। ঠিক কী কারণে কাঁচা ঘুমটা এভাবে চট করে ভেঙে গেল, প্রথমটায় কিছুতেই ঠাহর করতে পারল না সে। পরক্ষণেই দেখতে পেল, ভারী কাঁথাটা এখন আর গায়ে নেই তার, মেঝের ওপর পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে! চোখ কচলে ওটার দিকে ভাল করে তাকাতেই, দেহের সমস্ত রক্ত জমে বরফ হওয়ার জোগাড় হলো তার। কাঁথাটা আর আস্ত নেই মোটেও; চিরে ফালাফালা করে ফেলা হয়েছে! যেন প্রচণ্ড আক্রোশে ওটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কোন বিশালদেহী দানব!
