‘খাইসে! কত্ত বড় ইন্দুর! সাপখোপ না গো, ইন্দুরে কামড়াইসে তোমারে।’ ভুঁড়ি দুলিয়ে হাসতে শুরু করল মতি।
একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ইঁদুরটাকে তাড়িয়ে দিল সে। ঘরের পিছন দিকটায় বড়-বড় কয়েকটা গোলায় আতপ চাল রাখা আছে, ওখানেই গিয়ে লুকিয়ে পড়ল ওটা।
ইঁদুরটার চোদ্দগোষ্ঠীর উদ্দেশে খানিকক্ষণ খিস্তি করে উঠে দাঁড়াল মতি, দরজা খুলতে শুরু করল।
‘অহন আবার কনে যাইতাসেন?’
‘খাড়াও। আইতাসি। লতিপ্পারে ইঁদুরের ওষুধের কথা কইয়া আই। পরে ভুইল্যা যামু। ওষুধ না দিলে হারামিগুলান আমার গোলা সাফ কইরা ফালাইব।’
‘তাড়াতাড়ি আইয়েন কিন্তুক। আমার ডর করে।’
‘ডর কীয়ের আবার! আমি এই গেলাম আর আইলাম।’
দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে উঠনে পা রাখল মতি। জোর কদমে হাঁটতে শুরু করল কাছারি ঘরের দিকে।
বিশালকায় উঠনের একেবারে শেষ মাথায় কাছারি ঘর, তার পাশেই একটা ছোট্ট ঘরে রাত কাটায় লতিফ মিয়া।
অবচেতন মনে মাখনলালের বউটার কথা ভাবতে শুরু করল মতি চেয়ারম্যান। মেয়েটাকে প্রাণে মারার কোন ইচ্ছেই ছিল না তার। কী থেকে যে কী হয়ে গেল, খোদা মালুম!
বেঁচে থাকলে আরও অন্তত বার কয়েক মেয়েটাকে ভোগ করা যেত। বহুবছর পর ভীষণ রকম তৃপ্তি দিয়েছিল তাকে মেয়েটা।
আচমকা পিছনে অস্পষ্ট একটা শব্দ শুনতে পেয়ে ফিরে তাকাল মতি। শিশিরমাখা চাঁদের আলোয় যে দৃশ্যটা দেখতে পেল সে, কিছুতেই সেটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো না তার। সত্যিই কি এটা বাস্তব? নাকি নিদারুণ কোন ভ্রম?
জগতের সমস্ত ইঁদুর এসে জড় হয়েছে উঠনে! দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে এখন ওরই দিকে তেড়ে আসছে ওগুলো। কে কার আগে ওকে ধরতে পারবে, এই নিয়েই যেন প্রতিযোগিতায় মত্ত ওরা! নাগাল পেলে নিজের পরিণতি কী হবে, এটা না বোঝার মত বোকা নয় মতি। জীবন বাঁচাতে প্রাণপণে দৌড়তে শুরু করল সে।
ঘোলাটে জোছনায় কুয়াশা ভেজা খেতের আইলের উপর দিয়ে পালাচ্ছে মতি চেয়ারম্যান, তাকে তাড়া করে ছুটে চলেছে অপার্থিব ইঁদুরের পাল!
এসব থেকে অনেক দূরে এক ছোট্ট নৌকায় ঘুমিয়ে আছে পরিশ্রান্ত মাখনলাল। তার মাথার কাছে গামছায় জড়ানো কয়েক গাছি কাচের চুড়ি। বউয়ের জন্য হাট থেকে আজ বিকেলেই ওগুলো কিনেছে বেচারা।
সী-কুইন
ঢেউয়ের তালে-তালে মৃদু দুলছে জাহাজ-সী-কুইন। এই মাঝ দরিয়ায় জাহাজটার নিঃসঙ্গতা ঘোচাতেই যেন ওটাকে সঙ্গ দিয়ে চলেছে কয়েকটা দলছুট গাঙচিল।
জাহাজটা মাঝারি আকারের; মালবাহী। তবে যে কোন বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজের মতই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে-তকতকে।
ক্যাপ্টেন রবার্ট বায়রনের পরিচ্ছন্নতা বাতিক আর নাবিকদের নিখাদ আন্তরিকতার যুগপৎ মিশেলের কারণেই কেবল আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এই ব্যাপারটাকে সম্ভব করা গেছে। বায়রনের যে কোন আদেশ বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নেয় তাঁর অধীন ক্রুরা; নিজেদের ক্যাপ্টেনের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ওদের।
এই মুহূর্তে ক্যাপ্টেনের কেবিনে বসে তাঁর সাথে তাস পেটাচ্ছে ফার্স্ট মেট, নেলসন।
ভর সন্ধ্যার বিষণ্ণতা ভাসছে ঘরের বাতাসে। তাতে কীসের যেন একটা অশুভ গন্ধ মেশানো, যা নোনা জলের গন্ধ ছাপিয়ে আলাদা করে ধরা পড়ছে অবচেতন মনে।
সজোরে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন ক্যাপ্টেন রবার্ট, নিজের উপর বিরক্ত। ‘আজ একটাবারও ভাল কার্ড আসছে না আমার হাতে। ঘটনা কী, নেলসন? জাদুটোনা করোনি তো আবার? আমার সহায়-সম্পত্তি সমস্ত কিছু হাতিয়ে নিতে চাও বুঝি?’
হাসার চেষ্টা করল ফার্স্ট মেট, কিন্তু হাসিটা ঠিকঠাক ফুটল না চেহারায়। ব্যাপারটা ক্যাপ্টেনের নজর এড়াল না।
‘কী হয়েছে তোমার? পর-পর তিনবার জিতেও খুশি হতে পারছ না নাকি? আরও বেশি চাও? লোভটা একটু কমাও, নেলসন। একা মানুষ তুমি; এত পয়সা দিয়ে করবেটা কী, শুনি?’
‘না…মানে…ইয়ে…আপনাকে একটা কথা বলার ছিল, ক্যাপ্টেন।’
‘তো সেটা বলে ফেললেই হয়। এত ভণিতা করছ কেন?’
‘ছেলেরা…ছেলেরা ভীষণ ভয় পাচ্ছে, স্যর।’
‘মানে? কারা?’ অবাক কণ্ঠে জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট। আর যা-ই হোক অন্তত এধরনের কোন কথা আশা করেননি তিনি I
‘নাবিকেরা, খালাসীরা, ইঞ্জিন মাস্টার…মোদ্দা কথা আপনি ছাড়া জাহাজের আর বাদবাকি সবাই,’ ঢোক গিলতে-গিলতে কোনরকমে বলল নেলসন। ‘এমনকী ‘আমি নিজেও।’
‘কীসের ভয়?’ হতভম্ব মনে হলো ক্যাপ্টেন বায়রনকে। নিজের অজান্তেই গলার স্বর খানিকটা চড়ে গেছে তাঁর।
আমতা-আমতা শুরু করল ফার্স্ট মেট নেলসন। ‘আমাদের কার্গো হোল্ডে রাখা কষ্টি পাথরের মূর্তিটার জন্য, স্যর। ওটা…ওটা…রাসং উপজাতির অভিশাপের দেবতা তাখাপোং-এর মূর্তি!’
‘তো হয়েছেটা কী তাতে? সামান্য একটা মূর্তিই তো, তাই না? স্বয়ং দেবতা তো আর নয়। কী সমস্যা করছে ওটা তোমাদের? কেন ভয় পাচ্ছ ওটাকে?’ স্পষ্ট উষ্মা প্রকাশ পেল ক্যাপ্টেনের গলায়। ‘তোমাকে তো নাস্তিক বলেই জানতাম, নেলসন। কবে থেকে আবার এসব দেব-দেবতায় বিশ্বাস করা শুরু করলে?’
চুপ করে রইল ফার্স্ট মেট। কী জবাব দেবে এই প্রশ্নের?
কিন্তু ক্যাপ্টেন বায়রনের রাগ তখনও পড়েনি, বলে চললেন তিনি, ‘সাধারণ একটা মূর্তি তোমাদের সবাইকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে; বিষয়টা ভাবতেই বিরক্তি লাগছে আমার। তোমরা ভাল করেই জান যে, রানীর জন্য উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছে ওটা। পাঠিয়েছেন স্বয়ং আমাদের জাহাজের মালিক, মিস্টার হারলান। চাইলেই ওটা আমি রেখে আসতে পারতাম না; ফেলে আসার কোন যৌক্তিক কারণও নেই। তাছাড়া ওটা পড়ে আছে কার্গো হোল্ডের এক অন্ধকার কোনায়। ওটাকে নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মত কী আছে, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’
