.
রুপোর থালার মত চাঁদ উঠেছে আকাশে, চরাচরে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষাদমাখা জোছনা। আচমকা হিউগোকে দেয়া আশ্বাসের কথা মাথায় আসাতে, মনটা ভীষণ ভার হয়ে গেল মিচেলের।
একবার ভাবল, ফিরে গেলে কেমন হয়? কিন্তু মনের ভিতর থেকে সায় মিলল না। এতখানি এসে ফিরে যাওয়ার কোন মানে হয়? কে জানে, নিজের অসমাপ্ত কাজটা অন্য কেউ করে দিলে হয়তো খুশিই হবে হিউগোর আত্মা! অন্যলোকে বসে এই মুহূর্তে কি তার দিকেই অপলক তাকিয়ে আছে অদম্য বুড়ো?
হিউগোর উপহার দেয়া স্পারগুলো হাতে নিয়ে ধীর কদমে পানিতে নামল মিচেল। ক্রীকের জল বেজায় ঠাণ্ডা; রীতিমত কেঁপে উঠল তার সমস্ত শরীর।
শৈত্যের শিহরণ উপেক্ষা করে দ্রুত কোমর পানি অবধি পৌছে গেল তরুণ কাউবয়। যা করার তাড়াতাড়ি করতে চায়; সারা রাত এই বরফ শীতল জলে দাঁড়িয়ে থাকার প্রশ্নই আসে না।
আলতো করে চোখ মুদল সে; হাত দুটো বাড়িয়ে ধরল সামনের দিকে। তারপর চিৎকার করে বলল, ‘আমি হাজির হয়েছি, মিশিবিঝিউ! আমার উপহার গ্রহণ করুন।’ পর-পর তিনবার কথাটা বলে, চুপ মেরে গেল সে। প্রতীক্ষায় রইল; যদি কিছু ঘটে!
প্রথম কয়েক মুহূর্ত কিছুই ঘটল না। তবে গুমট হয়ে গেছে পরিবেশ; ঝিঁঝি পোকারাও থামিয়ে দিয়েছে তাদের একঘেয়ে ডাক!
পরক্ষণেই আলোড়িত হতে শুরু করল ক্রীকের জল। প্রথমটায় খুব ধীরে- ধীরে, পরবর্তীতে তীব্র বেগে। যেন অতল থেকে মাথাচাড়া দিচ্ছে অতিকায় কোন জলদানব!
আতঙ্কে জায়গায় জমে বরফ হয়ে গেল মিচেল। বুকের গভীর থেকে উঠে আসা চিৎকারটা গলার কাছটায় এসে থমকে গেল। সামনে বাড়িয়ে রাখা হাত দুটো অনবরত কাঁপছে তার।
চোখ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সমগ্র চেতনায় মিশিবিঝিউকে অনুভব করল মিচেল। প্রাণীটার ক্ষমতার বিস্তৃতি আঁচ করতে পেরে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তার। এমনকী অল্প সময়ের জন্য ওটার মোলায়েম গর্জনও শুনতে পেল সে!
ধীরে-ধীরে মিচেলের সামনে এসে দাঁড়াল মিশিবিঝিউ; অনেকটা সময় নিয়ে নিরীখ করল তাকে। তারপর আলগোছে লেজটা বাড়িয়ে দিল মিচেলের হাতে ধরা স্পারগুলোর দিকে; ছুঁয়ে দিয়ে সোনায় পরিণত করবে জিনিসগুলোকে।
ঠিক তখনই মারাত্মক একটা ভুল করে বসল মিচেল! দানবটাকে দেখার তীব্র ইচ্ছাটাকে দমন করতে ব্যর্থ হলো সে। চোখ মেলে সরাসরি তাকাল প্রাগৈতিহাসিক চিতাটার একমাত্র অক্ষিগোলকের দিকে!
সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল মিশিবিঝিউ-এর রক্তবর্ণ চোখ; ঝলসে উঠল পিঠের সবক’টা কাঁটা। ভয়ানক রেগে গেছে সিয়াদের জলদেবতা!
তড়িৎ গতিতে প্রকাণ্ড লেজটাকে নিজের দিকে ধেয়ে আসতে দেখল মিচেল; পরক্ষণেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত মসৃণভাবে দু’টুকরো হয়ে গেল তার গোটা দেহটা! যেন একখণ্ড নরম মাখনে ছুরি চালিয়েছে মিশিবিঝিউ!
চট করে জলের তলায় ডুবে গেল টুকরো দুটো। কারণ ততক্ষণে নিজেই নিখাদ সোনায় পরিণত হয়েছে মিচেল!
অগণিত দ্বিখণ্ডিত মানুষের সঙ্গে মিচেলও চিরকালের জন্য ঠাঁই পেল গোল্ড ক্রীকের তলায়। বুড়ো হিউগোর নির্দেশ অমান্য করে এই নিষিদ্ধ এলাকায় এসে মোটেও ঠিক করেনি সে।
আচমকা তীরে দাঁড়ানো একটা অবয়বের দিকে তাকিয়ে বিকট একটা হাঁক ছাড়ল মিশিবিঝিউ; রাগ নেই তাতে, আছে কৃতজ্ঞতা।
হাত নেড়ে প্রাণীটাকে আশ্বস্ত করল বুড়ো হিউগো; তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল! মিশিবিঝিউ-এর জন্য নতুন শিকার খুঁজতে যাচ্ছে!
আরও অনেকক্ষণ পর আবারও ডাকতে শুরু করল ঝিঁঝি পোকার দল। একমাত্র ওরাই জানে, খানিকক্ষণ আগে ঠিক কী ঘটেছিল এই গোল্ড ক্রীকে!
***
