দ্য সেলফিশ জিন

 ০০. প্রাককথন ও ভূমিকা

দ্য সেলফিশ জিন (স্বার্থপর জিন)
৪০ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণ অক্সফোর্ড ল্যান্ডমার্ক সায়েন্স হিসাবে (২০১৬)
মূল : রিচার্ড ডকিন্স / অনুবাদ : কাজী মাহবুব হাসান

The Selfish Gene
40th anniversary edition as Oxford Landmark Science 2016
Richard Dawkins / Translated by Kazi Mahboob Hassan

.

সূচিপত্র

৩০ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণের ভূমিকা

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

প্রথম সংস্করণের প্রাককথন

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

অধ্যায় ১: মানুষরা কেন?

অধ্যায় ২: অনুলিপনকারীরা

অধ্যায় ৩: অমর কুণ্ডলী

অধ্যায় ৪ : জিন মেশিন

অধ্যায় ৫ : আগ্রাসন: স্থিতিশীলতা এবং স্বার্থপর মেশিন

অধ্যায় ৬ : জিম্যানশীপ বা জিন সৌহার্দ

অধ্যায় ৭ : পরিবার পরিকল্পনা

অধ্যায় ৮ : আন্তঃপ্রজন্ম দ্বন্দ্ব

অধ্যায় ৯ : আন্তঃলিঙ্গ দ্বন্দ্ব

অধ্যায় ১০ : তুমি আমার পিঠ চুলকে দাও, আমি তোমার পিঠে চড়বো

অধ্যায় ১১ : মিম : নতুন অনুলিপনকারী

অধ্যায় ১২ : ভালোরা সফল হয়

অধ্যায় ১৩: জিনের দীর্ঘ হাত

৪০ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণের এপিলগ পর্যালোচনা থেকে বাছাইকৃত কিছু অংশ

লেখক পরিচিতি

.

৩০ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণের ভূমিকা

ভালো আর মন্দ মিলিয়ে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ (The Selfish Gene) বইটির সাথে আমি আমার প্রায় অর্ধেক জীবন কাটিয়েছি, এই উপলদ্ধিটি আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। পরবর্তী বছরগুলোয় যখন আমার আরো সাতটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, প্রকাশকরা সেই বইগুলোর বিজ্ঞাপনের জন্যে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে পাঠিয়েছিলেন। যে বইটাই হোক না কেন, আমার সেই বইটির প্রতি দর্শকরা সন্তোষজনক উদ্দীপনার সাথে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, বিনম্রতার সাথে তারা প্রশংসা করেছেন এবং বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। তারপর সেই বইটি কেনার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেনও, ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটিতেই আমার স্বাক্ষর নেবার জন্য…। হয়তো খানিকটা বেশী বাড়িয়ে বলে ফেললাম, তাদের কেউ কেউ নতুন বইটিও কেনেন আর বাকীরা, আমার স্ত্রী আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এই বলে যে, যখনই কেউ কোনো লেখককে নতুন করে আবিষ্কার করেন, তাদের সাধারণত লেখকের প্রকাশিত প্রথম বইটি দিয়ে শুরু করার প্রবণতা আছে। ‘দ্য সেলফিশ জিন’ পড়ার পর, নিশ্চয়ই তারা সবচেয়ে সাম্প্রতিকতম এবং (এর স্নেহান্ধ পিতামাতার কাছে) প্রিয়তম বইটিও খুঁজে নেবেন পড়ার জন্য?

আমার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ হতো যদি আমি দাবী করতে পারতাম, ‘দ্য সেলফিশ জিন’ সময়ের প্রেক্ষিতে খুব বেশী অচল এবং তার অধিকৃত জায়গাটি হারিয়ে ফেলেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ( একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে) আমি সেই দাবী করতে পারবো না। খুঁটিনাটি অনেক কিছু বদলেছে এবং বাস্তব তথ্যপুষ্ট উদাহরণগুলোও অনেক বেশী মাত্রায় বেড়েছে। কিন্তু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, যা আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই আলোচনা করবো, এই বইটিতে খুব কম বিষয় আছে যেগুলো ফিরিয়ে নেবার জন্য আমি ব্যস্ত হতে পারি অথবা ক্ষমা চাইতে পারি। প্রয়াত আর্থার কেইন, লিভারপুলে প্রাণিবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ষাটের দশকে অক্সফোর্ডে আমাকে অনুপ্রাণিত করার মত টিউটরদের একজন, ১৯৭৬ সালে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটিকে ‘তরুণ লেখকের বই হিসাবে বর্ণিত করেছিলেন: তিনি খুবই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ. জে. আইয়ারের ‘ল্যাঙ্গুয়েজ টুথ অ্যান্ড লজিক’ বইটি নিয়ে কোনো সমালোচকের এই মন্তব্যটি উদ্ধৃত করেছিলেন। অবশ্য আমি এই তুলনায় আত্মশ্লাঘা অনুভব করেছিলাম, যদিও আমি জানি যে আইয়ার তার প্রথম বইটি থেকে বেশ অনেক অংশই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং কেইনের সেই সুচালো ইঙ্গিতটির আমার দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন ছিল : অর্থাৎ সময় হলে আমিও তার (আহয়ার মত একই ভাবে আমার প্রস্তাবগুলোও প্রত্যাখ্যান করে নেবো।

বইটির শিরোনাম নিয়ে আমার কিছু দ্বিধার বিষয় ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে আমাকে এই আলোচনাটি শুরু করতে দিন। ১৯৭৫ সালে, বন্ধু ডেসমন্ড মরিসের মধ্যস্থতায় আংশিকভাবে সমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি আমি প্রথম দেখিয়েছিলাম লন্ডনের প্রকাশকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় টম মাশলারকে। জোনাথান কেপ প্রকাশনীর অফিসে তার কক্ষে আমরা আলোচনা করেছিলাম বিষয়টি নিয়ে। তিনি বইটি পছন্দ করেছিলেন তবে এর শিরোনামটিকে নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘সেলফিশ’ (স্বার্থপর) শব্দটি নেতিবাচক’ একটি শব্দ, কেন বইটির নাম দিচ্ছি না ‘দি ইমোর্টাল জিন’ (অমর জিন)? ‘ইমোর্টাল’ ইতিবাচক একটি শব্দ এবং ‘দ্য সেলফিশ জিনের’ মত ঠিক একই রকম কৌতূহলোদ্দীপকভাবেই অর্থবহ (আমার ধারণা, আমাদের তখন কারোরই মনে আসেনি নামটির সাথে অস্কার ওয়াইল্ড এর ‘দ্য সেলফিশ জায়ান্ট’ নামের একটি মিলও খুঁজে পাওয়া সম্ভব)। আমি এখন ভাবি মাশলার হয়তো ঠিক কথাই বলেছিলেন। অনেক সমালোচকই, বিশেষ করে উচ্চকণ্ঠ যারা, আমি পরে আবিষ্কার করেছি যারা দর্শনে পাণ্ডিত্যের দাবী করেন, তারা বইটিকে শুধুমাত্র এর শিরোনাম দিয়েই পড়তে আগ্রহী ছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, ‘দ্য টেইল অব বেনজামিন বানি’ অথবা ‘দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব রোমান এম্পায়ার নামের বইগুলোর ক্ষেত্রে শুধু শিরোনাম পড়ে বই বিচার করা যথেষ্ট কার্যকর একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু আমি খুব সহজেই দেখতে পাচ্ছি যে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ শুধুমাত্র শিরোনাম হিসাবে একাকী, পুরো বই, সেই বিশাল পাদটীকাটি ছাড়া, হয়তো এর বিষয়বস্তু সম্বন্ধে অসম্পূর্ণ একটি ধারণা দিতে পারে। বর্তমানে সময়ে হলে, এই সব জটিলতা কাটাতে আমেরিকার প্রকাশকরা যেকোনো ক্ষেত্রেই একটি উপশিরোনাম দাবী করতেন। কোনো একটি শিরোনামকে ব্যাখ্যা করার সবচেয়ে সেরা উপায় হলো, সেই শিরোনামে ব্যবহৃত শব্দগুলোয় ঠিক কোথায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেটি খুঁজে বের করা। যদি ‘সেলফিশ’ বা স্বার্থপর শব্দটির উপর জোর দেয়া হয়, আপনি হয়তো ভাববেন বইটির বিষয়বস্তু স্বার্থপরতা, অথচ, আর যদি কিছু নাও হয়ে থাকে, এই বইটি পরার্থবাদীতা বিষয়ে এর আলোচনায় অনেক বেশী সময় নিবেদিত করেছে। শিরোনোমে যে শব্দটিকে সঠিকভাবে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ সেটি হচ্ছে ‘জিন’, এবং আমাকে সেই কারণটি ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়া হোক। ডারউইনবাদের অভ্যন্তরে একটি কেন্দ্রীয় বিতর্ক মূলত সংশ্লিষ্ট সেই ‘একক’কে নিয়ে, যা আসলেই প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়: এটি কি ধরনের ‘সত্তা’, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিণতিতে যা টিকে থাকে অথবা টিকে থাকতে পারেনা। সেই এককটি কম বেশী সংজ্ঞানুযায়ী স্বার্থপর একটি একক হিসাবে রূপান্তরিত হয়। আলট্রইজম বা পার্থবাদ হয়তো অন্য কোনো এক স্তরে বিশেষভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হতে পারে। প্রাকৃতিক নির্বাচন কি প্রজাতিদের মধ্যে বাছ বিচার করে? যদি তাই হয়, তাহলে আমরা প্রত্যাশা করবো একক জীব সদস্যরা তাদের প্রজাতির মঙ্গলের জন্য পরার্থবাদীতার সাথে আচরণ করবে। জনসংখ্যার অতি বৃদ্ধি ঠেকাতে তারা হয়তো তাদের জন্মহার সীমাবদ্ধ করতে পারে, অথবা

প্রজাতির জন্য ভবিষ্যতে শিকার করা যায় এমন প্রাণীদের মজুদ বাড়ানোর লক্ষ্যে তাদের শিকার করার আচরণকে সংযত করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ডারউইনবাদে সর্বব্যাপী বিদ্যমান ভ্রান্তি মূলত আমাকে এই বইটি লেখার জন্যে প্ররোচিত করেছিল। অথবা, প্রাকৃতিক নির্বাচন– যেমন আমি এখানে যা দাবী করছি– কি জিনদের মধ্য থেকে নির্বাচন করে? এই ক্ষেত্রে আমরা খুব অবাক হবো না এমন কিছু দেখে যখন একক কোনো জীব সদস্য তাদের ‘জিনের কল্যাণের জন্যে পরার্থবাদীতার সাথে আচরণ করে, যেমন, আত্মীয়দের খাওয়ানো এবং সুরক্ষার করার মাধ্যমে, যারা তাদের মত একই জিনের প্রতিলিপি বহন করে। এই ধরনের ‘কিন’ আলট্রইজম বা জিনগত আত্মীয়দের প্রতি পরার্থবাদীতা শুধু একটি মাত্র উপায়, যার মাধ্যমে জিনের স্বার্থপরতা একক জীব সদস্যদের পরার্থবাদী আচরণের মাধ্যমে এর নিজেকে অনুদিত করতে পারে। এই বইটি ব্যাখ্যা করেছে কিভাবে এটি কাজ করে, প্রজননের সাথে, ডারউইনের তত্ত্বের যা আরেকটি (প্রজনন) প্রধানতম পরার্থবাদীতা সৃষ্টিকারী। যদি কখনো আমাকে এই বইটি আবার লিখতে হয়, জাহাভী/গ্রাফেনের ‘হ্যান্ডিকাপ প্রিন্সিপালের’ (মূল বইয়ের ৪০৬ ১২ পৃষ্ঠা, অধ্যায় নয়ের টীকা দেখুন) একজন বিলম্বে-রূপান্তরিত অনুসারী হিসাবে, আমোতস জাহাভীর ধারণাটিকে আরো কিছুটা জায়গা দেয়া আমার উচিৎ হবে, যেখানে তিনি প্রস্তাব করেছেন, পরার্থবাদী কোনো দান সম্ভবত ‘পটল্যাচ’ (১) ধরনের একটি প্রাধান্য বিস্তার করার (বা ডমিনেন্স) সংকেত: ‘দেখো আমি তোমার চেয়ে কত শ্রেষ্ঠ, আমি তোমাকে কোনো কিছু দান করার ক্ষমতা রাখি!”

শিরোনামে ব্যবহৃত ‘সেলফিশ’ শব্দটি ব্যবহারের যৌক্তিকতার বিষয়টি আমাকে পুনরায় ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয়া হোক। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে জীবনের প্রাধান্য পরম্পরায় কোন স্তরটিকে অবশ্যম্ভাবীভাবে স্বার্থপর স্তর হিসাবে আমরা দেখতে পারি; যে স্তরে

প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে? স্বার্থপর প্রজাতি? স্বার্থপর গ্রুপ? স্বার্থপর একক জীব? স্বার্থপর ইকোসিস্টেম বা প্রাকৃতিক পরিবেশ? অধিকাংশ ক্ষেত্রে যুক্তি দেয়া যেতে পারে এবং অধিকাংশ স্তরই কোনো গভীর পর্যালোচনা ছাড়াই প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করার একক হিসাবে কোনো না কোনো লেখক তাদের যুক্তিতে প্রস্তাব করেছেন, কিন্তু প্রত্যেকেই তাদের চিন্তায় ভ্রান্ত। যেহেতু ডারউইনীয় বার্তাটি খুব সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত করা সম্ভব হবে স্বার্থপর কোনো কিছু হিসাবে, সেই কোনো কিছুটি হচ্ছে ‘জিন’, এবং যুক্তিসঙ্গত কারণে এই বইটি যা প্রস্তাব করছে। আপনি সেই যুক্তির সাথে একমত পোষণ করেন কিংবা না করেন, এটাই আসলে শিরোনামটির মূল ব্যাখ্যা। আমি আশা করছি এটি আরো গভীর ভুল বোঝাবুঝির বিষয়গুলো বুঝতে সহায়তা করবে। তবে যাই হোক, এখন অতীত পর্যালোচনা করা সম্ভব এমন দৃষ্টির কারণে এই একটি বিষয়ে আমার নিজের কিছু ঘাটতি আমি লক্ষ করতে পারি। এইগুলো পাওয়া যাবে প্রথম অধ্যায়ে। যা বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে বৈশিষ্ট্যসূচক বাক্যটিতে, ‘আসুন দয়াশীলতা এবং পরার্থবাদীতা শিক্ষা দেবার জন্যে আমরা চেষ্টা করি, কারণ আমরা জন্মগতভাবে স্বার্থপর। অবশ্যই দয়াশীলতা আর পরার্থবাদীতা শেখানো দোষের কিছু নয়, কিন্তু আমরা ‘জন্মগতভাবে স্বার্থপর’ শব্দটি এখানে বিভ্রান্তিকর। আংশিক ব্যাখ্যা হিসাবে, ১৯৭৮ সালের আগে না যদিও, আমি ‘ভেহিকল বা বাহক’ (সাধারণত জীব) এবং “রেপ্লিকেটর বা অনুলিপনকারী’ যারা তাদের মধ্যে বাস করে, এই দুটির মধ্যে পার্থক্যগুলো (ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কার্যত তারা জিন, পুরো ব্যপারটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে তেরোতম অধ্যায়ে, দ্বিতীয় সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে) স্পষ্টভাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম। দয়া করে মানসিকভাবে সেই সমস্যা সৃষ্টিকারী বাক্যটিকে এবং একই ধরনের অন্য বাক্যগুলোও মুছে

ফেলুন, এবং এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধারণাগুলো দিয়ে সেগুলো প্রতিস্থাপিত করুন। শৈলীর ভ্রান্তি সংক্রান্ত বিপদের কথা মাথায় রেখে, আমি খুব সহজেই দেখতে পাচ্ছি কিভাবে এবং কেন এই শিরোনামটিকে ভুল বোঝা হতে পারে। এবং এটি একটি কারণ, কেন আমার উচিৎ ছিল ‘দি ইমোর্টাল জিন’ নামটি নির্বাচন করা। ‘দি আলট্রইস্টিক ভেহিকল’ আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারতো। হয়তো এটি বেশ রহস্যময় হতো, কিন্তু, যেকোনো ক্ষেত্রেই, প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিট হিসাবে জিন এবং জীবের মধ্যকার আপাতদৃষ্টিতে বিদ্যমান। বিতর্কটির সমাধান হয়েছে (যে দ্বন্দ্বটি প্রয়াত আর্নষ্ট মেয়ারকে তার জীবনের শেষদিন অবধি ব্যস্ত রেখেছিল)। প্রাকৃতিক নির্বাচনের দুই ধরনের ‘একক’ আছে এবং তাদের মধ্যে কোনো ধরণের বিতর্ক নেই। জিন হচ্ছে ‘একক’ রেপ্লিকেটর বা অনুলিপনকারী অর্থে, অর্গানিজম বা জীব হচ্ছে ‘একক’, এর ‘বাহন’ অর্থে। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ, কোনটাকেই অবমূল্যায়ন করা যাবে না। তারা দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ধরনের একককে প্রতিনিধিত্ব করছে এবং যদি আমরা এই পার্থক্যটি শনাক্ত করতে না পারি অযথাই নৈরাশ্যজনক সন্দেহের শিকার হবে। ‘দ্য সেলফিশ জিন’ শিরোনামের আরেকটি ভালো বিকল্প হতো ‘দ্য

কো-অপারেটিভ জিন’। এটি শুনতে ধাঁধার মতই মূল ধারণার বীপরিতার্থক মনে হয়, কিন্তু এই বইয়ের একটি কেন্দ্রীয় অংশের যুক্তি স্বার্থপর জিনগুলোর মধ্যে এক ধরণের সহযোগিতার ধারণাও প্রস্তাব করেছে। এটি খুব স্পষ্টভাবেই এমন কোনো অর্থ প্রকাশ করে

যে জিনদের গ্রুপগুলো সফল হয় তাদের সদস্যদের ক্ষতি করার। মাধ্যমে বা অন্য গ্রুপগুলোর ক্ষতি করে। বরং প্রতিটি জিনকে দেখা হয়েছে তাদের নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে জিন পুলে অন্যান্য বহু জিনের প্রেক্ষাপটে– কোনো একটি প্রজাতির মধ্যে যৌন সংমিশ্রণের প্রার্থীদের সেট। ঐসব অন্য জিনরা হচ্ছে:

সেই পরিবেশের অংশ, যেখানে প্রতিটি জিনকেই টিকে থাকতে হয়, ঠিক একই ভাবে, যেমন কোন আবহাওয়া, শিকারী প্রাণী এবং তাদের শিকার, সয়াহক উদ্ভিদ এবং মাটির ব্যাকটেরিয়া, সবাই যেভাবে পরিবেশের অংশ। প্রতিটি জিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, প্রেক্ষাপটের জিনগুলো হচ্ছে সেই জিনগুলো যাদের সাথে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হবার জন্য এটি বাহন বা শরীর ভাগ করে নেয়। স্বল্পমেয়াদে, এর মানে হচ্ছে জিনোমের অন্যান্য সদস্যরা। দীর্ঘমেয়াদে, এর মানে কোনো একটি প্রজাতির জিন পুলে অন্য জিনগুলো। প্রাকৃতিক নির্বাচন সে-কারণে পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ জিনদের দল হিসাবে এদের দেখে– যাকে প্রায় বলা সম্ভব ‘সহযোগিতাপূর্ণ’– যারা সুবিধা পায় পরস্পরের উপস্থিতিতে। কোনো সময়েই এই সহযোগিতাপূর্ণ জিনদের বিবর্তন স্বার্থপর জিনের মৌলিক নীতিগুলো লঙ্ঘন করেনা। পঞ্চম অধ্যায়ে এই ধারণাটির ব্যাখ্যা প্রচেষ্টা আছে, নৌকাবাইচের নৌকাচালক বা রোয়ারদের দলের সমরুপ একটি উদাহরণ ব্যবহার করে। এবং তেরোতম অধ্যায় এই বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনা আরো খানিকটা অগ্রসর করেছে।

এখন, যেহেতু সেলফিশ বা স্বার্থপর জিনগুলোর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রবণতা আছে জিনদের মধ্যে সহযোগিতাকে বিশেষ সুবিধা দেবার, স্বীকার করতে হবে, কিছু জিন আছে তারা এই কাজটি করে না এবং তারা জিনোমের বাকী অংশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। কিছু লেখক তাদের নাম দিয়েছেন ‘আউট-ল’ বা দস্যু জিন, কেউ কেউ ‘আল্টা সেলফিশ জিন, এবং অন্যরা শুধুমাত্র ‘সেলফি’ জিন– নিজেদের স্বার্থ রক্ষাকারী জিনদের একটি গ্রুপে যে জিনগুলো সহযোগিতা করে তাদের সাথে এর সূক্ষ্ম পার্থক্যটিকে তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। আল্টা সেলফিশ জিনের উদাহরণ যেমন, ‘মাইওটিক ড্রাইভ’ জিন যা এই (মূল) বইয়ের ৩০৪-৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে এবং ‘প্যারাসাইটিক (পরজীবি) ডিএনএ’, যা মূলত প্রস্তাব করা হয়েছে (মূল বইয়ের) পৃষ্ঠা ৫৬-৭ এ এবং আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে নানা লেখকদের রচনায়, সেই দৃষ্টি আকর্ষণকারী শব্দ-যুগল ‘সেলফিশ ডিএনএ’ শিরোনামের অধীনে। আল্টা-সেলফিশ বা অতি-স্বার্থপর জিনদের নতুন আর আরো অনেক বেশী অদ্ভুত উদাহরণের আবিষ্কার এই বইটি প্রথম প্রকাশ হবার পরের বছরগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে (২)।

দ্য সেলফিশ জিন বইটিকে সমালোচনা করা হয়েছে। নরাত্বরোপমূলক ব্যক্তিকরণ দোষে এবং এটিও ব্যাখার দাবী রাখে, যদিও কোনো ক্ষমা প্রার্থনা না। আমি দুটি পর্যায়ে ব্যক্তিকরণ ব্যবহার করেছিঃ জিন পর্যায়ে এবং জীব পর্যায়ে। জিনের ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিকরণের আসলেই কোনো সমস্যা করা উচিৎ না, কারণ কোনো সুস্থ মানুষই মনে করেন না যে, ডিএনএ অণুর সচেতন ব্যক্তিত্ব আছে। এবং কোনো কাণ্ডজ্ঞানপূর্ণ পাঠকই লেখকের উপর এ-ধরণের বিভ্রান্তিকর অভিযোগ আরোপ করবেন না। আমি কোনো এক সময় বিখ্যাত অণুপ্রাণবিজ্ঞানী জাক মনো’র (৩) একটি বক্তৃতা শুনেছিলাম, যেখানে মনো বিজ্ঞানের সৃজনশীলতা নিয়ে কথা বলছিলেন। আমি সঠিক সেই শব্দগুলো মনে করতে পারছি না ঠিকই, কিন্তু তিনি যা বলেছিলেন সেটি মোটামুটি এরকম, যখন কোনো একটি রাসায়নিক সমস্যা নিয়ে তিনি ভাবার চেষ্টা করেন, নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কি করতেন, যদি তিনি একটি ইলেক্ট্রন হতেন। পিটার অ্যাটকিনস তার অসাধারণ ‘ক্রিয়েশন রিভিজিটেড’ বইটিতে একই ধরণের ব্যক্তিকরণ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন যখন তিনি আলোক রশ্মির প্রতিসরণের কথা বিবেচনা করেছিলেন, যা কিনা উচ্চ প্রতিসরাঙ্ক ইনডেক্সের কোনো মাধ্যম অতিক্রম করে, যা এর গতিকে শ্লথ করে দেয়: “রশ্মিটি এমনভাবে আচরণ করে যেন, এটি তার শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অতিক্রান্ত দূরত্বকে যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করছে। অ্যাটকিনস এখানে সমুদ্রের একটি বেলাভূমিতে কর্মরত লাইফগার্ড হিসাবে সেটি কল্পনা করেছিলেন, ডুবতে থাকা কেন সাঁতারুকে বাঁচানোর জন্য যে কিনা দৌড়াচ্ছে। সেকি সাতারু বরাবর সরাসরি দৌড় দেবে, না, কারণ সে সাঁতার কাটার চেয়ে অনেক বেশী জোরে দৌড়াতে পারবে, এবং তার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে শুকনো মাটিতে তার দৌড়ানোর অংশের সময়টি বাড়ানো, তার কি উচিৎ হবে তার নিশানার হুবহু বেলাভূমিতে বিপরীত বিন্দু অবধি দৌড়ে যেতে, যা তার সাঁতারের অংশের পরিমান কমাবে? উত্তম, তবে এখনও শ্রেষ্ঠতম নয়। পরিমাপ (যদি তার সেটি করার সময় থাকে) হয়তো সেই লাইফগার্ডকে দেখাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক অন্তবর্তীকালীন কোন কি হবে। যা দ্রুত দৌড়ানো ও তারপর ধীর গতির সাঁতার এর একটি আদর্শ সংমিশ্রণ দেখাবে। অ্যাটকিন উপসংহার টানেন এভাবে:

‘কোনো একটি বেশী ঘনত্বের মাধ্যম দিয়ে আলোকরশ্মি অতিক্রম করার সময় তার আচরণ ঠিক এরকমই। কিন্তু আলো কিভাবে সেটি জানে, আপাতদৃষ্টিতে বেশ আগে থেকেই, কোনটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম পথ? এবং আর যাই হোক, কেনই বা এটি তা করার কথা ভাববে?’

চমৎকার একটি ব্যাখ্যার বিশ্লেষণে তিনি এই সব প্রশ্নগুলো করেছিলেন, যার অনুপ্রেরণা কোয়ান্টাম তত্ত্ব।

এই ধরণের ব্যক্তিকরণ আরোপ শুধুমাত্র পুরোনো শিক্ষাপ্রদান কৌশলই নয়। ভুল করার প্রতারণাপূর্ণ প্রলোভনের চ্যালেঞ্জের মুখে এটি পেশাগত বিজ্ঞানীদেরও সঠিক উত্তরটি খুঁজে বের করার জন্য সয়াহতা করে। পরার্থবাদীতা আর স্বার্থপরতা, সহযোগিতা, প্রতিশোধ বিষয়ক ডারউইনীয় হিসাব নিকাশগুলোএমনই একটি ক্ষেত্র, ভুল উত্তরে পৌঁছানো খুব সহজ। জিনকে ব্যক্তিকরণ আরোপ করার মাধ্যমে, যদি সঠিক সতর্কতা ও সংযমের সাথে সেটি করা হয়, প্রায়ই দেখা যায় এটি আসলেই জটিলতার মধ্যে ডুবতে থাকা কোনো ডারউইনীয় তাত্ত্বিককে বাঁচানোর সবচেয়ে সহজতম উপায়। এই সতর্কতাটি মনে রেখেই আমি ডাবলিউ. ডি, হ্যামিলটনের (৪) দক্ষ উদাহরণ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম, তিনি আমার এই বইয়ে উল্লেখ করা চার বীরোচিত চরিত্রের একজন। ১৯৭২ সালে। প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধে (যে বছর আমি ‘দ্য সেলফিশ জিন’ লিখতে শুরু করেছিলাম) হ্যামিলটন লিখেছিলেন:

‘কোনো একটি জিন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত হয়, যদি তাদের অনুলিপিদের সমষ্টি সামগ্রিক জিন। সম্ভারে ক্রমবর্ধিষ্ণু একটি অংশ গঠন করে। আমরা চিন্তিত হবো সেই জিনগুলো নিয়ে, তাদের বাহকের সামাজিক আচরণের উপর যাদের প্রভাব ফেলার কথা, সুতরাং, সাময়িকভাবে জিনগুলোর উপর বুদ্ধিমত্তা এবং স্বাধীনভাবে বাছাই করার কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আরোপ করার মাধ্যমে আসুন আমরা চেষ্টা করি এই যুক্তিটাকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতে। কল্পনা করুন একটি জিন তার অনুলিপিগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি করার সমস্যাটি বিবেচনা করছে এবং কল্পনা করুন যে এটি বাছাই করে নিতে পারে…’

সত্যিকারভাবে এটাই সেই সঠিক মেজাজ যা দিয়ে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটির বেশীর ভাগ অংশ পড়া উচিৎ।

কোনো একটি জীবের উপর ব্যক্তিকরণ আরোপ করার প্রক্রিয়া সমস্যার কারণ হতে পারে। এর কারণ, কোনো জীবের, জিনের ব্যতিক্রম, মস্তিষ্ক আছে এবং সেকারণে তাদের স্বার্থপর বা পরার্থবাদী উদ্দেশ্য আছে, কিছুটা যেমন, ব্যক্তিক চিন্তা অর্থে, যা আমরা শনাক্ত করতে পারবো। দ্য সেলফিশ লায়ন বা স্বার্থপর সিংহ হয়তো আসলেই সংশয়ের কারণ হয়, এমন একটি উপায়ে, যে সংশয় দ্য সেলফিস জিন সেটি কখনো সৃষ্টি করে না। ঠিক যেমন করে কেউ পারে তার নিজেকে কাল্পনিক সেই আলোক রশ্মির অবস্থানে ভাবতে, যে কিনা বুদ্ধিমত্তার সাথে লেন্স আর প্রিজমের ধারাবহিক সারির মধ্যে তার উপযুক্ত পথটি বেছে নিতে পারে অথবা একটি কাল্পনিক জিন যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হস্তারিত হবার জন্য সুবিধাজনক একটি পথ অনুসন্ধান করে। সুতরাং আমরা প্রস্তাব করতে পারি, দীর্ঘ মেয়াদী ভবিষ্যতে তার জিনের টিকে থাকার লক্ষ্যে একটি একক সিংহী, তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক আচরণের কৌশল হিসাব নিকাশ করতে পারে। জীববিজ্ঞানে হ্যামিলটনের প্রথম উপহার হচ্ছে সুনির্দিষ্টভাবে সেই নিখুঁত গাণিতিক ব্যাখ্যা, যা একজন সত্যিকারের ডারউইনীয় সদস্য, যেমন, কোনো সিংহ, কার্যত, তার কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, যখন সে হিসাব নিকাশ করে সিদ্ধান্ত নেয় কিভাবে তার জিনের দীর্ঘদিন টিকে থাকার ব্যপারটি সর্বোচ্চভাবে সে নিশ্চিৎ করতে পারে। এই বইতে দুটি স্তরে আমি এধরনেরই হিসাব নিকাশের সমতূল্য নানা অনানুষ্ঠানিক মৌখিক শব্দাবলী ব্যবহার করেছি। (মূল বইয়ের) ১৬৮ পৃষ্ঠায় আমরা খুব দ্রুত এক স্তর থেকে অন্য স্তরে চলে গেছিঃ ‘আমরা সেই সব পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেছি, যখন তার দুর্বলতম সন্তানকে (বা রান্ট) মরতে দিলে কোনো একটি মায়ের জন্য আসলেই সুবিধাজনক হয়। আমরা হয়তো সহজাতভাবে মনে করতে পারি, এই দুর্বলতম সন্তানের নিজেরই উচিৎ টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখা, কিন্তু তত্ত্বটি আবশ্যিকভাবে এ-সম্বন্ধে কোনো পূর্বধারণা দেয়না। যখন কোনো একটি দুর্বলতম সন্তান এতই ছোট আর দুর্বল হয়ে যায় তার জীবনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও হ্রাস পায় এমন একটি পর্যায় অবধি যখন তার প্রতি পিতামাতার বিনিয়োগের ফলে সৃষ্ট সুফল অন্য সন্তানদের প্রতি একই পরিমান সম্ভাব্য বিনিয়োগের ফলে প্রাপ্ত প্রত্যাশিত সুফলের অর্ধেকের চেয়ে কম হয়। সেই দুর্বল সন্তানের মরে যাওয়া উচিৎ স্বেচ্ছায় এবং সন্মানের সাথে। সে এভাবেই তার জিনের জন্যে সবচেয়ে উপকারী কাজটি করতে পারে।

এটি পুরোপুরিভাবে একক ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মবীক্ষণের মত। এর মানে কিন্তু এমন কোনো ধারণা না যে দুর্বলতম শিশুটি সেটাই নির্বাচন করবে যা তাকে তৃপ্তি দেবে, বা যে কাজটি করলে সে ভালো অনুভব করবে। বরং একটি ডারউইনীয় পৃথিবীতে একক সদস্যরা মনে করা হয় এক ধরনের ‘এস-ইফ’ বা ‘এটা করলে কি হতে পারে বা না হতে পারে এ ধরনের হিসাব নিকাশ করে, যা কিনা তাদের বহন করা জিনদের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিণতি নিশ্চিৎ করে।

এই বিশেষ অনুচ্ছেদটি আরো সুস্পষ্ট করে তোলে জিন পর্যায়ে ব্যক্তিকরণের ধারণাটি দ্রুত পরিবর্তন করার মাধ্যমে:

‘তার মানে হচ্ছে এমন কিছু বলা যে, একটি জিন যে কিনা এমন নির্দেশনা দেয়, “শরীর, যদি তোমার অন্য ভাইবোন থেকে তুমি যদি খুব বেশী ছোট হও, তাহলে বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্য হাল ছেড়ে দাও এবং মারা যাও’– জিন সম্ভারে তার সফল হবার সম্ভাবনা রাখে। কারণ তার এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাঁচানো তার প্রতিটি ভাই এবং বোনদের শরীরে সেই জিনটি থাকার ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে। কোনো একটি দুর্বলতম সন্তানের শরীরে এই জিনটির টিকে থাকার সম্ভাবনা এমনিতে যথেষ্ট কম।

এবং এরপর অনুচ্ছেদটি তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে আসে আত্মবীক্ষণরত দুর্বল সন্তানটির দিকে:

‘কোনো একটি দুর্বলতম সন্তানের জীবনের এমন কোনো মূহুর্ত আসে যা অতিক্রম করে গেলে ফিরে আসার আর কোনো উপায় থাকে না। এই অবস্থানে পৌঁছানোর আগ অবধি তার উচিত টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রাখা। কিন্তু যখনই সে সেখানে পৌঁছায় তার উচিৎ হাল ছেড়ে দেয়া এবং সম্ভব হলে তার নিজেকে তার সঙ্গী ভাইবোন কিংবা তার পিতামাতার খাদ্য হিসাবে বিসর্জন দেয়া।’ আমি আসলেই বিশ্বাস করি এইসব দুই স্তরের ব্যক্তিকরণ প্রক্রিয়া কোনো সংশয়ের কারণ না যদি আমরা এটি সেই প্রসঙ্গেই পুরোপুরিভাবে পাঠ করি। কি হলে কি হবে– এই ধরনের হিসাব নিকাশের দুটি স্তরই ঠিক একই উপসংহারে পৌঁছায় যদি সঠিকভাবে কাজটি করা হয়। আসলেই একটি মানদণ্ডের নির্ভুলতা প্রমাণের জন্য সেটি হচ্ছে। সুতরাং আমি মনে করিনা যে ব্যক্তিকরণ এমন কোনো কিছু আমি তা ফিরিয়ে নেবো যদি আজ বইটা আমি আবার নতুন করে লিখতে বসি।

কোনো একটি বই না লেখার পর সেটি আবার না লেখা একটি ব্যপার, আর পড়ার পর না সেটি পড়ার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি প্রতিবর্তন করা ভিন্ন আরেকটি ব্যপার। নীচে উল্লেখ করা অষ্ট্রেলিয়ার কোনো এক পাঠকের প্রদত্ত রায়টির বিষয়ে আমরা কি বলতে পারি?

‘বিস্ময়কর, কিন্তু মাঝে মাঝে আমি ভাবি যদি বইটি পড়ার পর সেটি পড়ার মত করে মুছে ফেলতে পারতাম। একটি স্তরে, আমি অনুভব করতে পারি বিস্ময়ের সেই অনুভূতিকে, যা ডকিন্স এত সুস্পষ্টভাবে দেখেছেন এই সব জটিল প্রক্রিয়াগুলোর সমাধান করতে গিয়ে। কিন্তু সেই একই সাথে, আমি অনেকাংশে দ্য সেলফিশ জিনকেই এক দশকের বেশী সময় ধরে আমার বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হবার সেই ধারাবাহিক পর্বগুলো জন্য দায়ী করবো। কখনোই জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আমি সুনিশ্চিৎ হতে পারিনি, কিন্তু চেষ্টা করেছি গভীর কোনো কিছু অনুসন্ধানের জন্য, কোনো কিছুর উপর বিশ্বাস করার চেষ্টায়, কিন্তু কখনোই সেটি করে উঠতে পারিনি পুরোপুরি– আমি অনুভব করেছি যে এই বইটি এই ধরণের কোনো চিন্তাধারা অনুসরণের সব অস্পষ্ট ধারণাই বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছে, তাদের কখনোই আর আমার মনে জমাট বাধতে দেয়নি। এটি কয়েক বছর আগে আমার জীবনের একটি ভয়ঙ্কর ব্যক্তিগত সমস্যার কারণ হয়েছিল।’

পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া এমন আরো দুটি প্রতিক্রিয়া আমি এর আগে বর্ণনা করেছিলাম।

‘আমার প্রথম বইয়ের একজন বিদেশী প্রকাশক স্বীকার করেছিলেন যে, এই বইটি পড়ার পর তিনি তিন রাত ঘুমাতে পারেননি, তার মতে বইটির শীতল, নৈরাশ্যবাদী বার্তায় তিনি এতটাই অস্থির হয়েছিলেন। অন্যরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে কিভাবে আমি সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠার মত কাজটি সহ্য করি। অনেক দুরের একটি দেশের এক শিক্ষক আমাকে তিরষ্কারের সুরেই লিখেছিলেন, এই একই বই পড়ে তার এক ছাত্র তার সাথে দেখা করতে এসেছিল কাঁদতে কাঁদতে। কারণ এই বইটি তাকে প্ররোচিত করে বোঝাতে পেরেছে যে, জীবন হচ্ছে শূন্য এবং অর্থহীন। তিনি তাকে উপদেশ দিয়েছেন, সে যেন তার কোনো বন্ধুকে বইটি না দেখায়, কারণ শঙ্কা আছে এটি তাদের মনকে সংক্রমিত করতে পারে সেই একই নাস্তিবাদী নৈরাশ্যবাদ থেকে (Unweaving the raindbow) (৫)।

যদি কোনো কিছু আসলেই বাস্তব সত্য হয়ে থাকে, কোনো ধরণের ইচ্ছা প্রণোদিত ভাবনা সেটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবেনা। এটি হচ্ছে প্রথম কথা যা বলতে পারি কিন্তু দ্বিতীয়টি প্রায় সমপরিমানেই গুরুত্বপূর্ণ। যেমনটি আমি লিখেছিলাম:

‘সম্ভাবনা আছে যে আসলেই এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত নিয়তির কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু আমরা কেউ কি সত্যি আমাদের জীবনের আশা-আকাঙ্খকে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতির সাথে সংযুক্ত করে এমন কোনো ভাবনায় জীবন কাটাই? অবশ্যই আমরা সেটি করিনা। যদি না আমরা নিজেদের মানসিকভাবে সুস্থ বলে দাবী করি। আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় বহু ধরণের নিকটবর্তী, উষ্ণতর মানবিক আকাঙ্খ আর অনুভূতির দ্বারা। জীবনের এই উষ্ণতা, যা। আমাদের জীবনকে বেঁচে থাকার জন্য যোগ্য করে তোলে, সেই উষ্ণতাকে ছিনিয়ে নেবার জন্য বিজ্ঞানকে অভিযুক্ত করা খুবই অযৌক্তিভাবে ভ্রান্ত, এত বেশী চূড়ান্তভাবে বিপরীত আমার নিজের এবং অধিকাংশ কর্মরত বিজ্ঞানীদের অনুভূতির সাথে, যা আমাকে গভীরভাবে হতাশ হতে বাধ্য করে। ভ্রান্তভাবে যে ভূলের অভিযোগ আমাকে করা হয়েছে।

অন্যান্য সমালোচককে মধ্যে বার্তাবাহককে গুলি করার একই ধরনের প্রবণতা দৃশ্যমান, যারা তাদের দৃষ্টিতে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটির মূল ধারণা যে ক্ষতিকর সামাজিক,রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, তার প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৭৯ সালে মিসেস থ্যাচারের নির্বাচনে (যুক্তরাজ্যে) জয়লাভ করার পর খুব শীঘ্রই, আমার বন্ধু স্টিফেন রোজ, নিউ সায়েন্টিস্ট পত্রিকায় এই মন্তব্য করেছিলেন:

‘আমি ইঙ্গিত করছিনা যে, সাচ্চি অ্যান্ড সাচ্চি সামাজিক জীববিজ্ঞানীদের একটি টিমকে নিয়োগ করেছেন থ্যাচারের (৬) বক্তৃতা লেখার জন্য, এমনকি অক্সফোর্ড এবং সাসেক্সের কিছু পণ্ডিত এখন আনন্দ করতে শুরু করেছেন স্বার্থপর জিনের সরল সত্যের এমন ব্যবহারিক প্রকাশে, আমাদের যা বোঝাতে তারা সংগ্রাম করেছিলেন। চটকদার কোনো তত্ত্ব আর রাজনৈতিক ঘটনা কাকতলীয় যোগাযোগ সাধারণত এর চেয়ে জটিল হয়ে থাকে। আমি যদিও বিশ্বাস করি, যখন ১৯৭০ এর দশকের শেষে যখন ডানপন্থী মতবাদের উত্থানের ইতিহাস লেখা হবে, আইন শৃঙ্খলা থেকে মনেটারিজমের (৭) দিকে সরে আসা এবং (আরো বিতর্কিত) স্টেটিজমের (৮) উপর আক্রমণের সূত্রপাত, সেদিন বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার ফ্যাশনে, শুধুমাত্র যদি বিবর্তনের তত্ত্বে গ্রুপ থেকে কিন সিলেকশন মডেলে সরে আসা বিষয়টি দেখা হবে সেই পরিবর্তনের অংশ হিসাবে, যা থ্যাচারপন্থীদের ও তাদের স্থির, উনবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতামূলক ও মানববিদ্বেষী অসহিষ্ণু মানবিক চরিত্রের ধারণাটি ক্ষমতা দখল করতে সহায়তা করেছে।

সাসেক্সের ডন হচ্ছেন প্রয়াত জন মেনার্ড স্মিথ (৯), যার গুণমুগ্ধ ছিলেন স্টিফেন রোস এবং আমি, দুজনেই। এবং বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে তিনি এর উত্তর দিয়েছিলেন। নিউ সায়েন্টিষ্টকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে তিনি প্রতিমন্তব্য করেছিলেন: “আমরা তাহলে কি করা উচিৎ ছিল? কাঙ্খিত উত্তর পাবার আশায় সমীকরণগুলো প্রভাবিত করাই কি তাহলে উচিৎ ছিল আমাদের?’ ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ের একটি প্রধানতম বার্তা হচ্ছে (এ ডেভিলস চ্যাপলিন’ বইয়ের শীর্ষ প্রবন্ধটি আরো জোরালো করে যা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিল) যে, ডারউইনবাদ থেকে নৈতিকতা আর মূল্যবোধ শেখা আমাদের উচিৎ হবে না, যদি না সেটি নেতিবাচক অর্থে হয়ে থাকে। আমাদের মস্তিষ্ক যথেষ্ট পরিমান বিবর্তিত হয়েছে, আমরা আমাদের স্বার্থপর জিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে সক্ষম। বাস্তব সত্যটি হচ্ছে, আমরা যে সেটি করতে পারি আমাদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের আচরণটি সেটি সুস্পষ্ট করে। সেই একই মূলনীতি আরো বড় পরিসরে কাজ করতে পারে এবং সেটাই করা উচিৎ। ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় সংস্করণের ব্যতিক্রম, এই বার্ষিকী সংস্করণ এই ভূমিকাটি ছাড়া আর নতুন কোনো কিছু এই বইয়ে যুক্ত করা হয়নি এবং পর্যালোচনা থেকে কিছু অংশ নির্বাচন করেছেন আমরা তিনবারের সম্পাদক ও সমর্থক লতা মেনন। তা ছাড়া আর কেউই পারবেন না মাইকেল রজার্স এর জায়গা নেবার জন্য, অসাধারণ মেধাবী ‘কে (k) সিলেক্টেড’ (১০) সম্পাদক, যার অদম্য বিশ্বাস যে এই বইটি প্রথম সংস্করণের ট্রাজেক্টরীর জন্য বুস্টার রকেট হিসাবে কাজ করবে।

এই সংস্করণটি যদিও– এবং আসলেই আমার জন্য বিশেষ আনন্দের কারণও– এখানে রবার্ট ট্রিভার্স (১১) এর মূল প্রাককথনটি পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছে তার মূল জায়গায়। আমি বলেছিলাম যে, বিল হ্যামিলটন হচ্ছেন এই বইয়ে চার বৌদ্ধিক বীরোচিত চরিত্রের একজন, রবার্ট (বব) ট্রিভার্স হচ্ছে আরো একজন। নবম, দশম এবং বারোতম অধ্যায়ে মূলত তার ধারণাই প্রাধান্য পেয়েছে। তার লেখাটি এই বইয়ের জন্য খুব যত্ন সহকারে সৃষ্ট ভূমিকাই শুধু না, তিনি এই মাধ্যমটিকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর আরেকটি অসাধারণ ধারণা সবাইকে জানাতে, আত্ম-প্রবঞ্চনার (সেলফ ডিসেপশন) বিবর্তন সংক্রান্ত তত্ত্বটি। বার্ষিকী সংস্করণের এই বইটিকে সম্মানিত করতে তার মূল ভূমিকাটি ব্যবহার করার অনুমতি দেবার জন্য আমি তার প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

রিচার্ড ডকিন্স,
অক্সফোর্ড, অক্টোবর ২০০৫

পাদটীকা:

১. পটল্যাচ হচ্ছে উপহার দান করার ভোজসভা যা প্রচলন আছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর পশ্চিম উপকূলের আদিবাসীদের মধ্যে।

২. অস্টিন বার্ট এবং রবার্ট ট্রিভার্স (২০০৬) Genes in Conflict: The Biology of Selfish Genetic Element ( Harvard Univesity Press) বইটি প্রকাশিত হয়েছিল পরে, সেকারণে এই বইটিতে প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পর সেখান থেকে তথ্য যুক্ত করা হয়নি। কোনো সন্দেহ নেই বইটি এই বিষয়ে চূড়ান্ত নির্ধারণী হিসাবে প্রমাণিত হবে।

৩. জ্যাক লুসিয়েন মনো (১৯১০-১৯৭৬) ফরাসী জীববিজ্ঞানী।

৪. উইলিয়াম ডোনাল্ড বিল’ হ্যামিলটন (১৯৩৬-২০০০) ইংরেজ বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক জীববিজ্ঞানী হিসাবে যাকে মনে করা হয়ে থাকে।

৫. Unweaving the Rainbow (subtitled “Science, Delusion and the Appetite for Wonder”)– 1998; Richard Dawkins)

৬. মার্গারেট হিলডা থ্যাচার (১৯২৫-২০১৩) ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, যুক্তরাজ্যের প্রধান মন্ত্রী (১৯৭৯-১৯৯০)।

৭. মনেটারী অর্থনীতিতে মনেটারিজম হচ্ছে সেই মতবাদ যেখানে কি পরিমান অর্থ সঞ্চালন করবে অর্থনীতিতে সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

৮. রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্টেটিজম শব্দটি ব্যবহার করা হয় সেই মতবাদকে বোঝাতে যেখানে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক অথবা/এবং সামাজিক নীতি নির্ধারণ করবে।

৯. জন মেনার্ড স্মিথ ( ১৯২০-২০০৪) ব্রিটিশ তাত্ত্বিক বিবর্তন জীববিজ্ঞানী।

১০. কে সিলেক্টেড : এই ধারণাটি এসেছে দুই ধরনের প্রজনন কৌশলের একটি সাধারণ শ্রেণীবিন্যাস থেকে। যারা কে- সিলেক্টেড, তাদের জনসংখ্যা সেই পরিবেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বা ক্যারিয়িং ক্যাপাসিটির কাছাকাছি থাকে। তারা অল্পকিছু প্রজন্মের জন্ম দেয়, তবে তাদের প্রজন্ম শক্তিশালী ও দীর্ঘজীবি হয়।

১১. রবার্ট লুডলো ‘বব’ ট্রিভার্স (জন্ম ১৯৪৩) যুক্তরাষ্ট্রের বিবর্তন জীববিজ্ঞানী ও সোসিওবায়োলজিস্ট।

.

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটি প্রকাশের প্রায় বারো বছরের মধ্যেই এই বইটির কেন্দ্রীয় বার্তাটি পাঠ্যপুস্তকের মূলধারার একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটি বেশ ধাঁধার মতই, কিন্তু খুব সুস্পষ্টভাবে না। এটি সেই বইগুলোর মত কোনো বই ছিল না, যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বৈপ্লবিক আখ্যা দিয়ে যে বইগুলোকে তীব্রভাবে তিরস্কৃত করা হয়েছে, এবং তারপরে যে বইটি পরে ধীরে ধীরে বিরোধীদের মত পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছিল, যতক্ষণ না অবধি এটি এত বেশী মূলধারার চিন্তায় তার জায়গা করে নিয়েছে যে, বইটি নিয়ে প্রথমে কেন এত সমালোচনার ঝড় উঠেছিল আমাদের পরে বিস্মিত হয়ে সেটি ভাবতে হয়। আমি বলবো দ্য সেলফিশ জিন বরং এর ব্যতিক্রমই। একেবারে শুরু থেকেই এটি বেশ সন্তোষজনক পর্যালোচনা পেয়েছে, এবং শুরুতে, এটিকে কেউই বিতর্কিত বই হিসাবে দেখেননি। তবে বিতর্কিত বিষয়বস্তু হবার তার এই কুখ্যাতিটি বাড়তে বেশ কিছু বছর লেগেছে, এবং এখন, ব্যাপকভাবে এটিকে মনে করা হয় পুরোপুরিভাবে বৈপ্লবিক, চরমপন্থী একটি কাজ। কিন্তু এই বছরগুলোতেই যখন এর চরমপন্থী বই হিসাবে কুখ্যাতি বেড়েছে, এর সত্যিকারের বিষয়বস্তু ধীরে ধীরে তার চরমপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসেছে, এবং ক্রমান্বয়ে সাধারণ বৈজ্ঞানিক চিন্তায় স্বাভাবিক একটি অবস্থানে এর জায়গা করে নিয়েছে।

স্বার্থপর জিনের তত্ত্বই হচ্ছে ডারউইনের তত্ত্ব; এটি এমনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, ডারউইন নিজে নির্বাচিত করেননি, কিন্তু তার যথার্থতা, আমি যেমন ভাবতে চাই, যদি তিনি এটি পড়তেন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে এটি শনাক্ত করতে পারতেন এবং তৃপ্তিবোধ করতেন। এটি আসলে অর্থডক্স নিও-ডারউইনিজমের (মূলধারার নব্য-ডারউইনবাদ) একটি যৌক্তিক সম্প্রসারণ, কিন্তু নতুন দৃশ্যকল্পের অভিব্যক্তির মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো একটি একক জীব সদস্যর উপর মনোযোগ না নিয়ে, এটি নজর দিয়েছে প্রকৃতির একটি জিন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি। এটি ভিন্নভাবে দেখার একটি উপায়, ভিন্ন কোনো তত্ত্ব নয়। ‘দি এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপ’ বইটির শুরুর পৃষ্ঠাগুলোয় আমি এটি ব্যাখ্যা করেছিলাম নেকার কিউবের একটি রুপক ব্যবহার করে।

এটি পাতায় কালি দিয়ে আকা একটি দ্বি-মাত্রিক প্যাটার্ন বা নকশা, কিন্তু এটিকে স্বচ্ছ, ত্রি-মাত্রিক কিউব হিসাবে অনুভূত হয়। এটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন, এটি বিভিন্ন দিক বরাবর তার মুখ পরিবর্তন করবে। তাকিয়ে থাকুন এবং এটি আবার মূল কিউবের রুপে ফিরে আসবে। উভয় কিউবই রেটিনায় দ্বি-মাত্রিক উপাত্তের সাথে সমানভাবে সঙ্গতিপূর্ণ, সুতরাং মস্তিষ্ক শুধু আনন্দের সাথে এই দুটি রুপ পালাবদল করে। কোনটাই অন্যটির চেয়ে বেশী সঠিক নয়। আমার মূল বক্তব্যটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিষয়টি আমরা দুই ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি: জিনের দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং একক জীব সদস্যদের দৃষ্টিকোণ থেকে। যদি অনুধাবনটি সঠিক হয় তারা সমার্থক। একই সত্যের দুটি দৃষ্টিভঙ্গি। আমি একটি থেকে অন্যটিতে অনায়াসে যেতে পারবেন এবং তারপরও এটি সেই একই নিও ডারউইনিজমই থাকবে।

আমি এখন মনে করি এই রুপক আসলে খুব বেশী সতর্ক রুপ ছিল। নতুন কোনো তত্ত্ব প্রস্তাব করার পরিবর্তে বা কোনো নতুন বাস্তব তথ্য উদঘাটন ছাড়াও একজন বিজ্ঞানী প্রায়শই পুরোনো কোনো তত্ত্ব বা বাস্তব সত্যকে নতুন কোনো উপায়ে দেখার পথ উদঘাটনের মাধ্যমে খুব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। নেকার কিউব মডেলটির উদাহরণ কিছুটা বিভ্রান্তিকর কারণ এটি প্রস্তাব করছে যে দুইটি উপায়ে কোনো কিছু দেখা আসলে সমানভাবে উত্তম। নিশ্চিভাবে, এই রুপকটি বিষয়টিকে বোঝাতে আংশিক সফল হয়: দৃষ্টিকোণ, যা তত্ত্বের ব্যতিক্রম, কোনো পরীক্ষা দ্বারা যাচাই করা সম্ভব না। এমন কোনো কিছুর সত্যতা নির্ণয় এবং মিথ্যা প্রমাণে আমরা আমাদের পরিচিত মানদণ্ডের আশ্রয় নিতে পারিনা। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, তার সবচেয়ে সেরা অবস্থানে, কোনো একটি তত্ত্বের চেয়ে বড় কিছু অর্জন করতে পারে। এটি চিন্তার জগতে সম্পূর্ণ নতুন কোনো পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, যেখানে অনেক উত্তেজনা আর পরীক্ষাযযাগ্য তত্ত্বের জন্ম হয় এবং কল্পনা করা হয়নি এমন বাস্তব তথ্যও উন্মোচিত হতে পারে। নেকার কিউবের রুপকটি এই বিষয়টিকে পুরোপুরিভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। এটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ধারণাটি সঠিকভাবে উপস্থাপন করে, কিন্তু এর সত্যিকারের মূল্যটি উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। আমরা যে বিষয় নিয়ে কথা বলছি সেটি সমরুপ দৃষ্টিভঙ্গির অদল বদল নয়, বরং চূড়ান্ত ক্ষেত্রে একটি ট্রান্সফিগারেশন বা রূপান্তর। আমার এই সামান্য অবদানের জন্য এমন কোনো মর্যাদার দাবী দ্রুততার সাথে অস্বীকার করছি। তবে যাই হোক, এই ধরনের কারণে আমি বিজ্ঞান এবং জনপ্রিয়করণের মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট বিভাজন সৃষ্টি করা সপক্ষে নই। এ যাবৎ যে ধারণাগুলো শুধুমাত্র টেকনিকাল বা পেশাগত জার্নালেই আবির্ভূত হয়েছে, সেই ধারণাগুলোকে ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন একটি শিল্প। এর জন্য ভাষার দুরদর্শিতাপূর্ণ নতুন ব্যবহার এবং দৃষ্টি উন্মোচনকারী রুপক উদাহরণ প্রয়োজন।

আপনি যদি ভাষার নতুনত্ব আর রুপক যথেষ্ট পরিমান দূরে নিতে পারেন, আপনিও নতুনভাবে দেখার একটি উপায় খুঁজে পাবেন। এবং এই নতুনভাবে দেখা, যা আমি প্রস্তাব করেছিলাম, এর নিজের অধিকারেই বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রাখতে পারে। আইনস্টাইন নিজে সাধারণ মাপের জনপ্রিয়কারী ছিলেন না। এবং আমি প্রায়ই সন্দেহ করেছি তার উজ্জল রুপকের ব্যবহার আমাদের বাকী সবাইকে বুঝতে সাহায্য করার চেয়ে বেশী কিছু করেছিল। সেগুলো কি তার সৃজনশীল প্রতিভাকেও চালিত করেনি?

তিরিশের দশকে আর. এ. ফিশার (১) ও নব্য-ডারউইনবাদের অন্যান্য অগ্রদূতদের লেখার মধ্যে ডারউইনবাদের জিন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত আমরা পাই। কিন্তু ষাটের দশকে ডাবলিউ ডি. হ্যামিলটন (২) এবং জি. সি. উইলিয়ামস (৩) তাদের লেখায় এটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছিলেন। আমার জন্য তাদের অন্তর্দৃষ্টি একটি ভবিষ্যৎসূচক গুণাবলী বহন করে। কিন্তু তাদের অভিব্যক্তিকে আমার অনেক বেশী সংক্ষিপ্ত, স্বল্পভাষী মনে হয়েছে, যা যথেষ্ট উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ করা হয়নি। আমি স্থির বিশ্বাসে পৌঁছেছিলাম যে, তাদের প্রস্তাবনাগুলোর একটি বিস্তারিত আর বিকশিত সংস্করণ জীবনের ইতিহাস ব্যাখ্যায় সর্বক্ষেত্রেই কার্যকরী হতে পারে, হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে উভয় ক্ষেত্রেই। বিবর্তনের জিনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিটির ব্যাখ্যা ও সমর্থনে আমি একটি বই লিখবো। এটি মূলত নজর ঘনীভূত করবে সামাজিক আচরণের উদাহরণের উপর, যার উদ্দেশ্য হবে জনপ্রিয় ডারউইনবাদিতায় সর্বব্যাপী অবচেতনে গ্রুপ সিলেকশনবাদের (গ্রুপ-নির্বাচন) ভ্রান্ত ধারণাটি সংশোধন করা। আমি বইটি শুরু করেছিলাম ১৯৭২ সালে যখন শিল্প কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের জন্যে দৈনন্দিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট আমার ল্যবরেটরী নির্ভর গবেষণা ব্যহত করেছিল। দুঃখজনকভাবে (একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে) এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতির পরিসমাপ্তি ঘটেছিল শুধুমাত্র দুটি অধ্যায় লেখার পরপরই। আমি পুরো প্রজেক্টটি, ১৯৭৫ সালে যখন দীর্ঘদিনের ছুটি বা সাবাটিকাল পাই, সেই সময়ের জন্য তুলে। রেখেছিলাম। ইতিমধ্যে বিশেষ করে জন মেনার্ড স্মিথ এবং রবার্ট ট্রিভার্সের কল্যাণে তত্ত্বটি অনেকটুকু সম্প্রসারিত হয়েছিল। আমি এখন সেই সময়টাকে দেখি সেই সব রহস্যময় পর্বগুলোর একটি হিসাবে যেখানে নতুন সব ধারণাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আমি একধরনের তীব্র উত্তেজনার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ‘দ্য সেলফিস জিন’ লিখেছিলাম।

যখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস আমাকে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিল, তারা জানিয়েছিলেন, সাধারণ প্রথাগত পন্থায় বেশ ব্যাপকভাবে বইটির প্রতিটি পাতা সংশোধন বা পরিমার্জন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কিছু বই আছে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা আবশ্যিকভাবে বেশ কিছু ধারাবাহিক সংস্করণ হিসাবে প্রকাশিত হবার জন্য চিহ্নিত, তবে ‘দ্য সেলফিশ জিন তাদের একটি নয়। প্রথম সংস্করণ যে সময় লেখা হয়েছিলো, সেই সময়ের তারুণ্যময় একটি বৈশিষ্ট্য এটি ঋণ করেছিল। বিদেশের বাতাসে তখন বিপ্লবের ঝাঁপটা, ওয়ার্ডসওয়ার্থের তীব্র সুখের ভোরের একটি আলোকচ্ছটা অনুভূত হয়েছিল তখন। সেই সময়ের একটি শিশুকে পরিবর্তন করা, নতুন তথ্য যুক্ত করে তাকে স্কুল করা বা জটিলতা আর সতর্কবাণী ব্যবহার করে একে কুচকানো খুব দুঃখজনক কাজ হবে। সুতরাং মূল লেখ্য অংশ যেমন ছিল তেমনই থাকবে, সেই সব লিঙ্গবাদী সর্বনাম, অস্বস্তিকর অংশসহ সব কিছুই। বইটি এর শেষে উল্লেখিত নোটগুলো সব সংশোধন, প্রতিক্রিয়া, প্রত্যুত্তর এবং বিকাশ এই সব বিষয়গুলোর দিকে নজর দিবে। এবং পুরোপুরি নতুন অধ্যায় যুক্ত করা উচিৎ হবে, এমন কোনো বিষয়ে যার নিজের সময়ের নতুনত্ব, বৈপ্লবিক ঊষালগ্নের সেই মেজাজটি আরো সামনে অগ্রসর করে নিয়ে যাবে। এর ফলাফল হচ্ছে অধ্যায় ১২ এবং ১৩। এই দুটি অধ্যায়ের জন্যে আমি আমার অনুপ্রেরণা আহরণ করছি এই মধ্যবর্তী সময়ে প্রকাশিত একটি বই, যা সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক হিসাবে আমার মনকে নাড়া দিয়েছিল: রবার্ট অ্যাক্সেলরডের (৪) “দি ইভোলুশন অব কোঅপারেশন, কারণ এটি আমাদের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমাকে এক ধরনের আশাবাদ দিয়েছিল; এবং আমার নিজের ‘দি এক্সটেন্ডেড ফিনোটাইপ’, কারণ আমার জন্য এই বইটি সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল সেই বছরগুলোয়– এর প্রভাব যাই হোক না কেন– সম্ভবত এটাই আমার সর্বশ্রেষ্ট রচনা–যা আমি আর কখনো লিখতে পারবো।

‘নাইস গাইস ফিনিশ ফার্স্ট’ (বা ভালোরা সফল হয়) এই শিরোনামটি আমি ঋণ করেছি বিবিসি হরাইজন টেলিভিশন প্রোগ্রাম থেকে, যা ১৯৮৫ সালে সম্প্রচারিত হয়েছিল। এটি পঞ্চাশ মিনিট দীর্ঘ একটি প্রামাণ্যচিত্র, যার বিষয়বস্তু ছিল সহযোগিতা বা কোঅপারেশন বিবর্তনে গেম-তাত্ত্বিক (গেম থিওরি) দৃষ্টিভঙ্গি। জেরেমি টেইলর এটি প্রযোজনা করেছিলেন। এই প্রামাণ্য চিত্রটির একই প্রযোজকের আরেকটি কাজ, ‘দ্য ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার’ প্রামাণ্য চিত্রটির নির্মাণের সময় নতুন করে তার পেশাগত দক্ষতার প্রতি আমার শ্রদ্ধার জন্ম হয়েছিল। তাদের শ্রেষ্ঠ সময়ে হরাইজন প্রযোজকরা (তাদের কিছু প্রোগ্রাম আমেরিকাতেও দেখা যেতে পারে, যেখানে প্রায়ই নতুন করে তাদের প্যাকেজ করা হয়েছে ‘নোভা’ নামে) তারা যে বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করতেন সেই বিষয়ের কোনো অগ্রসর বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতেন। শুধুমাত্র অধ্যায় বারোরই শিরোনাম না, জেরেমি টেইলর ও হরাইজন টিমের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতার কাছেও আমি অনেক বেশী ঋণী এবং কতজ্ঞ।

আমি সম্প্রতি একটি অস্বস্তিকর বাস্তব তথ্যের কথা জেনেছিঃ কিছু প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা আছেন বিভিন্ন প্রকাশনার সাথে তাদের নিজেদের জুড়ে দেবার যাদের অভ্যাস আছে, যে প্রকাশনায় তাদের যখন কোনো অবদানই নেই। আপাতদৃষ্টিতে বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের বিজ্ঞানী একটি প্রকাশনার জন্য যৌথ লেখক হিসাবে স্বীকৃতি দাবী করেন, যখন সেখানে তাদের অবদান হয়তো ল্যাবের জায়গা যোগান দেয়া, গ্রান্টের অর্থ যোগাড় কিংবা পাণ্ডুলিপিতে সম্পাদনার দৃষ্টি বোলানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমি যা জানি, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক সুখ্যাতি নির্মিত হয়েছে ছাত্র এবং সহকর্মীদের পরিশ্রমের দ্বারা! আমি জানি কিভাবে আমরা এই অসতোর সমাধান করতে পারি। হয়তো জার্নাল সম্পাদকরা কোনো একটি প্রবন্ধের প্রতিটি লেখকের কাছ থেকে সেখানে এককভাবে তাদের অংশগ্রহন কতটুকু সে বিষয়ে স্বাক্ষরিত হলফনামা দাবী করতে পারেন। কিন্তু এটি প্রসঙ্গক্রমে বলা, এই বিষয়টি এখানে উল্লেখ করার প্রধান কারণ হচ্ছে একটি পার্থক্যকে সুস্পষ্ট করা। হেলেনা ক্রোনিন (৫) অনেক কিছুই করেছেন প্রতিটি বাক্যকে উন্নত করার জন্য– প্রতিটি শব্দ– যেমনটি তার উচিৎ মনে হয়েছে, কিন্তু এই নতুন অংশের যৌথ লেখক হিসাবে খুব দৃঢ়ভাবে তিনি তার নিজের নাম সংযুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আমি গভীরভাবে তার প্রতি কৃতজ্ঞ, এবং দুঃখিত তার অবদানের প্রতি আমার এই স্বীকৃতি এখানে সীমাবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। আমি আরো ধন্যবাদ জানাই মার্ক রিডলী, মারিয়ান ডকিন্স এবং অ্যালান গ্রাফেনের প্রতি, বিশেষ কিছু অনুচ্ছেদে তাদের উপদেশ এবং গঠনমূলক সমালোচনার জন্য। থমাস ওয়েবস্টার, হিলারী ম্যাকগ্লিন এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের অন্যান্যদের প্রতি আমার ধন্যবাদ, যারা হাসিমুখে আমার খেয়ালী ইচ্ছা ও দীর্ঘসূত্রিতা সহ্য করেছেন।

রিচার্ড ডকিন্স (১৯৮৯)

পাদটীকা:

১. রোনাল্ড আইলমার ফিশার (১৮৯০-১৯৬২) আর এ ফিশার নামে তিনি পরিচিত, ইংরেজ পরিসংখ্যানবিদ ও জীববিজ্ঞানী, যিনি গণিত ব্যবহার করেছিলেন মেন্ডেলিয় জিনতত্ত্ব ও ডারউইনী প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটিকে সংশ্লেষণ করার জন্য, যা সাহায্য করেছিলেন বিবর্তনের নব্য ডারউইনীয় সংশ্লেষণের যা এখন পরিচিত মডার্ন ইভোশনারী সিনথেসিস হিসাবে।

২. উইলিয়াম ডোনাল্ড ‘বিল’ হ্যামিলটন (১৯৩৬-২০০০) বৃটিশ বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিবর্তন তাত্ত্বিক হিসাবে তাঁকে চিহ্নিত করা হয়। হ্যামিলটনের সবচেয়ে বড় অবদান প্রকৃতিতে দৃশ্যমান কিন সিলেকশন ( একই জিন বহন কারীদের মধ্যে পারস্পরিক পরার্থবাদীতা) এবং অ্যালুটুইজিম বা পরার্থবাদেও জিনগত ভিত্তিটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা। এবং এই অসাধারণ অন্তর্দষ্টিটি পরবর্তীতে জিন-কেন্দ্রিক বিবর্তনীয় ধারণাটি সুসংগঠিত করেছিল। তাকে সোসিওবায়োজলজীর অগ্রদূত হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়, যে ধারণাটি পরে ই ও উইলসন জনপ্রিয় করেছিলেন। হ্যামিলটন সেক্স-রেশিও এবং বিবর্তন নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৯৮৪ থেকে তার মৃত্যু অবধি তিনি অক্সফার্ডের রয়্যাল সোসাইটি রিসার্চ অধ্যাপক ছিলেন।

৩. জর্জ ক্রিস্টোফার উইলিয়ামস (১৯২৬-২০১০) আমেরিকার বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক অ্যাট স্টোনি ব্রুকের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি সুপরিচিত ছিলেন গ্রুপ সিলেকশন ধারণাটির ঘোরতর বিরোধী হিসাবে। তার গবেষণা ৬০ এর দশকে জিন-কেন্দ্রিক বিবর্তনের ধারণাটিকে সংগঠিত হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

৪. রবার্ট মার্শাল আক্সেলরড (১৯৪৩) যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি সুপরিচিত তার সহযোগিতার বিবর্তন নিয়ে আন্তঃশাখা গবেষণায়।

৫. হেলেনা ক্রোনিন (১৯৪২): ডারউইনীয় দার্শনিক। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের ডারউইন সেন্টার ও সেন্টার অব ফিলোসফি অব ন্যাচারাল অ্যান্ড সোস্যাল সায়েন্স এর সহ-পরিচালক। তার সুপরিচিত দুই বই: The Ant and the Peacock: Altruism 998 Sexual Selection from Darwin to Today (1991)

.

প্রথম সংস্করণের প্রাককথন

শিম্পাঞ্জি এবং মানুষ তাদের বিবর্তনীয় ইতিহাসের ৯৯.৫ শতাংশই ভাগাভাগি করে, তারপরও বেশীর ভাগ মানুষই শিম্পাঞ্জিদের বিকৃত এবং অপ্রয়োজনীয় একটি অদ্ভুত ব্যতিক্রম হিসাবে মনে করেন, আর সর্বশক্তিমানের কাছাকাছি পৌঁছাবার সিঁড়ির একটি ধাপ হিসাবে নিজেদেরকে দেখেন। কিন্তু বিবর্তন বিশেষজ্ঞের কাছে কখনোই বিষয়টি এমন হতে পারে না। নৈর্ব্যক্তিক মানদণ্ডের কোনো অস্তিত্বই নেই, যার উপর ভিত্তি করে অন্য কোনো একটি প্রজাতির উপর আমরা আরেকটি প্রজাতির শ্রেষ্ঠত দাবী করতে পারি। শিম্পাঞ্জি এবং মানুষ, টিকটিকি এবং ছত্রাক, আমরা সবাই প্রায় তিন হাজার কোটি বছর ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচন নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছি। প্রতিটি প্রজাতির অভ্যন্তরে কিছু একক সদস্য অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশী পরিমান সন্তান উৎপাদন করতে সক্ষম হয়, সুতরাং প্রজনন সফলদের বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যাবলী (জিনগুলো) পরবর্তী প্রজন্মে সংখ্যায় আরো বৃদ্ধি লাভ করে। এটাই প্রাকৃতিক নির্বাচন: জিনদের নন-র্যানডোম (বা নির্বিকার বা এলোমেলো নয়) বৈষম্যমূলক বা পার্থক্যসূচক প্রজনন। প্রাকৃতিক নির্বাচনই আমাদের তৈরী করেছে, এবং এই প্রাকৃতিক নির্বাচনকেই আমাদের বুঝতে হবে যদি নিজেদের পরিচয়কে আমরা বুঝতে চাই।

যদিও ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন তত্ত্বটি সামাজিক আচরণ সংক্রান্ত গবেষণায় একান্ত জরুরী (বিশেষ করে যখন এটি সংযুক্ত হয় মেন্ডেলিয় জিনতত্ত্বের সাথে), তা সত্ত্বেও খুব বেশী ব্যাপকভাবে এটি অবহেলিত হয়ে এসেছে। সমাজ বিজ্ঞানের একটি পুরো শিল্প প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে, সামাজিক এবং মনোজাগতিক পৃথিবীর প্রাক-ডারউইনীয় এবং প্রাক-মেন্ডেলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের প্রতি নিবেদিত হয়ে। এমনকি জীববিজ্ঞানের অভ্যন্তরেও ডারউইনীয় তত্ত্বের অবহেলা ও অপব্যবহার বিস্ময়কর। এই ধরনের একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির উদ্ভবের যে কারণই থাকুক না কেন, সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে এটি শেষ হতে চলেছে। ক্রমবর্ধিষ্ণু সংখ্যার জীববিজ্ঞানীরা ডারউইন এবং মেন্ডেলের অসাধারণ কাজগুলো সম্প্রসারিত করে চলেছেন, বিশেষ করে আর. এ. ফিশার, ডাবলিউ ডি, হ্যামিলটন, জি, সি, উইলিয়ামস এবং জে. মেনার্ড স্মিথ। এখন রিচার্ড ডকিন্স প্রথমবারের মত প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর নির্ভরশীল সামাজিক তত্ত্বটির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরল এবং সহজপাঠ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।

সামাজিক তত্ত্বের এই সব নতুন গবেষণার মূল বিষয়গুলোকে ডকিন্স ক্রমান্বয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করেছেন: পরার্থবাদী এবং স্বার্থপর আচরণের ধারণাগুলো, আত্ম-স্বার্থের জিনতাত্ত্বিক সংজ্ঞা, আক্রমণাত্মক আচরণের বিবর্তন, কিনশিপ বা আত্মীয়তার তত্ত্ব (যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত পিতামাতা-সন্তান সম্পর্কগুলো এবং সামাজিক কীটপতঙ্গের বিবর্তন), লিঙ্গ অনুপাত তত্ত্ব, পারস্পরিক পরার্থবাদীতা, প্রবঞ্চনা বা ছলনা এবং লিঙ্গ বৈষম্যগুলোর প্রাকৃতিক নির্বাচন। মূল ভিত্তি নির্মাণ করা তত্ত্বটি সম্বন্ধে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে সৃষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে, ডকিন্স তার এই নতুন কাজটিকে উন্মোচন করেছেন প্রশংসনীয় সুস্পষ্ট স্বচ্ছতা এবং শৈলীর মাধ্যমে। জীববিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষিত হয়েও তিনি এই বইয়ের পাঠকদের সমৃদ্ধ আর মনোমুগ্ধকর সাহিত্যের স্বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন। প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে যেখানে তিনি ভিন্নমত পোষণ করেছেন (যেমন তিনি আমার নিজের একটি যৌক্তিক বিভ্রান্তির সমালোচনা করেছেন, তিনি সবসময়ই প্রায় সঠিক নিশানায় ছিলেন। ডকিন্স নিজেও যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন তার নিজের প্রস্তাবনার যৌক্তিক বিশ্লেষণটি সুস্পষ্ট করতে, যেন পাঠকরা, সেই প্রস্তাবিত যুক্তিগুলো প্রয়োগ করে তার যুক্তিগুলোকে আরো সম্প্রসারণ করতে পারেন (এমনকি ডকিন্সের বিরুদ্ধেও তার যুক্তিগুলো ব্যবহার করতে পারেন)। যুক্তিগুলো নিজেরাই সম্প্রসারিত বহু দিক বরাবর। যেমন, যদি ( যেমন, ডকিন্স যুক্তিটি ব্যবহার করেছেন) জীবদের পারস্পরিক যোগাযোগের মৌলিক বিষয়টি ‘ছলনা’ হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই ছলনা শনাক্ত করার বৈশিষ্ট্যটি বিবর্তনের উপর শক্তিশালী নির্বাচনী চাপ থাকবে এবং এই কারণে এর উচিৎ হবে খানিকটা মাত্রার আত্ম-প্রবঞ্চনাকে নির্বাচন করা। যা কিছু বাস্তব তথ্য এবং উদ্দেশ্যকে অবচেতন করে দেয় যেন সেটি– আত্মজ্ঞানের সূক্ষ্ম সংকেত দ্বারা– ছলনার ব্যবহার বা চর্চা হওয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনা। এভাবে, প্রথাগত সেই দৃষ্টিভঙ্গিটি যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই ধরনের স্নায়ুতন্ত্রকে বাছাই করে, চারপাশের পৃথিবী সম্বন্ধে যা আরো বেশী সুস্পষ্ট ধারণা দেবে, সেটি অবশ্যই মানসিক বিবর্তন সম্বন্ধে অতি সরলীকৃত একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

সামাজিক তত্ত্ব সংক্রান্ত সাম্প্রতিক গবেষণার পরিমান এখন যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য, এটি প্রতি-বিল্পবী প্রতিক্রিয়ার একটি ছোট খাট কর্মতৎপরতার জন্ম দিয়েছে। যেমন, অভিযোগ আনা হয়েছে, সাম্প্রতিক এই অগ্রগতিগুলো, বাস্তবিকভাবে, সামাজিক প্রগতিকে বাধাগ্রস্থ করতে চক্রাকারে চলমান একটি ষড়যন্ত্রেরই অংশ, এই ধরনের অগ্রগতিকে যা জিনগতভবে অসম্ভব বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। একই ধরনের দুর্বল চিন্তাগুলো একই সাথে গাথা হয়েছে এমন একটি ধারণা দেবার জন্য যে ডারউইনীয় সামাজিক তত্ত্ব এর রাজনৈতিক তাৎপর্যে প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু এই ধরণের কোনো অভিযোগ সত্য থেকে অনেক দূরে। ভিন্ন লিঙ্গের মধ্যে জিনগত সাম্যতা, প্রথমবারের মত, সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে ফিশার এবং হ্যামিলটনের গবেষণার মাধ্যমে। সামাজিক কীটপতঙ্গ গবেষণা থেকে সংগৃহীত তত্ত্ব এবং পরিমানবাচক উপাত্ত প্রদর্শন করছে যে তাদের সন্তানদের উপর প্রভাব বিস্তার করার পিতামাতাদের কোনো অন্তর্গত প্রবণতা নেই (এবং সন্তানদেরও সেই প্রবণতা নেই পিতামাতার প্রতি) এবং ‘প্যারেন্টাল’ বা পিতামাতার বিনিয়োগের ধারণা এবং স্ত্রী সদস্যদের চয়েস বা বাছাই একটি নৈর্ব্যক্তিক আর পক্ষপাতহীন ভিত্তি প্রদান করেছে লিঙ্গ বৈষম্যগুলো দেখার জন্য, বৃত্তিহীন জৈববৈজ্ঞানিক পরিচয়ের জলায় নিমগ্ন নারীর ক্ষমতা আর অধিকার সমর্থনের জনপ্রিয় আন্দোলনের চেয়ে যা একটি উল্লেখযোগ্য পরিমান অগ্রগতি। সংক্ষেপে ডারউইনীয় সামাজিক তত্ত্ব আমাদেরকে সামাজিক সম্পর্কগুলোর একটি অন্তর্নিহিত সাম্যতা ও যুক্তির আভাস দেয়; যখন আমরা আরো পুরোপুরিভাবে বুঝতে সক্ষম হব, সেটি অবশ্যই আমাদের আমার রাজনৈতিক বোধকেও নবায়ন করবে এবং মনোবিজ্ঞানের চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের প্রতি বৌদ্ধিক সমর্থন প্রদান করবে। এই পক্রিয়ায় এটি আমাদের দুঃখকষ্টের মূল কারণগুলো সম্বন্ধে গভীর উপলদ্ধিও প্রদান করবে।

রবার্ট এল. ট্রিভার্স,
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি,
জুলাই,১৯৭৬

.

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

এই বইটিকে প্রায় এমনভাবে পড়া উচিৎ হবে যেন এটি কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। আমাদের কল্পনার প্রতি আবেদন সৃষ্টি করবে, এমনভাবেই বইটি পরিকল্পিত। কিন্তু এটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়: এটি বিজ্ঞান। বহু ব্যবহৃত কোনো শব্দ হোক বা না হোক, ‘গল্পের চেয়েও বিস্ময়কর’ শব্দটি সঠিকভাবেই প্রকাশ করে সত্য সম্বন্ধে আমি ঠিক কি অনুভব করি। আমরা হচ্ছি টিকে থাকার বা সারভাইভাল মেশিন– রোবোট বাহন, জিন নামে পরিচিত স্বার্থপর অণুটিকে সংরক্ষিত করার নির্দেশ অন্ধভাবেই অনুসরণ করতে যা প্রোগ্রাম করা আছে। যে সত্যিটা আজো আমাকে বিস্ময়ে আপ্লুত করে। যদিও আমি বহু বছর ধরে এই সত্যটা জানি, কিন্তু কখনোই ধারণাটির সাথে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারিনি। আমার একটি আশা হচ্ছে, হয়তো অন্যদেরকেও বিস্মিত করার ক্ষেত্রেও আমি কিছুটা সফল হবো।

যখন আমি লিখছিলাম, তিনজন কাল্পনিক পাঠক আমার ঘাড়ের উপর দিয়ে দেখছিলেন আমি কি লিখছি এবং এখন আমি এই বইটি তাদের প্রতি উৎসর্গ করছি। প্রথমেই সাধারণ পাঠক, যিনি এই বিষয়ে তেমন কিছুই জানেন না। তার জন্য কারিগরী শব্দগুলো আমি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছি প্রায় পুরোপুরিভাবেই এবং যেখানে আমি বিশেষায়িত কোনো শব্দ ব্যবহার করেছি, আমি সেটির অর্থও ব্যাখ্যা করেছি। আমি এখন ভাবছি কেন আমরা সব প্রতিষ্ঠিত পাণ্ডিত্যপূর্ণ জার্নাল থেকেও এই সব কারিগরী শব্দগুলোর অধিকাংশই নিষিদ্ধ করছি না। আমি ধরে নিয়েছি যে, সাধারণ পাঠকদের এই বিষয়ে বিশেষায়িত কোনো জ্ঞান থাকবে না। কিন্তু আমি তাকে নির্বোধ মনে করিনি। যে কেউই বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে পারেন যদি সে বিষয়টিকে অতিমাত্রায় সরলীকরণ করতে পারেন। আমি কিছু সূক্ষ্ম আর জটিল ধারণাগুলো অগাণিতিক ভাষায় এর মূলসারটিকে না হারিয়ে জনপ্রিয় সহজপাঠ্য হিসাবে উপস্থাপন করতে কঠোর পরিশ্রম করেছি। জানিনা আমি সেটি করতে কতটুকু সফল হয়েছি বা কতদূর আমি সফল হয়েছি আমার আরো একটি লক্ষ্য পূরণে: বইটার বিষয়বস্তু যেমন দাবী করে, তেমন চিত্তাকর্ষক আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারার মত করে উপস্থাপন করতে। আমি বহুদিন ধরেই অনুভব করে আসছি জীববিজ্ঞানকে মনে হওয়া উচিৎ কোনো রহস্য কাহিনীর মতই উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ রহস্য কাহিনী হচ্ছে ঠিক জীববিজ্ঞানের মতই। আমি অবশ্য এমন কোনো আশা করারও সাহস প্রকাশ করছি না যে, এই উত্তেজনার সামান্য অংশও যা এই বিষয়টি আমাদের নিবেদন করে তা প্রকাশ করতে পেরেছি।

আমার দ্বিতীয় কাল্পনিক পাঠক হচ্ছেন একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি হচ্ছেন কঠোর সমালোচক, আমার কোনো কথার কথা বা রুপক উদাহরণ তার শ্বাসপ্রশ্বাসকে চঞ্চল করে তুলবে। তার প্রিয় বাক্য হচ্ছে– উইথ দি এক্সেপশন অব’ বা ‘এটি ব্যতিরেকে’; ‘বাট অন দি আদার হ্যান্ড’ বা ‘কিন্তু আবার অন্য দিকে’ এবং বিতৃষ্ণায় উচ্চারিত ধ্বনি “উফফ। আমি মনোযোগের সাথে তার কথা শুনেছি, এবং এমনকি একটি অধ্যায় পুরোপুরি ভাবেই পুনরায় লিখেছি তার সুবিধার কথা বিবেচনা করে। কিন্তু পরিশেষে আমাকে এই কাহিনীটি বলতে হবে আমার মত করে। বিশেষজ্ঞ এখনো পুরোপুরি খুশী নন, যেভাবে আমি বিষয়গুলো সাজিয়েছি। তারপরও আমার সবচেয়ে বড় আশা যে এমনকি তিনিও এখানে নতুন কিছু খুঁজে পাবেন। পরিচিত ধারণাগুলো দেখার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো; হয়তো তার নিজের কিছু নতুন ধারণা সৃষ্টিতে এটি উদ্দীপনা যোগাবে। যদি এটি খুব বেশী বড় চাওয়া হয়ে যায়, তাহলে আমি কি নিদেনপক্ষে আশা করতে পারি যে, বইটি ট্রেনে পড়ার সময় তাকে আনন্দ যোগাবে?

তৃতীয় পাঠক, যে আমার মনে ছিল, তিনি হচ্ছেন শিক্ষার্থী, যিনি অবিশেষজ্ঞদের স্তর থেকে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠার উত্তরণের কোনো পর্যায়ে আছেন। যদি এখনও তার মন স্থির না করে থাকেন তিনি কোন বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হবেন, আমি তাকে উৎসাহিত করবো আমার নিজের ক্ষেত্র প্রাণিবিজ্ঞানের দিকে আরো আরেকবার দৃষ্টি দেবার জন্য। শুধুমাত্র এর সম্ভাব্য উপযোগিতা বিচার করা, কিংবা প্রাণীদের সাধারণত খুব সব সহজেই পছন্দ আদায় করে নেবার মত সহজাত ক্ষমতা ছাড়াও প্রাণিবিজ্ঞান পড়ার আরো উত্তম। কারণ আছে। এই কারণটি হচ্ছে আমরা প্রাণীরা হচ্ছি আমাদের জানা এই মহাবিশ্বে সবচেয়ে জটিল এবং নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত যন্ত্র। এভাবে যদি বলা হয় তাহলে কিন্তু বেশ কঠিন বোঝা কেনই বা কেউ অন্য কিছু পড়বে! ইতিমধ্যে যে শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তারা প্রাণীবিজ্ঞান পড়বেন, আমি আশা করছি আমার বইটি তাদের জন্য কিছু শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থাপন করার ভূমিকা পালন করবে। তবে তাকে এই বইটিকে তথ্যাভিজ্ঞ করা মূল সব প্রবন্ধ আর পাঠ্যপুস্তকগুলো পড়তে হবে, যার উপর নির্ভর করে এই বইটি আমি সাজিয়েছি। যদি মূল প্রবন্ধগুলো বুঝতে তার সমস্যা হয়, হয়তো আমার অগাণিতিক ব্যাখ্যা তাকে সেই ক্ষেত্রে সাহায্য করবে, ভূমিকা এবং বাড়তি সংযুক্তি হিসাবে। তিনজন ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের প্রতি আবেদন সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় স্পষ্টতই কিছু বিপদ আছে। আমি শুধু বলতে পারি যে এইসব বিপদগুলোর ব্যপারে খুব সচেতন ছিলাম কিন্তু প্রচেষ্টা করার সুবিধাগুলো সম্ভবত তাদের খানিকটা গুরুত্বহীন। করেছে।

আমি নিজে একজন ইথোলজিষ্ট (১), এবং এটি প্রাণী-আচরণ বিষয়ক একটি বই। ইথোলজির ঐতিহ্যবাহী ধারার প্রতি আমার ঋণ খুব বেশী স্পষ্ট, যে বিষয়ে আমি নিজে প্রশিক্ষিত হয়েছি। বিশেষ করে, নিকো টিনবার্গেন (২) আমার উপর তার প্রভাবের ব্যাপ্তিটা আসলে কতটুকু ছিল তা তিনি কখনোই অনুধাবন করেননি, যখন অক্সফোর্ডে বারো বছর আমি তার অধীনে কাজ করেছিলাম। ‘সারভাইভাল মেশিন’ বাক্যটি, যদিও সত্যিকারভাবে তার নিজস্ব নয়, তবে তার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইথথালজী সম্প্রতি নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে নতুন সব ধারণার আগ্রাসনে, এবং তারা এসেছে এমন কিছু উৎস থেকে যাদের প্রথাগতভাবে ইথথালজী সংক্রান্ত কোনো বিষয় মনে করা হয়না। এই বই অনেকাংশই সেই সব নতুন ধারণাগুলোর উপর ভিত্তি করে লেখা। এই ধারণাগুলো জন্মদাতাদের প্রতি বইয়ের লেখ্য অংশের যে জায়গায় প্রযোজ্য সেখানেই ঋণ স্বীকার করা হয়েছে। প্রধান সেই ব্যক্তিরা হলেন জি. সি, উইলিয়ামস, জে, মেনার্ড স্মিথ, ডাবলিউ. ডি. হ্যামিলটন এবং আর, এল, ট্রিভার্স।

বহু মানুষই এই বইয়ের শিরোনাম প্রস্তাব করেছেন, আমি কৃতজ্ঞতার সাথে যে নামগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনাম হিসাবে ব্যবহার করেছিঃ ‘ইমোৰ্টাল কয়েলস’ (অমর কুণ্ডলী), জন ক্রেবস; ‘দ্য জিন মেশিন’(জিন যন্ত্র), ডেসমন্ড মরিস; ‘জিনম্যানশিপ’(জিন দক্ষতা), টিম ক্লাটন-ব্রক এবং জিন ডকিন্স, স্বতন্ত্রভাবে ক্ষমাপ্রার্থনাসহ স্টিফেন পটার। কাল্পনিক পাঠকরা বিনম্র আশা এবং আকাঙ্খার নিশানা হিসাবে কাজ করতে পারেন কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তারা সত্যিকার পাঠক ও সমালোচকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম কাজে আসেন। পুনসংশোধন আর পরিমার্জনা করার প্রতি আমার আসক্তি আছে। এবং মারিয়ান ডকিন্স বাধ্য হয়েছেন প্রতিটি পাতার অসংখ্য সংশোধন এবং পুনসংশোধন পড়ার জন্য। জৈববৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ সম্বন্ধে তার সমীহ জাগানোর মত জ্ঞান এবং তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অনুধাবন করার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ছাড়াও, তার সার্বক্ষণিক বিরামহীন উৎসাহ এবং নৈতিক সমর্থন আমার জন্য অপরিহার্য ছিল। জন ক্রেবস যিনি এই বইটি খসড়া পাণ্ডুলিপি ড্রাফট হিসাবে পড়েছিলেন। তিনি এই বিষয় সম্বন্ধে আমার চেয়ে অনেক বেশী জানেন, এবং তিনি উদারতার সাথে অকৃপনভাবে আমাকে তাঁর উপদেশ এবং নানা প্রস্তাব দিয়েছেন। গ্লেনিস থমসন এবং ওয়াল্টার বড়মার জিনগত বিষয়গুলো নিয়ে আমার আলোচনা দয়ার সাথে তবে দৃঢ়ভাবে সমালোচনা করেছেল। আমি শঙ্কিত যে আমার পুনসংশোধন হয়তো তাদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারবে না। কিন্তু আমি আশা করি বইটি পড়ার পর তারা অন্তত মনে করবেন আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি অবশ্যই হয়েছে। তাদের সময় আর ধৈর্যের জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। জন ডকিন্সও তার নির্ভুল দৃষ্টি ব্যবহার করেছেন বিভ্রান্তিকর বাক্যগঠনের প্রতি এবং অসাধারণ কিছু গঠনমূলক প্রস্তাব করেছিলেন কিছু শব্দ পরিবর্তনের জন্য। ম্যাক্সওয়েল স্টাম্পের মত এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয় এমন কোনো বুদ্ধিমান মানুষ আমার পক্ষে আশা করা অসম্ভব। তার সতর্ক দৃষ্টির কারণে প্রথম ড্রাফটের শৈলীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ ভুল সংশোধন করা সম্ভব হয়েছিল যা চূড়ান্ত ড্রাফটটি সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনেক কিছু করেছিল। অন্যরা যারা গঠনমূলক সমালোচনা করেছিলেন বিশেষ অধ্যায়গুলো নিয়ে অথবা যারা তাদের বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছিলেন, তারা হলেন জন মেনার্ড স্মিথ, ডেসমন্ড মরিস, টম মাশলার, নিক ব্লার্টন জোনস, সারা কেটলওয়েল নিক হাম্পফ্রে, টিম ক্লাটন-ব্রক, লুইস জনসন, ক্রিস্টোফার গ্রাহাম, জিওফ পার্কার এবং রবার্ট ট্রিভার্স। প্যাট সিয়ারলে এবং স্টেফানি ভেরহয়েভেন শুধুমাত্র দক্ষতার সাথে টাইপই করেননি, কাজটি আনন্দের সাথে করে দেখিয়ে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। পরিশেষে আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মাইকেল রজার্সকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই, পাণ্ডুলিপির প্রয়োজনীয় সমালোচনা ছাড়াও এই বই প্রকাশনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সতর্ক দৃষ্টি রেখে যিনি তার স্বাভাবিক। দ্বায়িত্বের বাইরেও অনেক পরিশ্রম করেছিলেন।

রিচার্ড ডকিন্স (১৯৭৬)

পাদটীকা:

১. প্রাণিবিজ্ঞানের যে শাখায় বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেন।

২. নিকোলাস ‘নিকো’ টিনবার্গেন (১৯০৭-১৯৮৮) : ডাচ প্রাণিবিজ্ঞানী ও ইথোলজিস্ট, কার্ল ভন ফ্রিশ এবং কনরাড লরেঞ্জ এর সাথে ১৯৭৩ সালে নোবেল পুরষ্কার জিতেছিলেন।

০১. মানুষরা কেন?

অধ্যায় ১: মানুষরা কেন?

একটি গ্রহে বুদ্ধিমান জীবন এর প্রাপ্তবয়স্কতা অর্জন করে যখন প্রথমবারের মত এটি সেখানে এর অস্তিত্বের কারণ সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলো সমাধান করে উঠতে পারে। যদি আমাদের চেয়েও বুদ্ধিমত্তায় অগ্রসর কোনো প্রাণীরা মহাশূন্য থেকে কখনো পৃথিবীতে ভ্রমণ করতে আসে, আমাদের সভ্যতাটি ঠিক কোন স্তরে অবস্থান করছে সেটি নিরুপন করার লক্ষ্যে প্রথম যে প্রশ্নটি তারা জিজ্ঞাসা করবে, সেটি হলো: এরা কি এখনও বিবর্তনের বিষয়টি আবিষ্কার করতে পেরেছে? কোনো কারণ জানা ছাড়াই এই পৃথিবীতে প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন বছর ধরে জীবের অস্তিত্ব ছিল, অবশেষে তাদেরই একজনের কাছে এই সত্যটি স্পষ্ট হয়েছিল। তার নাম ছিল চার্লস ডারউইন। নিরপেক্ষভাবে বলতে হলে, অনেকেই সত্যটা সম্বন্ধে খানিকটা আভাস পেয়েছিলেন, কিন্তু ডারউইনই ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি আমাদের অস্তিত্বের কারণ সম্বন্ধে প্রথমবারের মত সঙ্গতিপূর্ণ আর প্রমাণযোগ্য একটি ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেছিলেন। ডারউইনের কারণে, সেই কৌতূহলী শিশুটির প্রশ্ন, যা এই অধ্যায়ের শিরোনাম, তার একটি বোধগম্য উত্তর দেয়া আমাদের পক্ষে এখন সম্ভব। যখন গভীর সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হই, আমাদের আর এখন কোনো কুসংস্কারের আশ্রয় নিতে হয়নাঃ জীবনের কি কোনো অর্থ আছে? আমরা কিসের জন্য এখানে? মানুষ কি? এই প্রশ্নগুলোর শেষ প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করে বিখ্যাত প্রাণিবিজ্ঞানী জি. জি. সিম্পসন (১) মন্তব্য করেছিলেন এভাবে: ‘এখন আমি যে প্রস্তাবনাটি করতে চাই সেটি হচ্ছে, ১৮৫৯ সালের আগে এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার সকল প্রচেষ্টাই ছিল অর্থহীন, আর আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে, যদি আমরা সম্পূর্ণভাবে সেগুলো উপেক্ষা করতে পারি।(২)

বর্তমানে সূর্যের চারপাশে পৃথিবী ঘুরছে এই তত্ত্ব নিয়ে যতটুকু সন্দেহ করা হয়, বিবর্তন তত্ত্বটি নিয়ে ঠিক ততটুকুই সংশয় প্রকাশ করার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু ডারউইনের বিল্পবটির পূর্ণ তাৎপর্য এখনও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাণিবিজ্ঞান এখনও গুরুত্বহীন একটি বিষয়, এবং যারা এটি অধ্যয়ন করার জন্য বেছে নেন, তারাও প্রায়শই সেই কাজটি করেন এর গভীর দার্শনিক গুরুত্বটি অনুধাবন না করেই। দর্শন এবং অন্যান্য বিষয়গুলো যারা পরিচিত হিউম্যানিটিস বা মানববিদ্যা হিসাবে, সে বিষয়গুলো শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এমনভাবে যেন ডারউইনের কোনো অস্তিত্ব কখনোই ছিলনা। কোনো সন্দেহ নেই সময়ের সাথে এর পরিবর্তন হবে। তবে কোনোভাবেই, এই বইটির উদ্দেশ্য ডারউইনবাদের সপক্ষে সাধারণ কোনো গুণকীর্তন নয়, বরং একটি বিশেষ প্রসঙ্গের ক্ষেত্রে বিবর্তন তত্ত্বের পরিনামগুলো এটি অনুসন্ধান করবে। স্বার্থপরতা আর পরার্থবাদের একটি জৈববৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করাই আমার উদ্দেশ্য।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণায় কৌতূহল ছাড়াও, এই বিষয়টির মানবিক গুরুত্ব খুবই স্পষ্ট। আমাদের সামাজিক জীবনের পরিমণ্ডলে প্রতিটি ক্ষেত্র এটি স্পর্শ করে, আমাদের ভালোবাসা এবং ঘৃণা করা, দ্বন্দ্ব এবং সহযোগিতায়, কোনো কিছু দান করা এবং চুরি করায়,আমাদের লোভ এবং দয়াপরায়নশীলতায়। এই সব দাবীগুলো লরেঞ্জের (৩) “অন অ্যাগ্রেসন’ (৪), আর্ডের (৫) “দ্য সোস্যাল কনট্রাক্ট’ (৬), আইবল-আইবেসফেল্টের (৭) “লাভ অ্যান্ড হেট’ (৮) বইগুলোর উপরেও করা যেতে পারতো। কিন্তু এই বইগুলোর সমস্যা হলো, এই লেখকরা বিষয়টিকে চূড়ান্তভাবে ভুল বুঝেছিলেন। তারা ভুল বুঝেছিলেন, কারণ বিবর্তন কিভাবে কাজ করে, সেই বিষয়টি তারা আসলে ভুল বুঝেছিলেন। তারা ভ্রান্ত একটি ধারণা করেছিলেন, ভেবেছিলেন একক কোনো সদস্যের (অর্থাৎ জিনের) জন্য নয় বরং প্রজাতির (অথবা গ্রুপের) কল্যাণই হচ্ছে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যপারটিকে বক্রাঘাতই মনে হতে পারে, যখন কিনা অ্যাশলে মনটে (৯) ‘একেবারে উনবিংশ শতাব্দীর “দাঁতে ও নখরে হিংস্র বন্য প্রকৃতির” (১০) সরাসরি উত্তরসূরি চিন্তাবিদ…’ আখ্যা দিয়ে বরং লরেঞ্জকেই বিদ্রূপ করেছিলেন। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ লরেঞ্জের বিবর্তন সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি বলতে আমি যতটুকু বুঝি, তিনি নিজেও মনটের সাথে টেনিসনের (১১) বিখ্যাত এই বাক্যটির নিহিত্যার্থ প্রত্যাখ্যান করতে খুব বেশী মাত্রায় একমত পোষণ করবেন। তাদের দুজনের ব্যতিক্রম, আমি মনে করি, “দাঁত ও নখরে হিংস্র প্রকৃতি’ মোটামুটি প্রশংসনীয় উপায়ে প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে আমাদের আধুনিক ধারণাটির সার্বিক সংক্ষিপ্ত একটি রুপ উপস্থাপন করছে।

আমার মূল যুক্তিটি শুরু করার আগে আমি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে চাই, এটি কোন ধরনের প্রস্তাব এবং এটি কোন ধরনের প্রস্তাব নয়। আমাদের যদি বলা হয় কোনো একজন ব্যক্তি, যিনি শিকাগোর অপরাধ জগতে দীর্ঘ এবং সফল জীবন কাটিয়েছেন, তাহলে সেই ব্যক্তিটির চরিত্র কেমন ছিল, সেই বিষয়ে আমরা কিছু অনুমান নির্ভর ধারণা করার অধিকার রাখি। আমরা হয়তো আশা করতে পারি যে, তার নিশ্চয়ই সেই সব গুণাবলী ছিল, যেমন, সাহসী, দৃঢ়, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে দক্ষতা, প্রায়শই যে দক্ষতাটি সে ব্যবহার করেছে এবং এছাড়াও আছে তার বিশ্বস্ত বন্ধুদের আকর্ষণ করার যোগ্যতা। এই সব ধারণাগুলো যে একেবারে নির্ভুল অনুমান হবে তা কিন্তু না, তবে কোনো মানুষের চরিত্র সম্বন্ধে কিছু ধারণা আপনি অবশ্যই অনুমান করতে পারবেন যদি আপনি খানিকটা জানতে পারেন, কি পরিস্থিতিতে সফলতার সাথে সেই মানুষটি টিকে ছিল। এই বইটির প্রস্তাবিত যুক্তি হচ্ছে যে, আমরা এবং অন্য সকল জীবরা, আসলে যন্ত্র, যাদের তৈরী করেছে আমাদের বহন করা জিনগুলো। অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পৃথিবীতে সফল শিকাগো গ্যাঙ্গস্টারদের মত আমাদের জিনগুলো টিকে গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহু মিলিয়ন বছর। আমাদের জিনগুলোর সুনির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য প্রত্যাশা করার জন্য এটি আমাদের অধিকার দেয়। আমি যুক্তি দেবো যে, একটি সফল জিনের প্রধানতম যে গুণটি আমরা আশা করতে পারি, সেটি হচ্ছে এর নিষ্ঠুর স্বার্থপরতা। এই জিনগত স্বার্থপরতা সাধারণত একক সদস্যের আচরণেও স্বার্থপরতার জন্ম দেয়। যদিও, আমরা পরে বিষয়টি যেমন দেখবো, বিশেষ কিছু পরিস্থিতি আছে যেখানে একটি জিন একক জীবের স্তরে খানিকটা সীমিত আকারের পরার্থবাদিতা বা আলট্রইজম লালন করার মাধ্যমে তার স্বার্থপর লক্ষ্যটি অর্জন করতে পারে। বিশেষ” এবং “সীমিত’– আগের বাক্যটিতে ব্যবহৃত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। যতই আমরা অন্য কিছু বিশ্বাস করতে চাই না কেন, সর্বজনীন ভালোবাসা আর সার্বিকভাবে প্রজাতির কল্যাণ আসলেই হচ্ছে সেই সব ধারণাগুলো, বিবর্তনীয় ব্যাখ্যাই যা কোনভাবেই অর্থবহ হয় না।

এটি আমাকে সেই প্রথম বিষয়টিতে নিয়ে আসে, যা আমি প্রস্তাব করতে চাইছি এই বইটি কি ‘বিষয়ে নয়’ সে প্রসঙ্গে। আমি কোনো নৈতিকতা নির্ভর বিবর্তনের সপক্ষে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করছি না (১২)। আমি বলছি কিভাবে এসব কিছু বিবর্তিত হয়েছে, আমি বলছি না, মানুষদের নৈতিকভাবে কিভাবে আচরণ করা উচিৎ। আমি বিষয়টির উপর জোর দিচ্ছি, কারণ জানি আমাকে ভুল বোঝার সম্ভাবনা আছে সেই সব মানুষদের, তারা সংখ্যায় অগণিত, যারা, কোনো একটি বিষয় বা পরিস্থিতি সম্বন্ধে বিশ্বাস নির্ভর একটি বক্তব্য কি বলছে আর বিষয় ও পরিস্থিতিটি কি হওয়া উচিৎ তার পক্ষে ওকালতি করার মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। আমার নিজস্ব অনুভূতি হচ্ছে যে, কোনো একটি মানব সমাজ যা শুধুমাত্র জিনের নিষ্ঠুর স্বার্থপরতার সার্বজনীন সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত, নিঃসন্দেহে বাস করার জন্য সেটি খুবই জঘন্য একটি সমাজ হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা কোনো কিছুকে যতই ঘৃণা করিনা কেন, সত্য হওয়া থেকে কিন্তু তা বিরত থাকে না। মূলত এই বইটির উদ্দেশ্য কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ের অবতারণা করা, কিন্তু আপনি যদি কোনো নৈতিকতা এখান থেকে সংগ্রহ করতে চান, তাহলে বইটি একটি সতর্ক সংকেত হিসাবে পড়ন। সতর্ক থাকুন যদি আপনি চান, যেমনটি আমি চাই, এমন একটি সমাজ সৃষ্টি করতে, যেখানে প্রতিটি সদস্য উদারতার সাথে একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে এবং সবাই নিঃস্বার্থভাবে একটি সর্বজনীন কল্যাণের জন্য কাজ করছে; তাহলে তাদের জৈববৈজ্ঞানিক প্রকৃতির কাছে আপনি বেশী কিছু আশা করতে পারবেন না। আসুন আমরা উদারতা এবং পরার্থবাদ বা পরোপকারিতা শিক্ষা দিতে চেষ্টা করি, কারণ আমরা জন্মগতভাবেই স্বার্থপর। আসুন আমরা বোঝার চেষ্টা করি, আমাদের স্বার্থপর জিনগুলো আসলে কি পরিকল্পনা করছে, কারণ হয়তো তখনই অন্ততপক্ষে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেবার জন্য আমাদের একটা সুযোগ থাকবে, আর কোনো প্রজাতি কখনোই এমন কিছু করার উচ্চাকাঙ্খ বোধ করেনি কোনোদিনও।

এই শিক্ষা দেবার ব্যাপারে উল্লেখিত মন্তব্যগুলোর অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে, এটি আসলেই একটি ভ্রান্তি– ঘটনাচক্রে খুব সাধারণ একটি ভ্রান্তি– এমন কিছু মনে করা যে জিনগত উত্তরসুরি হিসাবে প্রাপ্ত কোনো বৈশিষ্ট্যাবলী হচ্ছে তাদের সংজ্ঞানুযায়ী স্থির এবং অপরিবর্তনযোগ্য। স্বার্থপর হবার জন্য আমাদের জিন হয়তো আমাদের নির্দেশ দেয়। কিন্তু আবশ্যিকভাবে সারা জীবনের জন্য সেই সব নির্দেশ পালনের জন্য আমরা আদৌ বাধ্য নই। হয়তো পরার্থবাদিতা শেখাটাই শুধু কঠিন একটি বিষয়ে রূপান্তরিত হয় মাত্র যদি না জিনগতভাবে পরার্থবাদ শেখার জন্য আমরা আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা না থাকি। সব জীবদের মধ্যে, মানুষরা অনন্যভাবে সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত, বংশ পরম্পরায় হস্তান্তর হওয়া শিক্ষা এবং নানা কিছু করে ও দেখে শেখার দ্বারা প্রভাবিত। কেউ হয়তো বলতেই পারেন যে জিনের চেয়ে আমাদের উপর সংস্কৃতির প্রভাব অনেক বেশী, সেই জিন স্বার্থপর হোক কিংবা না হোক, জিন মানুষের প্রকৃতি বোঝার জন্য কার্যত অপ্রয়োজনীয়। অন্যরা হয়তো দ্বিমত পোষণ করবেন। পুরোটাই নির্ভর করবে ‘প্রকৃতি বনাম প্রতিপালন’ এই বিতর্কে আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, মানবীয় বৈশিষ্ট্যের নিয়ামকগুলো চিহ্নিত করার প্রসঙ্গে। বিষয়টি আমাকে নিয়ে আসে, এই বইটি আসলে কি নয় তার দ্বিতীয় প্রসঙ্গটিতে: প্রকৃতি/প্রতিপালন বিতর্কে কোনো একটি অবস্থানের পক্ষে সমর্থন জানানো এই বইটির উদ্দেশ্য নয়, খুব স্বাভাবিকভাবে এই বিষয়ে আমার একটি মতামত আছে, কিন্তু আমি সেই মতামতটি এখানে প্রকাশ করবো না, শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যতটুকু নিহিত আছে, সেটাই আমি শেষ অধ্যায়ে উপস্থাপন করবো। যদি জিনরা আসলে আধুনিক মানুষের আচরণের নির্ণায়ক হিসাবে সম্পূর্ণভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়, যদি আমরা আসলেই এই ক্ষেত্রে সব জীবদের মধ্যে অনন্য ব্যতিক্রম হয়েও থাকি, তারপরও, অন্তত কৌতূহদ্দেীপক এই বিষয়টির নিয়ম সম্বন্ধে আমাদের জানার আগ্রহ থাকা উচিৎ, খুব সম্প্রতি যে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছি আমরা। আর যদি আমাদের প্রজাতি আমরা যতটুকু ভাবি ততটুকু ব্যতিক্রম না হয়ে থাকে, তাহলে আরো বেশী জরুরী আমাদের সেই নিয়ম সম্পর্কে গবেষণা করা।

তৃতীয় যে জিনিসটি এই বইটি নয় তাহলো, মানুষের বা কোন জীব প্রজাতির বিস্তারিত আচরণের বর্ণনা। আমি শুধুমাত্র দৃষ্টান্তমূলক প্রমাণের জন্য বাস্তব কিছু উদাহরণ দেবো। আমি এমন কিছুই বলবো না যেমন, যদি আপনি কোনো একটি বেবুনের আচরণ লক্ষ্য করেন, আপনার কাছে মনে হবে তারা আসলেই স্বার্থপর, আর সেহেতু মানুষের আচরণও সেরকমই হবার সম্ভাবনা আছে। আমার শিকাগো গ্যাংস্টারে প্রস্তাবের যুক্তি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেটা হচ্ছে এরকম: মানুষ আর বেবুনরা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছে; আর আপনি যদি লক্ষ করেন কিভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে, মনে হবে যে এমন কিছু যা কিনা বিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সব স্বার্থপর হবার কথা। সুতরাং আমাদের সেটাই অবশ্যই আশা করতে হবে যখন আমরা বেবুন, মানুষ আর অন্যান্য সব জীবিত প্রাণীদের আচরণ অনুসন্ধান করতে যাবো, আমরা তাদের আচরণ দেখবো স্বার্থপরের মত। আমরা যদি আবিষ্কার করি, আমরা যা আশা করেছিলাম, সেটি ভুল, আমরা যদি লক্ষ করতে পারি মানুষের আচরণ সত্যিকারভাবেই পরার্থবাদী, তাহলে আমাদের একটা ধাঁধার মুখোমুখি হতে হবে, এমন একটি প্রশ্ন যার ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

আলোচনায় আরো অগ্রসর হবার আগে, আমাদের একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একটি সত্তা, যেমন একটি বেবুন, তাকে আমরা পরার্থবাদী বলতে পারবো, যদি এটি এমন ভাবে আচরণ করে যে তার আচরণ এরকমই আরেকটি সত্তার কল্যাণ বৃদ্ধি করে তার নিজের ক্ষতি করে। স্বার্থপর আচরণের পরিণতি ঠিক এর বিপরীত। কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার-এর অর্থ এখানে হচ্ছে ‘বেচে থাকার সুযোগ’, এমন কি যখন সত্যিকারের বাঁচা মরার সম্ভাবনার উপর এর প্রভাব এত সামান্য যেন মনে হতে পারে অগ্রাহ্য। ডারউইনীয় তত্ত্বের আধুনিক সংস্করণের একটি বিস্ময়কর ফলাফল হচ্ছে যে টিকে থাকার উপর আপাতদৃষ্টিতে খুব তুচ্ছ ক্ষুদ্র কোনো প্রভাবও বিবর্তনের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আর এর কারণ, এ ধরনের কোনো প্রভাবগুলো তাদের উপস্থিতি টের পাইয়ে দেবার জন্য পায় সুবিশাল সময়।

যে বিষয়টি অনুধাবন করা জরুরী, উপরের পরার্থবাদ আর স্বার্থপরতার সংজ্ঞাগুলো “আচরণগত, এটি আত্মগত অনুভুতি নির্ভর কোনো বিষয় নয়। এখানে আমি উদ্দেশ্য-সংশ্লিষ্ট মনোবিজ্ঞান নিয়ে চিন্তিত নই। আমি এমন কোনো তর্ক করবো না, যে মানুষগুলো, যারা পরার্থবাদী আচরণ করে তারা আসলেই তাদের অবচেতন বা গোপন কোনো স্বার্থপর উদ্দেশ্যে সেটি করছে। হয়তো তারা সেটি করছে বা হয়তো করছে না, এবং হয়তো আমরা কখনোই কখনো তা জানতে পারবো না, যাই হোক না কেন, এই বইটির বিষয় কিন্তু সেটি নয়। আমার সংজ্ঞাটি সীমাবদ্ধ শুধুমাত্র কোনো একটি আচরণ বা ক্রিয়ার ‘প্রভাব’ একজন সম্ভাব্য পরার্থবাদী এবং তার পরার্থবাদী আচরণের দ্বারা লাভবানকারীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে, নাকি হ্রাস করে।

দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার সম্ভাবনার উপর কি প্রভাব পড়ছে তা পরীক্ষা করে দেখানো খুবই জটিল একটি বিষয়। ব্যবহারিকভাবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে যখন আমরা সত্যিকারের আচরণগুলোর উপর সংজ্ঞাগুলো প্রয়োগ করি, আমাদের সেই শব্দটিকে গুণগতভাবে পরিবর্তন করতে হবে ‘আপাতদৃষ্টিতে’ শব্দটি ব্যবহার করে। আপাতদৃষ্টিতে পরার্থবাদী কোনো কাজ বা পরোপকারী কোনো কাজ হচ্ছে সেটি, যেটি উপরিদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে, সেই কাজটির কারণে পরার্থবাদী খুব সম্ভবত ( যতই সামান্য হোক না কেন সেই সম্ভাবনা), মারা যাবে এবং পরার্থবাদী কাজটির উপকার-গ্রহীতার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। প্রায়শই যেটা দেখা যায়, খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কোনো আপাতদৃষ্টি পরার্থবাদী কাজগুলো আসলে ছদ্মবেশে স্বার্থপরতা। আরো একবার, আমি কিন্তু বোঝাতে চাইছি না যে, তাদের সেই কাজটির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কোনো গুপ্ত স্বার্থপরতা কিন্তু বেঁচে থাকার সম্ভাবনার উপর এর সত্যিকারের প্রভাব আমরা প্রথমে যা ভেবেছিলাম, তার বিপরীতমুখী।

আমি কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করবো, যাদের কোনোটি আপাতদৃষ্টিতে স্বার্থপর এবং কোনটি আপাতদৃষ্টিতে পরার্থবাদী; খুবই কঠিন আসলে আত্মগত চিন্তার অভ্যাসটিকে দমিয়ে রাখা যখন আমরা আমাদের প্রজাতি নিয়ে আলোচনা করি, সুতরাং আমি অন্য প্রাণীদের থেকেই উদাহরণগুলো দেব, প্রথমে কিছু প্রাণী প্রজাতির একক সদস্যদের বিবিধ স্বার্থপরমূলক আচরণের উদাহরণ।

ব্ল্যাকহেডেড গালরা (Blackheaded gull) বড় আকারের কলোনী হিসাবে তাদের নীড় বানায়। সাধারণত এই সব বাসাগুলো পরস্পর থেকে অল্প কয়েক ফুট দূরত্বে অবস্থান করে। যখন ডিম ফুটে প্রথম বাচ্চা বের হয়, তারা আকারে খুব ছোট আর নিজেদের সুরক্ষা করার কোনো উপায় থাকে না, খুব সহজেই তাদের আস্ত গিলে খাওয়া যায়। এই গাল পাখিদের মধ্যে খুব প্রচলিত একটি আচরণ দেখা যায়, সেটি হচ্ছে, তারা অপেক্ষা করে কখন তাদের প্রতিবেশী গাল অন্যদিকে তাকাবে বা নিজের বাসা ছেড়ে বের হবে, তখনই তারা ছো মেরে প্রতিবেশীর কোন একটি পাখির ছানা আস্ত গিলে খেয়ে নেয়। এভাবেই সেই পাখিটি মাছ ধরার জন্য কোনো ঝামেলা না করে এবং নিজের বাসাটিকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে যাওয়া ছাড়াই বেশ ভালো একটি পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করে নেয়।

অপেক্ষাকৃতভাবে স্ত্রী প্রেইং মানটিসদের (praying mantise) অদ্ভুত স্বজাতি ভক্ষণ করার আচরণটি আরো সুপরিচিত। মানতিসরা বড় আকারের মাংসাশী কীট। তারা সাধারণত অপেক্ষাকৃত ছোট পোকামাকড় যেমন, মাছি খায়, কিন্তু তাদের নড়াচড়া করে এমন প্রায় সব কিছুকেই আক্রমণ করার স্বভাব আছে। তারা যখন প্রজননের জন্য মিলিত হয়, পুরুষ মানতিসরা সন্তর্পনে হামাগুড়ি দিয়ে তাদের স্ত্রী সদস্যদের উপরে ওঠে আসে, তারপর সঙ্গম করে, যদি স্ত্রী সদস্যটি সুযোগ পায়, সে তাকে খেয়ে ফেলে। প্রথমে এক কামড়ে তার মাথাটি খেয়ে ফেলে, এই কাজটি সে করতে পারে, যখন কোনো পুরুষ মিলিত হবার জন্য তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, অথবা তার উপর উঠেছে এবং সঙ্গমরত অবস্থায়, কিংবা সঙ্গমের পর পর তারা পথক হলে। মনে হতে পারে পুরুষটির মাথা ছিঁড়ে খাবার জন্য সঙ্গম শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করা স্ত্রী মানতিসের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হতো। কিন্তু দেখা গেছে পুরুষের মাথাটি খেয়ে নেবার পরও পুরুষটির বাকী শরীরের সঙ্গম অব্যাহত রাখতে কোনো সমস্যা হয়না, আসলেই বরং ভাবা হয়, যেহেতুটি পতঙ্গটির মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রে ইনহিবিটরী বা দমিয়ে রাখার কেন্দ্র থাকে, সম্ভাবনা আছে, স্ত্রী মানতিসরা তাদের পুরুষদের মাথা চিবিয়ে খেয়ে আসলে তাদের যৌন দক্ষতাকেই বাড়িয়ে দেয় (১৩)। যদি তা হয়ে থাকে তবে সেটি বাড়তি উপকারিতা, প্রথমটি হচ্ছে সে ভালো একটি খাদ্যের ব্যবস্থা করা।

‘স্বার্থপর’ শব্দটি এধরনের কোনো চূড়ান্ত ক্যানিবালিজম বা স্বজাতিভক্ষণের ক্ষেত্রে উনোক্তি মনে হতে পারে। আমাদের সংজ্ঞায় যদিও এটি খুব ভালোভাবে মানানসই। হয়তো আমরা সমব্যথী হতে পারি এমপেরর পেঙ্গুইনদের আপাতদৃষ্টিতে ভীরু কাপুরুষোচিত আচরণ লক্ষ করে। তাদেরকে দেখা গেছে কোনো সমুদ্রের সীমানায় দল বেধে দাঁড়িয়ে থাকতে, পানিতে ঝাঁপ দেবার আগে তাদের মধ্যে ইতস্ততা দেখা যায়, তাদের ভয় সীলের আক্রমণ ও তাদের খাদ্য পরিণত হওয়া থেকে নিজেকে যেন বাঁচানো যায়। যদি তাদের একজন পানিতে ঝাঁপ দেয়, বাকী সবাই কিন্তু সাথে সাথেই জেনে যায়, পানিতে সীল অপেক্ষা করছে, নাকি কোনো সীল সেখানে নেই। খুব স্বাভাবিকভাবে কেউ চায় না গিনিপিগ হতে, সুতরাং তারা অপেক্ষা করে, মাঝে মাঝে তারা নিজেদের মধ্যে ধাক্কা ধাক্কি করে একে অপরকে পানিতে ফেলে দেবার জন্য।

আরো সাধারণভাবে, স্বার্থপর ব্যবহার হতে পারে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারযোগ্য উপাদান ভাগাভাগি করতে অস্বীকার করা, যেমন খাদ্য, বাসস্থান ও শিকার করার এলাকা অথবা যৌনসঙ্গী। এবার কিছু আপাতদৃষ্টিকে পরার্থবাদী কাজের উদাহরণ লক্ষ করি।

কর্মী মৌমাছিদের হুল ফোটানোর আচরণ যারা মৌচাকের মধু চোরদের বিরুদ্ধে কার্যকরী একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কিন্তু যে মৌমাছিরা এই কাজটি করে, তারা আসলে কামিকাজি (১৪) যোদ্ধা, বা আত্মঘাতী। কারণ এই হুল দিয়ে তাদের এই দংশনের কাজটি করতে হলে, তাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আসলে বাইরে ছিঁড়ে চলে আসে আর আক্রমণকারী মৌমাছিও মারা যায় এই কাজটি শেষ করার পরে। তার এই আত্মঘাতী মিশন হয়তো তার কলোনীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যমজুদের সুরক্ষা করে ঠিকই, কিন্তু সে নিজে বেঁচে থাকে না সেই সুবিধাটি নেবার জন্য। আমাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি একটি পরার্থবাদী আচরণ। মনে রাখবেন আমরা কিন্তু এখানে কোনো সচেতন উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলছিনা, সেটি থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে, এখানে কিংবা স্বার্থপরতার উল্লেখিত অন্য উদাহরণেও, কিন্তু তারা আমাদের সংজ্ঞার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।

বন্ধুদের জন্য কারো নিজের জীবন উৎসর্গ করা অবশ্যই পরার্থবাদী একটি কাজ, কিন্তু একইভাবে তাদের জন্য সামান্য ঝুঁকি নেয়াটাও পরার্থবাদের উদাহরণ হতে পারে। অনেক ছোট পাখিরা, যখনই তারা উড়ন্ত কোনো শিকারী পাখিকে, যেমন, বাজ পাখি, কাছাকাছি দেখে, তারা সাথে সাথে একটা বৈশিষ্ট্যসুচক একটি ‘সতর্ক সঙ্কেত দিয়ে বাকীদের জানান দেয়, যা শুনে ছোট পাখিদের ঝাক দ্রুত আত্মরক্ষামূলক একটি ব্যবস্থা গ্রহন করে শিকারী প্রাণী থেকে বাঁচতে। পরোক্ষ প্রমাণ আছে যে পাখিটি এই সতর্কতা মূলক ডাকটি দেয়, সে তার নিজেকে বিশেষ ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়, কারণ তার সেই ডাকটি শিকারী প্রাণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিশেষ করে তার প্রতি; এটি শুধুমাত্র সামান্য একটু বাড়তি ঝুঁকি নেয়া, কিন্তু তা সত্ত্বেও, এটি প্রথম দৃষ্টিতে আমাদের সংজ্ঞা মোতাবেক একটি পরার্থবাদী কাজ হিসাবে গণ্য হতে পারে।

প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণতম ও সবচেয়ে বেশী চোখে পড়ার মত পরোপকারী কাজটি পিতা-মাতার দ্বারা সম্পাদিত হয়, বিশেষ করে জন্মদানকারী মায়েরা– তাদের সন্তানের প্রতি; তারা তাদের নীড়ে বা তাদের নিজেদের শরীরে সন্তানকে জন্ম দেবার আগ অবধি প্রতিপালন করেন, তাদের জন্মের পর নিজেদের বিশাল আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাদের খাদ্য সরবরাহ করেন, এবং শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে সন্তানদের বাঁচাতে বিশাল ঝুঁকি নেন। একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণের কথা ধরা যাক, মাটিতে নীড় বানানো অনেক পাখিরা একটি প্রদর্শনী আচরণ করে, যা পরিচিত মনোযাগ বিক্ষিপ্ত করার জন্য প্রদর্শনী বা ‘ডিসট্রাকশন ডিসপ্লে। যখন কোনো শিকারী প্রাণী যেমন শিয়াল আক্রমণ করে, পিতা কিংবা মাতা পাখিটি তখন তার নীড় ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে তাদের শুধু একটি ডানা প্রশস্ত করে ধরে রেখে, এমনভাবে যেন মনে হয় তাদের একটি ডানাটি ভেঙ্গে গেছে; শিকারী প্রাণীটি সেই ডানা ভাঙ্গা পাখিটিকে সহজ শিকার ভেবে নেয় আর তার নজর পাখির বাসায় থাকা নবজাতক পাখির চেয়ে সেই পাখির প্রতি নিবদ্ধ হয়। অবশেষে পাখিটি তার ভান করা নাটকটি ত্যাগ করে, শিয়ালের মুখে ধরা পড়ার আগে বাতাসে উড়ে যায়। যদিও এটি তার নীড়ের অন্যদের রক্ষা করে, কিন্তু তাকে ঝুঁকি নিতে হয়।

গল্প বলে আমি কোনো বিশেষ কিছু বোঝাতে চাইছি না, বাছাই করা উদাহরণ কখনোই গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে না যা দিয়ে কার্যকরী কোনো একটি সাধারণীকরণ সম্ভব।এই গল্পগুলো বলা হচ্ছে শুধুমাত্র উদাহরণ হিসাবে যে, প্রজাতির একক সদস্যদের পর্যায়ে পরার্থবাদীতা আর স্বার্থপরতা বলতে আসলে আমি কি বোঝাতে চাইছি। এই বইটি পরবর্তীতে দেখাবে কিভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিগত পরার্থবাদীতা দুটোই একটি মৌলিক সূত্র বা আইন দিয়ে বোঝানো সম্ভব, যাকে আমি বলছি “জিন স্বার্থপরতা’ (gene selfishnes); কিন্তু তার আগে আমাকে অবশ্যই পরার্থবাদীতার একটি বিশেষ ভ্রান্তিপূর্ণ ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে হবে, কারণ এটি ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং এমনকি ব্যাপকভাবে এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়ানো হয়ে থাকে।

এই ব্যাখ্যাটি একটি ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যা আমি আগেই উল্লেখ করেছিলাম, তা হলো জীবিত সব জীবরা ‘প্রজাতির কল্যাণে’ বা ‘কোনো গ্রুপ বা গোষ্ঠীর কল্যাণে কোনো কিছু করার জন্যবিবর্তিত হয়। খুবই সহজ কিন্তু দেখা কিভাবে এই ধারণাটির জন্ম হয়েছে জীববিজ্ঞানে। কোনো একটি জীবের জীবনের বেশীর ভাগ অংশই ব্যয় হয় প্রজননের জন্য এবং পরার্থবাদী আত্মত্যাগের বেশীর ভাগ ক্রিয়া যা আমরা প্রকৃতিতে দেখি, সেগুলো সন্তানদের প্রতি তাদের পিতামাতারা করে থাকে। প্রজাতির ধারা অব্যহত রাখা’ প্রজননের একটি খুব প্রচলিত সুভাষণ এবং এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রজননেরই একটি পরিণতি। সামান্য একটু সম্প্রসারিত যুক্তির প্রয়োজন হয় সেই উপসংহারে উপনীত হতে যে, প্রজননের কাজ হচ্ছে প্রজাতির ধারা অনন্তকালের জন্য ‘অব্যহত রাখা। এখান থেকে আরো একটি ছোট মিথ্যা পদক্ষেপ নিলেই সেই উপসংহারে পৌঁছানো যায় যে, প্রাণীরা সাধারণত এমনভাবেই আচরণ করে যা প্রজাতির ধারা অব্যহত রাখার বিষয়টি বিশেষ সুনজর পায়। প্রজাতি বা গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি পরার্থবাদী আচরণ মনে করা হয় এখান থেকেই এসেছে।

এই চিন্তার সূত্রটি হালকাভাবে ডারউইনীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়। বিবর্তন কাজ করে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের অর্থ হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত বা ‘ফিটেষ্টদের’ বৈষম্যমূলকভাবে বেঁচে থাকা (প্রজাতির ফিটেস্ট সদস্যদের তুলনামূলকভাবে বেশী বেঁচে থাকাটা নিশ্চিৎ করে) (১৫)। কিন্তু আমরা কি নিয়ে কথা বলছি, সবচেয় ফিট একক সদস্য, নাকি সবচেয়ে ফিট জনগোষ্ঠী, রেস বা বর্ণ নাকি সবচেয়ে ফিট প্রজাতি অথবা কি? কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। কিন্তু যখন আমরা পরার্থবাদীতা নিয়ে কথা বলবো এটি অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি এটি প্রজাতি হয়, যারা ডারউইনের ভাষায় টিকে থাকার সংগ্রামে প্রতিদ্বন্দিতা করতো, তাহলে প্রজাতির সদস্যরা সেই খেলায় দাবার ‘পন’ বা সৈন্য গুটির মত হতো, যাদের যখন খুশী বিসর্জন দেয়া যেতো, যখন প্রজাতির বৃহত্তর স্বার্থে সেই কাজটি করার দরকার পড়তো; ব্যপারটাকে কিছুটা সম্মানজনক উপায়ে বলতে চাইলে, কোন একটি গ্রুপ, যেমন একটি প্রজাতি বা কোনো একটি জনগোষ্ঠী সেই প্রজাতির মধ্যে, যাদের প্রতিটি সদস্য পুরো গ্রুপটির কল্যাণে নিজেদের বিসর্জন দেবার জন্য প্রস্তুত থাকে, হয়তো তাদের বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা কম, অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপদের তুলনায়, যে গ্রুপের সদস্যরা তাদের নিজেদের স্বার্থ গ্রুপের স্বার্থের উপরে স্থান দেয়। সুতরাং পৃথিবী সেই সব গ্রুপদের দ্বারা পূর্ণ হয় যাদের গ্রুপে আত্মত্যাগী সদস্যরা আছে। এটাই ‘গ্রুপ সিলেকশন’ তত্ত্ব। বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা একে সত্য হিসাবে ধারণা করে এসেছেন, বিশেষ করে সেই সব জীববিজ্ঞানীরা যারা বিবর্তন তত্ত্বটির বিস্তারিত অনেক কিছুই জানেন না। যে ধারণাটিকে ব্যাপকভাব পচার করেছিল ভি, সি ওয়াইন-এডওয়ার্ডের একটি বিখ্যাত বই (১৬) ও রবার্ট আর্ডে তার “দি সোস্যাল কনট্রাক্ট” বইটির মাধ্যমে এটি জনপ্রিয় করেছিলেন। এর প্রচলিত বিকল্পটি সাধারণত বলা হয়, “ইন্ডিভিজুয়াল সিলেকশন’, যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে চাই ‘জিন’ সিলেকশনের কথা।

যে যুক্তিটি এই মাত্র উল্লেখ করা হলো, সেই যুক্তির ‘ইন্ডিভিজুয়াল সিলেকশনবাদী’ কোনো দ্রুত উত্তর যা বলা হলো তা হয়তো এরকম হতে পারে। এমনকি পরার্থবাদীদের গ্রুপে, সেখানে অবশ্যই কিছু সংখ্যালঘু ভিন্ন মতাবলম্বী থাকবে, যারা কোনো ধরনের আত্মত্যাগ করতে রাজী হবে না, যদি সেখানে একজন স্বার্থপর বিদ্রোহী থাকে, সে বাকীদের পরার্থবাদী আচরণ ব্যবহার করতে পারবে নিজের স্বার্থে। তাহলে সে, সংজ্ঞানুযায়ী বাকীদের চেয়ে বেশী দিন বেঁচে থাকবে এবং সন্তানের জন্ম দেবে। তার প্রতিটি সন্তানও এই স্বার্থপর বৈশিষ্ট্যটি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার প্রবণতা থাকবে। এবং বেশ কিছু প্রজন্মান্তরে, এই প্রাকতিক নির্বাচনের ফলাফলে ‘পরার্থবাদী’ গ্রুপটি স্বার্থপর সদস্যদের সংখ্যাধিক্যের মুখোমুখি হবে, এবং যাদের আসলে কোনো স্বার্থপর গ্রুপ থেকে আলাদা করা সম্ভব হবেনা। এমনকি যদি আমরা সেই অসম্ভাব্য ঘটনাচক্রে এমন কোনো গ্রুপের অস্তিত্ব মেনে নেই, যে গ্রুপের প্রতিটি সদস্য বিশুদ্ধভাবেই পরার্থবাদী, যেখানে কোনো স্বার্থপর ভিন্নমতাবলম্বী বিদ্রোহীর কোনো অস্তিত্ব নেই, তারপরও চিন্তা করা খুবই কঠিন, এমন কি আছে যা স্বার্থপর কোনো গ্রুপ থেকে কোনো স্বার্থপর সদস্য এসে তাদের মধ্যে ভিড়ে যাওয়া থেকে বাধা দিতে পারে, এছাড়া আন্তঃগ্রুপ সম্পর্ক স্থাপন যেমন, বিয়ে তো আছেই, তার দ্বারাও কোনো বিশুদ্ধ পরার্থবাদী গ্রুপের বিশুদ্ধতাও নষ্ট হতে পারে।

ইন্ডিভিজুয়াল সিলেকশনবাদীরা স্বীকার করবেন যে গ্রুপ আসলেই বিলুপ্ত হয় এক সময় এবং কোনো একটি গ্রুপ বিলুপ্ত হবে, কি হবে না, সেটি সেই গ্রুপের একক সদস্যদের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। তিনি হয়তো এটাও স্বীকার করবেন যে, যদি শুধুমাত্র কোনো গ্রুপের সদস্যরা ভবিষ্যতে কি হতে পারে সেটি দেখার জন্য প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতার গুণে আশীর্বাদপুষ্ট হতেন, তারা হয়তো দেখতে পেতেন ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য ভালো হবে তাদের স্বার্থপর লোভ সংবরণ করা, যা তাদের পুরো গ্রুপটি ধ্বংস হওয়া থেকে প্রতিরোধ করবে। ব্রিটেনের শ্রমজীবি জনগণকে কতবার এই কথাটি আবশ্যিকভাবে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে? কিন্তু কোনো গ্রুপের বিলুপ্তি খুবই মন্থর একটি প্রক্রিয়া যদি আপনি একক সদস্যদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মারমুখী দ্বন্দ্ব আর রক্তপাতের সাথে তুলনা করেন। এমনকি যখন কোনো গ্রুপ ধীরে এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে পতন অভিমূখে থাকে, স্বার্থপর মানুষরা স্বল্প সময়ের জন্য পরার্থবাদীদের কল্যাণে বেশ ভালো থাকে; ব্রিটেনের নাগরিকরা দুরদর্শিতার আশীর্বাদপুষ্ট হতে পারেন আবার নাও পারেন কিন্তু বিবর্তন ভবিষ্যতের প্রতি অন্ধ।

যদিও গ্রুপ নির্বাচন তত্ত্ব এখন খুব সামান্যই সমর্থন আদায় করতে পারে সেই সব জীববিজ্ঞানীদের শিবিরে, যারা বিবর্তন বোঝেন, কিন্তু তত্ত্বটির আমাদের সহজাত বোধের কাছে এখনও খুবই আবেদনময়। ধারাবাহিক প্রজন্মের প্রাণিবিজ্ঞানের ছাত্ররা বিস্মিত হয়, যখন তারা স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় আসেন, যখন তারা আবিষ্কার করেন এটি আসলে জীববিজ্ঞানের প্রচলিত বা অর্থোডক্স ধারণা নয়। এর জন্য আসলেই তাদের দোষ দেয়া সম্ভব নয়, কারণ নাফিল্ড বায়োলজি টিচার্স গাইড, যা উচ্চতর শ্রেণীর জীববিজ্ঞানের পাঠ্য হিসাবে লেখা হয়েছে ব্রিটেনের স্কুল শিক্ষক শিক্ষিকাদের জন্য, সেখানে আমরা এই বাক্যটিকে দেখতে পাই: “উচ্চতর প্রাণীদের মধ্যে, আচরণ রুপ নিতে পারে যেমন আত্মহননেরও প্রজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। এই গাইডটির বেনামী লেখক অত্যন্ত আনন্দের সাথে অজ্ঞ সেই বাস্তব সত্যটি সম্বন্ধে, তিনি এই বাক্যে এমন কিছু বলেছেন যা বেশ বিতর্কিত একটি বিষয়। অবশ্য এই ক্ষেত্রে তিনি নোবেল জয়ী বিজ্ঞানীদের সংসর্গে অবস্থান করছেন। কনরাজ লরেঞ্জ, তার ‘অন অ্যাগ্রেসন’ বইটিতে, আলোচনা করেছেন, আগ্রাসী আচরণের ‘প্রজাতি সংরক্ষণ’ সংশ্লিষ্ট কাজের বিষয়ে, যাদের একটি কাজ হচ্ছে নিশ্চিৎ করা যে শুধু মাত্র যে সবচেয়ে উপযুক্ত বা ফিট, সেই সদস্যরাই সুযোগ পায় প্রজননের। এটি সার্কুলার বা আবদ্ধ যুক্তির একটি আদর্শ উদাহরণ। কিন্তু আমি যে বক্তব্যটি বোঝাতে চাইছি এখানে সেটি হলো যে গ্রুপ সিলেকশন এর ধারণাটি চিন্তার এত গভীরে প্রোথিত যে, লরেঞ্জ, নাফিল্ড গাইডের লেখকের মতই স্পষ্টতই অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তার বক্তব্য মূলধারা ডারউইনীয় তত্ত্বেরই বিরোধিতা করছে।

খুব সম্প্রতি আমি একই বিষয়ে একটি চমৎকার উদাহরণ শুনেছিলাম, আর বাকী সব দিক দিয়ে বিচার করলে অস্ট্রেলীয় মাকড়শাদের নিয়ে বিবিসির একটি সুনির্মিত টেলিভিশন প্রামাণ্যচিত্রে। এই প্রোগ্রামে বিশেষজ্ঞ লক্ষ করেন যে বিশাল সংখ্যক শিশু মাকড়শারা অন্য প্রজাতিদের খাদ্যে পরিণত হয়, এরপর তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, হয়তো এটাই তাদের অস্তিত্বের কারণ, কারণ অল্প কিছু সদস্যের শুধুমাত্র বেঁচে থাকতে হবে প্রজাতির ধারা সুরক্ষা করার জন্য। রবার্ট আর্জে, তার “দি সোস্যাল কনট্রাক্ট’ বইটিতে পুরো সামাজিক বিন্যাসকে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য এই গ্রুপ সিলেকশন’ তত্ত্ব ব্যবহার করেছিলেন। তিনি খুব স্পষ্টভাবে মানুষকে প্রজাতি হিসাবে দেখেছেন, যারা পশুর নৈতিকতার পথ থেকে সরে এসেছে; অন্তত আর্সে তার গবেষণা ঠিক মত করেছিলেন, প্রচলিত মূলধারা তত্ত্বের সাথে তার ভিন্ন মত পোষণ করার সিদ্ধান্ত একটি সচেতন সিদ্ধান্ত এবং এর জন্য তিনি কৃতিত্বের দাবী রাখেন।

গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্বে বিশেষ আবেদনের একটি কারণ হয়তো এটি আমাদের অধিকাংশের ধারণকৃত নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শের সাথে পুরোপুরিভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। হয়তো আমরা একক ব্যক্তি হিসাবে প্রায়শই স্বার্থপরের মত আচরণ করি কিন্তু আমাদের আদর্শবাদী মুহূর্তগুলোতে আমরা সম্মান ও বিশেষভাবে প্রশংসা করি সেই সব মানুষদের যারা অন্যদের কল্যাণ নিজেদের কল্যাণের আগে স্থাপন করে থাকেন। আমরা যদিও খানিকটা গুলিয়ে ফেলেছি কত বিস্তৃতভাবে আমরা আসলে অন্যদের সংজ্ঞায়িত করবো। প্রায়শই কোনো গ্রুপের অভ্যন্তরের পরার্থবাদীতা বিভিন্ন গ্রুপের প্রতি স্বার্থপরতার সাথে বিদ্যমান। এটাই ট্রেড ইউনিয়নবাদের মূল ভিত্তি, কোনো একটি ভিন্ন পর্যায়ে জাতি হচ্ছে আমাদের পরোপকারিতা বা পরার্থবাদী আত্মত্যাগের মূল সুবিধাভোগী এবং প্রায়শই দেশের সন্মানের জন্য তরুণরা তাদের নিজেদের জীবন উৎসর্গ করবে এমনটাই আশা করা হয়; উপরন্তু, তাদের উৎসাহিত করা হয়। অন্যদের হত্যা করার জন্য, যাদের সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না শুধুমাত্র তারা অন্য একটি দেশের নাগরিক এই তথ্যটি ছাড়া। (কৌতূহলোদ্দীপক একটি মজার ব্যপার হচ্ছে, শান্তির সময় নিজেদের জীবনের মান উন্নয়নের জন্য সামান্য কিছু আত্মত্যাগের আহবান যুদ্ধের সময় জীবন উৎসর্গ করার আহবানের চেয়ে অনেক কম কার্যকরী।)।

সম্প্রতি বর্ণবিদ্বেষ আর দেশপ্রেমের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ করেছি এবং একটি প্রবণতা, যা সমস্ত মানব প্রজাতিকে আমাদের সবার ভাতৃপ্রেমের নিশানা হিসাবে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করছে। আর আমাদের পরার্থবাদের নিশানার এই মানবতাবাদী সম্প্রসারণ একটি কৌতূহলোদ্দীপক অনুসিদ্ধান্ত, যা আবারো বিবর্তনের প্রজাতির জন্য কল্যাণকর ধারণাটিকে জোরালো করে। রাজনৈতিকভাবে উদারপন্থী যারা সাধারণত প্রজাতির নৈতিকতা নিয়ে সবচেয়ে বেশী মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী মূর্খপাত্র, এখন তারা প্রায়শই তাদের প্রতি সবচেয়ে বেশী ঘৃণা পোষণ করে, যারা তাদের পরার্থবাদের সীমানা আরো প্রশস্ত করে সামনে এগিয়ে গেছে এমনভাবে যাদের মধ্যে অন্য প্রজাতিরাও অন্তর্ভুক্ত। যদি বলি মানুষের বাসস্থানের উন্নতি করার চেয়ে আমি বেশী আগ্রহী তিমি মাছ হত্যা প্রতিরোধ করা করার জন্য, কোনো সন্দেহ নেই আমার অনেক বন্ধুকে তা হতবাক করবে।

নিজেদের প্রজাতির সদস্যরা অন্য প্রজাতির সদস্য অপেক্ষা বিশেষ নৈতিক বিবেচনার যোগ্য এই অনুভূতিটা খুবই প্রাচীন আর মনস্তত্ত্বের অনেক গভীরে প্রোথিত। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটের বাইরে মানব হত্যাকে সাধারণত সংঘটিত হতে পারে এমন অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত আর ভয়ঙ্কর হিসাবে বিবেচিত। আমাদের সংস্কৃতিতে নরহত্যার চেয়ে আর একটি কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ সেটি হচ্ছে নরমাংস ভক্ষণ (এমনকি যখন তারা মত); যদিও আমরা অন্য প্রজাতির সদস্যদের হত্যা করে খেতে উপভোগ করি। আমাদের অধিকাংশই এমনকি কোনো ভয়ঙ্কর মানব অপরাধীকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হত্যা করার ঘটনাতেও আৎকে উঠি, অথচ আমরা খুব আনন্দের সাথে বিনা বিচারে বেশ মৃদু স্বভাবের প্রাণীদের বিনা বিচারে হত্যা করাকে সমর্থন করি। আসলেই আমরা শুধু খেলা হিসাবে আনন্দ লাভের জন্য নীরিহ প্রজাতিদের হত্যা করি। একটি মানব ভ্রূণ, কানো একটি অ্যামিবার চেয়ে যার বেশী কিছু অনুভব করার ক্ষমতা নেই, সেটি যে সন্মান আর আইনীর সুরক্ষার সুফল ভোগ করে, তেমন কোনো কিছু প্রাপ্ত বয়স্ক শিম্পাঞ্জির ভাগ্যেও জোটে না। অথচ শিম্পাঞ্জিরা অনুভব করতে পারে, তারা চিন্তাও করতে পারে এবং সাম্প্রতিক কালের কিছু গবেষণা অনুযায়ী এমনকি তারা একধরনের মানুষের ভাষা শিখতেও সক্ষম। মানব ভ্রূণ আমাদের প্রজাতির সদস্য এবং তাই সেটি সাথে সাথেই বিশেষ সুবিধা পাবার যোগ্য ও সেটা পাবার অধিকারও রাখে সেই কারণেই। প্রজাতিবাদের এই নৈতিকতাটিকে আমরা, রিচার্ড রাইডারের শব্দ ‘স্পেসিসিজম’ ব্যবহার করে বর্ণবাদের মত একই পরিমান যৌক্তিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দেয়া যায় কিনা, আমি জানি না। আমি যা জানি সেটা হচ্ছে বিবর্তন জীববিজ্ঞানে এর কোন সঠিক ভিত্তি আছে।

ঠিক কোন স্তরে পরার্থবাদ কাঙ্খিত সেই মানবিক নৈতিকতার জটিলতা আর বিশৃঙ্খলায়– পরিবার, জাতি, বর্ণ, প্রজাতি বা সমস্ত জীবিত প্রাণী– এর প্রতিবিম্ব আমরা একই সমান্তরালে দেখতে পাই জীববিজ্ঞানেও, সেই একই সংশয়ে, ঠিক কোন স্তরে পরার্থবাদ আমরা আশা করতে পারি বিবর্তনবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী; এমনকি গ্রুপ সিলেকশনবাদীরা খুব একটা অবাক হবেন না বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখে: এভাবে, ট্রেড ইউনিয়নবাদীদের মত বা সৈন্যদের মত, তারা নিজেদের গ্রুপের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে যাচ্ছেন সীমিত সুযোগের মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে। কিন্তু তারপরও জিজ্ঞাসা করাটা অর্থহীন না, কিভাবে গ্রুপ সিলেকশনবাদীরা আসলে ঠিক করেন, ‘কোন’ স্তরটি আসলে গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো একটি প্রজাতির নানা গ্রুপে, এবং প্রজাতিগুলোর মধ্যে নির্বাচন কাজ করে, তাহলে সেটা কেনই বা বড় বড় গ্রুপের মধ্যে কাজ করবে না? প্রজাতির গ্রুপ করা হয়েছে গণ বা জেনেরায়, জেনেরারা বর্গ বা অর্ডারে, বর্গ বা অর্ডাররা ক্লাস বা শ্রেনীতে, সিংহ আর অ্যান্টেলোপ কিন্তু স্তন্যপায়ী হিসাবে একই গ্রুপে, দুটোই স্তন্যপায়ী শ্রেণীর সদস্য, যেমন আমরা। তাহলে কি উচিৎ হবে সিংহদের অ্যান্টেলোপদের হত্যা করা থেকে বিরত থাকা, ‘স্তন্যপায়ীদের কল্যাণে’? নিশ্চয়ই তারা এর বদলে পাখি বা সরীসৃপদের শিকার করতে পারে, তাদের নিজেদের শ্রেণীর বিলুপ্তি ঠেকাতে; কিন্তু তাহলে,পুরো মেরুদণ্ডী প্রাণীদের পর্বটির টিকে থাকার ব্যাপারে কি করা যেতে পারে?

আমার জন্য পুরো ব্যাপারটার বিরুদ্ধে রিডাকটিও এড অ্যাবসার্ডাম (reductio ad absurdum) যুক্তি (১৭) ব্যবহার করে তর্ক এবং গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্বের সমস্যাগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে খুব সহজ হয়তো। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিগত স্তরে পরার্থবাদের অস্তিত্ব তারপরও ব্যাখ্যা করা বাকী থেকে যায়। আর্সে এমনকি বলেছেন, গ্রুপ সিলেকশনই হচ্ছে একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এমন সব আচরণের যেমন থমসন গ্যাজেলদের ‘স্টটিং’ আচরণ (১৮)। এই বিশেষ উৎসাহী এবং দৃষ্টি আকর্ষণ করা লম্ফ ঝম্প করা কোনো শিকারী প্রাণীর সামনে কিন্তু মিল আছে পাখিদের সতর্ক সংকেতের সাথে, এখানে তার এই আচরণে সে তার সঙ্গীদের বিপদ সম্বন্ধে সতর্ক করছে, এবং একই সাথে তার নিজের দিকে শিকারী প্রাণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে স্টার গ্যাজেলটি। আমাদের দ্বায়িত্ব এই লক্ষ্য ঝম্পরত গ্যাজেল এবং এধরনের একইরকম প্রাকৃতিক প্রপঞ্চগুলো ব্যাখ্যা করা। এবং এই বিষয়গুলোর মোকাবেলা আমি করবো পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে।

কিন্তু তার আগে আমাকে আমার বিশ্বাসের সপক্ষে যুক্তি দিতে হবে, যা দাবী করছে বিবর্তনকে ভালোভাবে লক্ষ করার সবচেয়ে সেরা উপায় হচ্ছে একেবারে সর্বনিম্ন স্তরে ঘটা নির্বাচনকে বোঝার চেষ্টা করা। এই বিশ্বাসে জি. সি. উইলিয়ামসের দারুণ বই, Adaptation and Natural Selection দ্বারা আমি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছি। যে মূল ধারণাটি আমি ব্যবহার করবো আমার যুক্তিতে, সেটির পুর্বাভাস দিয়েছিলেন এ. ভাইজম্যান (১৯) এই শতাব্দীর শুরুর দিকের প্রাক-জিন দিনগুলোয়– তার ‘জার্মপ্লাজমের অব্যাহত ধারা’ বা continuity of the germ-plasm মতবাদে। আমি যুক্তি দেবো প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক– এবং সেই অর্থে আত্ম স্বার্থবাদের– প্রজাতি নয়, কোনো গ্রুপও নয়, কঠোরভাবে প্রজাতির একক সদস্যও নয়। আসল একক হচ্ছে জিন, বংশগতি বা হেরেডিটির একক (২০)। কোনো কোনো জীববিজ্ঞানীর কাছে প্রথমে মনে হতে পারে এটি চরমতম একটি অবস্থান।আমি আশা করি যখন তারা দেখবেন ঠিক কি অর্থে আমি সেটা বোঝাতে চাইছি, তারাও একমত হবেন যে এটি মূলত প্রচলিত ধারণা, এমনকি যদিও এটি প্রকাশ করা হয়েছে অপরিচিত একটি উপায়ে। এই যুক্তিটি তার আকার নেবে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে এবং আমাদের শুরু থেকেই শুরু করতে হবে, জীবনের সেই মূল উৎপত্তি থেকে।

.

নোটস (অধ্যায় ১)

(১) জর্জ গেলর্ড সিম্পসন (১৯০২-১৯৮৪) যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্মবিদ, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী জীবাশ্মবিদ, এবং মডার্ন ইভেন্যুশনারী সিনথেসিস এর একজন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রদূত।

(২) বহু মানুষ, এমনকি ধার্মিক নন এমন মানুষরাও জর্জ গেলর্ড সিম্পসনের এই উদ্ধৃতিটি পড়ে মর্মাহত হয়েছেন। আমি স্বীকার করছি, যখন আপনি এটি প্রথমবারের মত পড়বেন, আপনার এটিকে খুব অমার্জিত আর কাণ্ডজ্ঞানহীন আর অসহিষ্ণু বলেই মনে হবে, কিছুটা হেনরী ফোডের সেই উদ্ধৃতির মত: ‘ইতিহাস কম বেশী ধাপ্পাবাজী ছাড়া আর কিছুই না। কিন্তু ধর্মীয় উত্তরগুলো বাদে (আমি সেই উত্তরগুলো সম্বন্ধে অবগত আছি, দয়া করে আমাকে ডাকে চিঠি পাঠিয়ে আপনার ডাকটিকিট নষ্ট করবেন না), সত্যিকারভাবে যদি আপনি, ‘মানুষ কি?” “জীবনের কি কোনো অর্থ আছে?” “আমাদের এই অস্তিত্বের কারণই কি? এই প্রশ্নগুলোর প্রাক-ডারউইন উত্তরগুলো ভাববার একটি চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেন, আপনি কি পারবেন, সত্যিকারভাবে এমন কোনো উত্তর ভেবে বের করতে যা কিনা এখন অর্থহীন নয়, শুধুমাত্র তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়া? এমন কিছু জিনিস আছে যা একেবারেই স্পষ্টভাবেই ভুল, এবং ১৮৫৯ সালের আগে, এই প্রশ্নগুলোর সব উত্তরই হচ্ছে ঠিক সেটাই। উল্লেখ্য, ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন তার দি অরিজিন অব স্পিসিস বইটি প্রকাশ করেছিলেন।

(৩) কনরাড যাকারিয়াস লরেন্দ্র (১৯০৩-১৯৮৯) অষ্ট্রিয়ার প্রাণিবিজ্ঞানী, প্রাণি-আচরণবিদ এবং পক্ষীবিশারদ। তিনি ১৯৭৩ সালে নিকোলাস টিনবার্গেন ও কার্ল ভন ফ্রিশ-এর সাথে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। তাকে আধুনিক প্রাণীআচরণবিদ্যা বা ইথথালজীর একজন জনক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।

(8) On Aggression (German: Das sogenannte Böse zur Naturgeschichte der Aggression) ১৯৬৩

(৫) রবার্ট আর্সে (১৯০৮-১৯৮০) যুক্তরাষ্ট্রের নৃতত্ত্ববিদ।

(৬) The Social Contract: A Personal Inquiry into the Evolutionary Sources of Order and Disorder, 1890

(৭) ইরেনাউস আইবেল-আইবেসফেল্ট (জন্ম ১৯২৮) হিউমান ইথোলজী বিষয়টির প্রতিষ্ঠা। কর্মক্ষেত্র অষ্ট্রিয়া ও জার্মানী।

(৮) Love and Hate: The Natural History of Behavior Patterns. (১৯৭০)।

(৯) অ্যাশলে মনটেণ্ড (১৯০৫-১৯৯৯) বৃটিশ আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ।

(১০) Who trusted God was love indeed/ And love Creation’s final law
Tho’ Nature, red in tooth and claw/ With ravine, shriek’d against his creed./(Alfred Lord Tennyson’s In Memoriam A. H. H. ১৮৫০)

(১১) আলফ্রেড টেনিসন (১৮০৯-১৮৯২) ইংলিশ কবি।

(১২) স্বার্থপরতাকে বেঁচে থাকার একটি মূলনীতি হিসাবে গ্রহন করা উচিৎ এমন মতবাদের পক্ষে ওকালতি করার করছে বলে সমালোচকরা কখনো কখনো ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটিকে ভুল বুঝেছেন,! অন্যদের ক্ষেত্রে, হয়তো তার কারণ, তারা বইটার শুধু শিরোনামই পড়েছেন বা প্রথম এক দুই পাতার বেশী আর তারা অগ্রসরই হননি; তারা ভেবেছেন, আমি বলছি যে, আমরা পছন্দ করি বা না করি, স্বার্থপরতা ও অন্যান্য নোংরা আচরণ আমাদের প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ। এই ভুলের ফাঁদে পড়াটা খুব সহজ, যদি আপনি ভাবেন, যেমন বহুমানুষই অকারণেই মনে করেন, জিনগত ‘ডিটারমিনেশন’ বা পূর্বনির্ধারণ চিরকালের জন্য, অমোচনীয়– চূড়ান্ত, অপ্রতিবর্তনযোগ্য। কিন্তু বাস্তবিকভাবে জিন শুধুমাত্র পরিসংখ্যানগতভাবে কোনো আচরণ নির্ধারণ করে (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৪৬-৫০ দ্রষ্টব্য); একটি ভালো সমতুল্য উদাহরণ হতে পারে যেমন: ব্যাপকভাবে যে সাধারণীকরণকে মেনে নেয়া হয়েছে, “রাতের বেলায় লাল আকাশ মেষপালকের জন্য আনন্দ। হয়তো পরিসংখ্যানগতভাবেও এটি বাস্তব সত্য হতে পারে যে, ভালো লাল কোনো সুর্যাস্ত পরের দিনটিও সুন্দর হবে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করে। কিন্তু আমরা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর উপর অনেক পরিমান টাকা বাজী রাখবো না কখনোই। আমরা খুব ভালো করে জানি আবহাওয়া খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়ায় নানা উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। যেকোনো আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভুল হবার সম্ভাবনা আছে। এটি একটি পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাস মাত্র। আমরা কিন্তু দেখি না লাল সুর্যাস্ত কোনো রকমের ব্যতিক্রম ছাড়াই বা অনিবার্যভাবে এর পরের দিনের ভালো আবহাওয়া নিশ্চিৎ করে এবং আমাদেরও এমন কোনো কিছু ভাবা উচিৎ না যে জিনও অনিবার্যভাবে কিছু নির্ধারণ করতে পারে। কোনো কারণই নেই কেন জিনের প্রভাব সহজেই অন্য কিছুর প্রভাবে বাতিল বা ভিন্ন হবে না। জিনগত ডিটারমিনিজম নিয়ে এবং ভুল বোঝার বিষয়টি কেন এখানে ঘটে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য The Extended Phenotype বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় ও আমার 69777, Sociobiology: The New Storm in a Teacup দেখুন; আমাকে এমন কি অভিযুক্ত করা হয়েছে যে আমি নাকি দাবী করেছি সব মানুষই মূলত শিকাগো গ্যাঙ্গস্টার! কিন্তু আমার শিকাগো গ্যাঙ্গস্টারের তুলনামূলক উদাহরণটির (প্রথম অধ্যায়, মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ২ এ বর্ণিত) মূল বক্তব্যটি অবশ্যই যা ছিল: ‘কি ধরনের পৃথিবীতে কোনো একটি মানুষের বিশেষ ভালো করছে, সেই বিষয়ে আমাদের জ্ঞান কিন্তু আপনাকে সেই মানুষটি সম্বন্ধে কিছু ধারণা দেয়। এটি সেই শিকাগো গ্যাঙ্গস্টারের কোনো বিশেষ গুণাবলীর সাথে এর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এই উদাহরণটায় আমি অনায়াসে ব্যবহার করতে পারতাম এমন কোনো মানুষের কথা, যিনি চার্চ অব ইংল্যান্ডের শীর্ষস্থানে আরোহন করেছেন বা কোন অ্যাথিনিয়ামে (কোনো প্রাচীন বিদ্যামন্দিরে) নির্বাচিত হয়েছেন। যাই হোক না কেন, কোনো ক্ষেত্রেই এটি মানুষটি নয় বরং জিনরা হচ্ছে আমার অনুরুপ উদাহরণের বিষয়।

এই বিষয়টি এবং অন্যান্য কিছু অতিমাত্রায় আক্ষরিকভাবে গ্রহন করার কারণে উদ্ভূত ভুল বোঝাবুঝির বিষয়গুলো আমি আলোচনা করেছিলাম আমার পেপার in defence of selfish genes এ, যেখান থেকে উপরের উদ্ধৃতিটি নেয়া হয়েছে।

এখানে আমি অবশ্যই যোগ করবো, এই অধ্যায়ে বর্ণিত আকস্মিক রাজনৈতিক পাশ্বমন্তব্যের কারণ ১৯৮৯ সালে বইটি পুনপাঠ করা আমার জন্য বেশ অস্বস্তিকর ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেনের শ্রমজীবি মানুষের প্রতি কতবার অবশ্যই এটি বলতে হবে (পুরো গ্রুপকে ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচাতে স্বার্থপর লোভ সংবরণ করার প্রয়োজনীয়তা); এটি পড়লে আমাকে মনে হতে পারে টরি বা রক্ষণশীলদের মত কথা বলছি (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ১০)! ১৯৭৫ সালে, যখন এটি লেখা হয়েছিল, তখন একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার, যাদের ক্ষমতায় আনতে আমি ভোট দিয়ে সাহায্য করেছিলাম, ২৩ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে হতাশাজনকভাবে টিকে থাকার সংগ্রাম করছিল এবং অবশ্যই তারা বেশী বেতনের দাবী সামলাতে চিন্তিত ছিল। আমার মন্তব্য পড়ে মনে হতে পারে যে সেই সময়ের যে কোন শ্রমমন্ত্রীর ভাষণ থেকে সেটি সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন ব্রিটেনে একটি সরকার আছে, যা নতুন ডানপন্থী, যারা নিজেদের সংকীর্ণতা আর স্বার্থপরতাকে আদর্শের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। আমার শব্দগুলো সংশ্লিষ্টতার কারণে একটি নতুন ধরনের কদর্যতা অর্জন করেছে, যে কারণে আমি আক্ষেপ প্রকাশ করছি। এমন না যে আমি কথাগুলো ফিরিয়ে নিচ্ছি; স্বার্থপর হ্রস্বদৃষ্টিতা এখনও অনাকাঙ্খিত পরিণতির কারণ যা আমি উল্লেখ করেছিলাম। কিন্তু ইদানীং, যদি কেউ ব্রিটেনে স্বার্থপর হ্রস্বদৃষ্টি উদাহরণ সন্ধান করতে চান, কারোরই উচিৎ হবে না প্রথমে কর্মজীবি শ্রেণীর দিকে তাকানো। আসলেই সম্ভবতই এটাই ভালো হবে কোনো একটি বৈজ্ঞানিক লেখাকে রাজনৈতিক মন্তব্য দিয়ে ভারাক্রান্ত করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা। কারণ বিস্ময়করভাবে এই সব মন্তব্যগুলো তার সময় উপযোগিতা হারায় খুব দ্রুত। ১৯৩০ এর দশকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন বিজ্ঞানীরা –জে. বি. এস. হলডেন, ল্যান্সেলট হগবেন, যেমন– তাদের লেখায় বহু সময়-অনুপযোগী মন্তব্যে পূর্ণ।

(১৩) পুরুষ পতঙ্গ সংক্রান্ত এই অদ্ভুত তথ্যটি, আমি শুনেছিলাম ক্যাডিস ফ্লাই নিয়ে গবেষণা করছেন এমন একজন সহকর্মীর লেকচারে, তিনি বলেছিলেন যে তিনি চাইছেন ক্যাডিস মাছিদের বন্দীদশায় প্রজনন করানোর জন্য কিন্তু তিনি যতই চেষ্টা করছিলেন না কেন তিনি তাদের প্রজনন করতে প্ররোচিত করতে পারছিলেন না। এটি শুনে সেখানে সামনের সারিতে বসা এক কীটতত্ত্ববিদ্যার অধ্যাপক গর্জন করে উঠেছিলেন, যেন সবচেয়ে আবশ্যিক সুস্পষ্ট একটি বিষয় এখানে উপেক্ষা করা হয়েছে, “আপনি কি তাদের মাথাগুলো কেটে দিয়ে চেষ্টা করে দেখেননি?”

(১৪) কামিকাজি (স্বর্গীয় বাতাস) জাপানী আত্মঘাতী বোমারু বিমান চালকরা এই নামে পরিচিত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে মিত্র নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে জাপানী সেনাবাহিনী এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন প্রথাগত যুদ্ধ কৌশলের ব্যতিক্রম একটি পন্থা হিসাবে।

(১৫) জীববিজ্ঞানে ‘ফিটনেস’ শব্দটির ভিন্ন অর্থ আছে। বিবর্তন আর যৌন নির্বাচন তত্ত্বে এটি প্রধান একটি ধারণা। এটি জেনোটাইপ কিংবা ফেনোটাইপ উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যেতে পারে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে। উভয় ক্ষেত্রে এটি একক সদস্যের প্রজনন সাফল্যের বিষয়টি ইঙ্গিত করে। কোনো একটি সুনির্দিষ্ট জেনোটাইপ বা ফেনোটাইপসহ গড়পড়তা কোনো সদস্য পরবর্তী প্রজন্মের জিন সম্ভারে গড়ে যে অবদান রাখে সেটা ফিটনেসের সমান। ডারউইনীয় ফিটনেস শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে শারীরিক বা ফিজিকাল ফিটনেসের সাথে এর পার্থক্য করতে। যেখানে ফিটনেস কোনো একটি জিনের অ্যালিলদের কোনো জিনের বা জিন লোকাসের বিভিন্ন বিকল্প রুপের একটি) মধ্যকার পার্থক্যকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো জিনপুলে এই অ্যালিলগুলোর উপস্থিতির হার বদলে যেতে পারে প্রজন্মান্তরে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কোনো একক সদস্যদের ফিটনেসের উপর যে অ্যালিলগুলো বেশী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে তাদের সংখ্যাই জিনপুলে ক্রমশ বাড়তে থাকবে, এই প্রক্রিয়াটির নামই প্রাকৃতিক নির্বাচন। ফিটনেস মানে জীবন কতটা দীর্ঘ সেটার পরিমাপ নয়। সুপরিচিত বাক্য Survival of the fittest কে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি, সেই ফর্ম বা রুপটির ( জিনোটাইপিক অথবা ফিনোটাইপিক) টিকে থাকা, যা পরবর্তী প্রজন্মগুলোয় তার বেশী সংখ্যক কপি বা প্রতিলিপি রেখে যাবে।

(১৬) ভেরো কপনার ওয়াইন-এডওয়ার্ডস (১৯০৬-১৯৯৭) ইংলিশ প্রাণিবিজ্ঞানী। তিনি সুপরিচিত গ্রুপ সিলেকশন মতবাদটি প্রচারের জন্য, যা দাবী করে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করছে গ্রুপ স্তরে।

(১৭) রিডাকশন অ্যাড আবসার্ডাম বা রিডাকশন টু অ্যাবসার্ডিটি, যুক্তি তর্কের একটি সাধারণ যুক্তি, যা প্রদর্শন করতে চায় কোন একটি প্রস্তাবনা সত্যি কারণ মিথ্যা, অপ্রমাণযোগ্য অথবা অসম্ভব ফলাফল হবে এটি অস্বীকার করলে অথবা প্রদর্শন করা কোনো একটি স্টেটমেন্ট মিথ্যা, কারণ এটি গ্রহন করলে মিথ্যা, অপ্রমাণযোগ্য অথবা অসম্ভব ফলাফল হবে।

(১৮) “স্টটিং’ চতুষ্পদী প্রাণী বিশেষ করে গেজেদের মধ্যে দৃশ্যমান একটি আচরণ, যখন তারা লাফ দিয়ে শূন্যে ভেসে ওঠে, মাটি থেকে চার পা তুলে একসাথে, সাধারণ পাগুলো শক্ত সোজা হয়ে থাকে, ধনুকের মত বাঁকানো পিঠ এবং মাথা নীচের দিকে মুখ করে দেখে।

(১৯) ফ্রিডেরিখ লিওপোল্ড অগাস্ট ভাইজমান (১৮৩৪-১৯১৪): জার্মান বিবর্তন জীববিজ্ঞানী। আর্নস্ট মায়ার তাকে ডারউইনের পর উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিবর্তন তাত্ত্বিক বলে উল্লেখ করেছিলেন।

(২০) জিন নির্বাচনের আমার এই ম্যানিফেস্টোটি লেখার পর, আমার পরবর্তীতে ভিন্ন একটি ভাবনা হয়েছিল– আরো কি কোনো ‘ধরনের উচ্চতর পর্যায় আছে যেখানে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে কিনা বিবর্তনের দীর্ঘ সময় জুড়ে। আমি দ্রুত সেটা যোগ করার চেষ্টা করলাম, যখন আমি বলি “উচ্চতর পর্যায়, আমি কিন্তু সেটি বলতে কোনো ‘গ্রুপ সিলেকশন বা নির্বাচন’ বোঝাচ্ছি না। আমি কথা বলছি আরো সূক্ষ্ম আর আরো বেশী কৌতূলদ্দেীপক একটি বিষয় নিয়ে। আমার এখন মনে হয় শুধুমাত্র কিছু একক সদস্য অন্যদের চেয়ে বেশী ভালোভাবে টিকে থাকেই না, পুরো একটি শ্রেণীর জীবরাও অন্যদের চেয়ে বেশী দক্ষতার সাথে বিবর্তিত হতে পারে। অবশ্যই যে বিবর্তিত হবার কথা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি এখানে সেটা সেই একই বিবর্তন প্রক্রিয়া, যা ঘটে নির্বাচনের মাধ্যমে, আর নির্বাচনটি হয় জিন পর্যায়ে। মিউটেশনগুলো বিশেষ সহায়তা পায় এখনও কারণ একক সদস্যদের উপর বেঁচে থাকা আর তাদের প্রজনন সাফল্যের উপর তাদের প্রভাব আছে। কিন্তু কোনো একটি বড় নতুন মিউটেশন, মূল জণতাত্ত্বিক পরিকল্পনায় আরো অসংখ্য নানামুখী বিবর্তন ঘটার পথটি উন্মুক্ত করে দেয় ভবিষ্যত বহু মিলিয়ন বছর ধরে। সুতরাং একধরনের উচ্চ পর্যায়ের নির্বাচন ঘটতে পারে ভ্রূণতত্ত্বে যা নিজেদের উন্মুক্ত করে দেয় বিবর্তনের জন্য: কোনো একটি নির্বাচন বিবর্তনশীলতার পক্ষে, যা বিবর্তন হবার সপক্ষে কাজ করে। এই ধরনের নির্বাচন এমনকি হতে পারে পুঞ্জীভূত এবং সেকারণের ধাপে ধাপে অগ্রসর এমনভাবে যা গ্রুপ সিলেকশনে দেখা যায় না। এই ধারণাটি আরো বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে আমার The Evolution of Evolvability শীর্ষক একটি প্রবন্ধে, যেটি লেখার জন্য আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম Blind Watchmaker নিয়ে কম্পিউটারে কাজ করার সময়। Blind Watchmaker একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম যা বিবর্তনের বিশেষ ক্ষেত্রগুলোর মত কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে।

০২. অনুলিপনকারীরা

 অধ্যায় ২: অনুলিপনকারীরা

একেবারে শুরুতে ছিল শুধু সরলতা। কিভাবে একটি খুব সরল সাধারণ মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল সেটি ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট কঠিন একটি কাজ। আর আমি ধরে নিচ্ছি সবাই একমত হবেন যে, আরো বেশী কঠিন হবে ব্যাখা করা, যে কিভাবে পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত, আর জটিলভাবে বিন্যস্ত, জীবন বা এমন কোনো সত্তা যা কিনা জীবন সৃষ্টি করতে পারে, হঠাৎ করে আবির্ভূত হতে পারে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত হচ্ছে একটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা, কারণ এটি আমাদের একটি উপায় দেখাতে সক্ষম যেখানে সরলতা জটিলতায় রূপান্তরিত হতে পারে, কিভাবে অবিন্যস্ত এলোমেলো অণুরা একসাথে গুচ্ছাকারে জড়ো হয়ে ক্রমান্বয়ে আরো অনেক বেশী জটিল কোনো রুপের সৃষ্টি করে চলতে যতক্ষণ না অবধি তারা মানুষ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ডারউইন একটি সমাধান আমাদের দিয়ে গেছেন, আর আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম সমস্যাটির সমাধানে আপাতত প্রস্তাব করা হয়েছে এমন সমাধানগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য সমাধান। আমি এই মহান তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো সাধারণত যেভাবে করা হয় তার চেয়ে আরো খানিকটা সাধারণীকরণ করে, বিবর্তন প্রক্রিয়াটি নিজেই শুরু হবার আগের সেই সময় থেকে।

ডারউইনের ‘সবচেয়ে যোগ্যতমদের টিকে থাকা’ প্রস্তাবনাটি আসলেই আরো বেশী সাধারণ ‘স্থিতিশীলদের টিকে থাকা’ সূত্রটিরই বিশেষ একটি কেস। মহাবিশ্ব পুর্ণ নানা স্থিতিশীল জিনিসে। স্থিতিশীল কিছু বোঝাতে আমরা বুঝি, অণুদের একটি গুচ্ছ যার যথেষ্ট স্থায়িত্ব আছে বা যথেষ্ট সাধারণ এর উপস্থিতিতে যে তারা একটি নাম পাবার যোগ্যতা রাখে। হতে পারে এরা আসলেই অনন্য অণুদের স্বতন্ত্র একটি সম্ভার, যেমন, ম্যাটারহর্ন (সুইজারল্যান্ড এবং ইতালীর মাঝখানে আল্পসের একটি পর্বত, একটি নাম পাওয়ার জন্য যা যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘসময় টিকে থাকে। বা হতে পারে এটি কোনো এক শ্রেণীর কিছু, যেমন, বৃষ্টির ফোঁটা, যারা বেশ উচ্চ হারেই অস্তিত্বশীল হয় বলে তারা সামগ্রিকভাবে একটি নামের দাবী রাখে, যদিও তাদের মধ্যে কেউ কেউ যথেষ্ট পরিমান স্বল্পস্থায়ী। যা কিছু আমরা আমাদের চারপাশে দেখি এবং যা কিছু আমরা মনে করি ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে– পাথর, ছায়াপথ, সাগরের ঢেউ– এসব কিছুই কম বেশী মাত্রায় অণুদের নানা স্থিতিশীল রুপ– সাবানের ফেনায় সৃষ্টি বুদবুদ সাধারণত গোলাকার হয় কারণ এই ধরণের গ্যাস পূর্ণ পাতলা স্তরের কোনো কিছুর জন্যে এটাই সবচেয়ে স্থিতিশীল একটি রুপ। কোনো মহাশূন্যযানেও পানি স্থিতিশীল গোলাকার গ্লোবিউল হিসাবে, কিন্তু পৃথিবীতে যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে, পানির স্থিতিশীল উপরি পিঠটা চ্যাপটা আর আনুভূমিক। লবনের স্ফটিকগুলো সাধারণ ঘণ কিউবাকৃতির হয় কারণ, সোডিয়াম আর ক্লোরাইড আয়নকে বেধে রাখার জন্য এটাই সবচেয়ে স্থিতিশীল রুপ। সূর্যের সবচেয়ে সাধারণতম অণুগুলো হচ্ছে। হাইড্রোজেন পরমাণু, যারা পরস্পরের সাথে মিশে তৈরী করে হিলিয়াম পরমাণু, কারণ যেখানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করে যেখানে হিলিয়াম পরমানুর গঠনটি আরো বেশী স্থিতিশীল। অন্যান্য আরো জটিল অণুরা নক্ষত্রে তৈরী হচ্ছে সারা মহাবিশ্ব জুড়ে, সেই ‘বিগ ব্যাঙ্গ’ এর অল্প কিছু সময় পর থেকেই, বিদ্যমান তত্ত্ব অনুযায়ী যে মুহূর্তে মহাবিশ্বের সূচনা করেছিল। এবং আমাদের পৃথিবীর সব মৌলগুলো মূলত এখান থেকেই এসেছিল।

কখনো কখনো যখন পরমাণুরা পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, তারা একে অপরের সাথে যুক্ত হয় রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অণু সৃষ্টি করার জন্য। তারা কম বেশী স্থিতিশীল হতে পারে। কোনো কোনো অণু হতে পারে অনেক বেশী বড়। কোনো স্ফটিক, যেমন, হিরার একটি টুকরোকে মনে করা যেতে পারে একটি অণু, এবং প্রবাদ বাক্যের মতই এটি স্থিতিশীল এই ক্ষেত্রে; কিন্তু আবার এটি খুব বেশী সরলও তার গঠনে কারণ এর আভ্যন্তরীণ পরমাণুগুলোর গঠন অসীম সংখ্যকবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। কোনো জীবিত আধুনিক প্রাণীদের মধ্যে আরো অনেক বড় আকারের অণুদের আমরা খুঁজে পারে, যারা খুবই জটিল এবং তাদের জটিলতা আমরা দেখি বেশ কয়েকটি স্তরে। আমাদের রক্তে হিমোগ্লোবিন হচ্ছে খুব বৈশিষ্ট্যসূচক একটি প্রোটিন অণু। এটি তৈরী হয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট অণুদের দ্বারা, যারা অ্যামাইনো অ্যাসিড, যাদের প্রত্যেকটির মধ্যেই আছে কয়েক ডজন পরমাণু, যারা সজ্জিত থাকে সুনির্দিষ্ট একটি প্যাটার্নে। হিমোগ্লোবিন অণুতে মোট ৫৭৪ টি অ্যামাইনো এসিড আছে। এরা সজ্জিত থাকে চারটি চেইন বা শঙ্খল হিসাবে, যারা একে অপরের সাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে গোলাকৃতির বা গ্লোবিউলার হতভম্ভ করে দেবার মত জটিল একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরী করে। হিমোগ্লোবিন অণুর মডেল দেখতে বরং কোনো ঘন থর্নবুশ বা কাটা গাছের ঝোঁপের মত, সত্যিকারের কোনো কাটা ঝোঁপের ব্যতিক্রম এটি এলোমেলো খামখেয়ালী কোনো প্যাটার্ণ না বরং একটি সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন কাঠামো, যার হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যার একটিও শাখা-প্রশাখা কিংবা কুণ্ডলী ভুল জায়গায় নেই, আর এই একই প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে গড়পড়তা কোনো মানুষের শরীরের প্রায় ছয় হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন বারেরও বেশী। প্রোটিন অণু যেমন, হিমোগ্লোবিন সেই নিখুঁত কাটা-ঝোঁপের আকারে স্থিতিশীল এই অর্থে যে দুটি অ্যামাইনো এসিডের চেইন বা শৃঙ্খলদের প্রবণতা আছে, দুটি স্প্রিং-এর মত, ঠিক একই ত্রিমাত্রিক কুণ্ডলী আকারের কাঠামো তৈরী করেই স্থিতিশীল হয়। হিমোগ্লোবিনের কাটা-ঝোঁপরা আমাদের শরীরে তাদের পছন্দসই আকার নিচ্ছে প্রতিটি সেকেন্ডে চার শত মিলিয়ন মিলিয়ন বার এবং একই ভাবে বহু অণু একই হারে ধ্বংস হচ্ছে।

হিমোগ্লোবিনের একটি আধুনিক অণু, পরমাণুদের স্থিতিশীল একটি প্যাটার্ন গঠন করার প্রবণতা আছে, এই মূলনীতিটি বোঝানোর জন্য যা একটি উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এখানে যে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক সেটি হচ্ছে পৃথিবীতে জীবনের আবির্ভাব হবার আগে,। পদার্থবিদ্যা আর রসায়নের সাধারণ প্রক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে অণুদের কিছুটা প্রারম্ভিক বিবর্তন হতে পারে। কোনো ডিজাইন বা পূর্বপরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য বা কোনো দিক নির্দেশনার কথা ভাবার প্রয়োজন নেই। প্রাকৃতিক নির্বাচনের আদিমতম রুপটি ছিল শুধুমাত্র একটি স্থিতিশীল রুপের নির্বাচন এবং অস্থিতিশীল কোনো রুপের বর্জন। কোনো রহস্য নেই এই বিষয়ে, সংজ্ঞানুযায়ী এটি অবশ্যই হতে হবে।

এখান থেকে, অবশ্যই, শুধুমাত্র এই একই মূলনীতি ব্যবহার করে কিন্তু আপনি সেই সব সত্তার অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, যেমন, মানুষের মত জটিল কোনো কিছু। কোনোই লাভ হবে না, যতই আপনি সঠিক সংখ্যক পরমাণু এক সাথে নিয়ে যতক্ষণ না তারা সঠিক প্যাটার্নটি তৈরী করছে ততক্ষণ তাদের ভালো করে ঝাঁকিয়ে বাইরে থেকে কিছু শক্তি সরবরাহ করেন না কেন, সেখান থেকে আস্ত আদমও বেরিয়ে আসবে না! অল্প কয়েক ডজন পরমাণু দিয়ে আপনি সেখানে হয়তো একটি অণু তৈরী করতে পারবেন, কিন্তু একটি মানুষের শরীরে এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন পরমাণু আছে। কোনো একটি মানুষ তৈরীর চেষ্টা করতে, আপনি আপনার সেই জৈবরাসায়নিক ককটেল শেকার নিয়ে এতটা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হবে যে, মহাবিশ্বের পুরো বয়সকে চোখের পলকের মত সংক্ষিপ্ত অনুভূত হবে এবং এমনকি তারপরও আপনি সফল হবেন না। আর এখানেই ডারউইনের তত্ত্ব, এর সবচেয়ে সাধারণতম রুপে আমাদের উদ্ধার করে। ডারউইনের তত্ত্ব। সেখান থেকে এর দ্বায়িত্ব নেয় যেখানে অণুদের ধীরে ধীরে তৈরী হবার গল্পটি শেষ হয়।

জীবনের উৎপত্তির কাহিনী যা আমি এখানে বর্ণনা করবো আবশ্যিকভাবে সেটি ধারণা নির্ভর; সংজ্ঞানুযায়ী, আসলে কি ঘটেছিল সেটি দেখার জন্য কেউই সেখানে ছিলনা। বেশ কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্ব আছে কিন্তু তাদের সবার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। যে সরলীকৃত ব্যাখ্যা আমি আপনাদের দেবো সেটি সম্ভবত সত্য থেকে খুব বেশী দূরে নয় (১)।

আমাদের জানা নেই জীবনের উৎপত্তি হবার আগে পৃথিবীতে কোন রাসায়নিক কাঁচামালগুলোর প্রাচুর্য ছিল। কিন্তু আপাতগ্রাহ্য সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে সেখানে ছিল পানি, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন এবং অ্যামোনিয়া: সরল সব যৌগ, আমাদের সৌরজগতের অন্ততপক্ষে কয়েকটি গ্রহে তাদের উপস্থিতি আছে বলে আমরা জানি। রসায়নবিদরা চেষ্টা করেছে সেই নবীন পৃথিবীর রাসায়নিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য। তারা এইসব রাসায়নিক উপাদানগুলো কাঁচের ফ্লাস্কে রেখে সেখানে কোনো উৎস থেকে শক্তি সরবরাহ করেছিলেন, যেমন, অতিবেগুনী রশ্মি কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ, কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট আদিম সেই বিদ্যুত চমকের রুপ। এভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, সাধারণত কিছু অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল এই সব কাঁচের পাত্রের মধ্যে একটি হালকা বাদামী সুপ, যেখানে ছিল বহু সংখ্যক অণুর শুরুতে যে অণুগুলো সেখানে রাখা হয়েছিল সেগুলোর চেয়ে যারা অনেক বেশী জটিল। বিশেষ করে অ্যামাইনো অ্যাসিড খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল– প্রোটিন তৈরীর একক, বিখ্যাত দুটি জৈববৈজ্ঞানিক অণু শ্রেণীর একটি। এই পরীক্ষাগুলো হবার আগে, প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া অ্যামাইনো অ্যাসিডকে জীবনের উপস্থিতির শনাক্তকারী চিহ্ন হিসাবে ভাবা হতো। যদি তাদের খুঁজে পাওয়া যেত, যেমন ধরুন মঙ্গল গ্রহে, সেই গ্রহে জীবনের উপস্থিতিকে মনে করে হতে প্রায় নিশ্চিৎ। এখন অবশ্য কোথাও জীবনের অস্তিত্ব ইঙ্গিত করার জন্য প্রয়োজন বায়ুমণ্ডলে কিছু সাধারণ গ্যাসের উপস্থিতি, কিছু আগ্নেয়গিরি, সূর্যের আলো অথবা বিদ্যুত চমকাচ্ছে এমন আবহাওয়া ইত্যাদি। আরো সাম্প্রতিক সময়ে, পৃথিবীতে জীবনের আবির্ভাবের আগে রাসায়নিক পরিস্থিতি গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করার মাধ্যমে সেই জৈব যৌগগুলো পাওয়া গেছে, যেমন, পিউরিন আর পাইরিমিডিন; তারা জেনেটিক অণু, ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোজ নিউক্লিক এসিড) এর গঠনগত একক।

এ ধরনের কোনো সমতুল্য প্রক্রিয়া অবশ্যই হয়তো সৃষ্টি করেছিল ‘প্রাইমিভাল সুপ’ বা আদিম মিশ্রণ, জীববিজ্ঞানী এবং রসায়নবিদরা বিশ্বাস করেন তিন থেকে চার হাজার মিলিয়ন বছর আগে মোটামুটিভাবে যা সাগরগুলোর গঠনগত উপাদান ছিল। এই জৈব যোগগুলো স্থানীয়ভাবে উচ্চ ঘনত্ব সম্পন্ন হয়েছিল, হয়তো শুষ্ক হতে থাকা ঘন ফেনার মধ্যে সাগরের তীরের আশে পাশে বা ভেসে থাকা ক্ষুদ্র তরলের বিন্দুতে। এছাড়া সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনী রশ্মির মত শক্তির প্রভাবে তারা সংযুক্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত বড় অণুতে তৈরী করেছিল। বর্তমানে এমন বড় জৈব অণুগুলো যথেষ্ট দীর্ঘ সময় অবধি টিকে থাকতে পারেনা যা কিনা নজরে পড়তে পারে: তারা দ্রুত শোষিত হয় অথবা তাদের ভেঙ্গে ফেলে ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীরা। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া আর আমরা বাকী সব জীবই এই দৃশ্যে আরো অনেক সময় পরে এসেছিলাম এবং সেই দিনগুলোয় বড় জৈব যৌগগুলো ভেসে থাকতে পারতো ক্রমশ ঘন হয়ে ওঠা সেই তরল মিশ্রণে ধ্বংস হয়ে যাবার আগে।

কোনো এক পর্যায়ে দুর্ঘটনাক্রমে একটি বিশেষভাবে ভিন্ন অসাধারণ অণু গঠিত হয়েছিল। আমরা এটিকে নাম দিবো ‘রেপ্লিকেটর’ বা ‘অনুলিপনকারী। আবশ্যিকভাবে এটিকে সবচেয়ে বড় আর জটিলতম অণু হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু তার একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল, এটি নিজের অনুলিপি তৈরী করতে পারতো। ঘটবার মত খুবই অসম্ভাব্য ধরনের একটি দুর্ঘটনা মনে হতে পারে। কোনো কিছু যা এরকম অসম্ভাব্য, তাদের ব্যবহারিক ও বাস্তবিক কারণেই মনে করা যেতে পারে অসম্ভব। সে-কারণেই আপনি কখনো ফুটবল-পুলস লটারীগুলোয় বড় কোনো ধরনের পুরষ্কার পাবেন না। কিন্তু কি সম্ভব আর কি সম্ভব না মানব জীবনের সেই পরিমাপে শত শত মিলিয়ন বছরের সময় নিয়ে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত নই। আপনি যদি প্রতি সপ্তাহে পুলস কুপন হাতে নেন শত মিলিয়ন বছর ধরে, খুবই সম্ভাবনা আছে আপনার বেশ কয়েকটি জ্যাকপট জেতার।

আসলেই একটি অণু, যা কিনা তার নিজের অনুলিপি করতে পারে, সেটা কিন্তু কল্পনা করা কঠিন না, প্রথমে যেমন মনে হয়, এবং শুধুমাত্র একবারই এর উদ্ভব হতে হবে। অনুলিপনকারী এই অণুটিকে কল্পনা করুন একটি ছাঁচ বা টেমপ্লেট হিসাবে। এটিকে কল্পনা করুন একটি বড় অণু হিসাবে, নানা ধরনের বিল্ডিং ব্লক বা গঠনগত একক অণুরা যা তৈরী করেছে। অনুলিপনকারী অণুটির চারপাশে পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা আদিম সুপ সদৃশ তরলে এইসব ছোট গঠনগত একক বা বিল্ডিং ব্লক অণুগুলো পর্যাপ্ত পরিমানে বিদ্যমান। এখন ভাবুন প্রতিটি একক অণুগুলো তাদের সমগোত্রীয় অণুগুলোর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করে। তারপর যখনই একটি বিল্ডিং ব্লক সেই মিশ্রণ থেকে অনুলিপনকারী অণুর সেই অংশটির কাছে আসে যাদের প্রতি তাদের বিশেষ আকর্ষণ আছে, সেখানে সেটির যুক্ত হবারও প্রবণতা আছে। যে গঠনগত অনুগুলো যারা এভাবে তাদের নিজেকে সংযুক্ত করবে তারা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এমন একটি অনুক্রমে সজ্জিত হবে যে অনুলিপনকারী অণুটিকে সেটি মিমিক বা প্রায় হুবহু নকল করে। খুব সহজ তারপর এমনটি ভাবা যে তারা সব একসাথে যুক্ত হয়ে একটি স্থিতিশীল অণুর শিকল তৈরী করবে ঠিক যেমন করে মূল অনুলিপনকারী অণুটি গঠন হবার সময় ঘটেছিল। এই প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিকভাবে চলবে একের পর একটা স্তর সজ্জিত হয়ে। এভাবেই তৈরী হয় স্ফটিক। আবার অন্যদিকে, দুটো অণুর শিকল হয়তো পরস্পর থেকে আলাদাও হতে পারে, সেই ক্ষেত্রে আমরা পাবো দুটি অনুলিপনকারী, যাদের প্রত্যেকটি নিজেদের আরো অনেকগুলো অনুলিপি করতে পারে।

আরো জটিল একটি সম্ভাবনা হচ্ছে যে, প্রতিটি গঠনগত একক তাদের মত একই ধরনের অণুদের প্রতি আকর্ষণ নয় বরং অন্য কোনো বিশেষ ধরনের অণুর সাথেও পারস্পরিক আকর্ষণ আছে। তাহলে কোনো অনুলিপিকারক টেমপ্লেট বা ছাঁচ হিসাবে কাজ করবে হবে হুবহু অণু তৈরী করার জন্য নয়, বরং একধরনের ‘নেগেটিভ এর মত, যারা আবার হুবহু মূল ‘পজিটিভ’ অণুটিকে পুনসৃষ্টি করতে পারবে। আমাদের ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে কোনো কিছু যায় আসে না যে মূল অনুলিপন প্রক্রিয়াটি পজিটিভ-নেগেটিভ নাকি নেগেটিভ পজিটিভ, যদিও এখানে মন্তব্য করা যেতে পারে সঙ্গতকারণে, প্রথম অণুলিপনকারী অণুটির আধুনিক সমতুল্য অণুটি, ডিএনএ অণু, পজিটিভ-নেগেটিভ অনুলিপন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। যেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেটি হচ্ছে হঠাৎ করেই একটি নতুন ধরনের স্থিতিশীলতার আগমন ঘটে পৃথিবীতে। অতীতে সম্ভবত কোনো বিশেষ ধরনের জটিল অণুর প্রাধান্য ছিল না মিশ্রণে, কারণ প্রত্যেকটি অণু এর গঠনগত একক অণু বা বিল্ডিং ব্লকের ভাগ্যক্রমে একটি বিশেষ স্থিতিশীল কাঠামো গঠন করার উপর নির্ভর করে। এবং যখনই অনুলিপনকারী অণুর জন্ম হয়, অবশ্যই তার অনুলিপি অণুগুলো দ্রুত সাগরে ছড়িয়ে পড়ে, যতক্ষণ না অবধি ছোট ছোট বিল্ডিং ব্লক অণুগুলো ধীরে ধীরে আরো দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে এবং অন্য বড় অণুগুলো তৈরী হওয়া ক্রমবর্ধমান হারে আরো দুরুহ হয়ে ওঠে।

সুতরাং আমরা হুবহু প্রতিলিপিদের বিশাল একটি জনসংখ্যার মখোমখি হই। কিন্তু আমাদের অবশ্যই এখন যেকোন অণুলিপিকরণ প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে হবে যে : এটি নিখুঁত নয়। অনুলিপন প্রক্রিয়ায় অবশ্যম্ভাবীভাবে কিছু ভুল হবে। আমি আশা করি এই বইটিতে ছাপা হয়েছে এমন কোনো ভুল শব্দ নেই, কিন্তু আপনি যদি খুব সতর্কতার সাথে লক্ষ করেন, আপনি হয়তো একটি বা দুটি ভুল খুঁজে পাবেন। তারা সম্ভবত বাক্যগুলোর অর্থ খুব বেশী বদলে দেয় না, কারণ এগুলো সবই ‘প্রথম প্রজন্মের ভুল। কিন্তু মুদ্রণ প্রক্রিয়া আসার আগের সেই দিনগুলোর কথা কল্পনা করুন, যখন সব বই, যেমন, গসপেল প্রতিলিপি করা হতো হাতে লিখে। সব স্ক্রাইব বা অনুলিপনকারী লেখকরা যতই সতর্ক থাকুন না কেন, তারা কম বেশী ভুল করতে বাধ্য। কিছু কিছু ভুল ‘ইচ্ছাকৃত সম্পাদনা ছাড়া বেশী কিছু না। যদি কোনো একটি একক মাষ্টার মূল কপি থেকে সেগুলো অনুলিপি করা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে অর্থের বিশাল কোনো রদবদল ঘটে না। কিন্তু অন্য অনুলিপি থেকে আরো অনুলিপি বানানো হোক, যারা নিজেরাও একইভাবে অন্য কোনো অনলিপির অনলিপি এবং এভাবেই ভুলগুলো জমতে থাকে ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমরা এই ভুল অনুলিপি করার প্রক্রিয়াকে খারাপ ভেবে থাকি, কিন্তু মানুষের কাগজপত্রে, চিন্তা করা খুব কঠিন যে, কোনো ভুল সেখানে সেই লেখাটির উন্নতির কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হবে। আমার মনে হয় অন্তত বলা যেতে পারে সেপটুয়াজিন্টের (২) স্কলাররা একটা বিশাল বড় ব্যাপার শুরু করেছিলেন, যখন তারা হিব্রু ভাষায় ‘তরুণ রমনী’ বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দটি একটি ভুল গ্রিক শব্দ, যার অর্থ ‘কুমারী নারী’ দিয়ে অনুবাদ করে একটি ভবিষ্যদ্বাণী বানিয়ে ফেলেছিলেন এভাবে.. দেখুন একজন কুমারী নারী গর্ভধারণ করবে এবং একটি পুত্র সন্তান প্রসব করবে ‘ (৩); যাই হোক, আমরা পরে দেখবো ভুল অনুলিপি করা জীববিজ্ঞানের অণুলিপনকারী অণুদের সত্যিকার অর্থেই উন্নতির কারণ হতে পারে এবং জীবনের ক্রমবিবর্তনের জন্য এটি একান্ত অপরিহার্য যে এই পক্রিয়ায় কিছু ভ্রান্তি অবশ্যই যেন ঘটে। আমাদের জানা নেই ঠিক কতটা নিখুঁতভাবে মূল অনুলিপনকারী অণুগুলো তাদের অনুলিপি তৈরী করে। তাদের আধুনিক উত্তরসুরি –মানুষের বানানো সবচেয়ে আধুনিক অনুলিপি সৃষ্টি করার প্রক্রিয়ার তুলনায় ডিএনএ অণুরা বিস্ময়করভাবে নিখুঁতভাবে অনুলিপি করতে পারে। কিন্তু এমনকি তারপরও মাঝে মাঝে তারা ভুল করে, এবং অবশেষে এই সব ভুলগুলোই বিবর্তনকে সম্ভব করে তোলে। সম্ভবত মূল। অনুলিপিকারক অনেক বেশী ভ্রান্তিপ্রবণ ছিল কিন্তু যাই হোক না কেন আমরা নিশ্চিৎ হতে পারি যে ভুলগুলো হয়েছে এবং এই ভুলগুলো ক্রমশ জমতে থাকে।

যেহেতু ভুল-অনুলিপি করা হয় এবং সেগুলো বিস্তার লাভ করে, হুবহু একই রকম অনুলিপিদের জনগোষ্ঠী দিয়ে সেই আদিম সুপ বা মিশ্রণ পূর্ণ হয়না, বরং বেশ কয়েকটি ধরনের বা প্রকরণের অনুলিপনকারী দ্বারা মিশ্রণটি পুর্ণ হয়, যাদের সবাই একটি পূর্বসূরি অণু থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। কোনো বিশেষ ধরনের অনুলিপি কি অন্য ধরনের চেয়ে সেখানে প্রাধান্য বিস্তার করে? প্রায় নিশ্চিৎভাবে বলা যায়, হ্যাঁ। সেই অণুগুলো কোনো কোনো প্রকার তাদের বৈশিষ্ট্যগত কারণে অন্য প্রকারের চেয়ে বেশী স্থিতিশীল হবে। কিছু অণু একবার তৈরী হলে অন্য অণুদের তুলনায় আবার সেটির ভেঙ্গে যাবার সম্ভাবনা কম থাকে। সেই মিশ্রণের মধ্যে এই প্রকারের অণুগুলো সংখ্যায় অপেক্ষাকৃতভাবে বেড়ে যাবে, সরাসরি তাদের দীর্ঘায়ুর’ যৌক্তিক পরিনামের জন্যে নয় বরং আরো একটি কারণ হচ্ছ, তাদের নিজেদের অনুলিপি তৈরী করার জন্য এইসব দীর্ঘায়ু অনুলিপনকারী অণুগুলো অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ সময় পায়, সুতরাং মিশ্রণে ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অণু হয়ে উঠতে তাদের প্রবণতা থাকে। আর বাকী সব কিছুই অপরিবর্তিত থাকার কারণে এই অণু জনগোষ্ঠীর আরো দীর্ঘায়ু হবার দিকে একটি বিবর্তনীয় প্রবণতা থাকে।

কিন্তু অন্য সব বিষয়গুলো সম্ভবত এক ছিল না এবং একটি অনুলিপিকারক প্রকরণের আরো একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, পুরো জনগোষ্ঠীতে সেটি বিস্তার হবার চেয়ে যা অবশ্যই আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে অনুলিপি সৃষ্টি করার দ্রুততা বা ‘উর্বরতা’। যখন ‘ক’ টাইপের অনুলিপক অণুরা তাদের প্রতিলিপি তৈরী করে সপ্তাহে একবার, তখন টাইপ ‘খ’ তাদের অনুলিপি তৈরী করে প্রতি ঘন্টায় একবার, ব্যপারটা অনুধাবন করতে খুব কঠিন হবেনা যে, খুব দ্রুত টাইপ ‘ক’ অণুকে ছাড়িয়ে যাবে ‘খ’ টাইপের অণুগুলো, এমনকি যদিও তারা ‘খ’ টাইপ অণুর চেয়ে দীর্ঘদিন বাঁচে। সুতরাং সে কারণে আরো উচ্চতর ‘উর্বরতা সম্পন্ন অণুর সংখ্যা সেই মিশ্রণে বৃদ্ধি পাবার সম্ভবত একটি “বিবর্তনীয় প্রবণতা থাকে। এই অনুলিপিকারক অণুর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যা পজিটিভ বা ইতিবাচকভাবে নির্বাচিত হবে সেটি হচ্ছে অনুলিপন প্রক্রিয়ার ক্রটিহীনতা। যদি টাইপ ‘ক’ এবং টাইপ ‘খ’ অণুরা একই সময় ধরে টিকে থাকে এবং একই হারে অনুলিপি সৃষ্টি করে, কিন্তু ‘ক’ প্রতিটি দশম অনুলিপন প্রক্রিয়ায় গড়পড়তা একটি ভুল করে, অন্যদিকে ‘খ’ ভুল করে প্রতি একশত অনুলিপন প্রক্রিয়ায় একবার, অবশ্যই ‘খ’ অণুর সংখ্যা অনেক হারে বেড়ে যাবে। জনগোষ্ঠীর ‘ক’ অংশ শুধু ‘ভুল উত্তরসূরিদেরই হারাবে না, তাদের উত্তরসুরিদের উত্তরসুরিদের হারাবে, সত্যিকারের কিংবা সম্ভাব্য।

আপনি যদি বিবর্তন সম্বন্ধে ইতিমধ্যে কিছু জেনে থাকেন, আপনার হয়তো বিষয়টি শুনে সামান্য কিছুটা খটকা লাগবে, বিশেষ করে শেষ অংশটি। আমরা কি এই দুটি ধারণার মধ্যে সমঝোতা করতে পারবো, অনুলিপি করার সময় ভুল হওয়াটা বিবর্তন ঘটার জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত আর প্রাকৃতিক নির্বাচন নিখুঁত-অনুলিপি করার বৈশিষ্ট্যটিকে বিশেষভাবে সুবিধা দেয়? এর উত্তরটি হচ্ছে যদিও বিবর্তনকে মনে হতে পারে, কোনো একটি অস্পষ্ট অর্থে, ভালো কোনো কিছু, বিশেষ করে যখন আমরা এর ফসল। কিন্তু কোনো কিছুই আসলে বিবর্তিত হতে চায় না। বিবর্তন হচ্ছে এমনকিছু যা না চাইলেও ঘটবে, কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই, অনুলিপনকারীদের বিবর্তন যেন না ঘটে সেই প্রতিরোধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও (এখন যাদের আমরা জিন বলি)। জ্যাক মননা বিষয়টি চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার হার্বার্ট স্পেন্সর বক্তৃতায় খানিকটা হতাশা সহ : “বিবর্তন তত্ত্বের আরো একটি মজার বিষয় হচ্ছে, সবাই ভাবেন তারা এটি বুঝতে পেরেছেন।

আদিম সেই সুপ বা মিশ্রণের আলোচনায় ফিরে আসি, অবশ্যই সেটি ‘স্থিতিশীল’ প্রকৃতির অণু দ্বারা পুর্ণ হয়ে পড়েছিল। স্থিতিশীল দুই অর্থে, হয় প্রতিটি অণু দীর্ঘস্থায়ী বা তারা দ্রুত অনুলিপি তৈরী করে বা তারা খুব নিখুঁতভাবে তাদের অনুলিপি তৈরী করে। এই তিন ধরনের স্থিতিশীলতার প্রতি বিবর্তনীয় প্রবণতাটি ঘটে এভাবে: আপনি যদি সেই মিশ্রণ থেকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নমুনা সংগ্রহ করেন, পরের নমুনাটিতে সেই সমস্ত প্রকারের অণুদের পরিমানের শতাংশ বেশী হবে যারা দীর্ঘ সময় ধরে বাঁচে উর্বর বা দ্রুত অনুলিপি তৈরী করে/ নিখুঁতভাবে তারা তাদের অনুলিপি তৈরী করতে পারে; আর মূলত এটাই কোনো জীববিজ্ঞানী বিবর্তন বলতে বোঝাতে চান যখন তিনি জীবিত জীব নিয়ে কথা বলেন এবং প্রক্রিয়াটি সেই একই প্রাকৃতিক নির্বাচন।

তাহলে কি আমাদের মূল অনুলিপনকারী অণুটিকে বলা উচিৎ তারা ‘জীবিত’ বা তাদের জীবন আছে? কার কি এসে যায় তাতে? আমি হয়তো আপনাকে বলতে পারি, পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন এমন মানুষগুলোর মধ্যে ডারউইনই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং আপনি হয়তো বলতে পারেন, ‘না, অবশ্যই না, ‘নিউটন ছিলেন সেই শ্রেষ্ঠতম মানব’, কিন্তু আমি আশাকরি আমরা সেই তর্ক দীর্ঘায়িত করবো না, মূল বিষয়টি হচ্ছে কোনো সত্যিকারের উপসংহারে আমরা পৌঁছাতে পারবো না, যেদিকেই আমাদের এই বিতর্ক অগ্রসর হোক না কেন। বাস্তব সত্য হচ্ছে নিউটন আর ডারউইনের জীবন ও অর্জন সম্পূর্ণভাবে অপরিবর্তিত থাকবে, আমরা তাদের ‘মহান’ হিসাবে চিহ্নিত করি কিংবা না করি। একইভাবে, অনুলিপি অণুগুলোর গল্প সম্ভব ঘটেছিল যেভাবে আমি বলছি, আমরা তাদের জীবিত বলবো নাকি বলবো না, তাতে কিছু আসে যায় না। মানুষের বহু যন্ত্রণার কারণ, আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনা শব্দ হচ্ছে শুধুমাত্র একটি উপাদান বা টুল যা আমরা ব্যবহার করি মাত্র, কোনো অভিধানে ‘জীবিত (লিভিং)’ শব্দটির উপস্থিতি থাকা মানে এই না যে বাস্তব পৃথিবীতে এটি আবশ্যিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট কিছু বোঝাবে। আমরা আদি অনুলিপনকারীদের জীবিত কিংবা জীবিত না, যেভাবেই ডাকি না কেন, তারাই জীবনের পূর্বসূরি, তারাই ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠাতা পূর্বসূরি।

এই যুক্তির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সংযোগটি হচ্ছে সেটি, যা ডারউইন নিজেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে (যদিও তিনি কথা বলছিলেন প্রাণী ও উদ্ভিদ নিয়ে, অণুদের নিয়ে নয়) প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা কম্পিটিশন’। আদিম মিশ্রণের অসীম সংখ্যক অনুলিপনকারী অণুকে টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা ছিলনা। একটি কারণ তো অবশ্যই পৃথিবীর আকার সীমিত, কিন্তু সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করার আরো কারণ ছিল যেগুলো হয়তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের দৃশ্যকল্পে অনুলিপনকারী অণু ছাচ বা টেমপ্লেট হিসাবে কাজ করে, আমরা ধারণা করে নিয়েছিলাম যে, এটি ক্ষুদ্র গঠনগত একক অণুদের সমৃদ্ধ সুপ বা মিশ্রণে ভাসছে, যারা এর অনুলিপি তৈরী করার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু যখন অনুলিপনকারী অণুদের সংখ্যা বেড়ে যায়, তাদের তৈরী করার জন্য ছোট অণুগুলো এমন একটি হারে ব্যবহৃত হয়ে যায় যে তারা দ্রুত দুর্লভ আর মূল্যবান উপাদানে পরিণত হয়। সেই সময় বিভিন্ন ধরনের আর রুপের অনুলিপি অণুরা অবশ্যই তাদের পাওয়ার জন্যে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা করেছে। আমরা সেই সব শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, যেখানে অনুলিপনকারী অণুদের মধ্যে যে অণুটি বিশেষ আনুকুল্য পায়, তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। আমরা এখন দেখতে পাবো, অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাপ্রাপ্ত প্রকারগুলোর সংখ্যা আসলেই ‘কমে গিয়েছিল প্রতিযোগিতার কারণে। অবশেষ তাদের অনেক বংশধারাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেখানে নানা প্রকারের অনুলিপনকারী অণুগুলোর মধ্যে অস্তিত্ব বাঁচানোর সংগ্রাম বিদ্যমান ছিল। তারা কিন্তু জানতো না যে তারা টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে বা বিষয়টি নিয়ে কোন ভাবনাই ছিলনা। কোনো তিক্ত সম্পর্ক সৃষ্টি করা ছাড়াই এই সংগ্রাম চলমান, আসলে কোনো ধরনের কোনো অনুভুতি এখানে সংশ্লিষ্ট নয়। কিন্তু তারা সংগ্রাম করছিল এই অর্থে যে, কোনো ধরনের ভুল অনুলিপি নতুন কোনো উচ্চতর পর্যায়ে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বা কোনো নুতন উপায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অণুর স্থিতিশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। আর সেই সব পরিবর্তনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুরক্ষিত হবে এবং সংখ্যায় বৃদ্ধি পাবে। এই উন্নতির প্রক্রিয়াটি ক্রমশ পুঞ্জীভূত হয়। অণুগুলোর স্থিতিশীলতা বাড়ানোর উপায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী অণুদের স্থিতিশীলতা কমানোর উপায় আরো বেশ জটিলতর, বিস্তারিত আরো দক্ষতর একটি প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়। তাদের কেউ কেউ এমনকি আবিষ্কার করে কিভাবে রাসায়নিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকারের অণুগুলো ভাঙ্গতে হয় এবং তাদের ভেঙ্গে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গঠনগত মূল একক অণুগুলোকে নিজেদের অনুলিপি বানানোর কাজে ব্যবহার করতে শেখে। এই প্রোটো-কার্নিভোর, আদি-মাংসাশীরা যুগপতভাবে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে এবং দ্বন্দ্বরত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেয়। অন্য অনুলিপনকারী অণুগুলো কিভাবে এই ধরনের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হয় সেটি হয়তো আবিষ্কার করেছিল, রাসায়নিকভাবে অথবা তাদের চারপাশে প্রোটিনের তৈরী কোনো দেয়াল সৃষ্টি করে নেবার মাধ্যমে। এভাবেই হয়তো প্রথম জীবিত কোষের আবির্ভাব ঘটেছিল। অনুলিপনকারী অণুগুলো শুধুমাত্র তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে শুরু করেনি, এছাড়াও তারা তাদের অস্তিত্বের ধারা রক্ষা করার জন্যে নিজেদের জন্য খোলস, বাহনও তৈরী করতে শুরু করেছিল। যে অনুলিপনকারীরা টিকে গিয়েছিল তারা হচ্ছে সেই অনুলিপি যারা তাদের নিজেদের বাঁচানো আর বসবাস করার লক্ষ্যে সারভাইভাল মেশিন বা বেচে থাকার যন্ত্র তৈরী করে নিতে পেরেছিল। প্রথম সেই সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার যন্ত্রগুলো সম্ভবত তাদের চারপাশে ঘিরে থাকা প্রতিরক্ষামূলক একটি পর্দা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিন্তু টিকে থাকার সেই সংগ্রামটিও ধীরে ধীরে আরো কঠিন হয়ে ওঠে যখন নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের আবির্ভাব ঘটেছিল, যাদের টিকে থাকার যন্ত্রটি অপেক্ষাকৃত বেশী কার্যকর। পুঞ্জীভূত এই পরিবর্তনগুলো ধারণ করার মাধ্যমে ক্রমশ অগ্রসর হতে থাকা একটি প্রক্রিয়ায় টিকে থাকার যন্ত্রটি ক্রমশ আকারে আরো বড়, বিস্তারিত আর জটিলতর হয়ে উঠেছিল।

কোনো কি শেষ আছে নানা কৌশল আর যন্ত্র উদ্ভাবনের এই ক্রমোন্নয়নের ধারাবাহিকতার, পৃথিবীতে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য যা অনুলিপনকারীরা ব্যবহার করে আসছে? বহু সময় আছে আরো উন্নতি করার। এই নিজেকে রক্ষা করার প্রক্রিয়ার কি অদ্ভুত যন্ত্রই না জানি সৃষ্টি করেছিল ধীরে ধীরে বহু হাজার বছরের পরিক্রমায়? চার হাজার মিলিয়ন বছর পরে, আদিম অনুলিপনকারী এই অণুটির নিয়তি কি হবে? না, তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, কারণ তারা হচ্ছে এই টিকে থাকার কৌশল আর ক্ষমতার আদি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু উন্মুক্ত অবস্থায় এখনও সমুদ্রের পানিতে ভেসে আছে এমন ভাবনায় তাদের খোঁজার চেষ্টা করবেন না। তারা তাদের সেই বিরোচিত স্বাধীনতা পরিত্যাগ করেছে বহুদিন আগেই। এখন তারা দলবদ্ধ হয়ে বাস করে, বিশাল কলোনি রুপে, নিরাপদে দানবাকৃতির এলোমেলো হাটা রোবোটদের (৪) অভ্যন্তরে, বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন, যার সাথে তাদের যোগাযোগ এখন বহু ঘুরপথে, দুর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মত যাদের তারা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের বাস এখন আমার আর আপনার মধ্যে, তারা আমাদের সৃষ্টি করেছে, আমাদের শরীর ও মন, এবং তাদের সংরক্ষণ করা আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত যৌক্তিকতা। এইসব অনুলিপনকারীরা বহু দূর অতিক্রম করে এসেছে। এখন তারা পরিচিত ‘জিন’ নামে আর আমরা হচ্ছি তাদের ‘সারভাইভাল’ মেশিন বা টিকে থাকার যন্ত্র।

নোটস (অধ্যায় ২)

(১) জীবনের উৎপত্তি সম্বন্ধে বহু তত্ত্ব আছে। সেই সব তত্ত্বগুলো সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার পরিশ্রমসাধ্য প্রচেষ্টার পরিবর্তে The Selfish Gene বইটিতে মূল ধারণাটিকে বোধগম্য করে তোলার জন্য আমি শুধুমাত্র একটি ব্যাখ্যা উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আসলেই চাইনি এমন কোনো ধারণা দিতে যে- এটাই একমাত্র গুরুত্ব পেতে পারে বা এটাই সবচেয়ে ভালো তত্ত্ব। আসলেই, একই উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে The Blind Watchmaker বইটিতে আমি ইচ্ছা করেই ভিন্ন একটি উদাহরণ বেছে নিয়েছিলাম: এ. জি, কেয়ার্ন-স্মিথের clay theory। কোনো বইতেই আমি এমন ইঙ্গিত দেইনি যে উদাহরণ হিসাবে যে হাইপোথিসিসটাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে সেটি আমারও মতামত। আমি যদি অন্য কোনো বই লিখি আমি সম্ভবত সেই সুযোগটা নেবো আরো একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করার জন্য, যেমন, জার্মান গাণিতিক রসায়নবিদ ম্যানফ্রেড আইগেন এবং তার সহকর্মীদের প্রস্তাবটি। আমি সবসময়ই কোনো একটি গ্রহে জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত তত্ত্বের কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য মূল বিষয়টির মৌলিক বৈশিষ্ট্যে নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করে থাকি, বিশেষ করে স্ব-অনুলিপন সক্ষম জিনগত সত্তার ধারণাটি নিয়ে।

(২) সেপটুয়াজিন্ট ( ল্যাটিন সেপটুজিন্টা মানে সত্তর থেকে) হচ্ছে। হিব্রু বাইবেল ও কিছু সংশ্লিষ্ট লেখার গ্রীক অনুবাদ। ওল্ড টেষ্টামেন্টের প্রথম গ্রিক অনুবাদ হিসাবে এটি পরিচিত গ্রিক ওল্ড টেষ্টামেন্ট নামে। এই অনুবাদটি বহু ব্যবহৃত হয়েছে নিউ টেস্টামেন্টে।

(৩) বেশ কিছু মর্মাহত পত্রলেখক বাইবেল বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর মূল তরুণী নারী বা young woman শব্দটির virgin বা কুমারী নারী হিসাবে ভ্রান্ত অনুবাদের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছেন এবং তারা আমার কাছে এর উত্তরও দাবী করেছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া এখন বেশ বিপদজ্জনক একটি ব্যাপার, সুতরাং আমি তাদের দাবী মেনে নিলাম। আসলেই এ জন্যে আমি আনন্দিতও বটে, কারণ সত্যিকারের অ্যাকাডেমিক কোনো পাদটীকার সত্য অনুসন্ধান করতে বিজ্ঞানীরা প্রায়শই লাইব্রেরীর বইয়ের ধুলো প্রাণ ভরে ঝাড়তে পারার সুযোগ পান না। তবে এই বিষয়টি বাইবেল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অজানা কোনো বিষয় নয় এবং তারা বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্কও করেননি। ইসাইয়াহ’তে (Isaiah) উল্লেখিত হিব্রু ‘আলমাহ’ (almah) শব্দটির অর্থ তর্কাতীতভাবে তরুণী নারী, যেখানে তার কুমারিত্ব বিষয়ে সম্বন্ধে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয়নি। যদি বইটিতে কুমারী নারী উল্লেখ করাই প্রয়োজন বোধ করা হতো তাহলে, এর পরিবর্তে বেথুলাহ (bethulah) শব্দটি তারা ব্যবহার করতে পারতেন (অস্পষ্ট অর্থের ইংলিশ শব্দ মেইডেনই (maiden) দেখাচ্ছে কত সহজে দুটো অর্থের একটি থেকে অন্যটিতে সরে আসা যায়)। মিউটেশন বা পরিবর্তনটি ঘটেছিল যখন প্রাক-খ্রিস্ট গ্রিক অনুবাদ যা সেপ্টয়াজিন্ট (Septuagint) নামে পরিচিত; সেখানে almah শব্দটিকে গ্রিক parthenos শব্দে অনুবাদ করা হয়েছিল, যার আসলেই অর্থ হচ্ছে কুমারী। ম্যাথিউ (না, অবশ্যই যীশুর সমসায়য়িক আর শিষ্য সেই ম্যাথিউ নন বরং সেই গসপেল নির্মাতা, যিনি বহু বছর পরে লিখেছিলেন) Isaiah থেকে উদ্ধৃতি দেন সেখানে, যেটা আপাতদৃষ্টিতে Septuagint সংস্করণ থেকে উদ্ভব হয়েছিল ( সবগুলো শব্দ মানে ১৫ টি শব্দ মাত্র দুটি গ্রিক শব্দ ছাড়া এখানে হুবহু একই) যখন তিনি বলেছিলেন, এখন এই সব শেষ হলো, যেন এটি পরিপর্ণ হতে পারে সেই সব শব্দ দিয়ে, ঈশ্বরের যে শব্দগুলো তার দূত যা উচ্চারণ করেছেন, তিনি বলেন, দেখো, একটি কুমারী নারী গর্ভধারণ করবে এবং একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে, তারা তার নাম দেবে ইমানুয়েল’ ( স্বীকৃত ইংরেজী অনুবাদ)। খ্রিস্টীয় বিদ্বানদের অনেকে মেনে নিয়েছেন, কুমারী মাতার গর্ভে যীশুর জন্ম পরবর্তীতে সংযুক্ত হয়েছিল, খুব সম্ভবত কাজটি করেছিলেন গ্রিকভাষী শিষ্যরা এই (ভুল ভাবে অনুদিত) ভবিষ্যদ্বাণীটি যে পূর্ণ হয়েছে এমনভাবে এটি উপস্থাপন করার মাধ্যমে। আধুনিক সংস্করণ যেমন New English Bible সঠিকভাবে Isaiah সেই শব্দটি অনুবাদ করেছে তরুণ রমনী হিসাবে; এবং সঠিক ভাবেই ম্যাথিউতে শব্দটি virgin হিসাবে রেখে দিয়েছেন, কারণ তারা সেখানে গ্রিক থেকে অনুবাদ করেছিলেন।

(৪) এই ভাবালুতাপুর্ণ অনুচ্ছেদ বা ‘পারপল’ প্যাসেজটি (একটি দুর্লভ, ঠিক আছে, বেশ দুর্লভ একটি অসংযমী প্রশ্রয়) উদ্ধৃতি হিসাবে ব্যবহার আর পুনব্যবহার হয়ে আসছে আমার উন্মত্ত আনন্দের সাথে জিনগত ডিটারমিনিজমকে সমর্থন করার সপক্ষে প্রমাণ হিসাবে। আংশিকভাবে এই সমস্যাটির কারণ জনপ্রিয় তবে ভ্রান্ত ধারণা যা আমরা রোবট শব্দটির সাথে যুক্ত করেছি। আমরা এখন ইলেকট্রনিক্সের স্বর্ণযুগে বসবাস করছি এবং রোবোট আর সেই অনমনীয় নির্বোধ কোনো যন্ত্র নয় বরং তারা কোন কিছু শিখতে পারদর্শী, এছাড়া তাদের বুদ্ধিমত্তা আর সৃজনশীলতাও আছে। নিয়তির পরিহাস, যে সেই দুর অতীতে, ১৯২০ সালে ক্যারেল ক্যাপেক যখন প্রথম রোবাট শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যে রোবোটও ছিল যান্ত্রিক সত্তা, যে কিনা মানবিক অনুভূতি, যেমন প্রেমে পড়া অনুভব করতে পেরেছিল অবশেষে। মানুষরা যারা মনে করেন রোবোটরা আসলে আবশ্যিকভাবে সংজ্ঞানুযায়ী পূর্বনির্ধারিত বা ডিটারমিনিস্টিক, মানুষদের তুলনায় তারা বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেছেন (যদি না তারা ধর্মবাদী হয়ে থাকেন, সেই ক্ষেত্রে সারাক্ষণই সেই ধারণাটি নিয়ে বড়াই করবেন যে, মানুষদের স্বর্গীয় সেই উপহার স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি আছে যা সাধারণ যন্ত্রকে দেয়া হয়নি)। যদি আমার এই লাম্বারিং রোবট অনুচ্ছেদের বেশীরভাগ সমালোচকদের মত আপনি যদি ধর্মবাদী না হয়ে থাকেন, তাহলে, এই প্রশ্নটির মুখোমুখি করুন নিজেকে। আপনি নিজেকে আসলে কি মনে করেন, যদি না খানিকটা রবোটের মত কোনো কিছু ছাড়া? আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি The Extended Phenotype (পৃষ্ঠা ১৫-১৭) বইয়ে। কিন্তু ভুল আরো জটিল হয়ে যায় আরো একটি জোরালো মিউটেশন বা পরিব্যক্তির কারণে। ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে ঠিক যেমন এটি প্রয়োজনীয় মনে করা হয় যে, যীশুকে অবশ্যই কুমারী কোনো নারীর গর্ভেই জন্ম নিতে হবে, ঠিক তেমনি মনে করা যেতে পারে অশুভতম উদ্দেশ্যেই বাধ্যবাধকতা আছে কোন ধরনের জেনেটিক ডিটারমিনিজমের (জিনগত পরিণামবাদী) সত্যিকারের সমর্থক অবশ্যই বিশ্বাস করবেন যে, জিন আমাদের আচরণেরর সবকটি ক্ষেত্ৰই নিয়ন্ত্রণ করে। আমি জিনগত অনুলিপনকারী অণুদের কথা বলেছিঃ তারা আমাদের সৃষ্টি করেছে, শরীর এবং মনে; এবং এটি যথারীতি ভুলভাবে উদ্ধৃতি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে ( যেমন: Not in Our Genes– Rose, Kamin, and Lewontin, পৃষ্ঠা ২৮৭) এবং এর আগে প্রকাশিত লেওনটিনের একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে, যার শিরোনাম ছিল, ‘এভাবে .. (তারা) আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, শরীর ও মনে’ (আমি গুরুত্বপূর্ণ শব্দটিকে আন্ডারলাইন করে দিয়েছি)। এই অধ্যায়ের প্রাসঙ্গিকতায়, আমি মনে করি খুব স্পষ্ট আমি আসলে সৃষ্টি করা হয়েছে শব্দটি দিয়ে কি বোঝাতে চেয়েছি এবং এটি নিয়ন্ত্রণ করে এমন কোনো শব্দ থেকে খুবই ভিন্ন; যে কেউই বিষয়টি দেখতে পাবেন, আর আসল কথাটিও হচ্ছে, জিন তাদের সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করেনা সেই শক্তিশালী অর্থে যাকে সমালোচনা করা হয়েছে ‘ডিটারমিনিজম’ হিসাবে উল্লেখ করে। আমরা খুব সহজেই (বেশ যথেষ্ট কম কষ্ট সাপেক্ষে) তাদের অবজ্ঞা করি প্রতিটি সময় যখনই আমরা গর্ভনিরোধক ব্যবহার করি।

০৩. অমর কুণ্ডলী

অধ্যায় ৩: অমর কুণ্ডলী

আমরা হচ্ছি সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার যন্ত্র। কিন্তু ‘আমরা’ মানে এখানে শুধু মানুষকে বোঝাচ্ছে না, এই ‘আমরা’র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সকল প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস। এই পৃথিবীতে সারভাইভাল মেশিনের মোট সংখ্যা কত, সেটি গণনা করা খুবই কঠিন এবং এমনকি পথিবীতে প্রজাতির মোট সংখ্যা কত সেটিও আমাদের অজানা। যদি শুধু কীটপতঙ্গদের কথাই ধরা হয়,তাদের জীবিত প্রজাতির সংখ্যা অনুমান করা হয়েছে প্রায় তিন মিলিয়নের কাছাকাছি, এবং কীটপতঙ্গদের একক সদস্যদের সংখ্যা হতে পারে এক মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন।

বিভিন্ন ধরনের সারভাইভাল মেশিনগুলো আপাতদৃষ্টিতে বাইরে থেকে কিংবা তাদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোর ক্ষেত্রে খুবই ভিন্ন ভিন্ন রুপের মনে হতে পারে। একটি অক্টোপাস কোনোভাবেই ইঁদুরের মত নয় এবং দুটি প্রাণীই আবার একটি ওক গাছ থেকে খুব ভিন্ন। কিন্তু তাদের মৌলিক রসায়নে তারা বরং একই, এবং, বিশেষ করে, যে অনুলিপনকারীদের তারা তাদের মধ্যে ধারণ করে, জিনগুলো, সেগুলো মূলত একই ধরনের অণু, যা আমাদের সবার মধ্যে থাকে, ব্যাকটেরিয়া থেকে হাতি। আমরা সবাই একই ধরনের অনুলিপনকারী অণুর সারভাইভাল মেশিন– যে অণুর নাম ডিএনএ– কিন্তু আরো অনেক উপায় আছে এই পথিবীতে বাঁচার জন্য এবং সেই সব উপায়গুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার লক্ষ্যে অনুলিপনকারী সেই অণুটি বহু ধরনের মেশিনও তৈরী করেছে। বানর হচ্ছে একটি যন্ত্র যা গাছের উপরের মগডালে জিনগুলোকে সুরক্ষা করে, মাছ হচ্ছে তেমনই একটা যন্ত্র পানিতে জিনগুলোকে সুরক্ষা করে, এমনকি খুব ক্ষুদ্র একটি নেমাটোড প্রজাতি আছে যারা জার্মান বিয়ার ম্যাটে (বিয়ারের গ্লাসের নীচে রাখার জন্যে কার্ডবোর্ডের তলাচি) তাদের জিনগুলোকে সুরক্ষা করে (১)। বহু রহস্যময় উপায়ে ডিএনএ কাজ

করে। খুব সরলভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার জন্য আমি এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছি যে, আধুনিক জিনগুলো, যারা ডিএনএ দিয়ে তৈরী হয়েছে, আদিম সেই রাসায়নিক মিশ্রণে আবির্ভূত অনুলিপনকারী অণুর মত তারা ঠিক একই রকম দেখতে ছিল। আমার প্রস্তাবিত যুক্তির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু বিষয়টি আসলেই সত্যি নাও হতে পারে। সেই আদি মূল অনুলিপনকারী অণুরা হয়তো ডিএনএ-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত এমন কোনো অণুই ছিল। অথবা হয়তো তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো প্রকারের ছিল। পরের সম্ভাবনাটির ব্যপারে আমরা হয়তো বলতে পারি যে তাদের টিকে থাকার যন্ত্রগুলো পরবর্তীতে কোনো একসময় দখল করে নেয় ডিএনএ’রা। যদি তাই হয়, তাহলে আধুনিক টিকে থাকার কোনো যন্ত্রে তাদের আর কোনো চিহ্নের অবশেষ নেই, আদিম সেই অনুলিপনকারী অণুগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ভাবনা সুত্রেই এ. জি. কেয়ার্ন-স্মিথ (২) আমাদের পূর্বসূরিদের নিয়ে দারুণ আগ্রহ উদ্দীপক প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেছিলেন, প্রথম অনুলিপনকারী অণুগুলো হয়তো আদৌ কোনো জৈব অণুই ছিল না, সেগুলো হয়তো অজৈব স্ফটিক ছিল– খনিজ, ক্লে বা কাদার ক্ষুদ্র কোনো অংশ। দখলকারী হোক বা না হোক বর্তমানে ‘ডিএনএ’ তর্কাতীতভাবে মূল নিয়ন্ত্রণে আছে, যদি না, যেমন, পরীক্ষামূলকভাবে প্রস্তাব করেছি। অধ্যায় ১১ তে, ক্ষমতা নতুন করে দখল করার একটি পক্রিয়া কেবল শুরু হয়েছে।

কোনো ডিএনএ অণু হচ্ছে বিল্ডিং ব্লক বা গঠনগত একক অণু দিয়ে তৈরী একটি সুদীর্ঘ শৃঙ্খল, এই সব গঠনগত একক অণুগুলোকে বলে ‘নিউক্লিওটাইড’। ঠিক যেমন করে কোনো প্রোটিন অণু অ্যামাইনো এসিডদের শৃঙ্খল, তেমনি ডিএনএ হচ্ছে। নিওক্লিওটাইডদের শিকল। একটি ডিএনএ অণু খালি চোখে দেখার জন্যে অনেক বেশী ক্ষুদ্র, কিন্তু পরোক্ষ উপায়ে এর সঠিক আকারটি উদ্ভাবনী দক্ষতার সাথে আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। এটি তৈরী হয়েছে এক জোড়া নিউক্লিওটাইড দিয়ে তৈরী শঙ্খল দিয়ে, যারা পরস্পরের সাপেক্ষে কুণ্ডলী পাকিয়ে পেঁচানোর মাধ্যমে সর্পিলকার একটি আকার তৈরী করে। সেই ডাবল হেলিক্স (৩), সেই ‘অমর কুণ্ডলী’। নিউক্লিওটাইডগুলো, যারা ডিএনএ তৈরী করে তারা চার ধরনের, তাদের নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করে সংক্ষেপে বলা হয়, A,L,G এবং C; আর সব প্রাণী বা উদ্ভিদের নিউক্লিওটাইডরা ঠিক একই রকমের। শুধুমাত্র পার্থক্যটি হচ্ছে তারা কোন অনুক্রমে একটার পর একটি সাজানো থাকে। কোনো একটি G বিল্ডিং ব্লক মানুষের যেমন, সেটি শামুকের G বিল্ডিং ব্লকের মত হুবহু একই রকম দেখতে। কিন্তু কোনো একটি মানুষের ক্ষেত্রে এইসব নিউক্লিওটাইড বেসগুলোর সজ্জা বা অনুক্রম কোনো শামুকের বেস সজ্জা বা অণক্রম থেকে শুধু ভিন্নই না, অন্য কোনো মানুষের বেস সজ্জা থেকে আলাদা– যদিও অপেক্ষাকৃত কম ( শুধুমাত্র হুবহু জিনগত যমজদের ক্ষেত্র ছাড়া)।

আমাদের ডিএনএ বাস করে আমাদের শরীরে, শরীরের কোনো একটি অংশে তারা জড়ো হয়ে থাকে না, তারা ছড়িয়ে থাকে শরীরের কোষগুলোয়। গড় পড়তা কোনো মানব শরীরে প্রায় এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন কোষ থাকে, গ্রাহ্য না করার মত অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একটি সম্পূর্ণ সেট ডিএনএ থাকে। এই ডিএনএ-কে মনে করা যেতে পারে এক সেট নির্দেশাবলী হিসাবে, যেখানে কিভাবে একটি শরীর তৈরী করতে হয় সেই নির্দেশ থাকে, এবং সেই নির্দেশাবলী লেখা থাকে নিওক্লিওটাইড বেসদের বর্ণমালায়, A,T,G এবং C। তুলনা করা যেতে পারে কোনো একটি সুবিশাল অট্টালিকা, যার প্রতিটি রুমে বই রাখার একটি আলমারী বা ‘বুক-কেস আছে, যেখানে সেই পুরো অট্টালিকাটি কিভাবে তৈরী করতে হবে, সে ব্যপারে স্থপতির পরিকল্পনাটি রাখা আছে। প্রতিটি কোষের সেই ‘বুক-কেসটিকে বলা হয় নিউক্লিয়াস, মানুষের ক্ষেত্রে স্থপতির পরিকল্পনাটি সাজানো আছে ৪৬ টি খণ্ডে। এই সংখ্যাটি প্রজাতিভেদে ভিন্ন। আর সেই ভলিয়ুম বা খণ্ডকে বলা হয় ক্রোমোজোম। মাইক্রোস্কোপের নীচে তাদের লম্বা সুতার মত দেখা যায়, এবং জিনরা সেই সুতায় ধারাবাহিকভাবে সাজানো থাকে। বিষয়টি অবশ্য এত সহজ না, আসলেই এমনকি এটি অর্থবহও হয় না, ঠিক কোথায় কোনো একটি জিন শেষ হচ্ছে আর পরবর্তী জিনটি শুরু হচ্ছে। সৌভাগ্যক্রমে এই অধ্যায় আমাদের প্রদর্শন করবে, আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্যের জন্য বিষয়টি তেমন কোনো সমস্যা না।

আমি স্থপতির পরিকল্পনার রুপকটি এখানে ব্যবহার করবো, স্বাধীনভাবে রুপকের ভাষার সাথে সত্যিকারের বিষয়টির ভাষা মিশ্রণ করার মাধ্যমে। খণ্ড’ শব্দটি ক্রোমোজোমের সাথে পরস্পর পরিবর্তনীয়ভাবে ব্যবহৃত হবে। “পৃষ্ঠা’ শর্ত সাপেক্ষে পরস্পর পরিবর্তনীয়ভাবে ব্যবহৃত হবে জিনের সাথে, যদিও জিনদের মধ্যে বিভাজন কোনো বইয়ের আলাদা আলাদা পাতার মত এতটা সুস্পষ্ট নয়। তবে এই রুপকটি আমাদের অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করবে। যখন এটি অপ্রতুল হয়ে অবশেষে ভেঙ্গে পড়বে, আমি আরো নতুন কোনো রুপক ব্যবহার করবো। ঘটনাচক্রে, অবশ্যই কোনো ‘স্থপতির’ অস্তিত্ব নেই, ডিএনএর নির্দেশাবলী একসাথে জড়ো করেছে প্রাকৃতিক নির্বাচন।

ডিএনএ অণুগুলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, প্রথমত তারা অনুলিপনকারী, অর্থাৎ তারা নিজেদের অনুলিপি তৈরী করে। এবং জীবনের সূচনা থেকে এটি বিরামহীনভাবেই চলেছে এবং ডিএনএ অণুগুলো বর্তমানে আসলেই এই কাজটি করতে অত্যন্ত দক্ষ। প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে, আপনার শরীরের প্রায় এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন কোষ আছে, কিন্তু যখন মাতৃগর্ভে প্রথম আপনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, আপনি ছিলেন শুধু একটি মাত্র কোষ। আপনার সেই কোষে ‘স্থপতির’ পরিকল্পনার একটি মাত্র ‘মাস্টার’ বা মূল কপি ছিল, সেই কোষটি দ্বিবিভাজিত হয় এবং উৎপন্ন দুটি কোষ সেই মূল কপি থেকে তাদের নিজেদের কপিটি পায়। পরবর্তী আরো বিভাজনে কোষ সংখ্যা বাড়াতে থাকে ধারাবাহিক হারে, ৪, ৮, ১৬, ৩২ এবং এভাবে হাজার কোটি কোষে। প্রতিটি কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ পরিকল্পনাটি বিশ্বস্তভাবে অনুলিপি হয়, প্রায় কোনো ভুল ছাড়াই।

ডিএনএ’র অনুলিপি তৈরী নিয়ে কথা বলা এক বিষয়, কিন্তু ডিএনএ যদি আসলে শরীর গঠন করার জন্য এক সেট পরিকল্পনাই হয়ে থাকে, কিভাবে সেই পরিকল্পনাটিকে কাজে প্রয়োগ করা হয়? কিভাবে আমাদের শরীরের গঠনের প্রক্রিয়ায় সেটি অনূদিত হয়? আর এই বিষয়টি আমাকে ডিএনএ দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে নিয়ে আসে। একটি ভিন্ন ধরনের অণু সৃষ্টি করার প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে এটি তদারকী করে– প্রোটিন। আগের অধ্যায়ে হিমোগ্লোবিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে শুধুমাত্র একটি উদাহরণ, অসংখ্য প্রোটিন অণুর একটি মাত্র উদাহরণ। ডিএনএ’র সাংকেতিক বা কোড করা বার্তা লেখা আছে চার অক্ষরের ‘নিউক্লিওটাইড’ বর্ণমালায়, এবং সাধারণ যান্ত্রিক একটি উপায়ে এটি অনুদিত হয় অন্য একটি বর্ণমালায়, সেটি হচ্ছে অ্যামাইনো এসিডদের বর্ণমালা, যা প্রোটিন অণু গঠন করে।

কিন্তু শুধু প্রোটিন বানানো পুরো একটি শরীর বানানো থেকে অনেক দূরের একটি বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে এটি হচ্ছে প্রথম ক্ষুদ্র পদক্ষেপ। প্রোটিন শুধুমাত্র শরীরের গঠনগত মূল উপাদান হিসাবে কাজ করে না, তারা কোষের মধ্যে সব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়, বিশেষ সময় ও বিশেষ স্থানে তাদের বেছে বেছে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে তাদের সংবেদনশীল নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব খাটায়। এবং ঠিক কি ভাবে এই সব কাজ অবশেষে একটি শিশুকে তৈরী করে সে এক বিশাল কাহিনী, যার রহস্য পুরোপুরি উদ্ধার করতে ভ্রূণতত্ত্ববিদদের। কয়েক দশক কিংবা শতাব্দীকাল সময় লাগবে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে এটি তাই করে। জিন পরোক্ষভাবে শরীর তৈরী হবার প্রক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সেই প্রভাবটি খুব কঠোরভাবে একমুখী: অর্জিত কোনো বৈশিষ্ট্যই উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হয় না। জীবনে আপনি যত জ্ঞান আর প্রজ্ঞা অর্জন করুন না কেন, তার একটি বিন্দুও জিনের মাধ্যমে আপনার সন্তানদের মধ্যে হস্তান্তরিত হবেনা, প্রতিটি প্রজন্মকেই শুরু থেকে শুরু করতে হয়। অবিকৃত অবস্থায় জিনগুলোকে সংরক্ষিত করার জন্য শরীর সে-কারণে জিনেরই একটি উপায়।

আর জিনরা যে ভ্রূণসংক্রান্ত বিকাশ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই বাস্তব সত্যটির বিবর্তনীয় গুরুত্ব হচ্ছে এটি: এর অর্থ জিনরা অন্ততপক্ষে আংশিকভাবে ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য দায়ী। কারণ তাদের টিকে থাকাটা নির্ভর করবে যে শরীরে তারা বাস করবে এবং যে শরীর তৈরী করতে তারা সাহায্য করেছে, সেই শরীরের দক্ষতার উপর। কোন এক সময়, প্রাকৃতিক নির্বাচন মূলত ছিল আদিম সুপ বা মিশ্রণের মধ্যে মুক্তভাবে ভাসমান অনুলিপন করতে সক্ষম এমন অণুদের বৈষম্যমূলক একটি হারে টিকে থাকা, এখন প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই অনুলিপনকারী অণুদের প্রতি আনুকুল্যতা প্রদর্শন করে যারা ভালো ‘সারভাইভাল মেশিন’ তৈরী করতে পারে, সেই সব জিনগুলো, যারা দক্ষতার সাথে ভ্রূণগত বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখানে এই অনুলিপনকারী অণু, তারা যেমন কখনোই ছিল না, তেমনি কোনোভাবে আরো বেশী সচেতন বা উদ্দেশ্যমূলক ছিল না। সেই পুরানো প্রক্রিয়া, স্বয়ংক্রিয় নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বী অণুগুলোর মধ্যে তাদের দীর্ঘসময় টিকে থাকা বা দীর্ঘজীবিতা, উর্বরতা আর অনুলিপি করার সময় ভুল না করার দক্ষতা বা অনুলিপি-বিশ্বস্ততার কারণে তখনও পরিচালিত হয় অন্ধভাবেই এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে, যেমন একসময় বহু দিন আগে তারা করতো। জিনদের কোনো ভবিষ্যৎদর্শিতা নেই। আগে থেকে তারা কোনো পরিকল্পনা করে না। জিন শুধু জিন, কিছু জিন অন্য জিনদের তুলনায় কিছু বেশী এবং এখানে আর বেশী কিছু বলারও নেই। কিন্তু যে গুণগুলো কোনো জিনের দীর্ঘায়ু নির্ধারণ করে বা তাদের অনুলিপি করার দ্রুততা বা উর্বরতাকে নির্দেশ করে তারা জিনদের মত আর সরল নয় এখন, যেমন আগে ছিল, অনেক পার্থক্য সেখানে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয়– গত ছয়শ মিলিয়ন বছরের মত এই অনুলিপিকারী অণুগুলো তাদের টিকে থাকার যন্ত্র তৈরীর প্রযুক্তিতে কিছু উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করেছে, যেমন, মাংসপেশী, হৃদপিণ্ড, চোখ (স্বতন্ত্রভাবে বেশ কয়েকবার যা বিবর্তিত হয়েছে); তবে এর আগে অনুলিপনকারী অণু হিসাবে তাদের পূর্বতন জীবনাচরণের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো তারা বৈপ্লবিকভাবেই বদলে ফেলেছে, আমাদের সেটা অবশ্যই আগে বুঝতে হবে, যদি যুক্তিটি নিয়ে আমরা সামনে অগ্রসর হতে চাই।

একটি আধুনিক অনুলিপনকারী অণুর বিষয়ে প্রথমেই যে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে সেটি হচ্ছে তারা ভীষনভাবে সঙ্গলি, দলবদ্ধ হয়ে তারা বাস করতে চায়। কোনো একটি সারভাইভাল মেশিন’ হচ্ছে সেই বাহন, যা শুধু একটি জিন ধারণ করেনা, সেখানে বাস করে ‘বহু’ হাজার জিন। একটি শরীর তৈরীর প্রক্রিয়া এতটাই সূক্ষ্ম জটিল সমবায়ী একটি উদ্যোগ, সেই উদ্যোগে কোনো একটি জিনের অবদান অন্য কোনো জিনের অবদান থেকে পৃথক করা প্রায় অসম্ভব (৪)। একটি জিনের হয়তো পৃথক অনেক প্রভাব থাকতে পারে শরীরের বিভিন্ন অংশে। শরীরের যেকোনো একটি জায়গা প্রভাবিত হয় বহু জিনের কর্মকাণ্ডে এবং কোনো একটি জিনের প্রভাব আরো অনেকগুলো জিনের সাথে তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। কিছু জিন আছে যারা কাজ করে মাষ্টার’ জিন হিসাবে, যারা অন্য একগুচ্ছ জিনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। রুপকের ভাষায় বললে, স্থপতির পরিকল্পনার কোনো একটি পাতা, অট্টালিকার বিভিন্ন অংশের পরিকল্পনার প্রতি ইঙ্গিত করে এবং প্রতিটি পাতা অর্থবহ হয় অন্য পাতায় থাকা অসংখ্য তথ্যের আলোকে।

জিনদের এই জটিল ও সূক্ষ্ম পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আপনাকে ভাবাবে, আসলেই আমরা ‘জিন’ শব্দটি আদৌ কেন ব্যবহার করি? কেনই বা আমরা কোনো সমষ্ঠীসূচক শব্দ, যেমন, “জিন-কমপ্লেক্স’ শব্দটি ব্যবহার করিনা? উত্তর হচ্ছে, নানা উদ্দেশ্যের কারণে এটি আসলেই খুব ভালো একটি ধারণা, কিন্তু আমরা যদি বিষয়টি অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করি, কোনো জিন কমপ্লেক্সের ধারণাটিও অর্থবহ হয়, যখন জিন কমপ্লেক্সটি সুস্পষ্টভাবে পৃথক পৃথক অনুলিপনকারী অংশে বা জিনে বিভাজিত হবে এমনভাবে চিন্তা করা হয়। আর যৌন প্রজননের কারণে এই সমস্যাটি সৃষ্টি হয়। জিনগুলোকে মিশ্রণ আর সাফলিং বা এলোমেলো করে মিশিয়ে দেবার ক্ষেত্রে যৌন প্রজননের একটি বিশাল প্রভাব আছে। এর অর্থ হচ্ছে যে, একজন ব্যক্তির শরীর শুধু একটি স্বল্পায়ু জিন সন্নিবেশের ক্ষণস্থায়ী বাহন। আর জিনদের এই সন্নিবেশ হচ্ছে, যা কোনো একক সদস্যের শরীর ধারণ করে, সেই শরীরটি হয়তো বেশী দিন নাও বাঁচতে পারে, কিন্তু এর ধারণ করা জিনরা নিজেরা অনেক দীর্ঘায়ু হবার সম্ভাবনা রাখে। তাদের পথগুলো অবিরতভাবে বারবার মুখোমুখি হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কোনো একটি জিনকে মনে করা যেতে পারে ‘একক’ হিসাবে, ধারাবাহিকভাবে আসা বহু সংখ্যক একক সদস্যদের শরীরে স্থানান্তরিত হবার মাধ্যমে যা টিকে থাকে। আর এটাই এই অধ্যায়ে মূল যুক্তি হিসাবে গড়ে তোলা হবে। এটি হচ্ছে একটি যুক্তি, আমার বেশ কিছু সম্মানিত সহকর্মীরা যে যুক্তিটির সাথে দুর্দমনীয়ভাবে একমত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সুতরাং আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন যদি মনে হয় আমি বিষয়টি নিয়ে পরিশ্রম করছি!। প্রথমে যৌন প্রজনন নিয়ে কিছু বাস্তব বিষয় আমি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে চাই।

আমি বলেছিলাম যে মানুষের একটি শরীর তৈরী করার বিস্তারিত পরিকল্পনাটি সুরক্ষিত আছে ৪৬ টি খণ্ডে। আসলেই এটি অতিসরলীকরণ হয়ে গেছে। সত্যিটা বরং আরো অদ্ভুত, ৪৬টা ক্রোমোজোমে আছে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম। আমরা হয়তো বলতে পারি শরীর নির্মাণের পরিকল্পনাটি ২৩ খণ্ডের বিকল্প দুইটি সেট হিসাবে প্রতিটি কোষের নিউক্লিয়াসে সজ্জিত আছে। আমরা তাদের নাম দিলাম খণ্ড ১ক’ এবং ১খ, খণ্ড ‘ক’ এবং ২খ’ ইত্যাদি থেকে খণ্ড ‘২৩ক’ এবং খণ্ড ‘২৩খ’। অবশ্যই শনাক্তকারী সংখ্যাগুলো যা খণ্ডগুলো চিহ্নিত করতে এখানে এবং পরবর্তীতে পাতা নির্দেশ করতে আমি ব্যবহার করছি, সেটি অবশ্যই বিশুদ্ধভাবে কাল্পনিক।

আমরা প্রতিটি ক্রোমোজোম অবিকৃত অবস্থায় পাই আমাদের পিতা বা মাতা– এই দুজনের কারো একজনের কাছ থেকে, যাদের অণ্ডকোষ বা ডিম্বাশয়ে সেই ক্রোমোজোমটি তৈরী হয়েছিল। ধরুন খণ্ড ‘ক’, ‘২ক’, ‘ক’ .. এসেছে আপনার বাবার কাছ থেকে, খণ্ড ‘খ’, ‘২খ’, ‘খ’ এসেছে আপনার মায়ের কাছ থেকে। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কাজটি করা অত্যন্ত দুরুহ একটি ব্যাপার, তবে তাত্ত্বিকভাবে আপনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে আপনার যে কোনো একটি কোষের ৪৬টি ক্রোমোজোমের দিকে তাকাতে পারেন এবং যেখান থেকে যে ২৩টি আপনার মায়ের কাছ থেকে এসেছে এবং যে ২৩ টি আপনার বাবার কাছ থেকে এসেছে, সেগুলো পৃথক করতে পারেন।

জোড়া ক্রোমোজোমগুলো তাদের সারা জীবন কিন্তু একসাথে পাশাপাশি পরস্পরে সংস্পর্শে থেকে কাটায় না কিংবা এমনকি একে অপরের কাছাকাছিও থাকেও না, তাহলে কোন অর্থে তাদের জোড়া বলা হচ্ছে? সেই অর্থে যে, এর প্রতিটি জোড়ের যেটি আসছে মূলত বাবার কাছ থেকে এসেছে সেটির প্রতিটি পাতা অনুযায়ী, তার সঙ্গী ক্রোমোজোমের বিকল্প হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে যেটি মূলত আসছে মায়ের কাছ থেকে। যেমন, খণ্ড ১৩ক’ এর ‘পৃষ্ঠা ৬’ এবং খণ্ড ‘১৩খ’ এর ‘পৃষ্ঠা ৬’ দুটোই হয়তো চোখের কি রঙ হবে সেই বিষয়ের নির্দেশনা হতে পারে, হয়তো একটি বলছে ‘নীল’, অন্যটি বলছে ‘বাদামী।

কখনো কখনো দুটি বিকল্প পৃষ্ঠাই হুবহু একই রকম দেখতে, কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে, যেমন আমাদের চোখের রঙ বিষয়ক উদাহরণে যেভাবে বর্ণনা করলাম, তারা ভিন্নতা প্রদর্শন করছে। যদি তারা বিপরীতার্থক কোনো ‘প্রস্তাব করে পরিকল্পনায়, তাহলে শরীর কি করবে? এর উত্তর ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। কখনো একটি অন্যটির উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। চোখের রঙ নিয়ে যে উদাহরণটি দেয়া হলো এই মাত্র, এই মানুষটি হয়তো আসলেই বাদামী চোখের, সেক্ষেত্রে শরীরটি বানানোর সময় নীল চোখ বানানোর নির্দেশটি উপেক্ষা করা হয়েছে; তবে এটি কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে তাদের হস্তান্তর হবার ক্ষেত্রে কোনো বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। কোনো জিন যখন এভাবে উপেক্ষিত হয় তাকে বলে ‘রিসেসিভ’ জিন। আর ‘রিসেসিভ জিনের বিপরীতটি হচ্ছে ‘ডমিন্যান্ট’ জিন। নীল চোখের জিনটির উপর বাদামী চোখের জিনটি হচ্ছে ‘ডমিন্যান্ট’। কোন ব্যাক্তির নীল চোখ হবে তখনই যদি সংশিষ্ট পৃষ্ঠা দুটি ‘নীল রঙের চোখ তৈরী করার নির্দেশ দেবার ক্ষেত্রে একমত হয়। যখন দুটি বিকল্প জিন হুবহু একই রকম থাকে না, সচরাচর হয়ে থাকে তা হচ্ছে এক ধরনের সমঝোতা– শরীর কোনো একটি মধ্যবর্তী ডিজাইনে অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো পরিকল্পনায় তৈরী হয়।

যখন দুটি জিন, যেমন ‘বাদামী’ আর ‘নীল চোখের জিন, যারা ক্রোমোজোমে নির্দিষ্ট একটি জায়গা (লোকাস) দখল করার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তাদেরকে পরস্পরের ‘অ্যালিল’ বলা হয়। আমাদের এখানকার আলোচনার খাতিরে, অ্যালিল শব্দটি প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দটির সাথে সমার্থক। কল্পনা করুন স্থপতির পরিকল্পনাটি একটি আলাদা আলাদা পাতাগুলো একসাথে জড়ো করা আছে কোনো বাইন্ডারের মত, যেখান থেকে পৃষ্ঠাগুলো ইচ্ছামত খুলে সরিয়ে ফেলা যাবে এবং তাদের জায়গা অদল বদল করা যাবে। প্রতিটি ১৩ খণ্ডের (১৩ক ও ১৩খ) অবশ্যই একটি পৃষ্ঠা ৬’ থাকবে, কিন্তু ‘পৃষ্ঠা ৬ এর বেশ কয়েকটি সংস্করণ আছে, যাদের যে কোনো একটি ৫’ ও ‘পৃষ্ঠা ৭’ এর মধ্যবর্তী জায়গাটি নিতে পারে। একটি সংস্করণ হয়তো বলছে ‘নীল চোখ, আরেকটি সম্ভাব্য সংস্করণ বলছে ‘বাদামী চোখ, হয়তো আরো একটি সংস্করণ সেই জনগোষ্ঠীতে বিদ্যমান আছে যা হয়তো অন্য একটি রঙের কথা বলছে যেমন, ‘সবুজ। হয়তো প্রায় অর্ধ-ডজন বিকল্প সংস্করণ বা অ্যালিল আছে যারা ১৩ তম ক্রোমোজোমের ‘পৃষ্ঠা ৬ এর অবস্থানটিতে বসে আছে সেই পুরো জনগোষ্ঠীতে। যেকোন একক ব্যক্তির ‘খণ্ড ১৩’ ক্রোমোজোম মাত্র দুটি, সে কারণে তার পৃষ্ঠা ৬ এর জায়গায় সর্বোচ্চ দুটি অ্যালিল থাকতে পারবে, তার হয়তো, যেমন ‘নীল চোখের একজন ব্যক্তি, দুটি অ্যালিল একই সংস্করণের বা তার হয়তো যেকোনো দুটি অ্যালিল থাকতে পারে, সেই জনগোষ্ঠীর জিনপুল (জিন সম্ভারে) বিদ্যমান অর্ধ ডজন অ্যালিল থেকে বাছাইকৃত।

অবশ্যই, আক্ষরিকার্থে, পুরো জনগোষ্ঠীর জিন সম্ভার থেকে নিজের ইচ্ছামত আপনার জিন বাছাই করে আনতে আপনি পারবেন না। যেকোনো একটি সময়ে সব জিনই কোনো একক টিকে থাকা বা সারভাইভাল মেশিনের মধ্যে বন্দী। আমাদের জিনগুলো আমাদের প্রদান করা হয় ঠিক যে মুহূর্তে মাতৃগর্ভে পিতার শুক্রাণুর দ্বারা মায়ের ডিম্বাণু নিষিক্ত হবার মাধ্যমে সৃষ্ট একটি মাত্র কোষ হিসাবে আমরা যাত্রা শুরু করি। আমাদের এখানে বাছ বিচার করার কোনো উপায়ই নেই। যাইহোক, এক অর্থে, যেখানে, দীর্ঘ মেয়াদী একটা রুপে, সাধারণভাবে কোনো জনগোষ্ঠীতে বিদ্যমান জিনগুলোকে গন্য করা যেতে পারে ‘জিনপুল বা জিন সম্ভার হিসাবে। তবে জিনপুল শব্দটিতে আসলেই একটি কারিগরী’ শব্দ, যা জিনতত্ত্ববিদরা ব্যবহার করে থাকেন। জিনপুলের ধারণাটি যুক্তিযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা, কারণ, যৌন প্রজনন জিনগুলোর মিশ্রণ ঘটায়, যদিও খানিকটা সতর্ক পদ্ধতিগত উপায়ে। নির্দিষ্টভাবে, এমন কোনো কিছু– যেমন সেই খোলা পাতার বাইন্ডারের কোনো একটি বা একসাথে একগুচ্ছ পৃষ্ঠা আলাদা করে সরিয়ে অন্য কোনো স্থানে প্রতিস্থাপিত করার প্রক্রিয়াটা আসলেই চলতে থাকে, আমরা এখন যা দেখবো।

আমি একটি কোষের দুটি নতুন কোষে বিভাজিত হবার সাধারণ প্রক্রিয়াটি নিয়ে আগে আলোচনা করেছিলাম, প্রত্যেকটি কোষই একটি সম্পূর্ণ সেট, ৪৬ টি ক্রোমোজোমের সবকটি ক্রোমোজোম পায় সেখানে। এই সাধারণ কোষ বিভাজন পরিচিত ‘মাইটোসিস’ হিসাবে। কিন্তু আরো একধরনের কোষ বিভাজন আছে যাকে বলা হয় ‘মাইওসিস। এটি ঘটে শুধু মাত্র জনন কোষগুলি তৈরী হবার সময়: জনন কোষ হচ্ছে: শুক্রাণু ও ডিম্বাণু। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু আমাদের সব কোষগুলোর মধ্যে অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন, সেখানে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকার বদলে থাকে মাত্র ২৩ টি ক্রোমোজোম। এটি অবশ্য, ঠিক ৪৬ এর অর্ধেক –এবং বেশ সুবিধাজনক, কারণ তারা একসাথে সংযুক্ত হয়, যৌন প্রজনেনর নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়ায় একটি নতুন জীব সদস্য তৈরী করার জন্য। মাইওসিস হচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের কোষ বিভাজন, যা ঘটে শুধুমাত্র অণ্ডকোষ আর ডিম্বাশয়ে, যেখানে কোনো কোষ যার পুরো সেট, অর্থাৎ ২৩ জোড়া বা ৪৬টি ক্রোমোজোম আছে, বিভাজিত হয়ে ‘জনন কোষ তৈরী করে, যেখানে শুধু একটি সেট, বা ২৩টি ক্রোমোজোম থাকে (উদাহরণ হিসাবে আমি এখন সব সময়ই মানুষের ক্রোমোজোম সংখ্যাই উল্লেখ করছি)।

একটি শুক্রাণু, তার ২৩ ক্রোমোজোমসহ, তৈরী হয় অণ্ডকোষের সাধারণ ৪৬টি ক্রোমোজোমসহ কোষের মাইওটিক কোষ বিভাজনের মাধ্যমে। কিন্তু কোন ২৩টি ক্রোমোজোমকে কোনো একটি শুক্রাণুতে স্থানান্তর করা হবে? স্পষ্টতই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার হচ্ছে, কোনো একটি শুক্রাণু যেন অবশ্যই যেকোনো পুরোনো ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম না পায়: অবশ্যই এমন ঘটনা যেন না ঘটে, যেমন, এটি খণ্ড ১৩ র দুটি কপি আর খণ্ড ১৭ র কোনো কপি পেল না। তাত্ত্বিকভাবে যদিও সম্ভব কোনো একটি ব্যক্তি তার কোনো একটি শুক্রাণুতে শুধুমাত্র সেই ক্রোমোজোমগুলো রাখতে পারে, যারা এসেছে ধরুন, পুরোপুরিভাবে তার মায়ের কাছ থেকে, যেমন খণ্ড ১, ২খ, ৩খ ..২৩খ; এবং এই অসম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সেই বিশেষ শুক্রাণুটি দ্বারা নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে সৃষ্ট শিশু তার অর্ধেক জিন সমষ্টি পাবে তার দাদীর কাছ থেকে, কোনটাই তার দাদার কাছ থেকে না। কিন্তু আসলেই এই ধরনের মোটা দাগের পুরো ক্রোমোজোমসহ বিন্যাস সাধারণত ঘটেনা। আসল সত্যিটাই বরং আরো বেশী জটিল। মনে করে দেখুন যে খণ্ডগুলোকে (ক্রোমোজোম) আমরা ভাবছিলাম খোলা-আলাদা পাতার কোনো। বাইন্ডার হিসাবে। যা ঘটে তা হলো, শুক্রাণু তৈরী হবার সময়, একক পাতাগুলো বা বরং অনেকগুলো পাতার কিছু অংশ আলাদা হয়ে এর। বিকল্প খণ্ডটির সেই একই অংশের সাথে জায়গা রদবদল করে। সুতরাং কোন একটি নির্দিষ্ট শুক্রাণু কোষের খণ্ড ১ হয়তো তৈরী হয়েছে খণ্ড ১ক এর পৃষ্ঠা ৬৫ এবং খণ্ড ১খ এর পৃষ্ঠা ৬৬ থেকে শেষ পর্যন্ত পাতাগুলো একসাথে নিয়ে। শুক্রাণু কোষটি বাকি ২২ টি খণ্ডও পূর্ণ হয় একইভাবে। সুতরাং কোনো একক ব্যাক্তির প্রতিটি শুক্রাণু কোষ আসলেই অনন্য, যদিও তার সকল শুক্রাণু কোষ তাদের ২৩টি ক্রোমোজোম জড়ো করেছে সেই একই সেট ৪৬ টি ক্রোমোজোমের নানা অংশ নিয়ে। ডিম্বাণু এভাবেই তৈরী হয় ডিম্বাশয়ে, তারাও প্রত্যেকটি অনন্য।

বাস্তব ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়ায় এই মিশ্রণটি ঘটে সেটি এখন আমরা খুব ভালো করে জানি। কোনো একটি শুক্রাণু (বা ডিম্বাণু) তৈরী হবার সময়, পিতার কাছ থেকে আসা প্রত্যেকটি ক্রোমোজোমের টুকরো টুকরো অংশ শারীরিকভাবেই তাদের নিজেদের ক্রোমোজোম থেকে পৃথক করে নেয়, এবং মায়ের থেকে আসা সংশ্লিষ্ট ক্রোমোজোমের সেই অংশগুলোর সাথে তাদের জায়গা রদবদল করে। (মনে রাখতে হবে আমরা ক্রোমোজোম নিয়ে কথা বলছি যা মূলত এসেছে সেই মানুষটির বাবা-মার কাছ থেকে যে শুক্রাণুটি বানাচ্ছে, যেমন, সেই শিশুটির দাদা-দাদীর কাছ থেকে, যে শিশুটি সেই শুক্রাণুটি দিয়ে তার মায়ের ডিম্বাণু নিষিক্ত হবার পর জন্ম নেবে)। ক্রোমোজোমের টুকরোগুলোর এই অদল-বদল করার প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘ক্রসিং ওভার’। এই বইটির মূল যুক্তিটির জন্যে এই প্রক্রিয়াটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হচ্ছে যে আপনি যদি আপনার মাইক্রোস্কোপ বের করেন এবং আপনার নিজের শুক্রাণুর ( বা ডিম্বাণুর– যদি আপনি নারী হন) দিকে তাকান, সেখানে কোনগুলো আপনার মায়ের কাছ থেকে এসেছে, আর কোনগুলো আপনার বাবার কাছ থেকে এসেছে সেটা পার্থক্য করা আসলেই সময়ের অপচয় হবে। (এটি খুব বড় একটি পার্থক্য, শরীরের অন্যান্য সাধারণ কোষের সাথে যদি আপনি তুলনা করেন) (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৩১ দেখুন)। যেকোনো একটি ক্রোমোজোম একটি শুক্রাণুতে আসলেই একটি প্যাঁচওয়ার্ক, বা মিশ্রণ, একটি মোজাইক, মা এবং বাবার জিনের সমন্বয়ে যা তৈরী হয়েছে।

এই পর্যায়ে জিনের রুপক হিসাবে ‘পৃষ্ঠার’ বর্ণনা আসলেই ভেঙ্গে পারে। কোনো একটি আলাদা করে খোলা যায় এমন পাতার বাইন্ডারে পুরো একটি পৃষ্ঠাই হয়তো কোথাও ঢুকে যেতে পারে কিংবা অপসারিত হতে পারে বা রদবদল হতে পারে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার সাথে, কিন্তু আংশিক পৃষ্ঠার ক্ষেত্রে তেমন হবার কথা না নয়। কিন্তু জিন কমপ্লেক্সরা আসলেই আণবিক নিউক্লিওটাইড অক্ষরের একটি ধারাবাহিক সুতোর মত, যা আলাদা আলাদা পৃষ্ঠায় সুস্পষ্ট করে বিভাজিত নয়।

নিশ্চিতভাবে যদিও, সেই ধারাবাহিক অনুক্রমে, প্রোটিন চেইন তৈরীর সংকেতের সমাপ্তি’ ও ‘প্রোটিন অণু তৈরীর করার সংকেত শুরু; এর বিশেষ সংকেত থাকে সেই একই চারটি নিউক্লিওটাইড বেস নির্দেশিত অক্ষরে, ঠিক যেমন করে প্রোটিন বার্তা নিজেরাও সজ্জিত হয়। এই দুটি বিরাম চিহ্নের মাঝখানে কেমন করে একটি প্রোটিন অণু তৈরী করতে হবে সেই সাংকেতিক বার্তাটি থাকে। আমরা যদি চাই তাহলে একটি জিনকে আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি নিউক্লিওটাইড বর্ণমালার অনুক্রম হিসাবে যারা ‘শুরু’ আর ‘শেষ’ সংকেতের মধ্যে অবস্থান করে এবং যা একটি প্রোটিন অণুর শৃঙ্খল তৈরী করার সংকেত-বার্তা ধারণ করে। এভাবে সংজ্ঞায়িত করা কোন একটি ইউনিট বা একককে বোঝাতে ‘সিসট্রোন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এবং অনেকেই সিসট্রোন আর জিন শব্দ দুটি পরস্পর পরিবর্তনীয় রুপেও ব্যবহার করেন। কিন্তু ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়াটি সিসট্রোনদের মধ্যে থাকা কোনো বিভাজক সীমানা মেনে চলে না। একটি সিসট্রোনের ঠিক মাঝখানে বা কোনো দুটি সিসট্রোনের মাঝখানেও বিভাজিত হতে পারে। যেমন, অনেকটা এমন, স্থপতির পরিকল্পনাটি কোনো আলাদা আলাদা পৃষ্ঠায় লেখা হয়নি, যেন তাদের লেখা হয়েছে ৪৬ টি ‘টিকার টেপের’ রোল এর উপর (টিকার টেপ হচ্ছে কাগজের ফিতার মত, যার উপর টেলিগ্রাফিক টেপ মেশিনে বার্তাগুলো লিপিবদ্ধ হতো)। সিসট্রোনের কোনো সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য নেই। কোথায় একটি সিসট্রোন শেষ হচ্ছে আর কোথায় আরেকটি শুরু হচ্ছে সেটি বলার একটি মাত্র উপায় হতে পারে, সেই টেপের উপর সংকেতটি ভালো করে লক্ষ করা, ‘বার্তা শেষ’ বা ‘বার্তা শুরু’ সংকেত খুঁজে বের করার মাধ্যমে। ‘ক্রসিং-ওভার’ প্রক্রিয়াটি প্রতিনিধিত্ব করে— বাবা ও মায়ের ম্যাচিং বা সদৃশ টেপগুলো নিয়ে, সংশ্লিষ্ট অংশগুলো কেটে আবার সদৃশ আংশগুলো তাদের জায়গায় রদবদল করে যুক্ত করার প্রক্রিয়াটিকে, সেই টেপে কি লেখা আছে সেটি আদৌ লক্ষ না করে।

এই বইটির শিরোনামে, ‘জিন’ শব্দটির অর্থ একটি একক’ সিসট্রোন নয় বরং আরো সূক্ষ্ম কিছু। আমার সংজ্ঞা হয়তো অনেকেরই পছন্দ মত হবেনা, কিন্তু আসলে সর্বজনীনভাবে মেনে নেয়া হয়েছে জিনের এমন কোনো সংজ্ঞাও নেই। এমনকি যদিও তেমন কিছু থাকতো, মনে রাখতে হবে সংজ্ঞার বিশেষ কোনো অলঙঘনীয় পবিত্রতার স্মারক চিহ্ন নেই। আমরা যেকোনো শব্দকে আমাদের ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে সংজ্ঞায়িত করে নিয়ে পারি, শুধু আমাদের কাজটি সুস্পষ্টভাবে করতে হবে, অর্থের কোনো অস্পষ্টতা ছাড়া। আমি যে সংজ্ঞাটি ব্যবহার করছি, সেটি এসেছে জি. সি. উইলিয়ামস (৫) এর কাছ থেকে। একটি জিনকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, ক্রোমোজোম উপাদানের যেকোনো একটি অংশ, প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হিসাবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে টিকে থাকার মত যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার যার সম্ভাবনা আছে। আর এর আগের অধ্যায়ের সংজ্ঞানুযায়ী, কোনো জিন হচ্ছে খুব নিখুঁতভাবে নিজের অনুলিপি তৈরী করতে পারে এমন কোনো অনুলিপনকারী’। এই বিশ্বস্তভাবে নিজের অনুলিপি করা বাক্যটি ‘অনুলিপি-হিসাবে-দীর্ঘ-সময় টিকে থাকা বাক্যটিকে অন্যভাবে বলা এবং আমি এটিকে সংক্ষিপ্তভাবে এরপর থেকে আলোচনায় ব্যবহার করবো ‘দীর্ঘায়ু’ হিসাবে। জিনের সংজ্ঞাটির জন্য আরো কিছুটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

যেকোনো সংজ্ঞানুযায়ী, একটি জিনকে ক্রোমোজোমের একটি অংশ হতে হবে। প্রশ্নটি হচ্ছে, কত বড় অংশ, ‘টিকার টেপের’ কতটা অংশ? টেপের উপর যেকোনো একটি সাংকেতিক অক্ষরের অনুক্রম কল্পনা করুন। সেই অনুক্রমটির নাম দিন একটি জেনেটিক ইউনিট’। মাত্র দশটি অক্ষরের কোনো একটি সিসট্রোনের মধ্যে এটি হতে পারে একটি অনুক্রম। এটি আটটি সিসট্রোনের একটি অনুক্রমও হতে পারে; এটি হতো কোনো সিসট্রোনের মাঝামাঝি শুরু কিংবা শেষও হতে পারে। এটি হয়তো বা অন্য একটি জেনেটিক ইউনিটের কিছুটা অংশ ওভারল্যাপ বা অধিক্রমণ অর্থাৎ অপর অংশটির কিছু অংশ নিয়ে তৈরী হতে পারে। এর মধ্যে থাকবে ক্ষুদ্রতর ইউনিটগুলো এবং এটি বড় ইউনিটগুলোর অংশ তৈরী করবে। ইউনিটগুলো কত ছোট বা বড়, আমাদের বর্তমান যুক্তির জন্য সেটি ব্যপার না, সেটাকেই আমরা একটি ‘জেনেটিক ইউনিট’ বলছি। এটি ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য বরাবর একটি অংশ মাত্র, যা সত্যিকারভাবে ক্রোমোজোমের বাকী অংশ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়।

এবার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো একটি জেনেটিক ইউনিট যত ছোট হবে, এর জেনারেশন বা প্রজন্মগুলোর অপেক্ষাকৃত বেশী দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে সেই ইউনিটটি মাইওসিসের সময় ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হবার সম্ভাবনা কম। ধরুন, একটি পুরো ক্রোমোজোম, গড়ে, একবার ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, প্রতিবার মাইওটিক কোষ বিভাজনের মাধ্যমে যখন কোনো একটি শুক্রাণু বা ডিম্বাণু তৈরী হয়। এবং ক্রস ওভারটি হতে পারে এর দৈর্ঘ্য বরাবর যেকোনো স্থানেই। আমরা যদি খুব বড় কোনো একটি জেনেটিক ইউনিট বিবেচনা করি, ধরুন ক্রোমোজোর অর্ধেক দৈর্ঘ্য ব্যাপী, তাহলে প্রতিটি মাইওটিক বিভাজনে এর খণ্ডিত হবার ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে। যদি জেনেটিক ইউনিটটি ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্যের শুধুমাত্র ১ শতাংশ হয়, আমরা ধরে নিতে পারি যে যেকোনো একটি মাইওটিক বিভাজনের সময় এর খণ্ডিত হবার মাত্র ১ শতাংশ সম্ভাবনা আছে। এর অর্থ হচ্ছে ইউনিটটি নিয়ে আশা করা যেতে পারে যে, সেই ব্যক্তিটির বংশধারার উত্তরসূরিদের মধ্যে এটি বিশাল সংখ্যক প্রজন্মান্তরে টিকে থাকবে। একটি একক সিসট্রোন সাধারণত পুরো ক্রোমোজোমের ১ শতাংশ দৈর্ঘ্যের চেয়ে অনেক কম দৈর্ঘ্যের মনে করে হয়। এবং পাশাপাশি থাকা একগুচ্ছ সিসট্রোন ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়ায় খণ্ডিত হবার আগে, বহু প্রজন্ম ধরে টিকে থাকার আশা করতে পারে।

কোনো একটি জেনেটিক ইউনিটের গড় জীবনকাল ‘প্রজন্ম দিয়ে খুব সুবিধাজনকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে, যা আবার ‘বছরে’ অনুবাদ করা সম্ভব। আমরা যদি পুরো একটি ক্রোমোজোম নেই আমাদের আনুমানিক জেনেটিক ইউনিটটির জন্য, এর জীবনকালের স্থায়িত্ব মাত্র একটি প্রজন্ম। ধরুন এটি আপনার ক্রোমোজোম ‘৮ক’, আপনার বাবার কাছ থেকে যা আপনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। এটি তৈরী হয়েছে আপনার বাবার অণ্ডকোষে, মায়ের গর্ভে আপনার জীবন শুরু হবার অল্প কিছু সময় আগে। পৃথিবীর পুরোটা ইতিহাস জুড়ে আগে কখনোই এর অস্তিত্ব ছিলনা। এটি সৃষ্টি হয়েছে মাইওটিক কোষ বিভাজনের শাফলিং বা রদবদল প্রক্রিয়ায়, আপনার দাদা আর দাদীর ক্রোমোজোমের নানা টুকরো সমন্বয়ে গড়েপিটে সেটি তৈরী করা হয়েছে। এবং এটি একটি শুক্রাণুর মধ্যেই রাখা হয়েছিল, যেটি অনন্যভাবে স্বতন্ত্র। সেই শুক্রাণুটি কয়েক মিলিয়ন শুক্রাণুর একটি, ছোট ছোট নৌযানসহ একটি বিশাল নৌবাহিনীর মত, যারা একসাথে আপনার মায়ের জরায়ুতে সাঁতার কেটে প্রবেশ করেছিল। এবং সেই নির্দিষ্ট আর অনন্য শুক্রাণুটি (যদি না আপনি একজন আইডেন্টিকাল বা হুবহু যমজ না হয়ে থাকেন। সেই জাহাজের বিশাল নৌ-বহরে একটি মাত্র জাহাজ, যা কিনা আপনার মায়ের ডিম্বাণুতে নোঙ্গর ফেলতে পেরেছিল। আর আপনার অস্তিত্বে কারণ সেটাই। যে জিনগত ইউনিটটি আমরা বিবেচনা করছিলাম, আপনার ক্রোমোজোম নং ৮ক’, আপনার বাকী জিনগত উপাদানের সাথে সে তাকেও অনুলিপি করেছে। এখন এটি বিদ্যমান, প্রতিলিপি হিসাবে, আপনার সারা শরীরে। কিন্তু যখন আপনার সন্তান জন্ম দেবার সময় আসবে, এই ক্রোমোজোমটি ধ্বংস হবে, যখন আপনি ডিম্বাণু (বা শুক্রাণু তৈরী করবেন), এর নানা টুকরো অংশ আমরা মায়ের কাছ থেকে আসা সংশ্লিষ্ট ক্রোমাজোম ‘৮খ’ এর সংশ্লিষ্ট নানা টুকরো অংশের সাথে তাদের জায়গা রদবদল করবে। যেকোনো একটি জনন কোষে, একটি নতুন ক্রোমোজোম নং ৮’ সৃষ্টি হবে, হয়তো বা সেটি আগের চেয়ে আরো ‘উত্তম’ বা হয়তো আরো ‘খারাপ হতে পারে। কিন্তু, বরং প্রায় অসম্ভব দৈবক্রম ছাড়া, অবশ্যই সেটি আলাদা হবে, অবশ্যই এককভাবে অনন্য হবে। কোনো একটি ক্রোমোজোমের জীবনকালের ব্যাপ্তি হবে একটি প্রজন্মের সমান।

ক্ষুদ্র জেনেটিক ইউনিটদের জীবনকাল কতটুকু, ধরুন আপনার ক্রোমোজোম “৮ক’ এর দৈর্ঘ্যের ১ শতাংশ? এই ইউনিটও এসেছে আপনার বাবার কাছ থেকে, এবং খুব সম্ভবত এটি মূলত তার শরীরেও সৃষ্টি হয়নি; এর আগের যুক্তি অনুযায়ী, প্রায় ৯৯ শতাংশ সম্ভাবনা আছে যে তিনি এটি পেয়েছিলেন সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত অবস্থায় তার বাবা অথবা মা, দুজনের যেকোনো একজনের কাছ থেকে। এবং অবশেষে, যদি আমরা ক্ষুদ্র জেনেটিক ইউনিটদের বংশঐতিহ্য অনুসরণ করে দেখার চেষ্টা করি যথেষ্ট অতীত কোনো সময় অবধি, আমরা এর মূল সৃষ্টিকর্তার কাছে পৌঁছাতে পারবো। কোনো একটি পর্যায়ে এটি অবশ্যই প্রথমবারের মত সৃষ্টি হয়েছিল আপনার কোনো পূর্বসূরির অণ্ডকাষ বা ডিম্বাশয়ের মধ্যে।

আবারো পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, বিশেষ একটি অর্থে আমি ‘সৃষ্টি শব্দটি ব্যবহার করছি। ক্ষুদ্রতর সাব-ইউনিটগুলো যারা জেনেটিক ইউনিট তৈরী করে, যাদের কথা আমি আলোচনা করছি হয়তো বিদ্যমান ছিল আগে থেকেই। আমাদের জেনেটিক ইউনিট সৃষ্টি হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে শুধুমাত্র এই অর্থে যে কোনো নির্দিষ্ট সাব-ইউনিটদের ‘সজ্জা’ যার মাধ্যমে এটি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেই মুহূর্তের আগে তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সৃষ্টির মুহূর্তটি হয়তো ঘটেছে সাম্প্রতিক কোনো সময়ে, ধরুন আপনার কোনো পিতামহ বা প্রপিতামহের সময়ে। কিন্তু আমরা যদি খুব ছোটো কোনো ইউনিটের কথা ভাবি, সেটি হয়তো আরো অনেক দূরের কোনো পূর্বসূরিদের শরীরে সৃষ্টি হয়েছিল। হয়তো কোনো এইপ সদৃশ প্রাক-মানব পূর্বসূরির শরীরে। উপরন্তু, একটি ক্ষুদ্র ইউনিট আপনার শরীরে অনেক দূর ভবিষ্যতের দিকেও যেতে পারে, অখণ্ড অবস্থায় এটি স্থানান্তরিত হতে পারে আপনার উত্তরসূরিদের দীর্ঘ ধারায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

এটাও মনে রাখতে হবে যে, কোনো ব্যক্তির উত্তরসূরিরা একটি একক ধারা তৈরী করে না বরং একটি শাখাপ্রশাখা বিশিষ্ট ধারার সৃষ্টি করে; আপনার পূর্বসূরিদের মধ্যে যিনি, যে কিনা আপনার ক্রোমোজোম ‘৮ক’ এর সুনির্দিষ্ট অল্প দৈর্ঘ্যের একটি অংশ ‘সৃষ্টি করেছিল আপনি ছাড়াও তার হয়তো আরো বহু উত্তরসূরি আছে। আপনার জেনেটিক ইউনিটগুলোর মধ্যে একটি হয়তো উপস্থিত থাকতে পারে আপনার দ্বিতীয় জ্ঞাতি ভাইয়ের শরীরে। এটি আমার মধ্যে থাকতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর শরীরে এবং আপনার কুকুরের শরীরেও থাকতে পারে, কারণ আমরা যদি যথেষ্ট পরিমান অতীতে যেতে পারি, আমাদের সবাই কোনো না কোনো সাধারণ পূর্বসূরি ভাগ করেছিলাম। এছাড়াও আরো এই একই ক্ষুদ্র ইউনিট হয়তো বেশ কয়েকবারই স্বতন্ত্রভাবে তৈরী হয়েছিল দৈবক্রমে যদি ইউনিটটি ছোট হয়, তাহলে দৈবক্রমে ঘটার বিষয়টি খুব বেশী অসম্ভাব্য নয়। কিন্তু এমনকি কোনো একজন নিকটাত্মীয়ের পক্ষেও আপনার সাথে একটি আস্ত ক্রোমোজোম ভাগ করে নেবার সম্ভাবনা খুবই কম। কোনো একটি জেনেটিক ইউনিট যত ছোট হবে, অন্য কেউ সেটি ভাগ করে নেবার বা ধারণ করার সম্ভাবনাও বেশী হবে– এবং সারা পৃথিবীতে বহুবার এর অনুলিপি রুপে প্রতিনিধিত্ব করার আরো বেশী সেটির সম্ভাবনা থাকবে।

আগে থেকেই বিদ্যমান সাব-ইউনিটগুলোর ‘ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে একত্র হওয়া হচ্ছে, একটি নতুন জেনেটিক ইউনিট তৈরী হবার সাধারণ একটি উপায়। অন্য একটি উপায়– বিবর্তনীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি যদিও এটি কদাচিৎ ঘটে, সেটিকে বলা হয় ‘পয়েন্ট মিউটেশন’। একটি পয়েন্ট মিউটেশন’ হচ্ছে একটি ভুল, যার সাথে তুলনা করা যেতে পারে একটি বইয়ে ভুলভাবে মূদ্রিত হওয়া কোনো একটি অক্ষরের সাথে। সচরাচর এটি ঘটেনা কিন্তু স্পষ্টতই যতই দীর্ঘ হবে কোনো জেনেটিক ইউনিট, এর দৈর্ঘ্যের কোনো না কোনো অংশে মিউটেশনের মাধ্যমে এর পরিবর্তন হবার সম্ভাবনা ততই বাড়বে।

আরো একটি দুর্লভ ধরনের মিউটেশন, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আছে সেটিকে বলা হয় “ইনভারশন। ক্রোমোজোমের একটি টুকরো দুই প্রান্তে এর মূল ক্রোমোজোম থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, এটি পুরোপুরি উল্টো হয়ে যাবে, এবং আবার নিজেকে মূল ক্রোমোজোমের যুক্ত করবে, তবে পুরোপুরি উল্টোভাবে। এর আগের তুলনার সাথে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে এটি হচ্ছে নতুন করে যুক্ত হওয়া পৃষ্ঠাগুলোয় পুনরায় পৃষ্ঠা সংখ্যা দিতে হবে। কখনো কখনো ক্রোমোজোমের অংশ শুধু উল্টোভাবে যুক্তই হয়না বরং ক্রোমোজোমের সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেটি যুক্ত হয় বা সম্পূর্ণ অন্য কোনো একটি ক্রোমোজোমের সাথে যুক্ত হয়। প্রক্রিয়াটি হচ্ছে কোন একটি খণ্ড থেকে একগুচ্ছ পাতা অন্য আরেকটি খণ্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। এই ধরনের ভুলের গুরুত্ব হচ্ছে, যদি সাধারণত বিধ্বংসী, কখনো কখনো এটি কিছু জেনেটিক ইউনিটের মধ্যে কাছাকাছি একটি সংযোগ বা ‘লিংকেজ’ তৈরী করে যারা ঘটনাচক্রে একত্রে বেশী ভালোভাবে কাজ করে। হয়তো দুটো সিসট্রোনের কোনো উপযোগিতা আছে। যখন তারা দুটোই একসাথে উপস্থিত থাকে, তারা পরস্পরের সম্পুরক বা কোনো না কোনোভাবে পরস্পরকে আরো শক্তিশালী করে। ইনভারশন প্রক্রিয়াটি এমনই কোনো সিসট্রোনদের পরস্পরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। এরপর প্রাকৃতিক নির্বাচন এই নতুন করে তৈরী হওয়া ‘জেনেটিক ইউনিটের প্রতি তার আনুকুল্য প্রদর্শন করবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়বে। সম্ভাবনা আছে যে জিন কমপ্লেক্সগুলো, বহু সময়ের পরিক্রমায়, আরো ব্যাপকভাবে পুনবিন্যস্ত ও সজ্জিত হবে বা ‘সম্পাদিত হবে। এই উপায়ে।

এই বিষয়টি সংক্রান্ত পরিচ্ছন্ন উদাহরণের একটি হচ্ছে সেই প্রাকৃতিক প্রপঞ্চটি যা পরিচিত ‘মিমিক্রি’ নামে। কিছু প্রজাপতির স্বাদ খুবই বাজে, সাধারণত তাদের রঙ উজ্জ্বল আর খুব বৈশিষ্ট্যসূচক এবং সেই সতর্কতামূলক রঙ দেখেই পাখিরা সাধারণত তাদেরকে খাওয়া থেকে বিরত থাকে। এখন অন্য প্রজাতির প্রজাপতি যাদের স্বাদ খারাপ না তারা এই কৌশলটি নিজেদের কাজে লাগায়। তারা খারাপ স্বাদের প্রজাপতিদের ‘মিমিক’ বা অনুকরণ করে। তারা আকারে ও রঙে ঠিক খারাপ স্বাদের প্রজাপতিদের মত দেখতে হয়। কিন্তু স্বাদে নয়), এভাবে তারা প্রায়শই মানব প্রকৃতিবিদদের বোকা বানায়তো বটেই, তারা পাখিদেরও বোকা বানায়। কোনো একটি পাখি যে একবার সত্যিকারের খারাপ স্বাদের প্রজাপতি মুখে নিয়েছে, সাধারণত সেই একই রকম দেখতে আর কোনো প্রজাপতি খাওয়া থেকে এড়িয়ে চলে। এবং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সেই অনুকরণকারী বা মিমিক প্রজাতিগুলোও। সুতরাং যে জিনগুলো এই অনুকরণ বা মিমিক করতে সাহায্য করে সেই জিনগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের আনুকুল্য পায়। এভাবে মিমিক্রি বিবর্তিত হয়।

‘বাজে’ স্বাদের বহু প্রজাতির প্রজাপতি আছে, এবং তারা সবাই একই রকম দেখতে নয়। একটি মিমিক বা অনুকরণকারী প্রজাতি তাদের সবার মত দেখতে হতে পারেনাঃ তাকে একটি মাত্র খারাপ স্বাদের কোনো প্রজাপতিকে অনুকরণ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয়। সাধারণত, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির অনুকরণকারী বা মিমিক, একটি নির্দিষ্ট বাজে স্বাদের প্রজাপতিকে অনুকরণ করতে বিশেষজ্ঞ। কিন্তু আরো কিছু প্রজাতির মিমিক বা অনুকরণকারী আছে, যারা আরো অদ্ভুত কিছু কাজ করে। তাদের কোনো কোনো সদস্য একটি বাজে স্বাদের প্রজাতিকে মিমিক করে, কিন্তু সেই প্রজাতির অন্য সদস্য হয়তো অন্য একটি প্রজাতির বাজের স্বাদের প্রজাতিকে মিমিক করে। সেই প্রজাতি জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য যারা দুজনকেই মিমিক বা অনুকরণ করার চেষ্টা করে বা আর কেউ যদি এর মাঝামাঝি একটি অবস্থানে থাকে, তারা বেশ তাড়াতাড়ি পাখিদের খাদ্যে পরিণত হয়, কিন্তু এমন ধরনের মধ্যবর্তী কারো জন্ম হয়না। ঠিক যেমন কোনো একক সদস্য হয় নির্দিষ্টভাবে পুরুষ বা নারী। সুতরাং কোনো একটি একক সদস্য প্রজাপতি যা কোনো কোনো একটিমাত্র বাজে স্বাদের প্রজাপতির ‘মিমিক’ হয়। একটি প্রজাপতি হয়তো প্রজাতি ‘ক’ কে অনুকরণ করে আর তার ভাই হয়তো প্রজাতি ‘খ’কে অনুকরণ করে।

দৃশ্যত মনে হয় যেন একটি একক কোনো জিন নির্ধারণ করছে কোন একক সদস্যটি প্রজাতি ‘ক’ বা প্রজাতি ‘খ’ কে অনুকরণ করবে। কিন্তু কিভাবে একটি একক জিন মিমিক্রির এই বহুমাত্রিক কাজটি করতে পারে– রঙ, আকার, স্পটের বিন্যাস, ওড়ার ভঙ্গিমায়? এর উত্তর হচ্ছে কোনো একটি জিন, একটি সিসট্রোন অর্থে সম্ভবত সেই কাজটি পারেনা। কিন্তু সচেতন নয় এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত সম্পাদিত বা এডিটিং হওয়া জিন যা ঘটতে পারে জিন উপাদানের ইনভারশন বা অন্যান্য দূর্ঘটনাবশত পুনবিন্যাস প্রক্রিয়ায়। প্রাক্তন কোনো বিচ্ছিন্ন জিনের একটি বড় সমষ্ঠী একসাথে কাছাকাছি এসে একটি দৃঢ় সংযোগ বা লিংকেজ গ্রুপ তৈরী করে কোনো একটি ক্রোমোজোমে। পুরো গুচ্ছ বা ক্লাস্টারটি একটি একক জিন হিসাবে আচরণ করে আসলেই, আমাদের সংজ্ঞানুযায়ী সেটি এখন একটি একক জিন ও তার একটি অ্যালিল বা বিকল্প রুপ আছে, যেটি আসলেই আরেকটি জিন গোষ্ঠী বা ক্লাষ্টার। একটি ক্লাস্টার হয়তো সেই সব সিসট্রোনগুেলো ধারণ করে যারা প্রজাতি ‘ক’ কে অনুকরণ করতে সাহায্য করে এবং বিকল্প অন্যটি হয়তো প্রজাতি ‘খ’ কে অনুকরণ করতে সাহায্য করে। এবং প্রতিটি ক্লাষ্টার ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে খণ্ডিত হবার সম্ভাবনা খুব কম, আর তাই যেকোনো মাঝামাঝি রুপের কোনো প্রজাপতিকে আমরা প্রকৃতিতে কখনো দেখতে পাবো না। কিন্তু এই সব মাঝামাঝি রুপের প্রজাপতিদের মাঝে মাঝে আমরা দেখতে পাই যদি বহু সংখ্যক প্রজাপতিদের আমরা ল্যাবরেটরীতে প্রজনন করি।

আমি জিন শব্দটি ব্যবহার করছি একটি জেনেটিক ইউনিটকে বোঝতে। এবং বহু সংখ্যক প্রজন্ম টিকে থাকার জন্য তারা যথেষ্ট পরিমানে আকারে ছোট এবং অনেক সংখ্যক প্রতিলিপি হিসাবে এটি জনগোষ্ঠীতে বিদ্যমান। এটি কিন্তু খুব আটোসাটো অলঙ্ঘনীয় কোনো সংজ্ঞা নয়, বরং এক ধরনের ধীরে ধীরে মিশে যাওয়া সংজ্ঞার মত, ঠিক ‘বড়’ আর ‘পুরাতন’ এর সংজ্ঞার মত। ক্রোমোজোমের কোনো একটি দৈর্ঘ্যের ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খণ্ডিত হবার বা নানা ধরনের মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবার যতই সম্ভাবনা থাকবে, ততই এটি একটি ‘জিন’ হিসাবে চিহ্নিত হবার গুণাবলী হারায় ঠিক সেই অর্থে, যে অর্থে আমি ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করছি। আনুমানিক হিসাবে কোনো একটি সিসট্রোন হয়তো এই নামের যোগ্য, কিন্তু একইভাবে যোগ্য আরো বড় ইউনিটগুলোও। এক ডজন সিসট্রোন হয়তো একে অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে কোনো একটি ক্রোমোজোমে, সেটি আমাদের আলোচনার উদ্দেশ্য পুরণ করে একটি একক দীর্ঘায়ু জেনেটিক ইউনিট হিসাবে। প্রজাপতির মিমিক্রি ক্লাষ্টার ভালো একটি উদাহরণ। সিসট্রোন একটি শরীর ত্যাগ করে এবং অন্য একটি শরীরে প্রবেশ করে যখন তারা শুক্রাণু বা ডিম্বাণুতে আরোহণ করে পরবর্তী প্রজন্ম বরাবর যাত্রা শুরু করে। সম্ভাবনা আছে তারা সেই ক্ষুদ্র নৌযানে তাদের আগের যাত্রায় নিকটতম প্রতিবেশী খুঁজে পাবে, পুরোনো অভিযান সঙ্গী, যাদের সাথে তারা একটি দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিল দুরবর্তী কোনো পূর্বসুরির শরীর থেকে। একই ক্রোমোজোমে পাশাপাশি থাকা ক্রোমোজোমগুলো একটি খুব দৃঢ় বন্ধনযুক্ত অভিযান সঙ্গীদের গ্রুপ তৈরী করে, যখন মাইওসিস কোষ বিভাজনের সময় হয় যাদের কেউ খুব কদাচিৎ একই জাহাজে উঠতে ব্যর্থ হয়।

খুব কঠোরভাবে বললে এই বইটি নাম হওয়া উচিৎ না ‘The Selfish Cistron’ of ‘The Selfish Chromosome but The slightly selfish big bit of chromosome and the even more selfish little bit of chromosome, sports ‘ক্রোমোজোমের খানিকটা স্বার্থপর বড় টুকরা এবং ক্রোমোজোমের আরো বেশী স্বার্থপর ছোট টুকরো”। অন্ততপক্ষে বইয়ের শিরোনাম হিসাবে এটি তেমন আকর্ষণীয় নয়। সুতরাং ক্রোমোজোমের সংক্ষিপ্ত অংশ বহু প্রজন্ম টিকে থাকার মত যারা সম্ভাবনাময়, তাদের জিন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে আমি এই বইটির নাম দিয়েছি, ‘দ্য সেলফিশ জিন।

আমরা আবার সেই প্রসঙ্গেই ফিরে এসেছি, অধ্যায় ১ এর শেষে যা আমরা ছেড়ে এসেছিলাম। সেখানে আমরা দেখেছিলাম যে, স্বার্থপরতাই প্রত্যাশা করা যাবে এমন কোনো কিছুর কাছে, যা কিনা ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করার একক’ শিরোনামটি দাবী করতে পারে। আমরা দেখেছি কেউ কেউ প্রজাতিকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করার একক হিসাবে মনে করেন, অন্যরা ভাবেন এই দাবী করতে পারে জনগোষ্ঠী অথবা কোনো প্রজাতির মধ্যে কোন গ্রুপ বা গোষ্ঠী, আবার কেউ কেউ ভাবেন প্রজাতির একক সদস্যরা হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করার একক। আমি বলেছিলাম যে, আমি মনে করি জিনরাই হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক এবং সেকারণে আত্ম-স্বার্থের মৌলিক একক। আমি এখন যা করলাম সেটি হচ্ছে জিনকে ‘সংজ্ঞায়িত করলাম এমনভাবে, যে আমি চাইনা সেখানে ন্যূনতম সংশয় আর ভুল হবার অবকাশ থাকুক!

প্রাকৃতিক নির্বাচনের সবচেয়ে সাধারণতম রুপে নানা এনটিটি বা সত্তার বৈষম্যমূলক ভাবে টিকে থাকাকেই বোঝায়। কিছু সত্তারা টিকে থাকে আর কিছুর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। এই বাছাইকৃতভাবে মারা যাওয়ার বিষয়টির এই পৃথিবীর উপর কোনো প্রভাব রাখতে হলে, আরো একটি বাড়তি শর্ত মেনে নিতে হবে। প্রতিটি সত্তাকে অবশ্যই অস্তিত্বশীল হতে হবে বহু সংখ্যক প্রতিলিপি রুপে। এবং কমপক্ষে কিছু সত্তার অনুলিপি রুপে– যথেষ্ট পরিমান বিবর্তন সময়ের জন্যে এর টিকে থাকার অবশ্যই সম্ভাবনা থাকবে। ছোটো জেনেটিক ইউনিটগুলোর এই বৈশিষ্ট্যাবলী আছে: প্রজাতির কোনো একক সদস্য, গোষ্ঠী বা গ্রুপ বা প্রজাতির এই বৈশিষ্ট্য নেই। গ্রেগর মেন্ডেলের একটি অসাধারণ অর্জন হচ্ছে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, হেরেডিটারি বা বংশগতির এককগুলোকে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এমনভাবে গ্রহন করা যেতে পারে, যেন সেটি অবিভাজ্য এবং স্বতন্ত্র কোনো পার্টিকেল বা ক্ষুদ্রতর কোনো অংশ বা কণা। ইদানীং আমরা জানি যে এটি একটি বেশী সরলীকরণ। এমনকি একটি সিসট্রোনও মাঝে মাঝে বিভাজিত হতে পারে এবং যেকোনো দুটি জিন একই ক্রোমোজোমে আসলে পুরোপুরিভাবে স্বতন্ত্র স্বাধীন নয়। আমি যেটা করেছি সেটি হচ্ছে, কোনো একটি জিনকে একটি ইউনিট হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছি, যা কিনা একটি উচ্চ মাত্রা অবধি অবিভাজ্য ক্ষুদ্র স্বতন্ত্র কনার আদর্শ বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কোনো একটি জিন অবিভাজ্য নয় বটে, কিন্তু এটি কদাচিৎ বিভাজিত হয়। কোনো একটি একক সদস্যর শরীরে এটি হয় সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থিত থাকবে বা সুনির্দিষ্টভাবে অনুপস্থিত থাকবে। একটি জিন অখণ্ডিত অবস্থায় পিতামহ থেকে পৌত্রের শরীরে যাত্রা করে। যা অতিক্রম করে মধ্যবর্তী প্রজন্মটি, কিন্তু সেখানে তার কোনো মিশ্রণ হয়না বা অন্য কোনো জিনের সাথে এটি মিশে যায় না। যদি জিনরা সারাক্ষণই একে অপরের সাথে মিশে যেত, ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বলতে আমরা এখন যা বুঝি, সেটি অসম্ভব একটি ব্যাপার হতো। ঘটনাচক্রে, এটি প্রমাণ হয়েছিল ডারউইনের জীবদ্দশায় এবং এটি ডারউইনকে ভীষণ চিন্তায় ফেলেছিল কারণ সেই সময় ধারণা করা হতো বংশগতি বা হেরেডিটি হচ্ছে মিশে যাবার একটি প্রক্রিয়া। মেন্ডেলের আবিষ্কার ততদিনে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং সেটি ডারউইনকে দুশ্চিন্তা মুক্ত করতে পারতো, কিন্তু হায় তিনি সে বিষয়ে কিছুই জানতেন না। ডারউইন ও মেন্ডেল দুজনেরই মারা যাবার বহু বছর পরে ছাড়া আসলে কেউই মনে হয় সেটি মনোযোগ দিয়ে পড়েননি। হয়তো মেন্ডেল নিজেও তার আবিষ্কারের গুরুত্বটি বুঝতে পারেননি, নয়তো তিনি হয়তো ডারউইনকে বিষয়টি জানিয়ে লিখতেন।

জিনের পার্টিকুলেটনেস বা ক্ষুদ্র কণার মত বৈশিষ্ট্যের আরো একটি দিক হচ্ছে এটি কখনোই সেনাইল বা জরাগ্রস্থ হয় না। এটি যেমন মিলিয়ন বছর বয়স হলেও মরার সম্ভাবনা যতটুকু বাড়েনা, ঠিক তেমনই সেই সম্ভাবনা বাড়ে না এর যখন বয়স মাত্র একশ। এটি এক শরীর থেকে অন্য শরীরে লাফিয়ে চলে প্রজন্মান্তরে, একটার পর একটি শরীরকে তার নিজের মত করে ব্যবহার করে, তার নিজের উদ্দেশ্যে, ধারাবাহিকভাবে মরনশীল দেহগুলো সে পরিত্যাগ করে, দেহগুলো জরাগ্রস্থ আর মৃত্যুর কাছে পরাজিত হবার আগে।

জিনরা আসলে অমর, অথবা বরং তাদের সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে জিনগত সত্তা হিসাবে যারা এই আখ্যা পাবার জন্য সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। আমরা, এই পৃথিবীতে একক সেই সারভাইভাল মেশিন, কয়েক দশক বেঁচে থাকার আশা করতে পারি। কিন্তু জিনরা এই পৃথিবীতে তাদের যে সময়ব্যাপী জীবনকাল আশা করতে পারে, সেটি দশক দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব না বরং হাজার এবং মিলিয়ন বছর দিয়ে পরিমাপ করতে হবে।

যৌন প্রজনন করে এমন কোনো প্রজাতিতে, একটি জেনেটিক ইউনিট হিসাবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে কোনো একক সদস্য হচ্ছে অনেক বড় ও অনেক বেশী ক্ষণস্থায়ী বা সাময়িক, প্রাকৃতিক নির্বাচনের যে ইউনিটটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারেনা (৬); আর একটি গ্রুপ বা গোষ্ঠী তার চেয়ে আরো বড় একটি ইউনিট। জিনগত দৃষ্টিভঙ্গিতে একক সদস্য আর সদস্যদের কোনো গ্রুপ হচ্ছে আকাশে ভাসমান মেঘ বা মরুভূমির মরু-ঝড়ের মত; একটি ক্ষণস্থায়ী সহযোগিতায় তারা সাময়িকভাবে একসাথে জড়ো হয়। বিবর্তনীয় সময়ের প্রেক্ষিতে এটি যথেষ্ট পরিমান স্থিতিশীল নয়। কোনো জনগোষ্ঠী হয়তো বহুদিন টিকে থাকে, কিন্তু তারা সারাক্ষণই মিশ্রিত হচ্ছে অন্য জনগোষ্ঠীর সাথে এবং তাদের সেই পরিচিতিটাও লঘু হয়ে হারাচ্ছে। এবং তারা নিজেরাও ভিতর থেকে বিবর্তনীয় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হবার জন্য একটি জনগোষ্ঠী যথেষ্ট পরিমান পৃথক সত্তা নয়, তেমনি এটি স্থিতিশীলও নয় এবং অন্য কোনো একটি জনগোষ্ঠীর তুলনায় যা কিনা নির্বাচিত হতে পারে এমন কোনো এককও নয়।

প্রজাতির কোনো একক সদস্যের দেহকে মনে হতে পারে সুস্পষ্টভাবে যথেষ্ট পৃথক যখন এটি টিকে থাকে, কিন্তু হায়, কতটা দীর্ঘ সময় সেটা? প্রতিটি সদস্যই স্বতন্ত্রভাবে অনন্য। এমন কোন সত্তাদের মধ্যে বাছাই করে আপনি কোনো বিবর্তন পেতে পারেন না, যখন প্রতিটি সত্তার জন্য সেখানে আছে মাত্র একটি কপি। যৌন প্রজনন কিন্তু অনুলিপিকরণ নয়। ঠিক যেমন কোনো একটি জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠী দ্বারা দুষিত হতে পারে, কোন একটি একক সদস্যের বংশধররাও দুষিত হতে পারে তার যৌন সঙ্গীর মাধ্যমে। আপনার সন্তান হচ্ছে অর্ধেকটি আপনি, আপনার পৌত্র হচ্ছে শুধু সিকি ভাগ আপনি। এবং এভাবে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই বড় জোর আপনি হয়তো আশা করতে পারেন বিশাল সংখ্যক উত্তরসূরিদের, যাদের প্রত্যেকেই আপনার সামান্য কিছু অংশ বহন করে– অল্প কিছু জিন এমনকি যদিও তাদের খুব অল্প কয়েকজন আপনার পদবী বহন করে।

একক সদস্যরা স্থিতিশীল নয়, তারা ক্ষণস্থায়ী, রদ বদলের মাধ্যমে ক্রোমোজোম হারিয়ে যায় বিস্মতিতে, ঠিক তাস খেলায় বেটে পাওয়া হাতের তাসের কার্ডের মত; কিন্তু কার্ডরা নিজেরা এই রদবদল আর সাজানো পর্বে টিকে থাকে। এই কার্ডগুলো হচ্ছে জিন। এবং জিনরা ধ্বংস হয়না ‘ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে, তারা শুধু সঙ্গী বদলায় এবং প্রজন্মান্তরে বহমান থাকে। অবশ্যই তারা চলতে থাকে, সেটাই তাদের কাজ। তারা হচ্ছে অনুলিপনকারী এবং আমরা তাদের বেঁচে থাকার মেশিন। যা কাজ সেটি হয়ে গেলে পরিত্যক্ত হিসাবে আমাদেরকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু জিনরা হচ্ছে ভূতাত্ত্বিক সময়ের নাগরিক: জিনরা হচ্ছে অবিনশ্বর।

জিনগুলো, হীরার মত, চিরকালের জন্য, কিন্তু ঠিক হীরার মত একই ভাবে নয়। হীরার একক ভাবে কোনো স্ফটিক, যা পরমাণু সজ্জার অপরিবর্তিত একটি রুপ হিসাবে টিকে থাকে। ডিএনএ অণুর সেই একই ধরনের স্থায়ীত্ব নেই। শারীরিকভাবে কোনো একটি ডিএনএ অণুর জীবনকাল সংক্ষিপ্ত– হয়তো কয়েক মাসের ব্যাপার। নিশ্চয়ই কোনো একটি জীবনকালের চেয়ে দীর্ঘ নয়। কিন্তু একটি ডিএনএ অনু তার নিজের অনুলিপি হিসেবে তাত্ত্বিকভাবেই শত মিলিয়ন বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে। উপরন্তু, সেই আদিম সুপে বা মিশ্রণে প্রাচীন অনুলিপনকারীদের মত, কোনো একটি নির্দিষ্ট জিনের অনুলিপি সারা বিশ্বব্যাপী বিন্যস্ত থাকে। পার্থক্যটি হলো, আধুনিক সংস্করণগুলো তাদের টিকে থাকার যন্ত্র শরীরগুলোতে সব সুন্দর করে সাজানো আছে।

আমি যা করছি, তাহলে শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হিসাবে অনুলিপি রুপে কোনো একটি জিনের সম্ভাব্য প্রায়-অমরত্বের বিষয়টির উপর গুরুত্ব আরোপ করা। কোনো একটি জিনকে একটি একক সিসট্রোন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা কিছু কিছু ক্ষেত্রে উপযোগী, কিন্তু বিবর্তনীয় তত্ত্বের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো সম্প্রসারিত হওয়ার দরকার। সংজ্ঞার উদ্দেশ্য অনুযায়ী সেই সম্প্রসারণের সীমানাটি নির্ধারিত হতে পারে। আমরা আসলেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি ব্যবহারিক’ ইউনিট খুঁজতে চাই। আর সেটা করতে আমরা শুরু করি সেই বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে, যা কোনো প্রাকৃতিক নির্বাচনের সফল ইউনিটের অবশ্যই থাকতে হবে। গত অধ্যায়ের ভাষায়, সেগুলো হচ্ছে দীর্ঘায়ু, উর্বরতা ও নিজের সঠিক অনুলিপি করার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা। আমরা তারপর একটি বড় ইউনিট হিসাবে ‘জিনকে’ সংজ্ঞায়িত করতে পারি, যার অন্ততপক্ষে এই সব গুণাবলী থাকার থাকার সম্ভাবনা আছে। কোনো একটি জিন হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা একটি অনুলিপনকারী, এবং বহু অনুলিপি রুপে সেটি বিদ্যমান। অবশ্যই অসীমভাবে দীর্ঘায়ু নয়, এমনকি একটি হীরকখণ্ডও আক্ষরিক অর্থে চিরস্থায়ী নয় এবং এমন কি একটি সিসট্রোনও ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত হতে পারে। জিনকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে ক্রোমোজোমের টুকরো হিসাবে, যা যথেষ্ট পরিমানে ক্ষুদ্র এবং যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ সময় ধরে যার টিকে থাকার সম্ভাবনা আছে, যেন সেটি প্রাকৃতিক নির্বাচনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইউনিট হিসাবে কাজ করে।

কিন্তু কত দীর্ঘ সময় আসলে যথেষ্ট দীর্ঘ সময়’? এই প্রশ্নের কোনো ধরাবাধা উত্তর নেই। এটি নির্ভর করবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপটি কত শক্তিশালী। অর্থাৎ, একটি ‘ভালো’ অ্যালিলের তুলনায় একটি ‘খারাপ’ জেনেটিক ইউনিট ধ্বংস হয়ে যাবার কতটা বেশী সম্ভাবনা আছে। এটি হচ্ছে গুণবাচক একটি বিষয়, যা উদাহরণ থেকে উদাহরণ ভিন্নতা প্রদর্শন করে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক একক– জিন– সাধারণত অবস্থান করে সিসট্রোন আর ক্রোমোজোমের মাঝামাঝি কোনো মাত্রায়।

এই সম্ভাবনাময় অমরত্বের বৈশিষ্ট্যটাই হচ্ছে কোনো একটি জিনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক হিসাবে দাবী করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী একটি কারণ। এখন এই ‘পোটেনশিয়াল’ বা সম্ভাবনাময় শব্দটির উপর জোর দেবার সময় এসেছে। কোনো একটি জিন এক মিলিয়ন বছর বছর বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু অনেক নতুন জিন তাদের প্রথম প্রজন্মই পার হতে পারেনা। অল্প কিছু নতুন জিন সেটি করতে সফল হয় তার কারণ আংশিকভাবে তাদের ভাগ্য ভালো, কিন্তু মূলত তাদের সেই সব বৈশিষ্ট্য আছে যা থাকা দরকার, এবং এর অর্থ হলো তারা সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার শরীর যন্ত্রগুলো তৈরীতে দক্ষ। প্রত্যেকটি ধারাবাহিকভাবে আসা শরীরের জণগত বিকাশে তাদের একটি প্রভাব আছে, অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জিন বা অ্যালিলের সমরুপ প্রভাবের তুলনায় যে শরীরগুলোয় তারা বাস করে যেন সেই শরীরটি খানিকটা বেশী বেঁচে থাকে ও প্রজনন সফল হয়। যেমন একটি “ভালো’ জিন হয়তো, একে পর এক আসা যে শরীরে সে বাস করে, এর টিকে থাকা নিশ্চিৎ করে সেই শরীরে দীর্ঘ পা সৃষ্টি করতে সাহায্য করে, দৌড়াবার দক্ষতা বাড়িয়ে যে পাগুলো সেই শরীরকে শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

এটি একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ তবে সর্বজনীন নয়। লম্বা পা, আর যাই হোক, সব সময় উপকারে নাও আসতে পারে। কোনো একটি মোল ইঁদুরের জন্য এটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা; নানা বিস্তারিত খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা মত্র না করে বরং আমরা কি ভাবতে পারি এমন কোনো বিশ্বজনীন গুণাবলী যা আমরা আশা করবো যে কেন ভালো (যেমন দীর্ঘায়ু) জিনে? এর বীপরিতার্থে, কি সেই গুণাবলী যা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জিনকে চিহ্নিত করে ‘বাজে’ বা ‘স্বল্পায়ু’ জিন হিসাবে? এধরনের বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্য বেশ কয়েক ধরনেরই হতে পারে। কিন্তু একটি আছে, যা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এই বইটির জন্য: জিন পর্যায়ে, পরার্থবাদীতা অবশ্যই খারাপ এবং স্বার্থপরতা অবশ্যই ভালো। অনতিক্রম্য এই ধারণাটি আসে আমাদের প্রস্তাবিত পরার্থবাদীতা ও স্বার্থপরতার সংজ্ঞানুযায়ী। জিনরা টিকে থাকার জন্য তাদের বিকল্প সংস্করণ বা অ্যালিলদের সাথে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যখন তাদের অ্যালিলগুলো জিনপুলে ভবিষ্যত প্রজন্মেগুলোয় ক্রোমোজোমের একই জায়গা বা স্পটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। যেকোনো একটি জিন যা কিনা জিন পুলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালিলকে হটিয়ে তার নিজের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে এভাবে আচরণ করে, সেই জিনটির, সংজ্ঞানুযায়ী, যৌক্তিকভাবেই টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকবে। জিন হচ্ছে স্বার্থপরতার মৌলিক একক।

এই অধ্যায়ের মূল বার্তাটি এখন বলা হয়ে গেছে, কিন্তু আমি কিছু জটিলতা আর গোপন পূর্বধারণা আলোচনায় এড়িয়ে গেছি। প্রথম সমস্যাটি এর আগে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজন্মান্তরে তাদের যাত্রায় জিনদের যতই স্বাধীন আর মুক্ত মনে হোক না কেন, তারা ভ্রূণ বিকাশের উপর তাদের আরোপিত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আসলে খুব বেশী ‘স্বাধীন আর মুক্ত নয়। ব্যাখ্যাতীত অত্যন্ত জটিল নানা উপায়ে তারা পারস্পরিক সহযোগিতা ও তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে। লম্বা পায়ের জন্য জিন’ বা ‘পরার্থবাদী আচরণের জন্য জিন’, এমন অভিব্যক্তিগুলো আসলে ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করার অর্থেই সুবিধাজনক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বুঝতে হবে সেটি হচ্ছে, এই অভিব্যক্তিগুলো আসলে কি বোঝাচ্ছে। এমন কোনো জিন নেই যা কিনা একাই একটি পা তৈরী করতে পারে, লম্বা কিংবা খাটো। পা তৈরী করার মত কোনো কাজ হচ্ছে বহু জিন নির্ভর সমবায়ী সম্মিলিত একটি উদ্যোগ। বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবও সেখানে অপরিহার্য। সর্বোপরি পা আসলে তৈরী হচ্ছে খাদ্য দিয়ে! কিন্তু আসলেই সেখানে এমন কোনো একক জিনও থাকতে পারে, যে জিনটি আর সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, তার বিকল্প অ্যালিলের প্রভাবে পা যতটা লম্বা হতো তার চেয়ে দীর্ঘতর পা তৈরী করতে পারে। একটি তুলনামূলক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, জমিতে ব্যবহার করা সারের কথা ভাবুন, যেমন, গমের বৃদ্ধির উপর নাইট্রেটের প্রভাব। প্রত্যেকেই জানেন, অনুপস্থিতির তুলনায়, নাইট্রেটের উপস্থিতিতেই বরং গম গাছ আকারে অনেক দ্রুত বাড়ে। কিন্তু একটি গম গাছ বানাতে শুধুমাত্র নাইট্রেটেরই ক্ষমতা আছে, এমন কোনো দাবী করার মত কেউ খুব বোকা নয়। সেই কাজটি করতে বীজ, মাটি, সূর্য, পানি ও নানা ধরনের খনিজ অবশ্যই সব একান্ত প্রয়োজনীয়, কিন্তু এই সব অন্য শর্তগুলো যদি অপরিবর্তিত থাকে এবং এমনকি যদি তারা একটি সীমার মধ্যে পরিবর্তিত হবার অনুমতিও পায়, যদি গমের ক্ষেতে নাইট্রেট যোগ করা হয় তাহলে গম গাছ আকারে অনেক বড় হয়। এবং ভ্রূণবিকাশের প্রক্রিয়ায় একক জিন যেভাবে তার প্রভাব ফেলার চেষ্টা করে ঠিক একই রকম ঘটে। যে পরস্পরসংবদ্ধ সম্পর্কের বিস্তৃত জালের মত প্রক্রিয়াটি দ্বারা ভ্রূণবিকাশ নিয়ন্ত্রিত হয় সেটি এত বেশী জটিল যে, আমাদের জন্য আপাতত সেটি চিন্তা না করাই উত্তম হবে। একটি শিশুর যেকোনো একটি অংশের একক কারণ হিসাবে জিনগত বা পরিবেশ নির্ভর কোনো পূর্বশর্ত নেই যা কিনা বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো শিশুর সব অংশের প্রায় অসীম সংখ্যক পূর্ববর্তী কারণ আছে। কিন্তু একটি শিশু থেকে অন্য কোনো একটি শিশুর মধ্যে পার্থক্য, যেমন, পায়ের দৈর্ঘের পার্থক্য, খুব সহজেই অনুসরণ করা সম্ভব হবে একটি, কিংবা অল্প কিছু পূর্ববর্তী কারণের প্রতি, এর পরিবেশনতুবা এর জিনে। আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সংগ্রামে এই পার্থক্যগুলোই টিকে থাকার জন্যে জরুরী এবং জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত পার্থক্যগুলোই বিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো একটি জিনের জন্যে এর অ্যালিল হচ্ছে ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু অন্য জিনরাও এর পরিবেশের একটি অংশ, তাপমাত্রা, খাদ্য, শিকারী প্রাণী অথবা সঙ্গীদের মতই। কোন জিনের প্রভাব কি হবে সেটি নির্ভর করে এর পরিবেশের উপর এবং সেখানে অন্যান্য জিনরাও অন্তর্ভুক্ত। কখনো কখনো কোনো একটি জিন প্রভাব ফেলতে পারে, নির্দিষ্ট অন্য একটি জিনের উপস্থিতিতে, এবং হয়তো এর সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো প্রভাব আছে অন্য আরেক সেট সঙ্গী জিনের উপস্থিতিতে। একটি শরীরের পুরো সেট জিন একধরনের জিনগত পরিবেশ বা প্রেক্ষাপট গঠন করে, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট জিনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন করতে পারে।

কিন্তু এখন আমরা একটি ধাঁধার সম্মুখীন হয়েছি, কোনো একটি শিশু তৈরী করা যদি এত বেশী বিস্তারিত, সূক্ষ্ম আর জটিল সামগ্রিক প্রচেষ্টা হয়ে থাকে এবং প্রতিটি জিনের যদি আরো কয়েক হাজার সঙ্গী জিনের সাহায্য দরকার হয় তার কাজটি শেষ করার জন্য, তাহলে আমার বর্ণিত অবিভাজ্য জিনের ধারণার সাথে কিভাবে আমরা এই বিষয়টির সামঞ্জস্য করতে পারি, যে জিনগুলো অমর ‘শামোয়া’ হরিণের মত এক শরীর থেকে লাফিয়ে অন্য আরেকটি শরীরে যুগের পর যুগ টিকে থাকে: জীবনের সেই স্বাধীন, বন্ধনমুক্ত স্বার্থপর এজেন্টটি? এসবই কি তাহলে অর্থহীন পুরোপুরি? মোটেও না, আমি হয়তো একটু বেশী আলঙ্কারিক বর্ণনায় নিজেকে প্রসঙ্গচ্যুত করে ফেলেছিলাম, কিন্তু আমি অর্থহীন কিছু বলিনি এবং আসলেই এখানে কোনো সত্যিকারের ধাঁধা নেই। আমরা আরো একটি তুলনামূলক উদাহরণ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করতে পারি।

একজন নৌকাচালকের একক প্রচেষ্টায় অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় জেতা অসম্ভব। তার সাথে দাঁড় টানার জন্য আরো আট জন সহকর্মীর দরকার হয়। যারা প্রত্যেকেই বিশেষজ্ঞ, নৌকার একটি নির্দিষ্ট স্থানে তারা সবসময় বসেন– বোবা স্ট্রোক বা কক্স ইত্যাদি। নৌকা বাওয়া একটি সম্মিলিত উদ্যোগ, কিন্তু কিছু মানুষ তাসত্ত্বেও অন্যদের চেয়ে এই কাজটিতে বেশী দক্ষ। ধরুন একজন কোচ বেশ কিছু সম্ভাব্য প্রার্থী থেকে তার আদর্শ নৌকা বাইচ দলটি নির্বাচন করবেন, কেউ বিশেষজ্ঞ হয়তো ‘বো’ অবস্থানে, অন্য কেউ ভালো ‘কক্স’ হিসাবে ইত্যাদি। ধরুন সে তার নির্বাচনটি করছে একরমভাবে, প্রতিদিন তিনি তিনজন করে নতুন পরীক্ষামূলক সদস্য বাছাই করেন, ইচ্ছামত নানা বিন্যাসে প্রতিটি অবস্থানের জন্য প্রার্থীদের জায়গা অদল বদল করে, তিনি তিনটি দলকে একে অপরের সাথে পরীক্ষামূলক একটি প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন। এভাবে কয়েক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে দেখা যাবে যে প্রতিবারই যে নৌকাটা জিতছে, সেটি চালিয়েছে একই সদস্যদের নিয়ে তৈরী একটি দল। তাদের চিহ্নিত করা হয় ভালো নৌকা চালক হিসাবে। অন্যান্য সদস্যরা দেখা যাবে প্রতিবারই তারা স্বল্পগতির টীমের সাথেই আছে, এবং অবশেষে টীম থেকে বাদ দেয়া হয় তাদের। কিন্তু এমনকি কখনো অসাধারণ কোনো নৌকা চালাতে পারে এমন কেউ ধীর গতি টীমেও থাকতে পারে, হয়তো তার অন্যান্য দলীয় সদস্যদের দুর্বলতার কারণে কিংবা শুধুমাত্র খারাপ ভাগ্যের জন্য– ধরুন, বীপারতমুখী প্রতিকুল বাতাস। শুধুমাত্র ‘গড়পড়তা’ সেরা নৌকা চালকরা বিজয়ী নৌকাটিতে থাকে।

নৌকা চালকরা হচ্ছে জিন; নৌকায় প্রতিটি সীটের জন্য প্রতিদ্বন্দিরা হচ্ছে অ্যালিল, ক্রোমোজোমের একই জায়গা দখল করার জন্যে যাদের সম্ভাবনাময় যোগ্যতা আছে। দ্রুত নৌকা চালানোর ক্ষমতার এই উদাহরণের সাথে এমন ধরনের শরীর তৈরী করার সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যারা টিকে থাকার জন্য সফল। বাতাস হচ্ছে। বাইরের পরিবেশ, এবং পানি পূর্ণ পুলটি হচ্ছে জিন পুলের বিকল্প দাবিদার। যতদুর কোনো একটি শরীরের টিকে থাকার প্রশ্ন, সব জিনই একই নৌকায় আসীন। অনেক ভালো জিন খারাপ সঙ্গী পায় এবং এমন কোনো জিনের সাথে তারা নিজেদের আবিষ্কার করে, শরীরের জন্যে যারা ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক হতে পারে, যারা শৈশবেই শরীরকে হত্যা করে, তখন ভালো জিনটিও সেই খারাপ জিনের সাথেই হারিয়ে যায়। কিন্তু এটি একটি মাত্র শরীর এবং একই ভালো জিনের অনুলিপি অন্য শরীরেও বাস করে যার সেই ক্ষতিকর প্রাণনাশী জিনটি নেই। ভালো জিনের বহু কপি হারিয়ে যায় কারণ তারা ঘটনাচক্রে ক্ষতিকর কোনো জিনের সাথে শরীরে বাস করে বা আরো নানা ধরনের দুর্ভাগ্যের কারণে তারা হারিয়ে যায়, যেমন, ধরুন হয়তো তাদের শরীর বজ্রাহত হলো। কিন্তু ভাগ্য এর সংজ্ঞানুযায়ী, খারাপ কিংবা ভালো, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই আঘাত হানতে পারে এবং একটি জিন যেটি সারাক্ষণই পরাজিত পক্ষে থাকে, সেটি দুর্ভাগা কোনো জিন নয়, এটি একটি খারাপ জিন।

ভালো নৌকা বাইচ দলের কোনো সদস্যের একটি গুণ অবশ্যই ‘টিমওয়ার্ক’, অন্যদের সাথে একটি একক দল হিসাবে কাজের সমন্বয় করতে পারার দক্ষতা, বাকী সদস্যদের সাথে সহজেই সহযোগিতা আর খাপ খাইয়ে নেবার যোগ্যতা। এটি হয়তো শক্তিশালী মাংসপেশী থাকার মতই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রজাপতির ক্ষেত্রে আমরা যেমন দেখেছি, প্রাকৃতিক নির্বাচন তার নৈর্ব্যক্তিক অচেতন প্রক্রিয়া, যা কোনো একটি জিন কমপ্লেক্সকে ‘সম্পাদিত’ করে ইনভারশন বা ক্রোমোজোমের টুকরো অংশকে ব্যাপক নাড়াচাড়া করার মাধ্যমে। যার ফলে সেই জিনগুলো কাছাকাছি চলে আসে যারা পরস্পরের সাথে ভালো সহযোগিতা করতে পারে, এবং খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত কোনো গ্রুপ হিসাবে কাজ করে। কিন্তু আরো একটি অর্থ আছে, যেখানে জিনরা, যারা কোনোভাবে পরস্পরের সাথে শারীরিকভাবে যুক্ত নয় তবে তারা নির্বাচিত হতে পারে তাদের পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ উপযোগিতার কারণে। একটি জিন যা অন্য সব জিনের সাথে ভালোভাবে সহযোগিতা করে, ধারাবাহিকভাবে আসা শরীরে যাদের সাথে তাদের দেখা হয়, যেমন, বাকী পুরো জিনপুলে থাকা অন্য সব জিনদের সাথে, তাদের বাড়তি সুবিধা পাবার প্রবণতা আছে।

যেমন, বেশ কিছু উপযোগী বৈশিষ্ট্য আছে যারা দক্ষ কোনো মাংসাশী প্রাণীর শরীরে কাঙ্খিত, তাদের মধ্যে যেমন আছে কোনো কিছু কাটার উপযোগী ধারালো তীক্ষ্ম দাঁত, মাংস পরিপাক করার জন্যে সঠিক ধরনের আন্ত্রিক নালী এবং আরো অনেক কিছু। একটি দক্ষ তৃণভোজী প্রাণীর অন্যদিকে প্রয়োজন চ্যাপটা, পিষ্ট করার উপযোগী দাঁত এবং অনেক লম্বা আন্ত্রিক নালী, এবং ভিন্ন ধরনের পরিপাক উপযোগী রসায়ন। কোনো একটি তৃণভোজী প্রাণীদের জিন পুলে, যদি এমন কোনো জিনের উদ্ভব হয়, যারা এর বাহককে ধারালো মাংস কাটার উপযোগী কোনো দাঁত দেয়, তারা খুব বেশী সফল হবেনা। এর কারণ কিন্তু এই না যে মাংস খাওয়া সার্বিকভাবে একটা খারাপ ধারণা, বরং যেহেতু কেউ ভালোভাবে মাংস খেতে পারবে না, যদি না তার সঠিক ধরনের আন্ত্রিক নালী না থাকে এবং মাংসাশী প্রাণী হিসাবে জীবন কাটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য গুণাবলীও থাকে। ধারালো, মাংস খাওয়ার উপযোগী দাঁত এমনিতে সহজাতভাবে খারাপ কোনো জিন নয়। তবে তারা শুধুমাত্র খারাপ জিন হয় এমন কোনো জিন পুলে, যেখানে তৃণভোজী বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিকারী জিনরা প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।

এটি বেশ সূক্ষ্ম আর জটিল একটি ধারণা। এটি জটিল কারণ কোনো একটি জিনের পরিবেশ মূলত গঠিত হয় অন্য অনেক জিনদের দ্বারা, যাদের প্রত্যেকটি এর নিজস্ব পরিবেশে অন্যান্য জিনদের সাথে এর সহযোগিতা করার যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে নিজেই নির্বাচিত হয়। এই সূক্ষ্ম বিষয়টির সাথে তুলনামূলক একটি উদাহরণ আমাদের হাতে আছে, কিন্তু এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। এই রুপক উদাহরণটি মানুষের ‘গেম থিওরী’ সংক্রান্ত, অধ্যায় ৫ এ একক প্রাণীদের মধ্যে বিদ্যমান আগ্রাসী প্রতিতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার সময় যা আমি আলোচনার জন্যে উপস্থাপন করবো। সুতরাং পরে অধ্যায়ের শেষাংশ অবধি আমি এই বিষয়ে কোনো আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখছি, এবং এই অধ্যায়ের মূল বার্তাটিতে আবার ফিরে আসি। সেটি হচ্ছে যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মৌলিক একক হিসাবে প্রজাতিকে গন্য করা ঠিক হবে না, তেমনি কোনো গ্রুপ বা জনগোষ্ঠীর কথা, এমনকি প্রজাতির একক সদস্যদেরও তেমন কিছু ভাবা সঠিক হবেনা, বরং এই একক হিসাবে কাজ করতে পারে খুব ক্ষুদ্র জিনগত উপাদান, যাকে ‘জিন’ হিসাবে সুবিধাজনকভাবে আমরা ডাকতে পারি।

এই যুক্তির মূল বক্তব্যটি হচ্ছে– এর আগেও যা উল্লেখ করা হয়েছে।– সেই ধারণাটি, জিনের অমর হবার সম্ভাবনা আছে, যখন কিনা এদের বাহক শরীরগুলো এবং এর চেয়ে উচ্চ কোনো এককগুলো আসলেই চিরস্থায়ী হতে পারেনা। আর এই ধারণাটি দুটি বাস্তব সত্যের উপর নির্ভর করে আছে: যৌন প্রজনন আর ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়ার বাস্তব সত্য এবং একক সদস্যদের মরণশীলতা। এই বাস্তবতাটি অনস্বীকার্যভাবেই সত্যি। কিন্তু বিষয়টি আমাদের সেই প্রশ্নগুলো উত্থাপন করতে বাধা দেয় না, যেমন, কেন তারা সত্য? কেন আমরা এবং অন্য সব টিকে থাকার বা সারভাইভাল মেশিনগুলো যৌন প্রজনন করি? কেন আমাদের ক্রোমোজোমে ‘ক্রসিং ওভার’ প্রক্রিয়াটি ঘটে? কেন আমরা চিরকাল বেঁচে থাকি না?

বৃদ্ধ বয়সে কেন আমরা মারা যাই এই প্রশ্নটি একটি জটিল প্রশ্ন এবং এর বিস্তারিত বিষয়গুলো এই বইয়ের আলোচনা করার সুযোগের বাইরে। সুনির্দিষ্ট কারণগুলো ছাড়াও, আরো কিছু সাধারণ কারণও প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন, একটি তত্ত্ব বলছে, জরা বা বার্ধক্য আসলে কোনো একক জীব সদস্যের জীবদ্দশায় ডিএনএ অনুলিপন প্রক্রিয়ায় ঘটা পুঞ্জীভূত হওয়া সব ক্ষতিকর ভুল ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্থ জিনের প্রতিনিধিত্ব করে। স্যার পিটার মেদাওয়ারের (৭) প্রস্তাবিত অপর একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, জিন নির্বাচনের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি দেখার ক্ষেত্রে বেশ ভালো একটি উদাহরণ (৮); মেদাওয়ারই প্রথম প্রচলিত সেই যুক্তিগুলো খণ্ডন করেছিলেন, যেমন, ‘প্রজাতির বাকী সদস্যদের প্রতি পরার্থবাদী একটি কর্ম হিসাবে বদ্ধ সদস্যরা মারা যায়, কারণ যদি তারা বেঁচে থাকে, প্রজননক্ষম হবার জন্যে তারা যথেষ্ট পরিমানে জরাগ্রস্থ হয়ে থাকে। কোনো ভালো কারণ ছাড়া তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খল ভীড় সৃষ্টি করবে। যেমন, মেদাওয়ার উল্লেখ করেছিলেন, এটি হচ্ছে একটি আবদ্ধ যুক্তি, ধরে নেয়া হয়েছে, এটি শুরু থেকেই প্রমাণ করতে চেয়েছে, তাদের জরাগ্রস্থতার জন্য বৃদ্ধ জীবরা প্রজননক্ষম নয়। এছাড়াও এটি সেই গ্রুপ-সিলেকশন বা প্রজাতি-সিলেকশনের সরল ধরনের একটি ব্যাখ্যা, যদি সেই অংশটি নতুন করে আরো খানিকটা সম্মানজনক উপায়ে বলা যেতে পারে। মেদাওয়ারের নিজের তত্ত্বে ছিল সুন্দর একটি যুক্তি। আমরা এভাবে সেই যুক্তিটি গড়ে তুলতে পারি:

আমরা ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোনো একটি ভালো জিনের সবচেয়ে সাধারণতম বৈশিষ্ট্য কি হতে পারে। এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, স্বার্থপরতা সেই গুণাবলীর একটি। কিন্তু কোনো সফল জিনের আরো একটি সাধারণ গুণ থাকে, সেটি হচ্ছে। প্রজনন শেষ না হওয়া অবধি এর সারভাইভাল মেশিনের মৃত্যুকে স্থগিত করা। কোনো সন্দেহ নেই আপনার কিছু আত্মীয় এবং কিছু চাচা বা মামা শৈশবে মারা গিয়েছিল, কিন্তু আপনার কোনো পূর্বসূরি শৈশবে মারা যাননি, পূর্বসূরি অল্প বয়সে মারা যেতেই পারে না!

কোনো জিন, যে কিনা এর বাহককে মেরে ফেলে তাকে বলা হয় প্রাণঘাতী একটি জিন। একটি আংশিক-প্রাণঘাতী জিন কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যেমন, এটি অন্যান্য কারণে মৃত্যু হবার সম্ভাবনা আরো বেশী বাড়িয়ে দেয়। একটি জিন শরীরের উপর তার সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলে জীবনের নির্দিষ্ট একটি পর্যায়ে, এবং প্রাণঘাতী কিংবা আংশিক-প্রাণঘাতী জিনগুলো এর ব্যতিক্রম নয়। বেশীর ভাগ জিন তাদের প্রভাব খাটায় ভ্রূণ অবস্থায় এবং অন্যান্যরা শৈশবে, অন্যরা প্রাপ্তবয়স্কতার প্রারম্ভেই, কোনোটি মধ্যবয়সে এবং আরো কিছু অন্য জিন কাজ করে বার্ধক্যে (ভাবুন একটি শুয়োপোকা আর যে প্রজাপতিতে তারা রূপান্তরিত হয়,তাদের ঠিক একই সেট জিন থাকে); অবশ্যই প্রাণঘাতী জিনরা জিন পুল থেকে ক্রমশ অপসারিত হতে থাকে, কিন্তু একই সাথে স্পষ্টতই জীবনের শুরুর দিকে কাজ করা কোনো প্রাণঘাতী জিন অপেক্ষা, পরে কাজ করে এমন একটি প্রাণঘাতী জিন কোনো জিন পুলে বেশী স্থিতিশীল হবে। বৃদ্ধ শরীরে কোনো প্রাণঘাতী জিন হয়তো তারপরও জিনপুলে সফলভাবে টিকে থাকে, শুধুমাত্র শর্ত হচ্ছে তার সেই প্রাণঘাতী প্রভাবটি প্রদর্শিত হয়না যতক্ষণ না কোনো না কোনোভাবে প্রজনন করতে শরীরের কিছুটা সময় থাকে। যেমন, একটি জিন, যা কোনো বৃদ্ধ শরীরে ক্যান্সারের কারণ সেটি বহুসংখ্যক উত্তরসূরিদের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করতে পারে কারণ সেই জিনটির বাহক সদস্যটি তার শরীরে ক্যান্সার হবার আগেই প্রজনন করবে। অন্যদিকে, একটি জিন যা কোনো তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক শরীরে ক্যান্সারের কারণ হয়, সেটি বেশী সংখ্যক উত্তরসূরিদের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে না এবং কোনো জিন যা কোনো শিশুর শরীরে প্রাণঘাতী ক্যান্সারের কারণ হয় সেটি কোনো উত্তরসূরিদের মধ্যেই বিস্তার লাভ করবে না। এই তত্ত্বানুযায়ী, জিনপুলে জমা হওয়া আর পরবর্তীতে সক্রিয় হতে পারে শুধুমাত্র এমন প্রাণঘাতী ও আংশিক প্রাণঘাতী জিনই জরা বা বার্ধক্যজনিত ক্ষয়ের কারণ। শুধুমাত্র তারা জীবনের শেষাংশে কাজ করে বলে যে জিনগুলোকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফাঁদ গলে বেরিয়ে যাবার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

যে বিষয়টির উপর মেদাওয়ার নিজেই জোর দিয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে। যে, নির্বাচন সেই সব জিনদের সুবিধা দেয় যারা অন্যান্য প্রাণঘাতী জিনগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠাটিকে স্থগিত করে রাখে, এটি আরো বিশেষভাবে সুবিধা দেয় সেই জিনগুলোকে, যারা “ভালো’ জিনগুলো যেন দ্রুত তাদের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়টিকে তরান্বিত করে। বিবর্তন অনেকটুকুই জিনের কর্মকাণ্ড শুরু হবার সময়ে জিন নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনগুলোর সমষ্টি হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির দিকে লক্ষ রাখতে হবে সেটি হচ্ছে, প্রজনন ঘটছে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বয়সে, এই তত্ত্বটির এমন কোনো পূর্বধারণার প্রয়োজন নেই। শুরুতেই যদি আমরা এমন কোনো ধারণা গ্রহন করে নেই যে, যেকোনো বয়সে সন্তানের জন্ম দেবার জন্যে প্রত্যেকেরই সমান সম্ভাবনা থাকবে। মেদাওয়ারের তত্ত্বটি খুব দ্রুত ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে যে, জিন পুলে শেষের দিকে সক্রিয় হওয়া ক্ষতিকারক জিনগুলো পুঞ্জীভূত হবে, এবং বার্ধক্যে প্রজনন কম করার বিষয়টি এরই পরোক্ষ পরিণতিতে ঘটে।

একটি পার্শ্ব বিষয় হিসাবে, এই তত্ত্বটির অন্যতম একটি ভালো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি আমাদের বরং আরো কিছু কৌতূহলোদ্দীপক ধারণার দিকে মনোযোগ নির্দেশ করে। যেমন, এখান থেকে আমরা এমন একটি ধারণা পেতে পারি, যদি আমরা মানুষরা আমাদের জীবনকাল বাড়াতে চাই, দুটি সাধারণ উপায় আছে সেটি আমরা করতে পারি। প্রথমত, আমরা একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে প্রজননের নিষিদ্ধ করতে পারি, ধরুন, চল্লিশ বছর বয়সের আগে। কয়েক শতাব্দী পর সর্বনিম্ন বয়সসীমা বেড়ে হবে পঞ্চাশ এবং এভাবে আরো বাড়বে। ভাবা খুবই সম্ভব যে মানুষের দীর্ঘায়ু এভাবে বেশ কয়েক শতাব্দী আরো বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব। কোনো পরিস্থিতিতেই আমরা অবশ্য কল্পনা করতে পারিনা এমন কোনো নীতিমালা বাস্তবিকভাবে আরোপ করা সম্ভব হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জিনদের বোকা বানাতে আমরা চেষ্টা করতে পারি, যেন তারা ভাবে যে শরীরে তারা বাস করছে সেটি আসলে যতটা বয়স হয়েছে, এটি তার চেয়ে তরুণ। ব্যবহারিক পর্যায়ে এর মানে হচ্ছে শরীরের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক পরিবেশে সেই পরিবর্তনটি চিহ্নিত করা, যা বার্ধক্য হবার প্রক্রিয়ার সাথে ঘটে। এর যে কোনোটি শেষের দিকে কাজ করে এমন ক্ষতিকর জিনগুলোকে সক্রিয় হয়ে ওঠার জন্যে ‘ইঙ্গিত’ হতে পারে। কোনো একটি তরুণ শরীরের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মত পরিবেশ সৃষ্টি করে শেষের দিকে কাজ করা ক্ষতিকর জিনগুলোকে সক্রিয়া হওয়া স্থগিত রাখা সম্ভব হতে পারে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হচ্ছে বার্ধক্যের সেই রাসায়নিক সংকেতগুলো কিন্তু সাধারণ অর্থে নিজেরাই ক্ষতিকর হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; যেমন, ধরুন ঘটনাচক্রে আমরা দেখতে পেলাম, বাস্তব একটি সত্য হচ্ছে ‘পদার্থ এস’ বয়স্ক সদস্যদের শরীরে যে পরিমান ঘনত্বে থাকে, তার চেয়ে অনেক কম পরিমানে থাকে তরুণদের মধ্যে। এস পদার্থটি’ নিজে ক্ষতিকর নয়, হয়তো খাদ্যের কোনো উপাদান যা আমাদের শরীরে সময়ের সাথে জমা হয়। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে, কোনো জিন, যা কিনা ঘটনাচক্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এই ‘পদার্থ এস’ এর উপস্থিতিতে, কিন্তু এর অনুপস্থিতিতে এটি কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না বরং ভালো প্রভাব ফেলে, এমন কোনো জিন জিন পুলে ইতিবাচকভাবে নির্বাচিত হবে এবং আসলেই এটি হবে বৃদ্ধ বয়সে মারা যাওয়ার জন্য জিন। এর চিকিৎসা হবে শুধুমাত্র ‘পদার্থ এস’কে শরীর থেকে সরিয়ে ফেলা।

এই ধারণাটির বৈপ্লবিক দিক হচ্ছে যে ‘পদার্থ এস’ নিজে বৃদ্ধ বয়সের শুধুমাত্র একটি লেবেল’। কোনো ডাক্তার যিনি রোগীর শরীরের উচ্চামাত্রায় এর উপস্থিতি মৃত্যুর কারণ হিসাবে লক্ষ করবেন, তিনি সম্ভবত ভাববেন,’পদার্থ এস’ হয়তো একটি বিষ এবং তিনি সারাক্ষণই ভাবতে থাকবেন, কিভাবে ‘পদার্থ এস’ এর সাথে শরীরের বিকল হয়ে যাবার একটি যোগসূত্র তিনি খুঁজে বের করবেন। কিন্তু আমাদের এই হাইপোথেটিকাল উদাহরণে তিনি হয়তো তার সময় নষ্ট করবেন!

আরো একটি পদার্থ হয়তো থাকতে পারে, ‘পদার্থ ওয়াই’, যা তারুণ্যের ‘লেবেল’, এই অর্থে যে বৃদ্ধ বয়সের তুলনায় অল্প বয়সে শরীরেএটির মাত্রা বেশী থাকে। আবারো সেই সব জিনগুলো হয়তো নির্বাচিত হবে যারা ভালো প্রভাব ফেলে ‘ওয়াই’ এর উপস্থিতিতে, এবং যার অনুপস্থিতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এস’ ও ‘ওয়াই’ কি সেটি জানার কোনো উপায় ছাড়াই– আরো বহু রাসায়নিক পদার্থে উপস্থিতি থাকতে পারে। আমরা শুধুমাত্র সাধারণ একটি ভবিষ্যদ্বাণী করবো যত বেশী বদ্ধ শরীরে আমরা অনুকরণ প্রণোদনা দেবো তরুণ বয়সের শরীরের কোনো গুণাবলীকে, সেই গুণাবলী যতই উপরি বৈশিষ্ট্য মনে হোক না কেন, বৃদ্ধ শরীর ততই দীর্ঘ সময় বাঁচবে।

মেদাওয়ারের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে আমি অবশ্যই গুরুত্বারোপ করবো যে এগুলো শুধুমাত্র আনুমানিক কিছু ধারণা। যদি একটি অর্থে যেখানে মেদাওয়ার তত্ত্ব যৌক্তিকভাবে অবশ্যই কিছু সত্য এর মধ্যে ধারণ করে, তবে এর অর্থ এই না যে, কিভাবে বার্ধক্য ও জরায় আমরা আক্রান্ত হই, কোনো একটি ব্যবহারিক উদাহরণের ক্ষেত্রে, এটাই সঠিক কোনো ব্যাখ্যা। বর্তমান আলোচনার উদ্দেশ্যে যেটা সত্যি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে বৃদ্ধ হলে প্রজাতিদের সদস্যদের মারা যাবার প্রবণতাটি ব্যাখ্যা করতে বিবর্তনের জিন নির্বাচন কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো সমস্যা হবেনা। কোন একক সদস্যের মরণশীলতার ধারণা, যা এই অধ্যায়ে আমাদের যুক্তির কেন্দ্রে অবস্থিত, সেটি এই তত্ত্বের ব্যাখ্যার কাঠামোতে যুক্তিযুক্ত।

আরেকটি যে ধারণা আমি হালকাভাবে আলোচনা করেছিলাম, সেটি হচ্ছে যৌন প্রজনন আর ক্রসিং ওভারের অস্তিত্ব, আর সেটি ব্যাখ্যা দেয়া বরং আরো কঠিন। সবসময়ই ক্রসিং ওভার হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পুরুষ ফুট ফ্লাইরা সেটি করে না। এই প্রজাতির স্ত্রী সদস্যের একটি জিন আছে যা এই ‘ক্রসিং ওভার’ যেন না হয় সেটি লক্ষ করে। আমরা যদি এমন কোনো মাছি জনগোষ্ঠীকে প্রজনন করানোর চেষ্টা করি, যাদের মধ্যে এই জিনটি সর্বজনীন, তাহলে ক্রোমোজোম পুলে একটি ক্রোমোজোম প্রাকৃতিক নির্বাচনের অবিভাজ্য একক হবে। বাস্তবিকভাবে যদি আমরা আমাদের সংজ্ঞাটির যৌক্তিক উপসংহার বরাবর অনুসরণ করতে পারি, একটি পুরো ক্রোমোজোমকে তখন একটি ‘জিন’ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।

কিন্তু আবার, যৌন প্রজননের বিকল্পেরও অস্তিত্ব আছে। স্ত্রী গ্রিনফ্লাইরা জীবন্ত, পিতৃহীন, স্ত্রী সন্তানদের জন্ম দিতে পারে, যাদের প্রত্যেকেই তাদের মায়ের সব জিনগুলো ধারণ করে। (ঘটনাচক্রে কোনো একটি মায়ের গর্ভে’ কোনো ভ্রূণের হয়তো আরো একটি ক্ষুদ্র ভ্রূণ থাকে তার নিজের গর্ভের ভিতর। সুতরাং একটি স্ত্রী গ্রিনফ্লাই এমন কোনো কন্যা এবং নাতনীর একসাথে জন্ম দিতে পারে, যারা দুজনই তার হুবহু জমজ)। অনেক উদ্ভিদ প্রজনন করে অঙ্গজ জননের মাধ্যমে, যেমন, সাকার বা চোষকদের ছড়িয়ে দিয়ে। এই ক্ষেত্রে আমরা হয়তো, প্রজননের বদলে ‘বৃদ্ধি পায় এমনভাবে বলতে পছন্দ করবো। কিন্তু তারপরও, যদি আপনি বিষয়টি নিয়ে ভাবেন, মূলত বৃদ্ধি আর অযৌন প্রজননের মধ্যে সেখানে খুব সামান্য পার্থক্য আছে। কারণ দুটোই ঘটছে মাইটোটিক কোষ বিভাজনের মাধ্যমে। কখনো উদ্ভিদরা অঙ্গজ জননের মাধ্যমে প্রজনন করে এবং তারপর সেই বাড়তি অংশটি তাদের পিতামাতা সদৃশ মূল বৃক্ষটি থেকে পৃথক হয়ে যায়। অন্যান্য ক্ষেত্রে, যেমন, এলম গাছ, তাদের সংযুক্ত সাকার বা চোষকটি অপরিবর্তিত থাকে। আসলেই পুরো এলম জঙ্গলকে একক একটি সদস্য মনে করা যেতে পারে।

সুতরাং প্রশ্নটি হচ্ছে: যদি গ্রিনফ্লাইরা আর এলম গাছ কাজটি না করে, তাহলে বাকী সবাই আমরা কেন এতটাই পরিশ্রম করি, আমাদের সন্তান তৈরীর আগে অন্য কারো জিনের সাথে আমাদের জিনের মিশ্রণ করানোর জন্য? মনে হতে পারে একটি অদ্ভুত পথ বেছে নিতে হচ্ছে। কেন তাহলে যৌন প্রজনন, সরাসরি অনুলিপি তৈরী করার প্রক্রিয়াটির সেই অদ্ভুত বিকৃতি, কেনই বা বিবর্তিত হয়েছিল? যৌন প্রজননের উপকারিতাটি কি (৯)?

এটি বিবর্তনবাদীদের পক্ষে উত্তর দেবার জন্যে খুবই কঠিন একটি প্রশ্ন। এর উত্তর দেবার জন্য বেশীরভাগ গুরুতর প্রচেষ্টার সাথে গাণিতিক যুক্তি প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্টতা আছে। একটি কথা বলা ছাড়া আমি সরাসরি এই বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাবো। সেটি হচ্ছে যৌন প্রজননের বিবর্তন ব্যাখ্যা করার জন্য অন্ততপক্ষে কিছু সমস্যা যা তাত্ত্বিকরা মুখোমুখি হন সেগুলো সূচনা হয়েছিল সেই বাস্তব সত্যটি থেকে, তারা স্বভাবজাতভাবেই মনে করেন একক সদস্যরা যারা টিকে থাকে তারা তাদের জিন সংখ্যা বাড়াতে চেষ্টা করে, আর এই শর্তানুযায়ী, যৌন প্রজনন আসলেই আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী, কারণ এটি একক সদস্যের জন্যে তার জিন টিকিয়ে রাখার একটি অদক্ষ উপায়: প্রতি শিশুর মাত্র ৫০ শতাংশ জিন আসে কোনো একটি সদস্য থেকে, বাকী ৫০ শতাংশ আসে তার যৌন সঙ্গী থেকে। শুধু যদি গ্রিনফ্লাইয়ের মত, তারা সরাসরি সন্তানের জন্ম দিতে পারতো, যারা তার হুবহু অনুলিপি, সেক্ষেত্রে পুরো ১০০ শতাংশ জিনই পরবর্তী প্রজন্মের সকল সন্তানে মধ্যে থাকার নিশ্চয়তা থাকতো। আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী এই বিষয়টি বেশ কিছু তাত্ত্বিককে গ্রুপ সিলেকশনবাদকে গ্রহন করে নিতে সহায়তা করেছে, যেহেতু যৌন প্রজননের একটি গ্রুপ-স্তরের সুবিধার কথা ভাবা অপেক্ষাকৃত সহজ, যেমন ডাব, এফ, বোদমার চমৎকার সংক্ষিপ্ত ভাবে প্রকাশ করেছিলেন, যৌন প্রজনন –’কোন একটি একক ব্যক্তির শরীরে সুবিধাজনক মিউটেশনগুলো পুঞ্জীভূত করার প্রক্রিয়াটিকে সহায়তা করে, যে মিউটেশনগুলো ভিন্ন ভিন্ন একক সদস্যদের শরীরের উদ্ভব হয়েছিল।

কিন্তু এই আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী বিষয়টি অপেক্ষাকৃত কম সত্যবর্জিত মনে হয়, যদি আমরা এই বইয়ের যুক্তিটি অনুসরণ করি এবং কোনো একক সদস্যকে একটি সারভাইভাল মেশিন হিসাবে ভাবি, যে মেশিনটি দীর্ঘায়ু জিনদের স্বল্পস্থায়ী একটি সহযোগিতার মাধ্যমে তৈরী করেছে। অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয় হিসাবে পুরো একক কোনো সদস্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা দক্ষতা বা এফিসিয়েন্সি ব্যাপারটি দেখতে পারি। যৌন বা অযৌন বিষয়টিকে গণ্য করা যেতে পারে একটি একক জিনের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো বৈশিষ্ট্য হিসাবে, ঠিক যেমন নীল চোখ বনাম বাদামী চোখ। যৌনতার জন্য কোনো জিন অন্য সেই সব জিনদের তাদের নিজেদের স্বার্থপর উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে প্রভাবিত করবে, একই কাজ করবে মাইওসিস কোষ বিভাজনের সময় ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়াটির জন্যে দায়ী একটি জিন। এমনকি এমনও জিন আছে, যাদের মিউটেটর বলা হয়– যারা অন্য জিনের অনুলিপি হবার সময় কি পরিমান ভুল (কপিইং এরর রেট) হবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। সংজ্ঞা মোতাবেক, কপিইং এরর বা অনুলিপন প্রক্রিয়ার সময় কোনো ভুল হলে যে জিনটির ভুল অনুলিপি হচ্ছে তার জন্যে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্তু স্বার্থপর মিউটেটর জিনের জন্যে যদি সেটি সুবিধাজনক হয়, তাহলে মিউটেটর জিনটি জনগোষ্ঠীর জিন পুলে বিস্তার লাভ করতে পারে। একই ভাবে ক্রসিং ওভার যদি কোনো একটি জিনকে ক্রসিং ওভার করলে কোনো সুবিধা দেয়, তাহলে সেটিই ক্রসিং ওভার জিনের অস্তিত্বের জন্যে একটি সন্তোষজক ব্যাখ্যা। এবং অযৌন প্রজননের ব্যতিক্রম, যদি যৌন প্রজনন কোনো জিনকে সুবিধা দেয় যৌন প্রজননে, যৌন প্রজননের অস্তিত্বের জন্য সেটাই যথেষ্ট একটি ব্যাখ্যা। প্রজাতির কোনো একক সদস্যের বাকী সব জিনকে এটি কোনো সুবিধা দিক বা না দিক সেটি তুলনামূলকভাবে গৌণ একটি বিষয়। স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, যৌন প্রজনন আসলেই অদ্ভুত কোনো বিষয় না।

খুব আশঙ্কাপূর্ণভাবে উপরের যুক্তিটি প্রায় আবদ্ধ কোনো যুক্তির কাছাকাছি পৌঁছায়, যেহেতু যৌন প্রজননের অস্তিত্বই এই ধারাবাহিক যুক্তি প্রক্রিয়াটির অগ্রসর হবার একটি পূর্বশর্ত, যা নির্বাচনের একক হিসাবে ‘জিনকে’ বিবেচনা করার বিষয়টিতে আমাদের নিয়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি, এই আবদ্ধ যুক্তি থেকে পালাবার পথ আছে, কিন্তু এই বইটি সেই প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা করার জায়গা নয়। যৌন প্রজননের অস্তিত্ব আছে, সেটুকু সত্যি। যৌন প্রজনন আর ক্রসিং ওভারের পরিণতি হচ্ছে, সেই ক্ষুদ্র জেনেটিক ইউনিট বা জিনদের আমরা গণ্য করতে পারি এমন কিছু যেটি তার বৈশিষ্ট্যাবলীতে বিবর্তনের মৌলিক আর স্বাধীন এজেন্টের সবচেয়ে নিকটবর্তী কিছু হতে পেরেছে।

যৌন প্রজনন শুধুমাত্র আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী বা প্যারাডক্সই নয়, যা অনেক কম ধাঁধা মনে হয় যে মুহূর্তে আমরা স্বার্থপর জিনের ধারণায় চিন্তা করতে শিখি। যেমন, একটি জীবের শরীরে ডিএনএর পরিমান তার ঠিক যতুটুকু লাগবে অর্থাৎ সেই জীবটি তৈরী করার জন্য জন্য যতটুকু দরকার, তার চেয়েও বেশী দরকার হয়: ডিএনএ এর বিশাল অংশ প্রোটিন অনু তৈরী হবার মাধ্যমে কখনোই অনূদিত হয় না। কেবলমাত্র কোনো এটি একক জীব সদস্যর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি ধাঁধা মনে হয়। যদি ডিএনএর উদ্দেশ্য কিংবা লক্ষ্য হয় শরীর কিভাবে তৈরী হবে সেটি তত্ত্বাবধান করা, ডিএনএ এর বিশাল একটি অংশ এধরনের কোনো কাজ করে না, সেটি যখন আমরা দেখতে পাই আসলেই অবাক হতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই বাড়তি ডিএনএ আসলে কোনো উপযোগী কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট কিনা বিষয়টি বোঝার জন্যে জীববিজ্ঞানীরা সব ধরনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি আদৌ কোনো প্যারাডক্স নয়। ডিএরএ এর সত্যিকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে টিকে থাকা, কমও না বেশী না। এই বাড়তি ডিএনএর উপস্থিতি ব্যাখ্যা করার সরলতম উপায় হচ্ছে এমন কিছু মনে করা যে, এটি পরজীবি বা বড়জোর কোনো নিরীহ, ক্ষতি করেনা, তবে কোনো উপকারেও আসেনা এমন কোন যাত্রী, যারা ডিএনএ অন্য অংশ দিয়ে তৈরী সারভাইভাল মেশিনে জায়গা করে নেয় কোনো কিছু না করার বিনিময়েই (১০)।

কেউ কেউ অবশ্য এর বিরোধীতা করেন, কারণ তাদের দৃষ্টিতে তারা। যা দেখেন, সেটি হচ্ছে বিবর্তনের অতিমাত্রায় জিন-কেন্দ্রিক একটি দৃষ্টিভঙ্গি। সর্বোপরি, তারা তর্ক করেন, পুরো একটি জীব সদস্য, তাদের সব জিন নিয়ে আসলেই বাঁচে অথবা মারা যায়। আমার মনে হয় এই অধ্যায়ে আমি যথেষ্ট বলেছি, যা প্রদর্শন করেছে যে আসলেই এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। ঠিক যেমন একটি পুরো নৌকা প্রতিযোগিতায় জিততে পারে অথবা হারতে পারে, আসলেই কোনো একক সদস্য বাঁচে অথবা মারা যায় এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের তাৎক্ষণিক প্রকাশ পায় সবসময়ই একক সদস্য পর্যায়ে। কিন্তু নন র‍্যানডোম সদস্যদের মৃত্যু এবং প্রজনন সাফল্যের দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাবটি প্রকাশ পায় জিন পুলে জিনের উপস্থিতির হারের তারতম্য ঘটিয়ে। কিছু সীমাবদ্ধতাসহ আধুনিক অনুলিপনকারী অণুদের প্রতিটি জিন পুল একই দায়িত্ব পালন করে, যেমন করে আদিম সেই সুপ মূল অনুলিপনকারীদের সাথে করেছিল। সুপটির আধুনিক সমতুল্য রুপটির তরলত্ব সংরক্ষিত করার ক্ষেত্রে যৌন প্রজনন ও ক্রোমোজোমের ক্রসিং ওভার প্রক্রিয়ার একটি প্রভাব আছে। কারণ যৌন প্রজনন ও ক্রোমোজোমের ক্রসিং ওভারের কারণে জিন পুল যথেষ্ট পরিমান মিশ্রণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে এবং জিনগুলো আংশিকভাবে রদবদল হয়। বিবর্তন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছু জিনের হার বেড়ে যায় এবং অপেক্ষাকৃতভাবে অন্যদের পরিমান কমে যায়। সুতরাং ভালো হবে যদি আমরা অভ্যাস করে নিতে পারি একটি প্রশ্ন করার, যখনই আমরা কোনো বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন, যেমন পরার্থবাদী আচরণ, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি: জিন পুলে জিনদের উপস্থিতির হারের উপর এই বৈশিষ্ট্যটির কি প্রভাব আছে? কখনো কখনো, জিনের ভাষা কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে এবং সংক্ষিপ্ততা আর প্রাণবন্ততা জন্য আমরা মেটাফর বা রুপকের আশ্রয় নেবো। কিন্তু আমরা সবসময়ই আমাদের সংশয়বাদী চোখ রাখবো আমাদের রুপগুলোর উপর, নিশ্চিৎ করার জন্য যে, যদি প্রয়োজন পড়ে তাদের যেন জিনের ভাষায় পুনরায় অনূদিত করা যেতে পারে।

যতক্ষণ জিন আলোচনার বিষয়, জিনপুল হচ্ছে শুধু আরেকটি নতুন ধরনের সুপ বা মিশ্রণ যেখানে তাদের বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হয়। যা বদলেছে সেটি হচ্ছে এখন এটি তার জীবন ধারণ করে ধারাবাহিকভাবে জিন পুল থেকে আসা সঙ্গী জিন গুচ্ছদের সাথে সহযোগিতা করার মাধ্যমে, যারা তাদের জন্য ধারাবাহিকভাবে মরনশীল সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার যন্ত্র তৈরী করে। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে এই সব সারভাইভাল মেশিন, এবং সেই অর্থে, যেখানে বলা যেতে পারে জিনরা তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে, সেই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের আলোচনার দিক পরিবর্তন করবো।

নোটস (অধ্যায় ৩)

(১) নেমাটোড প্রজাতিটির নাম Panagrellus redivivus, বহু আগেই চিহ্নিত হয়েছিল এই স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারা খুবই ক্ষুদ্র নেমাটোড বা রাউণ্ড ওয়ার্মটি, যা মাইক্রোওয়ার্ম নামে পরিচিত। ১৯১৪ সালে নাথান কব মন্তব্য করেছলিনে যে এটি শুধুমাত্র সার্বক্ষণিকভাবে ভেজা ফেল্ট ম্যাটের উপর পাওয়া যায়, যে ম্যাটের উপর সাধারণত জার্মানরা তাদের বিয়ারের মগ রাখে। ১৯২১ সালে আরো বেশ কিছু জায়গায় এদের সন্ধান মেলে। কিন্তু কবের বিয়ার ম্যাট সংক্রান্ত উদ্ধৃতি প্রায়শই বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ব্যবহৃত হয়েছে, সেকারণে এটি ‘বিয়ার ম্যাট’ নেমাটোড নামে পরিচিত।

(২) আলেক্সান্ডার গ্রাহাম কেয়ার্নস-স্মিথ (জন্ম ১৯৩১) জৈব রসায়নবিদ এবং আণবিক জীববিজ্ঞানী। বিশেষভাবে পরিচিত ১৯৮৫ সালে তার প্রকাশিত বিতর্কিত Seven Clues to the Origin of Life বইয়ের জন্য। বইটি মূলত ষাটের দশক থেকে তার গবেষণা করা একটি হাইপোথিসিসে জনপ্রিয়করণ– স্ব-অনুলিপন করতে সক্ষম ক্লে- ক্রিস্টালরা কোনো দ্রবণে হয়তো অজৈব কোনো পদার্থ থেকে জৈব জীবনের অন্তবর্তীকালীন পর্যায়ের সেই সরল ধাপটি সৃষ্টি করেছিল।

(৩) ডাবল হেলিক্স হচ্ছে যখন কোনো কিছু এমন একটি ত্রিমাত্রিক রুপ নেয়, যেন কোনো কোন (মোচাকৃতি) বা সিলিন্ডারের উপরে একটি স্তরে সুসমভাবে পেঁচানো তার, যেমন কোনো কর্ক স্ট্র অথবা সর্পিলকার সিঁড়ির ক্ষেত্রে দেখি।

(৪) এখানে এবং (মূল বইয়ের) ১১০-১৩ পৃষ্ঠা হচ্ছে জেনেটিক ‘অ্যাটোমিজম’ সংক্রান্ত সমালোচকদের বিরুদ্ধে আমার উত্তর। খুব কঠোর একটি রুপে এটি মূলত একটি আকাঙ্খ, উত্তর না, কারণ এটি সমালোচনার আগেই লেখা হয়েছে! আমি দুঃখিত, নিজের উদ্ধৃতিগুলো এখানে পুরোপুরিভাবে উদ্ধৃত করা জরুরী হয়ে পড়বে, কিন্তু দ্য সেলফিশ জিনের প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদগুলো উদ্বিগ্ন করার মত খুব সহজ চোখে না পড়ার মতই মনে হয়। যেমন, Caring Groups and Selfish Genes 9 (The Panda’s Thumb বইটিতে), স্টিফেন জে, গুল্ড বলেছিলেন,

‘এমন কোন জিন নেই যা সুস্পষ্টভাবে কোনো বাহ্যিক প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্যের একাংশের জন্য দায়ী, যেমন, আপনার বা পায়ের হাটুর মালা বা প্যাটেল কিংবা আপনার নোখ। নানা খণ্ডাংশে শরীরকে এভাবে আণবিকীকরণ করা যায়না, যা কিনা তৈরী করে কোনো একটি একক জিন। শত শত জিন অবদান রাখে শরীরের বেশীর ভাগ অংশ তৈরীতে ..

গুল্ড এটি লিখেছিলেন দ্য সেলফিশ জিন এর সমালোচনায়। কিন্তু এখন আমার মূল কথাগুলো পড়ুন (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৩০):

একটি শরীর তৈরীর প্রক্রিয়া এতটাই সূক্ষ্ম জটিল সমবায়ী একটি উদ্যোগ, সেই উদ্যোগে কোনো একটি জিনের অবদান অন্য কোনো জিনের অবদান থেকে পৃথক করা প্রায় অসম্ভব। একটি জিনের হয়তো অনেকগুলো পৃথক পৃথক প্রভাব থাকতে পারে শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশে। শরীরের যেকোনো একটি জায়গা প্রভাবিত হয় বহু জিনের কর্মকাণ্ডে এবং কোনো একটি জিনের প্রভাব নির্ভর করে আরো অনেকগুলো জিনের সাথে তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার উপর।

এবং আবারো (পৃষ্ঠা ৪৬, মূল বইয়ের):

‘তবে জিনদের যতই স্বাধীন আর মুক্ত মনে হোক না কেন এই প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে তাদের যাত্রায়, তারা ভ্রূণ বিকাশের উপর তাদের আরোপিত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আসলে খুব বেশী স্বাধীন আর মুক্ত ‘নয়। তারা পারস্পরিক সহযোগিতা ও তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে ব্যাখ্যাতীত অত্যন্ত জটিল নানা উপায়ে। ‘লম্বা পায়ের জন্য জিন’ বা ‘পরার্থবাদী আচরণের জন্য জিন’, এমন অভিব্যক্তিগুলো আসলে সুবিধাজনকভাবে ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করার অর্থেই বলা হয়, কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বুঝতে হবে সেটি হচ্ছে, এই অভিব্যক্তিগুলো আসলে কি বোঝাচ্ছে। এমন কোনো জিন নেই যা কিনা একাই একটি পা তৈরী করতে পারে, লম্বা কিংবা খাটো। পা তৈরী করার মত কোনো কাজ হচ্ছে বহু জিন নির্ভর সমবায়ী সম্মিলিত একটি উদ্যোগ। বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবও সেখানে অপরিহার্য। সর্বোপরি পা আসলে তৈরী হচ্ছে খাদ্য দিয়ে! কিন্তু আসলেই সেখানে এমন কোনো একক জিনও থাকতে পারে, যে জিনটি আর সব কিছু অপরিবর্তিত থাকলে, তার বিকল্প অ্যালিলের প্রভাবে পা যতটা লম্বা হতো তার চেয়ে দীর্ঘতর পা তৈরী করতে পারে।

আমি বিষয়টি আরো বিস্তারিত করেছিলাম আমার পরবর্তী অনুচ্ছেদে গমের উপর সারের প্রভাব সংক্রান্ত তুলনামূলক একটি উদাহরণ ব্যবহার করে। মনে হতে পারে যেন গুল্ড অত্যন্ত নিশ্চিৎ, আগে থেকেই যে, আমি অতি সরল কোনো অ্যাটোমিষ্ট, আর সেকারণে বিস্তারিত অনুচ্ছেদটি তিনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন যেখানে আমি ঠিক সেই পারস্পরিক ক্রিয়-প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ করেছি, যার উপর তিনি জোর দিয়েছেন।

গুল্ড সেখানে আরো বলেছিলেন:

‘ডকিন্সের অন্য কোনো রুপকের প্রয়োজন পড়বে: জিনদের সংঘবদ্ধ হওয়া, সহযোগিতার জন্য জোট বাধা, কোনো গ্রুপে যোগ দেবার সুযোগের প্রতি সম্মান দেখানো, সম্ভাব্য পরিবেশের নানা উপাদান পরিমাপ করা।

আমার নৌকা চালানোর সমরুপ উদাহরণটিতে (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ১১০-১২) ইতিমধ্যে আমি ঠিক সেই কাজটি করেছি যা গুল্ড এখানে করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই নৌকা চালানোর অনুচ্ছেদটি ভালো করে লক্ষ করুন, কেন গুল্ড, যদিও আমরা অনেক বিষয়ে একমত পোষণ করি, এখানে ভুল এমন কোনো দাবী করার ক্ষেত্রে যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন ‘গ্রহন বা বর্জন করে পুরো জীবকে কারণ নানা অংশ, জটিল উপায়ে নিজেদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করার মাধ্যমে উপযোগিতা বা সুবিধা প্রদান করে। জিনদের এই সহযোগিতা করার প্রবণতার সত্যিকারের ব্যাখ্যা হচ্ছে:

জিনরা নির্বাচিত হয়, এই কারণে না যে তারা এককভাবে ‘ভালো’, বরং জিনপুলে অন্যান্য জিনের উপস্থিতিতে তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারে সেই অর্থে ভালো। একটি ভালো জিনকে অন্যান্য জিনগুলোর সাথে অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ, সম্পূরক হতে হবে যাদের সাথে এটি ধারাবাহিকভাবে বহুশীর ভাগাভাগি করে সময়ের সুদীর্ঘ পরিক্রমায়। (পৃষ্ঠা ১১০, মূল বই)

আমি জেনেটিক অ্যাটোমিজম সংক্রান্ত সমালোচনার আরো বিস্তারিত একটি প্রত্যুত্তর লিখেছিলাম The Extended Phenotype, বইটিতে, বিশেষ করে পৃষ্ঠা ১১৬-১৭ এবং ২৩৯-৪৭ এ।

(৫) Adaptation and Natural Selection বইটিতে উইলিয়ামসের হুবহু শব্দগুলো হচ্ছে: আমি “জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেছি বোঝাতে, যা বিচ্ছিন্ন আর পুনসংযুক্ত হয় পরিমাপযোগ্য উচ্চহারে’ .. একটি জিনকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে, যেকোনো বংশগতির তথ্য হিসাবে যার জন্য একটি অনুকূল অথবা প্রতিকূল নির্বাচনী পক্ষপাতিত্ব আছে যা এর অন্তর্জনিষ্ণু পরিবর্তন হারের সমান থেকে বেশ কয়েক বা বহু গুণের সমান।

উইলিয়ামসের বইটি এখন বেশ সুপরিচিত এবং ব্যাপকভাবে এবং সত্যিকারভাবে একটি ধ্রুপদী রচনা হিসাবে যা বিবেচিত হয়, যা শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে ‘সোসিওবায়োলজিস্ট’ ও ‘সোসিওবায়োলজীর’ সমালোচক উভয় পক্ষের।

আমার মনে হয় এটি স্পষ্ট, উইলিয়ামস কখনোই নিজেকে এমন ব্যক্তি ভাবেননি, যিনি নতুন কিছু বা বৈপ্লবিক কোনো কিছুর পক্ষে ওকালতী করছে তার জিন নির্বাচনবাদ বা সিলেকশনিজম ধারণা দিয়ে এবং আমিও তার চেয়ে বেশী কিছু করেছি বলে মনে করিনি, ১৯৭৬ সালে। আমরা দুজনেই ভেবেছিলাম আমরা শুধুমাত্র ফিশার, হলডেন ও রাইটের মৌলিক নীতিগুলো পুনর্ব্যক্ত করছি, যারা ১৯৩০ এর দশকে নব্য-ডারউইনবাদের প্রতিষ্ঠাতা পিতা ছিলেন। যাইহোক, হয়তো আমাদের অনমনীয় ভাষার কারণে, কিছু মানুষ, এমনকি সিওয়াল রাইট নিজেও, আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচনের একক হচ্ছে জিন’ এই দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মূল কারণটি হচ্ছে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন পুরো জীবদের দেখছে, সেই জীবের মধ্যে ধারণ করা জিনদের নয়। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি, যেমন, রাইটের, আমার উত্তর আছে দি এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপ বইটিতে, বিশেষ করে পৃষ্ঠা ২৩৮-৪৭ এ। নির্বাচনের একক হিসাবে জিন প্রশ্নে উইলিয়ামসের সবচেয়ে সাম্প্রতিকতম ধারণা, পাওয়া যাবে তার ‘ Defense of Reductionism in Evolutionary Biology বইটিতে, সেটি তার আর সব বইয়ের মতই অত্যন্ত গভীর এবং মর্মস্পর্শী। কিছু দার্শনিক যেমন ডি, এইচ, হাল, কে, স্টেরেলনী এবং পি. কিচার এবং এম, হাম্প এবং এস, আর, মর্গানও সম্প্রতি নির্বাচনের একক বিষয়টি স্পষ্ট করে তাদের উপযোগী অবদান রেখেছেন। দুঃখজনকভাবে, আরো অনেক দার্শনিক আছেন, যারা ব্যাপারটি আরো সংশায়চ্ছন্ন করেছেন।

(৬) উইলিয়ামসকে অনুসরণ করে, আমি আমার মাইওসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় খণ্ডিতকরণের প্রভাব সংক্রান্ত যুক্তিটি উপস্থাপন করেছি, যেখানে একক কোনো সদস্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের অনুলিপনকারীর ভূমিকা পালন করতে পারেনা। আমি এখন দেখতে পাচ্ছি এটি আসলে মূল কাহিনীর অর্ধেক মাত্র। এর বাকী অংশ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে দি এক্সটেন্ডেড টাইপ (পৃষ্ঠা ৯৭-৯৯) বইয়ে এবং আমার প্রবন্ধ Replicators and Vehicles এ। মাইওসিসের এই খণ্ডিত করার প্রভাব যদি পুরো কাহিনী হতো, তাহলে অযৌন উপায়ে প্রজনন করা কোনো প্রাণী যেমন, স্ত্রী স্টিক ইনসেক্টরা হতো সত্যিকারের অনুলিপনকারী, এক ধরনের দানবীয় জিনের মত। কিন্তু যদি কোনোভাবে একটি স্টিক ইনসেক্টের শরীরে কোনো পরিবর্তন হয়– ধরুন সে তার একটি পা হারিয়ে ফেললো সেই পরিবর্তনটি পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবে না, শুধু জিনরাই পারে একটি প্রজন্ম থেকে অন্য একটি প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবার জন্য, প্রজনন যৌন বা অযৌন, যাই হোক না কেন। সে কারণে জিনরা আসলেই অনুলিপনকারী। অযৌন স্টিক ইনসেক্টদের ক্ষেত্রে, তাদের পুরো জীনোম (এর পুরো সেট জিন) হচ্ছে একটি অনুলিপনকারী। কিন্তু স্টিক ইনসেক্ট নিজে তা নয়। কোনো একটি স্টিক ইনসেক্টের শরীর আগের প্রজন্মের শরীরের ছাঁচে হুবহু অনুলিপি হিসাবে তৈরী হয় না। কোনো একটি প্রজন্মে শরীর গড়ে ওঠে ডিম থেকে নুতন করে, এর পুরো জিনোম বা জিনগত সংকেতের নির্দেশনায়, যে জিনোমটি এর আগের প্রজন্মের জিনোমের একটি অনুলিপি।

এই বইটি সব ছাপা সংখ্যাই একে অপরের সদৃশ হবে, তার অনুলিপি, তবে অনুলিপিকারক করা। তারা অনুলিপি কারণ তারা একে অপরের অনুলিপি নয়, বরং তারা অনুলিপি কারণ একই প্রিন্টিং প্লেট থেকে তারা সবাই এসেছে। তারা অনুলিপির কোনো বংশধারা তৈরী করে না যে কোনো বই অন্য একটি বইয়ের পূর্বসূরি। অনুলিপির বংশধারার অস্তিত্ব হতে পারে যদি আমরা বইয়ের কোনো একটি পাতার ফটোকপি করি, তারপর সেই ফটোকপির আবার ফটোকপি করি, ফটোকপির ফটোকপির ফটোকপি করে,এভাবে চলতে থাকবে। পৃষ্ঠাদের এই বংশধারায়, সেখানেই আসলেই পূর্বসূরি-উত্তরসূরি সম্পর্ক আমরা দেখবো। কোনো একটি দাগ এই ধারার কোনো একটি জায়গায় উদ্ভব হলে, সেই দাগটি সকল উত্তরসূরিরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে, কোনো পূর্বসূরি সেটি পাবে না। একটি পূর্বসূরি/উত্তরসূরি ধারাবাহিক এই ধরনের সম্পর্কের বিবর্তিত হবার সকল সম্ভাবনা আছে।

উপরিভাবে, স্টিক ইনসেক্টদের ধারাবাহিক প্রজন্মগুলোয় আপাতদৃষ্টিতে শরীর অনুলিপিদের একটি বংশধারার রুপ নেয়। কিন্তু যদি আপনি সেই বংশধারায় কোন একটি সদস্যকে পরীক্ষামূলকভাবে পরিবর্তন করেন (যেমন তার একটি পা কেটে সরিয়ে নেন), সেই পরিবর্তনটি কিন্তু সেই বংশধারায় পরবর্তী উত্তরসূরিরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে না। বরং এর ব্যতিক্রম, যদি আপনি পরীক্ষামূলকভাবে সেই বংশধারায় কোন একটি সদস্যদের জিনোমকে বদলে দেন ( যেমন, এক্স-রে ব্যবহার করে, সেই পরিবর্তনটি তার বংশধারায় পরবর্তী উত্তরসূরিদের মধ্যে হস্তান্তরিত হবে; এটাই, মাইওসিসে এর খণ্ডিতকরণ প্রভাব ছাড়াই, মূল কারণ এমন কিছু বলা যে, কোনো একক জীব সদস্য নির্বাচনের একক হতে পারে না– এবং তারা সত্যিকারের অনুলিপিকারকও না। এটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত বাস্তব সেই সত্যটি যে “লামার্কিয় উত্তরাধিকারের তত্ত্বটি মিথ্যা’ তারই গুরুত্বপূর্ণ পরিণতির একটি।

(৭) স্যার পিটার ব্রায়ান মেদাওয়ার (১৯১৫-১৯৮৭) ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী। অঙ্গ প্রতিস্থাপন গ্রাফট রিজেকশন এবং অ্যাকোয়াড ইমিউন টলারেন্স এর বিষয়ে তার মৌলিক গবেষণা অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিষয়টি সম্ভব করেছে।

(৮) আমাকে কঠোরভাবেই তিরস্কার করা হয়েছে (অবশ্যই উইলিয়াম নিজে নন বা তাদের জানামতেও না) এই বার্ধক্য সংক্রান্ত তত্ত্বটির কৃতিত্ব, জি সি উইলিয়ামসের বদলে পি. বি. মেডাওয়ারকে দেবার জন্য। এটি সত্যি যে অনেক জীববিজ্ঞানী, বিশেষ করে আমেরিকায়, এই তত্ত্বটি সম্বন্ধে জেনেছেন মূলত ১৯৫৭ সালে লেখা উইলিয়ামস এর Pleiotropy, Natural Selection, and the Evolution of Senescence শীর্ষক একটি প্রবন্ধ থেকে। আরো সত্যি যে, মেডাওয়ার যা বলেছিলেন, উইলিয়ামস এই তত্ত্বটি নিয়ে আরো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছিলেন। তবে যাই হোক আমার নিজের বিবেচনা বলছে যে, মেডাওয়ারই প্রথম এই ধারণাটির কেন্দ্রীয় যুক্তিটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, ১৯৫২ সালে তার An Unsolved Problem in Biology এবং ১৯৫৭ সালে The Uniqueness of the individual বইয়ে। আমি যুক্ত করতে চাই যে তত্ত্বটি নিয়ে উইলিয়ামসের ব্যাখ্যা আসলেই খুব বোধগম্য, কারণ এটি এই যুক্তিতে একটি আবশ্যকীয় ধাপ, যা সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে (pleiotropy বা multiple gene effects এর গুরুত্ব) যা মেডাওয়ার যেমন সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি। সাম্প্রতিক সময়ে ডাবলিউ. ডি. হ্যামিলটন এই ধরনের তত্ত্বকে আরো খানিক সম্প্রসারণ করেছেন তার The Moulding of Senescence by Natural Selection শীর্ষক একটি প্রবন্ধে। ঘটনাচক্রে আমি অনেক উল্লেখযোগ্য চিঠি পেয়েছি ডাক্তারদের কাছ থেকে, কিন্তু আমার মনে হয় কেউই মন্তব্য করেননি আমার সেই অনুমান নির্ভর ‘fooling’ জিনের ধারণা নিয়ে, জিনগুলো যে শরীরে তারা বাস করে সেই শরীরের বয়স নিয়ে বোকা বানানো সংক্রান্ত ধারণা প্রসঙ্গে (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা৫৩-৪); ধারণাটি এখনও আমার কাছে খুব স্পষ্টভাবে অর্থহীন বলে মনে হয় না। আর যদি সেটি সঠিক হয়ে থাকে, এটি নিশ্চয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হবার কথা তাইনা?

(৯) যৌন প্রজনন কিসের জন্য ভালো সেই প্রশ্নটির সমস্যা আগের মতই এখনও আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে লোভনীয় একটি প্রস্তাবনা, যদিও বেশ কিছু ভাবনা উদ্রেক করার মত বই প্রকাশিত হয়েছে এই বিষয়ে, বিশেষ করে, এম, টি, গিশেলিন, জি, সি. উইলিয়ামস, জে, মেনার্ড স্মিথ এবং জি. বেল প্রমূর্খ লেখকদের লেখা, এছাড়া একটি খণ্ড, যা সম্পাদনা করেছেন আর. মিশেদ এবং বি. লেভিন। আমার মনে হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধারণাটি এসেছে ডাবলিউ. ডি. হ্যামিলটনের পরজীবি তত্ত্বটি থেকে, যা সাধারণ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছে জেরেমি শেফাস ও জন গ্রিবিন তাদের The Redundant Male বইটিতে।

(১০) (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ২৩৭ও দেখুন); বাড়তি, অনূদিত হয় না ডিএনএ-এর এমন অংশগুলো কোনো স্বার্থপর পরজীবি হতে পারে, আমার এমন ধারণাটি আরো বিস্তারিতভাবে গবেষণার বিষয় হিসাবে গ্রহন করেছেন আণবিক জীববিজ্ঞানীরা (ওরগেল এবং ক্রিক, ডুলিটল ও সাপিয়েনজার প্রবন্ধগুলো দেখতে পারেন) পরিচিত স্লোগান ‘Selfish DNA’ শিরোনামে। স্টিফেন. জে. গুল্ড তার Hen’s Teeth and Horse’s Toes বইটিতে একটি প্ররোচনামূলক প্রস্তাব (আমার প্রতি!) করেছিলেন, স্বার্থপর ডিএনএ ধারণাটি ঐতিহাসিক উৎস জানা সত্ত্বেও তিনি দাবী করেন, “স্বার্থপর জিন ও স্বার্থপর ডিএনএর তত্ত্বগুলো খুব বেশী আলাদা কিছু হতে পারে না তাদের লালনকারী ব্যাখ্যার কাঠামো ছাড়া। আমি এই যুক্তিটি ভ্রান্ত তবে আকর্ষণীয় মনে করি। ঘটনাচক্রে, তিনি আমাকে দয়া করে জানিয়েছিলেন, আমার ধারণাগুলো সম্বন্ধে সাধারণত তার অনুভূতিও একই রকম। রিডাকশনিজম’ এবং ‘হায়ারার্কি’ সংক্রান্ত কিছু প্রারম্ভিক আলোচনার পর (যা যথারীতি আমার ভুলও কিছু মনে হয়নি তেমন আকর্ষণীয় কিছু মনে হয়নি), তিনি আরো বলেন:

‘ডকিন্সের স্বার্থপর জিনের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পায় কারণ শরীরগুলোর উপরতাদের প্রভাব আছে, বেঁচে থাকার সংগ্রামে যা তাদের সহায়তা করে। স্বার্থপর ডিএনএ হারে বৃদ্ধি ঠিক এর বিপরীত কারণে– কারণ শরীরের উপর এর কোনো প্রভাবই নেই।

গুল্ড এখানে যে পার্থক্যটি করেছেন সেটি আমি দেখতে পারছি, কিন্তু আমি সেটাকে মৌলিক কোনো বিষয় হিসাবে দেখছি না। এর বিপরীত, আমি এখনও স্বার্থপর ডিএনএ কে দেখি, পুরো স্বার্থপর জিন তত্ত্বের একটি বিশেষ কেস হিসাবে, এবং ঠিক এভাবেই স্বার্থপর ডিএনএ ধারণাটির উদ্ভব হয়েছিল মূলত (এই বিষয়টি, যে স্বার্থপর ডিএনএ হচ্ছে বিশেষ কোনো কেস, হয়তো আরো বেশী স্পষ্ট এই বইয়ের ২৩৭ পৃষ্ঠায় (মূল বইয়ের)। ৫৭ পৃষ্ঠায় (মূল বইয়ে) উল্লেখিত অনুচ্ছেদ যা ডুলিটল ও সাপিয়েঞ্জা এবং ওরগেল ও ক্রিক উদ্ধৃত করেছিলেন, তার চেয়েও বেশী স্পষ্ট। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার ডুলিটল ও সাপিয়েঞ্জা তাদের লেখায় বরং selfish DNA এর পরিবর্তে selfish genes শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন); গুন্ডের সমালোচনার উত্তর দেবার জন্য আমাকে এই অনুরুপ উদাহরণটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হোক: যে জিনগুলো ওয়াস্প বা বোলতাদের হলুদ আর কালো ডোরা কাটা দাগের সৃষ্টি করে তার সংখ্যা বৃদ্ধি পায় কারণ এই ( সতর্কতামূলক) রঙের প্যাটার্নটি শক্তিশালীভাবে অন্যান্য প্রাণীদেও মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে, যে জিনগুলো বাঘদের শরীরে হলুদ কালো ডোরাকাটা দাগ সৃষ্টি করে সেটি তার সংখ্যায় বাড়ে ‘সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো কারণে’– কারণ আদর্শভাবে এই সব (ক্রিপ্টিক বা গোপন) রঙের সজ্জা অন্য কোনো প্রাণীদের মস্তিষ্ককে আদৌ উত্তেজিত করে না। আসলেই এখানে। একটি পার্থক্য আছে, যা খুবই সমরুপী গুন্ডের পাথর্কের সাথে (একটি ভিন্ন হায়ারার্কি বা প্রাধান্য পরম্পরার স্তরে!), কিন্তু শুধুমাত্র বিস্তারিত প্রেক্ষাপটে এটি খুব সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য। এমন কোনো কিছু দাবী করার সামান্যতম ইচ্ছা পোষণ করা আমাদের উচিৎ না যে, এই দুটি উদাহরণ, কোনোভাবে ভিন্ন হতে পারে না, সেই ব্যাখ্যার কাঠামোতে, যে ব্যাখ্যাটি এদের লালন করছে। ওরগেল ও ক্রিক সঠিক সেই জায়গাটিকে শনাক্ত করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন যখন তারা স্বার্থপর জিনের সাথে কোকিলের ডিমের তুলনা করেছিলেন। কোকিলের ডিম, সর্বোপরি, চোখ ফাঁকি দেয় পোষক পাখির ডিমের হুবহু রুপ ধারণ করে।

ঘটনাচক্রে, Oxford English Dictionary র সাম্প্রতিক সংস্করণে selfish শব্দটির একটি নতুন অর্থ তালিকাভুক্ত করেছে এভাবে, ‘কোনো একটি জিন বা জেনেটিক উপাদানের’: ‘যার চিরস্থায়ী হবার প্রবণতা আছে অথবা সেটি বিস্তার লাভ করে ফিনোটাইপের উপর কোনো প্রভাব না ফেলেই’। স্বার্থপর ডিএনএ’ র এটি আসলে চমৎকার একটি আটসাট সংজ্ঞা এবং দ্বিতীয় সহায়ক উদ্ধৃতিটি আসলেই স্বার্থপর ডিএনএ সংক্রান্ত। আমার মতে যদিও, শেষ বাক্যটি– যদিও ফিনোটাইপের উপরে কোনো প্রভাব ফেলে না– দুর্ভাগ্যজনক। স্বার্থপর জিনদের হয়তো ফিনোটাইপের উপর কোনো প্রভাব নাও থাকতে পারে, কিন্তু তাদের অনেকেরই প্রভাব থাকে। লেক্সিকোগ্রাফারদের জন্য বিষয়টি তাই উন্মুক্ত দাবী করার জন্য যে, তারা তাদের অর্থটা ‘স্বার্থপর ডিএনএ’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন, যাদের আসলেই ফিনোটাইপের উপর কোনো প্রভাব থাকেনা। কিন্তু তাদের প্রথম সাক্ষ্যমূলক উদ্ধৃতি, যেটি নেয়া হয়েছে The Selfish Gene থেকে, সেটি সেই সব স্বার্থপর জিনদের অন্তর্ভুক্ত করেছে যাদের ফিনোটাইপিক প্রভাব আছে। যদিও এটি আমি যা বোঝাতে চেয়েছি তার থেকে বহু দূরে, তাসত্ত্বেও অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারীতে উদ্ধৃত হবার সম্মানের প্রতি এটি সামান্য অভিযোগ মাত্র।

স্বার্থপর ডিএনএ নিয়ে আমি পরবর্তীতে আরো আলোচনা করেছি, The Extended Phenotype (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ১৫৬-১৬৪)।

০৪. জিন মেশিন

অধ্যায় ৪ : জিন মেশিন

সারভাইভাল মেশিন বা টিকে থাকার যন্ত্রগুলো তাদের যাত্রা শুরু করে জিনদের ধারণ করার জন্য একটি অক্রিয় আধার হিসাবে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে রাসায়নিক যুদ্ধ এবং দূর্ঘটনাজনিত আণবিক গোলাবর্ষণের ঘাত প্রতিঘাতের ধ্বংসলীলা থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য চারপাশে একটি দেয়ালের ব্যবস্থা করা ছাড়া শুরুর সেই টিকে থাকার যন্ত্রগুলো বেশী কিছু করেনি। শুরুর সেই দিনগুলোতে তারা আদিম সুপে সহজলভ্য নানা জৈব অণুগুলোকে খাদ্য হিসাবে গ্রহন করেছে। এই সহজ জীবন একসময় শেষ হয় যখন আদিম সুপে থাকা জৈব খাদ্য, যা খুব ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল বহু শতাব্দীর সূর্যের আলোর শক্তির প্রভাবে, সবই ব্যবহৃত হয়ে গিয়েছিল। টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর একটি প্রধান শাখা, যাদের আমরা উদ্ভিদ বলি, তারা নিজেরাই সাধারণ সরল অণু থেকে জটিল অণু সৃষ্টি করার জন্যে সরাসরি সূর্যের আলো ব্যবহার করতে শুরু করেছিল, সেই প্রাচীন সুপের সংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটির পুনমঞ্চস্থ করে, তবে এবার সেই প্রক্রিয়াটি বহু দ্রুতগতিতে ঘটে। আরেকটি শাখা, যারা প্রাণী হিসাবে এখন পরিচিত, তারা ‘আবিষ্কার করেছিল কিভাবে উদ্ভিদদের এই রাসায়নিক শ্রমটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়, হয় তাদের খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে অথবা অন্য প্রাণীদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে। টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর প্রধান দুটি শাখার প্রতিটিতে বিচিত্র জীবনাচরণে তাদের দক্ষতা বাড়াতে ক্রমবর্ধমান হারে আরো বেশী উদ্ভাবনী কৌশল বিবর্তিত হয়েছিল এবং সেই সাথেই জীবন যাপনের নতুন উপায়গুলো নিরন্তরভাবেই সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছিল। উপশাখা এবং উপ-উপ-শাখারা বিবর্তিত হয়েছে। জীবনধারণের জন্য প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট বিশেষায়িত উপায়ে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে: সাগরে, মাটিতে, বাতাসে, মাটির নীচে, গাছে এবং অন্যান্য জীবিত শরীরের অভ্যন্তরে। এই উপ-শাখা-প্রশাখাগুলো জন্ম দিয়েছে সুবিশাল এই জীববৈচিত্র্য, আমাদের আজ যা বিসিত আর মুগ্ধ করে।

বহু কোষী শরীরের জীব হিসাবে প্রাণী এবং উদ্ভিদরা বিবর্তিত হয়েছে, প্রতিটি কোষে জিনদের সম্পূর্ণ কপি বন্টন করা হয়েছে। আমাদের জানা নেই কখন, কেন অথবা স্বতন্ত্রভাবে কত বার এটি ঘটেছে। কিছু গবেষক ‘কলোনির’ (উপনিবেশ) রুপক ব্যবহার করেন, তারা শরীরকে অগণিত কোষের একটি কলোনি হিসাবে বর্ণনা করেন। শরীরকে আমি কোষ নয় বরং “জিনদের’ কলোনি হিসাবে এবং কোষগুলোকে, জিনদের রাসায়নিক কারখানার সুবিধাজনক কার্যকরী ইউনিট হিসাবে ভাবতে পছন্দ করি।

তারা হয়তো জিনদের কলোনি হতে পারে কিন্তু এটি অস্বীকার করা যাবে না যে, তাদের আচরণে, শরীরগুলো নিজস্ব একটি স্বতন্ত্রতা অর্জন করে। একটি প্রাণী তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে সমন্বিত সম্পূর্ণ, অসংখ্য কোষের সমন্বিত উদ্যোগে সৃষ্ট একক একটি ইউনিট হিসাবে।আত্মগতভাবে আমি নিজেকে অসংখ্য কোষের সমন্বয়ে সৃষ্ট কোনো কলোণী হিসাবে নয়, বরং একক একটি ইউনিট হিসাবে অনুভব করি। আর এটাই প্রত্যাশিত। নির্বাচন সেই সব জিনদের সাহায্য করেছে যারা পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্যতাপূর্ণ সমন্বয় রক্ষা করে। সীমিত সম্পদের জন্যে সুতীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, অন্যান্য টিকে থাকার যন্ত্রদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করার অবিরাম সংগ্রাম ও নিজেকে অন্য কারো খাদ্য হওয়া থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টায়, বিচ্ছিন্ন কোষের একত্রে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করার সমন্বয়হীনতা অপেক্ষা একক ইউনিট হিসাবে শরীরে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত হবার অবশ্যই কোন বিশেষ সুবিধা আর উপযোগিতা আছে। বর্তমানে জিনদের অনিবর্তনীয়ভাবেই জটিল পারস্পরিক সহ-বিবর্তন এমন একটি পর্যায় অবধি অগ্রসর হয়েছে যে কোনো একটি একক সারভাইভাল মেশিনের সমাজবদ্ধ হিসাবে বসবাস করার রুপটি আসলেই শনাক্ত করা সম্ভব না। সত্যিই বহু জীববিজ্ঞানীরাও এটি এভাবে শনাক্ত করেন না এবং আমার সাথে তারা দ্বিমত পোষণ করবেন।

সৌভাগ্যক্রমে, এই বইটির বাকী অংশের জন্যে সাংবাদিকরা যে বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে থাকেন, এই মতানৈক্য মূলত অ্যাকাডেমিক বা তাত্ত্বিক। ঠিক যেমনভাবে ‘কোয়ান্টা বা মৌলিক কণা সম্বন্ধে কথা বলা সুবিধাজনক নয় যখন আমরা গাড়ি কিভাবে কাজ করে সেটি নিয়ে আলোচনা করি, তেমনি যখন আমরা টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর আচরণ নিয়ে আলোচনা করবো, তখন জিনদের আলোচনায় বার বার টেনে আনা অনেক সময়ই খুব ক্লান্তিকর আর অপ্রয়োজনীয় অনুভূত হতে পারে। সুতরাং বাস্তব ক্ষেত্রে একটি নিকটবর্তিতার আশ্রয় নেয়া সাধারণত সুবিধাজনক, এমন কিছু যা পুরোপুরি এক না হলেও তাদের সদৃশ্য অর্থে খুব নিকটবর্তী। সেই অর্থে আমরা কোনো একক সদস্যর শরীরকে গন্য করতে পারি একটি ‘এজেন্ট হিসাবে, যারা ভবিষ্যতে প্রজন্মের শরীরে এর সবগুলো জিনের সংখ্যা বাড়ানোর ‘চেষ্টা করে। সুবিধাজনক ভাষাই আমি ব্যবহার করবো। যদি না আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘পরার্থবাদী আচরণ” এবং “স্বার্থপর আচরণের অর্থ হবে, একটি জীব শরীরের প্রতি অন্য একটি জীব শরীরের আচরণ।

এই অধ্যায়টি ‘আচরণ সংক্রান্ত, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন কৌশল, যা মূলত ব্যবহার করে টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর প্রাণী শাখাঁটি। কোনো প্রাণী হয়ে ওঠে সক্রিয় উদ্দেশ্য সাধনের তীব্র আকাঙ্খসহ একটি জিন বহনকারী: ‘জিন যন্ত্র। এই আচরণের বৈশিষ্ট্য, যেমন করে জীববিজ্ঞানীরা এই শব্দটিকে ব্যবহার করেন, খুব দ্রুত একটি প্রক্রিয়া। উদ্ভিদরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে, কিন্তু খুবই ধীরে। খুব দ্রুতগতিতে চালানো ফিল্মে যখন দেখা হয়, আরোহী উদ্ভিদকে দেখে মনে হতে পারে যেন কোনো সক্রিয় প্রাণী। কিন্তু বেশীর ভাগ উদ্ভিদের স্থান পরিবর্তন আসলে অপ্রতিবর্তনযোগ্য বৃদ্ধি। প্রাণীরা, আবার অন্যদিকে শত সহস্র গুণ দ্রুততার সাথে নড়াচড়া করার কৌশল বিবর্তিত করেছে। উপরন্তু, যে নড়াচড়া তারা করে সেটি প্রতিবর্তনযোগ্য বা চূড়ান্ত নয় এবং যা অসীম সংখ্যকবার পুনরাবৃত্তযোগ্য।

এই দ্রুততার সাথে স্থান পরিবর্তন করার জন্য যে যন্ত্রটি প্রাণীরা বিবর্তিত করেছে, সেটি হচ্ছে মাংসপেশী। মাংসপেশীরা হচ্ছে ইঞ্জিন, যেটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন এবং ইন্টারনাল কম্বাশন বা অন্তর্দহন ইঞ্জিনের মতই, যান্ত্রিক গতি অর্জনের জন্যে যা রাসায়নিক জ্বালানীতে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে। পার্থক্যটি হচ্ছে গ্যাসীয় চাপের বিপরীত, যা আমরা দেখি বাষ্পীয় বা ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে, এখানে তাৎক্ষণিক যান্ত্রিক শক্তি কোনো মাংসপেশীতে টেনশন বা চাপ রুপে সৃষ্টি হয়। কিন্তু মাংসপেশী আসলেই ইঞ্জিনের মত সেই অর্থে, তারা প্রায়শই তাদের শক্তি প্রয়োগ করে তন্তু, আর হিঞ্জ বা কবজাসহ লিভার বা ভারোত্তলন-দণ্ডের মাধ্যমে। আমাদের শরীরে এই লিভারগুলো পরিচিত অস্থি বা হাড় হিসাবে, আর কর্ড বা তন্তু হচ্ছে টেনডন এবং হিঞ্জ হচ্ছে সন্ধি বা জোড়া। সঠিক সেই আণবিক প্রক্রিয়াটি সম্বন্ধে এখন অনেক কিছু আমাদের জানা, যা ব্যবহার করে মাংসপেশী এর কর্ম সম্পাদন করে, কিন্তু আমার কাছে মাংসপেশীর সংকোচনের সময় কিভাবে নিয়ন্ত্রণ হয়, সেই বিষয়টি আরো বেশী কৌতূহলোদ্দীপক মনে হয়।

আপনি কি কখনো কিছুটা জটিলতাসহ কোনো কৃত্রিম যন্ত্রকে দেখেছেন, উল-বোনা বা সেলাইমেশিন, কোনো তাঁত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বোতলজাত করার যন্ত্র কিংবা মাঠের খড়কে কুণ্ডলী পাকানোর ‘হে বেলার’ মেশিন? মোটিভ পাওয়ার বা উদ্দেশ্যমূলক শক্তি আসে কোনো একটি জায়গা থেকে, ধরুন, একটি ইলেকট্রিক মটর বা একটি ট্রাক্টর। কিন্তু আরো বেশী ধাঁধার ব্যপারটা হচ্ছে সেই কাজগুলো করার জন্য এর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা। সঠিক ধারাবাহিক নিয়ম মেনে ভালভগুলো খোলে আর বন্ধ হয়, ইস্পাতের আঙ্গুল দক্ষভাবে একটি খড়ের গাঁটির চারপাশে দড়ির গিট বাধে, এবং ঠিক সঠিক সময় একটি ছুরি বের হয়ে এসে সুতাটি কেটে দেয়। অনেক কৃত্রিম মেশিনের এই সময়-সমন্বয় অর্জিত হয়েছে একটি অসাধারণ আবিষ্কার ‘ক্যাম’ এর মাধ্যমে। এটি খুব সাধারণ ঘূর্ণ্যমান গতিকে একটি জটিল ছন্দময় নানা অপারেশনের প্যাটার্নে অনূদিত করে অদ্ভুত অথবা বিশেষ আকারের একটি চাকা ব্যবহার করে। মিউজিক বক্সের মূলনীতিও একই রকম। অন্যান্য মেশিন, যেমন, স্টিম অর্গান এবং পিয়ানোলা কাগজের রোল বা কার্ড ব্যবহার করে, যাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সজ্জা ছিদ্র করা থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ যান্ত্রিক টাইমারের ব্যবহারের বদলে ইলেক্ট্রনিক টাইমার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ডিজিটাল কম্পিউটার হচ্ছে অনেক বড় আর বহুমুখী কর্ম সম্পাদনের জন্যে নির্মিত ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের একটি উদাহরণ, যা জটিল সময় সমন্বয়কৃত নানা গতির প্যাটার্ন তৈরী করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। আধুনিক ইলেক্ট্রনিক মেশিন, যেমন, কম্পিউটারের মৌলিক একটি উপাদান হচ্ছে, সেমিকন্ডাক্টর, যাদের সবচেয়ে পরিচিত রুপটি হচ্ছে, ট্রানজিস্টর।

টিকে থাকার যন্ত্রগুলো মনে হয় “ক্যাম’ আর ‘পাঞ্চড কার্ডের’ প্রযুক্তি পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছিল। যে যন্ত্রাংশটি তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করে সেটির বেশ মিল আছে একটি ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের সাথে। যদিও মূল পরিচালনার স্তরে এটি খুব কঠোরভাবে পৃথক। জৈববৈজ্ঞানিক কম্পিউটারের মূল একক হচ্ছে স্নায়ু কোষ বা নিউরন, তারা অভ্যন্তরীণ স্তরে যেভাবে কাজ করে সেটির সাথে ট্রানজিসটরের কাজ করার প্রক্রিয়ার সাথে কোনো মিল নেই। অবশ্যই নিউরনগুলো পারস্পরিক সংযোগে যে সংকেত ব্যবহার করে করে, সেটি খানিকটা ডিজিটাল কম্পিউটারের পালস কোডের মত মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি নিউরন এককভাবে ট্রানজিস্টরের তুলনায় অনেক বেশী জটিল আর সূক্ষ্ম উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণে দক্ষ একটি ইউনিট। অন্যান্য অংশের সাথে মাত্র তিনটি সংযোগের বদলে একটি একক নিউরনের বহু হাজার সংখ্যক সংযোগ থাকতে পারে। ট্রানজিস্টরের তুলনা নিউরন ধীরে কাজ করে। কিন্তু ক্ষুদ্রাকৃতিকরণের ক্ষেত্রে এটি আরো অনেক অগ্রসর। গত দুই দশক ধরে ইলেকট্রনিক শিল্পে এর আকারে ছোট হয়ে আসবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টিকে প্রকাশ করা যেতে পারে এভাবে, মানুষের মস্তিষ্কে দশ হাজার মিলিয়ন নিউরন আছে, এবং আপনি আপনার মাথার খুলির মধ্যে মাত্র কয়েকশত ট্রানজিস্টরের জায়গা দিতে পারবেন।

উদ্ভিদদের কোনো নিউরনের প্রয়োজন নেই, কারণ তারা তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে পারে জায়গা পরিবর্তন না করে। কিন্তু বহু সংখ্যক প্রাণীদের গ্রুপে আমরা নিউরন দেখি। এটি হয়তো প্রাণীদের বিবর্তনের শুরুর দিকে উদ্ভাবিত হয়েছে এবং সব গ্রুপই উত্তরাধিকার সূত্রে এটি পেয়েছে। অথবা এটি বেশ কয়েকবার উদ্ভব হয়েছে স্বতন্ত্রভাবে।

নিউরন মৌলিকভাবে শুধুমাত্র কোষ, অন্য যেকোনো কোষের মত যার নিউক্লিয়াস আর ক্রোমোজোম আছে। কিন্তু তাদের কোষ পর্দাগুলো সজ্জিত সরু, তারের মত নানা শাখা-প্রশাখা সহ বিস্তৃত। প্রায়শই নিউরনের নির্দিষ্টভাবেই একটি বিশেষ লম্বা ‘তারের মত উপাঙ্গ থাকে, যাকে বলা হয় ‘অ্যাক্সন’। যদিও অ্যাক্সনের প্রশস্ততা আণুবীক্ষণীক, তবে এর দৈর্ঘ্য হতে পারে কয়েক ফুট। জিরাফের ঘাড়ে একক অ্যাক্সনগুলো পুরো ঘাড়ের দৈর্ঘ্য জুড়ে থাকে। অ্যাক্সনরা সাধারণত একসাথে গাঁটবাঁধা থাকে মোটা বহু তার বিশিষ্ট কোনো কেবলের মত, যাদের বলা হয় নার্ভ বা স্নায়ুতন্তু। শরীরের এক প্রান্ত থেকে এরা অন্য প্রান্তে বার্তা বহন করে নিয়ে যায়, ট্রাঙ্ক টেলিফোন কেবলের মত। অন্য নিউরনগুলোর অপেক্ষাকৃত কম লম্বা অ্যাক্সন থাকে। এবং তারা একগুচ্ছ স্নায়ু কোষের ঘন একটি উপাঙ্গ তৈরী করে, যাদের আমরা বলি গ্যাঙলিয়া অথবা যখন সেই স্নায়ুকোষগুচ্ছ আকারে অনেক বড় হয়, সেটি ব্রেইন বা মস্তিস্ক তৈরী করে। কাজের দিক থেকে মস্তিস্ককে আমরা কম্পিউটারের মত মনে করতে পারি (১)। তারা সমরুপ এই অর্থে যে উভয় যন্ত্রই, নানা ধরনের জটিল প্যাটার্নের উপাত্ত ইনপুট বিশ্লেষণ এবং সংরক্ষিত তথ্যভাণ্ডারে প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্র যাচাই করার পর জটিল আউটপুট তৈরী করে।

প্রধান যে উপায়ে মস্তিস্ক আসলে টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর সফলতার প্রতি অবদান রাখে, সেটি হচ্ছে মাংসপেশীর সংকোচন নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করা। আর সেটি করতে তাদের দরকার মাংসপেশী পর্যন্ত দীর্ঘ ‘কেবল’ সংযোগ, যাদের বলা হয় মটর নার্ভ, মটর স্নায়ু। কিন্তু এটি দক্ষভাবে জিনের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে শুধুমাত্র যদি পেশী সংকোচনের সময় যদি বাইরের পৃথিবীতে ঘটা নানা ঘটনার সময়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। চোয়ালের মাংসপেশী সংকোচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ শুধু যখন এমন কোনো কিছুর সংস্পর্শে আসে যা কামড় দেয়া যায় এবং পায়ের মাংস দৌড়ানোর ভঙ্গীতে সংকোচনের দরকার, যখন কোনো কিছু থেকে দৌড়ে পালানো বা দৌড়ে কাছে যাবার দরকার আছে। আর এ কারণে প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই প্রাণীদের প্রতি আনুকুল্য প্রদর্শন করে যারা অনুভব করার ইন্দ্রিয় দিয়ে সজ্জিত, যে অঙ্গগুলো বাইরের পৃথিবীর নানা ভৌত ঘটনার প্যাটার্ন নিউরনের জন্যে স্পন্দনশীল সংকেতে অনূদিত করে। চোখ, কান, স্বাদ নিরূপক কোষগ্রন্থি এই সব ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে মস্তিষ্ক যুক্ত থাকে স্নায়ুরজ্জ্ব বা কেবলের মাধ্যমে, যাদের বলা হয় সেন্সরী বা সংবেদী স্নায়ু। সংবেদী এই তন্ত্রের কাজ বিশেষভাবেই ধাঁধার মত। কারণ প্যাটার্ন চেনার প্রক্রিয়ায় তারা আরো অনেক বেশী অসাধারণ কাজ করতে পারে, যা মানুষের বানানো সবচেয়ে দামী আর সেরা যন্ত্রগুলোকেও হার মানায়। যদি সেরকম না হতো এটি, তাহলে সব টাইপিষ্টই অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য হিসাবে চিহ্নিত হতেন, তাদের জায়গা দখল করে নিত মানুষের গলার আওয়াজ শনাক্তকারী বা। হাতের লেখা পড়তে জানা কোনো যন্ত্র। মানব টাইপিষ্টদেরএখনও বহু দশক প্রয়োজন আছে।

হয়তো এমন কোনো সময় ছিল যখন সংবেদী অঙ্গগুলো কম বেশী সরাসরি মাংসপেশীর সাথে সংযুক্ত হতো। আসলেই সী অ্যানিমোনরা এই অবস্থা থেকে আজও খুব দূরে নয়, কারণ তাদের জীবনাচরণে দক্ষতার সাথে এটি কাজ করে। কিন্তু বাইরের পৃথিবীতে ঘটা কোনো ঘটনার সময় আর মাংসপেশীর সংকোচনের ‘সময়ের মধ্যে আরো জটিল আর পরোক্ষ সম্পর্ক অর্জন করতে, যোগাযোগের মধ্যস্থ হিসাবে কোনো এক ধরনের মস্তিস্কের আবশ্যিকতা আছে। একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে বিবর্তনের স্মৃতি আবিষ্কার। এই কৌশলটি ব্যবহার করে, শুধুমাত্র নিকটবর্তী অতীতের কোনো ঘটনার দ্বারাই নয়, বরং আরো দূর অতীতের ঘটনার দ্বারাও মাংসপেশী সংকোচনের সময়কে প্রভাবিত করা যায়। স্মৃতি বা স্টোর বা ভাণ্ডার, ডিজিটাল কম্পিউটারের জন্যেও একটি অপরিহার্য অংশ। কম্পিউটার স্মৃতি মানুষের স্মৃতির চেয়ে অনেক বেশী নির্ভরযোগ্য, কিন্তু তাদের ধারণ ক্ষমতা কম, আর তাদের তথ্য-পুনরুদ্ধার করার প্রক্রিয়াটিও অনেক বেশী পরিমানে অপরিশীলিত।

সারভাইভাল যন্ত্রদের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি আচরণ হচ্ছে এর আপাতগ্রাহ্য একটি উদ্দেশ্যময়তা। এবং এর অর্থ হিসাবে আমি শুধু বোঝাতে চাইছি না যে, কোনো সারভাইভাল যন্ত্রকে মনে হতে পারে প্রাণীদের জিনগুলোকে টিকে থাকতে সাহায্য করার লক্ষ্যে খুব হিসাব করেই সৃষ্টি করা হয়েছে, যদিও অবশ্যই এটি তা করছে। আমি বলতে চাইছি মানুষের উদ্দেশ্য প্রণোদিত কোনো ব্যবহারের কাছাকাছি একটি সদৃশ উদাহরণ হিসাবে। আমরা যখন কোনো প্রাণীকে খাদ্য বা কোনো প্রজনন সঙ্গী বা হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ‘খুঁজতে’ দেখি, সেখানে এই ধরনের কোনো অনুসন্ধানে আমরা নিজেরা যা অনুভব করি, সেই অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট কিছু আত্মগত অনুভূতি যুক্ত না করে থাকাটা আমাদের জন্য খুব কঠিন। এগুলো হতে পারে কোনো কিছুর জন্য ‘আকাঙ্খ”, বা কোনো কাঙ্খিত বস্তুর একটি মানসিক চিত্র’, একটি লক্ষ্য’ বা ‘উদ্দেশ্য। আমাদের আত্মগত নিজস্ব ভাবনার প্রমাণ থেকে আমরা প্রত্যেকেই জানি কমপক্ষে একটি আধুনিক সারভাইভাল যন্ত্রে এই উদ্দেশ্যময়তা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে বিবর্তিত হয়েছে যাকে আমরা বলি ‘কনশাসনেস’ বা সচেতনতা। এর অর্থ কি সেই বিষয়ে আলোচনা করার জন্যে আমি দার্শনিক হিসাবে যথেষ্ট নই। সৌভাগ্যজনকভাবে আমাদের বর্তমান লক্ষ্যের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ মেশিনদের নিয়ে কথা বলা খুব সহজ, যারা এমনভাবে আচরণ করে ‘যেন মনে হয় কোনো একটি উদ্দেশ্য পূরণে এটি কোনো কাজ করতে প্রণোদনা পাচ্ছে এবং এটি আরো বেশ উন্মুক্ত করে দেয়, তারা কি আসলেই সচেতন কিনা সেই প্রশ্নটিকে। এই মেশিনগুলো মূলত খুবই সরল, এবং অসচেতন উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণ প্রকৌশল বিজ্ঞানে খুব সাধারণ একটি ঘটনা। সবচেয়ে ধ্রুপদী উদাহরণ হচ্ছে ‘ওয়াট স্টিম গভর্নর।

যে মৌলিক মূলনীতিটি এখানে জড়িত তাকে বলা হয় ‘নেগেটিভ ফিডব্যাক’, যার বেশ কিছু ভিন্ন রুপ আছে। সাধারণভাবে যা ঘটে সেটি হচ্ছে: কোনো একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ মেশিন’, অর্থাৎ যে মেশিনটি বা কোনো কিছু এমনভাবে আচরণ করে যেন এর একটি সচেতন উদ্দেশ্য আছে, সাধারণত এ ধরনের মেশিনে পরিমাপ করার একটি যন্ত্রাংশ আছে, বর্তমান পরিস্থিতি এবং ‘কাঙ্খিত পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য যা সারাক্ষণ পরিমাপ করে। এটি এমনভাবে তৈরী যে, পার্থক্যটি যত বড় হবে, যন্ত্রটি তত পরিশ্রম করে কাজ করবে, এবং এভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেশিনটি এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্যটি সব সময় কমানো চেষ্টা করবে– একারণে এটিকে বলা হয় ‘নেগেটিভ ফিডব্যাক’ এবং এভাবেই আসলেই যন্ত্রটি বিশ্রামে পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে যখন কাঙ্খিত পরিস্থিতিটি অর্জিত হয়। ওয়াট গভর্নরে এক জোড়া বল থাকে, যেটি স্টিম ইঞ্জিনের চাপে ঘুরতে থাকে, প্রতিটি বলই কজাসহ একটি বাহুর শেষ প্রান্তে লাগানো থাকে। যত দ্রুত বলগুলো ঘুরতে থাকে ততই কেন্দ্রমুখী বল তাদের ধরে রাখা বাহুটাকে আনুভূমিক অবস্থায় নিয়ে যেতে থাকে, আর এই প্রবণতাকে বাধা দিতে থাকে মাধ্যাকর্ষণ। আর একটি ভালভ বা কপাটিকার সাথে বাহুগুলো আটকে থাকে, যার মাধ্যমে ইঞ্জিনে বাষ্প প্রবেশ করে এমনভাবে যে বাষ্প প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, যখনই বলসহ বাহুটি সমান্তরাল একটি অবস্থানে পৌঁছায়। এভাবেই যদি ইঞ্জিনটি বেশী জোরে চলতে থাকে, তাহলে সেখানে প্রবেশ করা বাষ্পের প্রবাহ কিছুটা কমে যাবে, এবং আবার যখন এটি বেশী ধীরে চলতে শুরু করে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালভ দিয়ে আরো বেশী বাষ্প ভিতরে প্রবেশ করবে এবং এটি আবার দ্রুত চলতে থাকবে। এধরনের ‘পারপাস’ মেশিনগুলো প্রায়ই ওভারশুটিং বা যতটুকু এর সীমা সেটি অতিক্রম করা এবং টাইম-ল্যাগ বা সময়ের ব্যবধান বা বিরতি, যখন এটি আবার কাঙ্খিত পরিস্থিতিতে ফিরে আসে, এভাবে দ্বিমুখী দুটি পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোলিত হয় এবং প্রকৌশলীদের শিল্পের একটি অংশ হচ্ছে এই আন্দোলিত হওয়াকে বাড়তি কোনো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।

ওয়াট গভর্নরের ‘কাঙ্খিত পরিস্থিতি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট গতিতে ঘোরা। অবশ্যই এটি সচেতনভাবে সেটি কামনা করছে না। কোনো একটি মেশিনের উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধুমাত্র সেই অবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করা, যে অবস্থায় এটি ফিরে আসতে চায়। আধুনিক পারপাস মেশিনগুলো আরো জটিল ‘জীবন-সদৃশ’ কোনো আচরণ অর্জন করার জন্য ‘নেগেটিভ ফিডব্যাকের’ মত মূলনীতিগুলোর একটি সম্প্রসারিত রুপ ব্যবহার করে। গাইডেড মিসাইলদের, যেমন আমরা দেখি তারা সক্রিয়ভাবে তাদের লক্ষ্য খুঁজে বের করছে এবং যখনই তারা তাদের লক্ষ্যবস্তুকে তাদের সীমানায় নিয়ে আসে, মনে হয় ক্ষেপণাস্ত্রটি যেন সেই লক্ষ্যবস্তুটিকে সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করছে, এর সব পালাবার ভঙ্গি, বাক নেয়া সবই খেয়াল করছে এবং কখনো কখনো আগে থেকে ধারণা করছে বা লক্ষ্যবস্তুটি কি করতে পারে, সেটি সম্বন্ধে ‘পূর্বধারণা করছে। এবং এটি কিভাবে করছে সেই বিস্তারিত বিবরণ এখানে দেবার প্রয়োজন নেই। তবে সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে বহু ধরনের নেগেটিভ ফিডব্যাক’, ‘ফিড ফরোয়ার্ড এবং আরো অন্যান্য কিছু নীতিমালা আছে, যা প্রকৌশলীরা খুব ভালো করে বোঝেন এবং এখন আমরা জানি, জীবন্ত শরীরের নানা কাজের সাথেও এটি সংশ্লিষ্ট। কোনোভাবেই এখানে সচেতনতার মত কোনো কিছু কাজ করছে এমন ভাবার দরকার নেই, যদিও কোনো অদক্ষ মানুষ এর আপাতদৃষ্টিতে উদ্দেশ্যমূলক এবং পুর্বপরিকল্পিত আচরণ দেখে, হয়তো সমস্যায় পড়বেন বিশ্বাস করতে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি আসলেই কোনো মানব পাইলটের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নেই।

খুবই সাধারণ একটি ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে যে, যেহেতু একটি মেশিন যেমন, গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মূলত পরিকল্পনা এবং তৈরী করেছে সচেতনতাসহ মানুষরা, সুতরাং অবশই এটি সত্যিকারভাবে সচেতনতাসহ মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন। এই ভ্রান্ত যুক্তিটির আরেকটি রুপ হচ্ছে যে, কম্পিউটার আসলে দাবা খেলে না, কারণ তারা সেই কাজটি করতে পারে যখনই কোনো মানব অপারেটর সেটি করতে তাদের নির্দেশ দেয়। বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ বোঝা যে কেন এটি ভুল একটি যুক্তি। কারণ এটি আমাদের সেই সত্যটি বোঝার ক্ষমতার উপর এর প্রভাব ফেলে, যখন আমরা বলছি যে, জিনদের বলা যেতে পারে তারা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য কম্পিউটারের দাবা খেলা খুব ভালো একটি উদাহরণ হতে পারে। সুতরাং সংক্ষেপে বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করবো।

কম্পিউটার এখনও মানব গ্রান্ড মাষ্টারদের মত দাবা খেলতে পারেনা, তবে তারা এমন একটি মানদণ্ডে পৌঁছেছে যা কোনো দক্ষ সখের খেলোয়াড়ের সমতুল্য। আরো কঠোর অর্থে বলতে গেলে, “প্রোগ্রামগুলো’ দক্ষ শখের খেলোয়াড়দের স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে, কারণ একটি দাবা খেলার প্রোগ্রাম কোন কম্পিউটারের শরীরের মধ্যে বসে এর দক্ষতা দেখাচ্ছে সেটা নিয়ে সে আদৌ খুঁত খুঁতে নয়। তাহলে এখানে মানব প্রোগ্রামারদের ভূমিকাটি কি? প্রথমত, সে অবশ্যই প্রতিটি মূহুর্তে কম্পিউটারকে নিয়ন্ত্রণ করছে না, পুতুল নিয়ে খেলা দেখানো শিল্পীর হাতের বাধা পুতুলদের মত। কারণ সেটি পুরোপুরিভাবে প্রতারণা হবে। তার কাজ হচ্ছে প্রোগ্রামটি লেখা, এবং সেই প্রোগ্রামটি কম্পিউটারে স্থাপন করা এবং তারপর কম্পিউটার নিজের মত করে একা একাই কাজ করবে: আর কোনো মানবীয় হস্তক্ষেপ নেই, শুধুমাত্র প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় তার দান কি হবে সেটি কি বোর্ডের মাধ্যমে প্রবেশ করানো ছাড়া। প্রোগ্রামার কি তাহলে সম্ভাব্য সব দাবার দান আগে থেকে অনুমান করে রেখেছেন এবং কম্পিউটারকে সেই ভালো দানগুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা প্রদান করেছেন, যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য একটি? অবশ্যই না, কারণ দাবা বোর্ডে সম্ভাব্য অবস্থানের সংখ্যা এতই বিশাল যে, পুরো পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে সেই তালিকা সম্পূর্ণ করার আগে। আর একই কারণে সম্ভাব্য সব দান ব্যবহার করে সম্ভবত কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম করা সম্ভব নয়, যা কিনা এটি ‘কল্পনা’ করতে পারে, এবং প্রতিটি দানের পরবর্তী পাল্টা দানগুলো, যতক্ষণ না এটি খেলাটি জিতবার একটি কৌশল খুঁজে পায়। দাবার বোর্ডে সারা গ্যালাক্সীতে যত পরমাণু আছে তারচেয়ে বেশী সংখ্যক সম্ভাব্য দান আছে। কম্পিউটারকে দাবা খেলার জন্য প্রোগ্রামিং করার এগুলো হচ্ছে অসমাধানযোগ্য কিছু সমস্যা। আসলেই এটি অতিমাত্রায় একটি কঠিন সমস্যা এবং এজন্য খুব একটা বিস্ময়কর না ব্যপারটা যে, সবচেয়ে সেরা প্রোগ্রামগুলো এখনও গ্রান্ড মাস্টারের মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি।

একজন প্রোগ্রামারের আসল দ্বায়িত্ব হচ্ছে বরং অনেকটা বাবার মত, যিনি তার ছেলেকে দাবা খেলা শেখাচ্ছে। তিনি কম্পিউটারকে খেলার মূল দানগুলো সম্বন্ধে নির্দেশ দেন, আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি সম্ভাব্য শুরুর দান থেকে না, বরং বলা যায় অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত আরো সাধারণ কিছু নিয়ম ব্যবহার করে। তিনি হয়তো আক্ষরিক অর্থে পরিষ্কার ইংরেজীতে বলবেন না যে, ‘বিশপ বা গজ কৌণিক পথে চলে’ বরং এর গাণিতিক সমতুল্য কোনো নির্দেশ, যেমন যদিও সংক্ষিপ্তভাবে: ‘বিশপের নতুন কোঅর্ডিনেট পাওয়া যাবে তার পুরোনো কোঅর্ডিনেট থেকে, একই ধ্রুব পরিমান সংখ্যা যোগ করে– যদিও একই চিহ্ন হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই–পুরোনো x আর y উভয় কোঅর্ডিনেটের সাথে। তারপর তিনি হয়তো কিছু উপদেশ’ সেখানে প্রোগ্রাম করতে পারেন, যা লেখা হয় কোনো এক ধরনের গাণিতিক লজিক্যাল ভাষায়, যা মানুষের ভাষায় একই ধরনের ইঙ্গিতের মত, যেমন ‘রাজাকে কখনোই অরক্ষিত রাখা যাবে না বা কিছু উপযোগী কৌশল যেমন, নাইট বা ঘোড়া ব্যবহার করে ফর্কিং করা। বিস্তারিত বিষয়গুলো কোন সন্দেহ নেই দারুন আগ্রহ উদ্দীপক, কিন্তু সে বিষয়ে আলোচনা আমাদের জন্য অপ্রাসঙ্গিক হবে। প্রধান বিষয়টি হচ্ছে এটি; যখন আসলেই এটি খেলবে, কম্পিউটার একা একাই খেলবে, এবং তখন সে তার মাষ্টার বা প্রোগ্রামারের কাছ থেকে কোনো প্রত্যক্ষ সাহায্য আশা করতে পারেনা। প্রোগ্রামাররা সম্ভাব্য সেরা সব কৌশল প্রোগ্রাম করে আগে থেকে কম্পিউটারকে প্রস্তুত করে রাখতে পারেন, বিশেষ কিছু দক্ষতার তালিকার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে নানা ধরনের কৌশল আর দান সম্বন্ধে ইঙ্গিত দিয়ে রাখতে।

জিনরাও তাদের টিকে থাকার যন্ত্রগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা যেটা করতে পারে সেটি হলো সব কিছু আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখে, এরপর সারভাইভাল মেশিনকে একাই তার সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং জিনরা অক্রিয় হিসাবে তাদের ভিতর বসে থাকে, সরাসরি তাদের আঙ্গুলগুলো পুতুলদের নিয়ন্ত্রণ করার সুতায় ধরা থাকে না, বরং তারা কাজ করে পরোক্ষভাবে, কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের মত। কেন তারা এত অক্রিয়? মাঝে মাঝে কেন তারা সরাসরি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নেয় না? এর উত্তরটা হচ্ছে তারা সেটা করতে পারেনা কারণ সময়ের ব্যাবধান বা টাইম ল্যাগ সমস্যা। ভালো করে এটা বোঝা সম্ভব হতে পারে আরেকটি সদৃশ উদাহরণ ব্যবহার করলে, এটির উৎস বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী; ফ্রেড হয়েল ও জন এলিয়টের লেখা A for Andromeda, একটি আকর্ষণীয় কল্পকাহিনী। এবং যেকোনো ভালো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত কাহিনীর অন্তরালে এরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা আছে। বিস্ময়কর যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সুস্পষ্টভাবে বইতে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি, পুরোটাই ছেড়ে দেয়া হয়েছে পাঠকের কল্পনার উপর। আমি আশা করছি লেখকদ্বয় কিছু মনে করবেন না যদি বিষয়টি আমি এখানে স্পষ্ট করি।

আমাদের থেকে ২০০ আলোক বর্ষ দূরে, অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে (২) একটি সভ্যতার অস্তিত্ব আছে, এবং তারা তাদের সভ্যতা আর সংস্কৃতিকে দূরবর্তী জগতগুলোতে প্রচার করে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছুক। কিভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে সেই কাজটি করা যেতে পারে? সরাসরি সেখানে ভ্রমণ করার তো প্রশ্নই আসে না। আলোর গতি তাত্ত্বিকভাবে উপরে একটি সীমা বেধে দিয়েছে এই মহাবিশ্বে কি গতিতে আপনি একটি জায়গা থেকে অন্য একটি জায়গায় যেতে পারবেন, আর যান্ত্রিক বিবেচনা এই গতিকে আরো নীচে নামিয়ে এসেছে, যা কিনা প্রায়োগিক স্তরে সম্ভব হতে পারে। এছাড়াও মহাবিশ্বে হয়তো বাসযোগ্য এমন কোনো জগৎ নাও থাকতে পারে, যেখানে যাবার জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে। আর এছাড়া আপনি কিভাবেই বা জানবেন কোন দিক বরাবর যেতে হবে? রেডিও বরং মহাবিশ্বের বাকী অংশের সাথে যোগাযোগ করার ভালো কোনো উপায়। কারণ, যদি আপনার যথেষ্ট ক্ষমতা থাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিক বরাবর সংকেত না পাঠিয়ে আপনার সংকেতকে সব দিক বরাবর সম্প্রচার করতে পারলে, আপনি হয়তো অনেক বেশী সংখ্যক জগতের কাছে পৌঁছাতে পারবেন ( এই সংখ্যা বৃদ্ধি পায় যে পরিমান দূরত্ব সংকেতটি অতিক্রম করে তার বর্গফল অনুযায়ী); বেতার তরঙ্গ আলোর গতিতে ভ্রমণ করে, তার মানে হলো সেই সংকেতটি অ্যান্ড্রোমিডা থেকে পৃথিবীতে আসতে লাগবে ২০০ বছর। এই ধরনের দুরত্বের সমস্যাটি হচ্ছে এই দূরত্বে আপনি কখনোই কোনো কথোপকথন অগ্রসর করতে পারবেন না। এমনকি যদি আপনি সেই বাস্তব সত্যটিও বাদ দেন যে, প্রতিটি ধারাবাহিকভাবে আসা বার্তা পৃথিবীতে সম্প্রচার করবে এমন মানুষরা যারা প্রায় বারটি প্রজন্ম দ্বারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, এত দূরে বসে কথপোকথন অব্যাহত রাখা স্পষ্টতই সময়ের অপচয়।

সত্যিকারভাবে আমাদের জন্য এই সমস্যাটি শীঘ্রই উদ্ভব হবে: পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহ থেকে বেতার তরঙ্গ আসা যাওয়া করতে সময় নেয় প্রায় চার মিনিট। কোনো সন্দেহ নেই যে নভোচারীদের একটার পর একটা পাল্টা বাক্য বিনিময়ের মাধ্যমে কথা বলার আচরণটি বদলাতে হবে এবং তার বদলে তাদের ব্যবহার করতে হবে দীর্ঘ মনোলোগ বা সলিলিকুই, অনেকটা চিঠির মত, বাক্য বিনিময়ের মত নয়। যেমন, আরেকটি উদাহরণ, রজার পেইন আমাদের দেখিয়েছেন, সমুদ্রে শব্দের গুণাবলী বা অ্যাকুষ্টিকে কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে, যার অর্থ খুব বেশী মাত্রায় জোরে উচ্চারিত তিমির কোনো গান তাত্ত্বিকভাবে সারা পৃথিবীর জুড়ে শোনা যাবে, শর্ত একটাই, তিমিরা যদি একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় সাঁতার কাটে। আসলেই তারা এভাবে নিজেদের সাথে খুব বেশী দুরত্বে যোগাযোগ করে কিনা তা আমাদের জানা নেই, কিন্তু তারা যদি সেটা করে থাকে, তাদেরও সেই মঙ্গল গ্রহে বাস করা কোনো নভোচারীর মত একই সমস্যা হবে। পানিতে শব্দের গতি এমন যে, কোনো গানের আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে এবং একইভাবে তার উত্তর পেতে দুই ঘন্টা সময় লাগবে। আমি প্রস্তাব করছি এটিকে সেই বাস্তব সত্যটির একটা ব্যাখ্যা হিসাবে, কেন কিছু তিমি দীর্ঘ ধারাবাহিক সলিলোকুই বা স্বগতোক্তির মত শব্দ তৈরী করে, কোনো পুনরাবৃত্তি করা ছাড়াই, পুরো আট মিনিট ধরে। তারপর আবার তারা গানের শুরুতে ফিরে যায় এবং পুরো গানটি আবার পুনরাবৃত্তি করে। এভাবে বহুবার সেটি চলতে থাকে, প্রতিটি পূর্ণাঙ্গ চক্রের স্থায়িত্ব প্রায় আট মিনিট।

গল্পের সেই অ্যান্ড্রোমিডাবাসীরাও ঠিক একই কাজটি করছিল। যেহেতু উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করার কোনো অর্থ হয়না, তারা যা কিছু বলতে চায় সবকিছু একসাথে গুছিয়ে একটি বিশাল অখণ্ড বার্তা হিসাবে তারা মহাশূন্যে সম্প্রচার করেছিল, বার বার, কয়েক মাস ব্যাপী একটি সময়ের চক্রাকারে। তাদের সেই বার্তার সাথে তিমির বার্তার যদিও মিল নেই। তাদের বার্তায় একটি বিশাল কম্পিউটার বানানোর জন্য সাংকেতিক নির্দেশাবলী ছিল। অবশ্যই সেই নির্দেশাবলী সেখানে মানুষের ভাষায় লেখা ছিল না, কিন্তু কোনো দক্ষ ক্রিপ্টোগ্রাফারের পক্ষে যেকোনো সাংকেতিক ভাষার মর্মোদ্ধার করার সম্ভব, বিশেষ করে যদি সেই কোডটি যিনি তৈরী করেছেন তিনি যদি চান, সহজে কেউ সেটির পাঠোদ্ধার করুক। জরডেল ব্যাঙ্ক রেডিও টেলিস্কোপে সেই বার্তাটি ধরা পড়ে এবং অবশেষে বার্তাটির অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়, এবং সেই প্রোগ্রামটি চালানোর জন্য একটি কম্পিউটার তৈরী করা হয়। যার ফলাফল মানবজাতির জন্য প্রায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের হয়েছিল, কারণ অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের উদ্দেশ্য সর্বজনীনভাবে খুব পরোপকারী মানসিকতাপূর্ণ ছিল না, এবং তাদের নকশা অনুযায়ী বানানো কম্পিউটারটি সারা পৃথিবীব্যাপী একনায়কতন্ত্র স্থাপন প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছিল, তবে গল্পের নায়ক একটি কুড়াল দিয়ে সেটি ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল অবশেষে।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, সবচেয়ে মজার প্রশ্নটি হচ্ছে, কি অর্থে বলা যেতে পারে যে অ্যান্ড্রোমিডাবাসীরা পৃথিবীর নানা ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করেছিল। প্রতিটি মুহূর্তে কম্পিউটার কি করবে তার উপর তাদের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, আসলেই আদৌ কম্পিউটারটি তৈরী করা হয়েছিল কিনা সেটা তো তাদের জানারই কোনো উপায় ছিলনা। কারণ সেই খবরটি তাদের কাছে পৌঁছাতে ২০০ বছর লাগবে। কম্পিউটারের সব সিদ্ধান্ত আর কাজ পুরোপুরি তার নিজের। কোন ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবার জন্যে এটির এমনকি তার পরিকল্পক মাষ্টারদের কাছেও পরামর্শ নেবারও কোনো সুযোগ নেই। অনতিক্রম্য ২০০ বছরের প্রতিবন্ধকতার কারণে, তার সব নির্দেশগুলো আগে থেকে এর ভিতর তৈরী করে দেয়া হয়েছিল। নীতিগতভাবে, অবশ্যই আগে থেকে প্রোগ্রাম করতে হবে, অনেকটাই দাবা খেলার কম্পিউটারের মত, কিন্তু আরো বেশী নমনীয় ও ক্ষমতাধর স্থানীয় তথ্য ধারণ করার জন্য। আর এর কারণ সেই প্রোগ্রামটি পরিকল্পনা করতে হয়েছিল এমনভাবে যেন তা শুধু পৃথিবীতেই কাজ করে তাই না, বরং যেকোনো গ্রহে, যেখানে অগ্রসর সভ্যতার উপস্থিতি আছে, যেকোনো সেই একগুচ্ছ গ্রহ, যেখানকার বিস্তারিত পরিবেশ পরিস্থিতি সম্বন্ধে অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের আগে থেকে জানার কোনো উপায় ছিলনা।

ঠিক যেমন অ্যান্ড্রোমিডাবাসীদের দরকার ছিল একটি কম্পিউটার, যা পৃথিবীতে থাকবে তাদের হয়ে দৈনন্দিন সিদ্ধান্তগুলো দেবার জন্য, আমাদের জিনগুলো সেভাবে মস্তিষ্ক তৈরী করেছে। কিন্তু জিনরা শুধুমাত্র অ্যান্ডোমিডাবাসীরা না, যারা সাংকেতিক বার্তা পাঠিয়েছে; তারা নিজেরাও নির্দেশাবলী ধারণ করে। আর যে কারণে তারা আমাদের সুতোয় বাধা কোনো পুতুলের মত সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা সেটিও সেখানে একই: টাইম ল্যাগ বা কোনো কারণ ও তার ফলাফলের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান। জিন কাজ করে প্রোটিন সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার এটি একটি শক্তিশালী উপায় কিন্তু এটি খুব মন্থর একটি প্রক্রিয়া। ধৈর্য সহকারে প্রোটিন সুতো নিয়ন্ত্রণ করে ভ্রণ তৈরী করার জন্য বহু মাসের পরিশ্রম প্রয়োজন। কিন্তু অন্য দিকে, আচরণ সংক্রান্ত বিষয়টির মূল হচ্ছে এটি অত্যন্ত দ্রুত একটি প্রক্রিয়া। এটি যে সময়ের পরিমাপে কাজে করে সেটি মাস না বরং সেকেন্ড বা সেকেন্ড এর ভগ্নাংশ সময়ের মাত্রায়। কিছু ঘটলো আশে পাশে, মাথার উপর একটি পেঁচা বসে আছে। লম্বা ঘাসের নাড়াচাড়া শিকারে উপস্থিতি জানিয়ে দেয় এবং মাত্র কয়েক মিলি সেকেন্ডে পুরো স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে, মাংসপেশী লাফ দিয়ে ওঠে, কারো জীবন বাঁচে বা হারায়। জিনরা এধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া করার সময় পায় না। অ্যানড্রোমিডাবাসীদের মত জিনরা শুধু পারে তাদের কাজ চালানোর জন্য খুব ভালোভাবে আগে থেকেই একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কাজ করার কম্পিউটার তৈরী করে নিতে এবং আগে থেকে নানা ধরনের নিয়ম আর উপদেশ সেখানে প্রোগ্রাম করে দেয়া যা সাহায্য করে যতটা ঘটনা ঘটবে বলে সে আশা করে, সেই সব পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য। কিন্তু জীবন, দাবা খেলার মত সেখানে অনেক বেশী ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাবনার ঘটনাবলী আছে, যাদের সব কিছু আগে থেকে ধারণা করা সম্ভব না। এবং দাবার প্রোগ্রামারদের মত, জিনদেরকে সারভাইভাল মেশিনদের নির্দেশ দিতে হয় সব কিছু সুনির্দিষ্টভাবে না বরং সাধারণ কৌশল ও উপায় সংক্রান্ত বিষয়ে যা জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় (৩)।

যেমন, জে. জেড. ইয়ং বলেছিলেন, জিনদের এমন কিছু কাজ করতে। হয় যা ভবিষ্যদ্বাণী সদৃশ। যখন একটি ভ্রণ সারভাইভাল মেশিন তৈরী হচ্ছে, এর জীবনের বিপদ ও সমস্যাগুলো থাকে ভবিষ্যতে। কে বলতে পারে কোনো মাংসাশী প্রাণি ঝোঁপের আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আসে বা দ্রুত দৌড়াতে পারে এমন কোনো শিকার দ্রুত তার সামনে দিয়ে ছুটে যাবে এবং আঁকাবাঁকা হয়ে দৌড়াবে? কোনো মানব ঈশ্বর প্রেরিত দূত যেমন পারবে না, তেমনই পারবে না কোন জিন। কিন্তু বেশ কিছু সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী করা যেতে পারে। পোলার ভালুকদের জিনরা যেমন বেশ নিরাপদের সাথে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে, এখনও জন্ম হয়নি তাদের সারভাইভাল মেশিনের জন্য আগামী ভবিষ্যৎ খুবই শীতল হবে। তারা এটিকে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে করে না, তারা কোনো কিছুই চিন্তাই করে নাঃ তারা শুধু মোটা পুরুত্বের চুলের একটি আস্তরণ তৈরী করে, কারণ তারা ঠিক সেই কাজটি করেছে আগে তাদের অতীত শরীরগুলোয় এবং সেকারণে এটি এখনও টিকে আছে তাদের জিনপুলে। তারা আরো ভবিষ্যদ্বাণী করে যে মাটিতে বরফ থাকবে এবং তাদের ভবিষ্যদ্বাণী রুপ নেয় শরীরের চুলের রং সাদা করার জন্য, যা সাদা বরফের সাথে সহজেই মিশে ক্যামোফ্ল্যাজ বা লুকিয়ে থাকার বেশ তৈরী করবে। যদি উত্তর মেরুর জলবায়ু দ্রুত বদলে যায় কোনো কারণে যে কোনো শিশু মেরু ভালুক নিজেকে জন্ম নিতে দেখবে ক্রান্তীয় কোনো মরুভূমিতে, তাহলে জিনদের ভবিষ্যদ্বাণী হবে ভুল এবং এর জন্য তাদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। শিশু সেই ভালুকটি মারা যাবে, যার ভিতরে সেই জিনগুলোর বাস।

কোনো একটি জটিল পৃথিবীতে ভবিষদ্বাণী খুব ভাগ্য নির্ভর একটি কাজ। প্রতিটি সিদ্ধান্ত যা কোনো একটি সারভাইভাল মেশিনকে নিতে হয় সেটি জুয়া খেলার মত এবং জিনদের কাজ হচ্ছে মস্তিষ্ককে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করে রাখা যেন গড়পড়তা তারা সেখানে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি যেন তাদের উপকারে আসে। বিবর্তনের ক্যাসিনোতে যে বিনিময় মূল্যটি ব্যবহৃত হয় সেটি হচ্ছে ‘টিকে থাকা’, খুব কঠোর অর্থে ‘জিনদের’ টিকে থাকা, কিন্তু বহু উদ্দেশ্যে বলা যেতে পারে একক সদস্যদের টিকে থাকাটা খুব নিকটবর্তী অর্থে একটি যুক্তিসঙ্গত বিনিময় মূল্য হতে পারে। যদি আপনি কোনো পানির উৎসের কাছে পানি খেতে যান, কোনো শিকারী প্রাণীর খাদ্য হবার সম্ভাবনায় আপনি নিজের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন, যারা তাদের জীবন ধারণ করে পানির মধ্যে শিকার ধরার জন্যে লুকিয়ে থেকে। কিন্তু সেই ভয়ে আপনি যদি পানি খেতে না যান, তাহলে একসময় আপনি তৃষ্ণার্ত হয়ে মারা যাবেন। আপনি যে পথই বেছে নেন না কেন, ঝুঁকি থাকবেই এবং কিভাবে আপনার জিনগুলোর দীর্ঘায়ু হবার সম্ভাবনাকে বাড়ানো যায় আপনাকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হয়তো সবচেয়ে ভালো নীতিটি হবে, যতক্ষণ না আপনার তৃষ্ণা পাচ্ছে ততক্ষণ পানির কাছে গিয়ে পানি খাওয়াটা স্থগিত রাখতে, তারপর সময় হলে সেখানে গিয়ে বেশ ভালো পরিমান পানি পান করে আসা, যেন আপনি অনেকক্ষণ সময় পানি ছাড়া থাকতে পারেন। বিকল্পভাবে সবচেয়ে বড় বাজটি হবে অল্প করে মাঝে মাঝে পানি পান করা, পানির কোনো উৎসের পাশ দিয়ে দৌড়াবার সময় দ্রুত এক ঢোঁক পানি গিলে ফেলা। তবে কোনটি বাজীর সবচেয়ে ভালো দান, সেটি নির্ভর করে নানা ধরনের জটিল বিষয়গুলোর উপর, শুধুমাত্র শিকারী প্রাণীদের শিকার করার অভ্যাসই ন্যুনতম শর্ত না, কারণ সেটিও বিবর্তিত হয়েছে শিকারী প্রাণীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, সবচেয়ে দক্ষ কৌশল হিসাবে। সুতরাং এখানে বিপক্ষের বেশ কিছু শর্তকে গুরুত্বের সাথে বিবচেনা করতে হবে, কিন্তু অবশ্যই প্রাণীদের সম্বন্ধে আমাদের এমনভাবে ভাবতে হবে না যে, তারা এই হিসাব নিকাশগুলো খুব সচেতনভাবে করে থাকে। আমাদের শুধু বিশ্বাস করতে হবে যে সেই সব একক সদস্যদের জিন তাদের মগজকে এমনভাবে তৈরী করেছে যে তারা এই সবক্ষেত্রে সঠিক বাজিটা খেলে, যার প্রত্যক্ষ ফলাফল হচ্ছে সেই সব সদস্যদের টিকে থাকা এবং সেভাবেই তারা তাদের সেই একই জিন ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে বিস্তারে সাহায্য করবে।

আমরা বাজী ধরার এই রুপকটাকে আরো খানিকটা সামনে বাড়াতে পারি। কোনো জুয়াড়ী অবশ্যই ভাববে তিনটি প্রধান পরিমাপ– স্টেক, অড এবং প্রাইজ, বা প্রথমে তাকে কতটুকু বিনিয়োগ করতে হবে, সেই বিনিয়োগটি তার জন্য সুফল আনবার ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হবার সম্ভাবনা আছে এবং অবশেষে কি পুরষ্কার সে পাবে। যদি পুরষ্কার অনেক বড় হয়, খেলা জেতার জন্য একজন জুয়াড়ী অনেক বেশী পরিমান কিছু বাজী রাখে। কোনো জুয়াড়ী যদি তার সবকিছু একটি জুয়ার দানের উপর বাজী রাখে তার যেমন অনেককিছু জেতার সম্ভাবনা থাকে, আবার একই ভাবে তার অনেক কিছু হারানোরও সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু কোনো গড়পড়তা বড় দান দেয়া কোনো জুয়াড়ী অন্য সেই সব জুয়াড়ীদের চেয়ে ভালো বা খারাপ কোনো অবস্থাতেই থাকে না, যারা অল্প পরিমান পুরষ্কার পাবার আশায় অল্প পরিমান বাজী রাখে। একটি সদৃশ্যমূলক তুলনা হচ্ছে, স্টক মার্কেটে স্পেকুলেটিভ বা অনুমাননির্ভর আর সেফ বা নিরাপদ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পার্থক্যগুলো। বেশ কিছু উপায়ে একটি স্টমার্কেট ক্যাসিনোর চেয়ে ভালো সদৃশ উদাহরণ হতে পারে। কারণ ক্যাসিনোগুলো পরিকল্পিতভাবে এমন করে সাজানো যে এটি ব্যাঙ্কের পক্ষে কাজ করে (এর অর্থ হচ্ছে কঠোরভাবে, যারা বড় দানের জুয়াড়ী, তারা গড় পড়তায় বেশী টাকা হারায় কম দানের জুয়াড়ীদের তুলনায়, আর কম দানের জুয়াড়ীরা আরো বেশী টাকা হারায়, যারা আদৌ জুয়া খেলে না তাদের তুলনায়, কিন্তু এর কারণ অবশ্যই আমাদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক নয়।) এটিকে উপেক্ষা করলে, বড় আর ছোট দুই দানের জুয়া খেলা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। এমন কি কোনো প্রাণী জুয়াড়ী আছে যারা অনেক বড় দানের জুয়া খেলে এবং অন্যরা যারা সংযত তাদের জুয়ার দানে? অধ্যায় ৯ এ আমরা দেখবো প্রায়শই সম্ভব হবে পুরুষদের এমনভাবে দেখা, যে তারা আসলে বড় দান ও বড় ঝুঁকি নিয়ে বাজী খেলছে এবং নারীরা নিরাপদ বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে বহুগামী প্রজাতির ক্ষেত্রে যেখানে পুরুষরা নারীদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। প্রকৃতিবিদ যারা এই বইটি পড়ছেন তারা এমন কোনো প্রজাতির কথা হয়তো ভেবে দেখতে পারেন, যাদের বলা যেতে পারে, বড় দানে বড় ঝুঁকি জুয়াড়ী এবং অন্য কোনো প্রজাতি যারা তাদের জুয়া খেলায় অনেক রক্ষণশীল। আমি এখন সেই আলোচনায় ফিরে যাবো, যে আলোচনার সাধারণ মূলভাবটি হচ্ছে কিভাবে জিন ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে।

মোটামুটি অনিশ্চয়তাপূর্ণ পরিবেশে ভবিষ্যদ্বাণী করার সমস্যা মোকাবেলায় জিনদের একটি উপায় হচ্ছে কোনো কিছু শেখার ক্ষমতা বা দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। যেমন, এখানে প্রোগ্রামটি হয়তো সারভাইভাল মেশিনকে দেয়া নিম্নোক্ত নির্দেশাবলীর রুপ ধারণ করতে পারে। এখানে একটি তালিকা দেয়া হলো যাদের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে সুখকর বা পুরষ্কার হিসাবে: মুখে মিষ্টি স্বাদ, যৌনতৃপ্তি, হালকা তাপমাত্রা, শিশুর হাসিমুখ। আর এই হলো খারাপ জিনিসগুলোর তালিকা: নানা ধরনের যন্ত্রণা, বমনেচ্ছা, চিৎকাররত কোনো শিশু। আপনি যদি এমন কিছু করতে থাকেন, যার পরিণতিতে এই সব খারাপ জিনিসের তালিকা থেকে কিছু যদি আপনার সাথে ঘটে, কাজগুলো পুনরাবৃত্তি করবেন না, কিন্তু অন্যদিকে পুনরাবৃত্তি করুন, যদি সেই কাজের ফলাফল সুখকর ভালো জিনিসের তালিকার কিছু হয়ে থাকে। এই ধরনের প্রোগ্রামের সুবিধা হচ্ছে এটি আরো অনেক বিস্তারিত নিয়মকানুন অসংখ্য সূত্র সংক্ষিপ্ত করে, না হলে এই সব জটিল নিয়মগুলো মল প্রোগ্রামগুলো লিখতে হতো। এবং এটি একই সাথে সক্ষম পরিবেশের নানা পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে, যে পরিবেশ সম্বন্ধে আগে থেকে পূর্বধারণা করা যায় না বা অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা অনেক বেশী। আবার অন্যদিকে, কিছু ভবিষ্যদ্বাণী তারপরও করার ঝুঁকি নিতে হয়। আমাদের উদাহরণে জিনগুলো পুর্বধারণা করছে যে মুখে যদি মিষ্ট স্বাদ লাগে, যৌনতৃপ্তি, ভালো কিছু অবশ্যই হবে, এই অর্থে যে, শর্করা খাওয়া আর যৌন প্রজনন করাটি জিনের টিকে থাকার জন্য উপকারী। সেখানে পুষ্টিশক্তিহীন স্যাকারিন আর স্বমেহনের সম্ভাবনার বিষয়টি আগে থেকে ভাবা সম্ভব হয়নি, যেমন হয়নি, বেশী মাত্রায় শর্করা খাওয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো কথাও, বিশেষ করে আমরা যে পরিবেশে বাস করি যেখানে এর উপস্থিতি অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশী।

শেখার কৌশলগুলো কিছু কিছু দাবা খেলার কম্পিউটার প্রোগ্রামেও ব্যবহার করা হয়েছে। এইসব প্রোগ্রামগুলা আসলে আরো ভালো হয় যখন তারা মানব বিরোধীপক্ষ বা অন্য কম্পিউটারের সাথে খেলার সুযোগ পায়। যদি তারা নিজেরা বেশ কিছু নিয়ম আর কৌশল আগে থেকেই ধারণ করে, তারপরও তাদের সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়ায় ছোটখাট র‍্যানডোম কিছু প্রবণতা আগে থেকেই নির্মিত থাকে। তারা অতীতের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো রেকর্ড করে এবং যখনই তারা কোনো খেলা জেতে তারা সেই জয়ের পুর্বে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষিত করে। সুতরাং পরবর্তী সময়ে তাদের সম্ভাবনা আছে একই কৌশলগুলো থেকে আবারো বাছাই করার।

ভবিষ্যত সংক্রান্ত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী জানার একটি কৌতূহলোদ্দীপক পদ্ধতি হচ্ছে সিমুলেশন, সম্ভাব্য বাস্তব পরিস্থিতির একটি কাল্পনিক মডেল তৈরী। যদি কোনো সেনানায়ক একটি নির্দিষ্ট সামরিক পরিকল্পনা এর বিকল্প থেকে উত্তম হবে কিনা সেটি জানতে চান, তখনই তাকে ভবিষ্যদ্বাণী করার সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সেখানে আবহাওয়া ও তার সৈন্যদের মনোবলের অবস্থা সংক্রান্ত ও শত্রু পক্ষের প্রতি-আক্রমণ সংক্রান্ত উপাত্তগুলো অজানা। তার পরিকল্পনা ভালো কিনা সেটি আবিষ্কার করার একটি উপায় হচ্ছে চেষ্টা করে দেখা। কিন্তু অবশ্যই সব অনুমানিক পরিকল্পনা কাম্য নয়, যা কিনা ভাবা সম্ভব সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা, যদি শুধুমাত্র একটি কারণও যদি হয় অল্প বয়সী তরুণদের সরবরাহ, যারা কিনা তাদের দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত’ অফুরন্ত নয় এবং যখন পরিকল্পনারও কোনো অভাব নেই। সেকারণেই উত্তম নানা ধরনের পরিকল্পনা সত্যি সত্যি না করে কাল্পনিক কোন পরিস্থিতি তৈরী করা। এটি হতে পারে যেমন পুরো মাত্রার কোনো অনুশীলন, যেখানে নর্থল্যান্ড এবং সাউথল্যান্ড উভয় পক্ষই ফাঁকা গোলবারুদ ব্যবহার করবে এমনকি এমন কিছু করাও সময় ও ব্যায়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। অনেক কম অপচয় করার মাধ্যমে ওয়ার গেমস খেলা যেতে পারে, টিনের সেনা ও ছোট খেলনা ট্যাঙ্ক ব্যবহার করে বিশাল মানচিত্রের উপর জায়গা পরিবর্তন করে।

সম্প্রতি সিমুলেশনের বড় একটি অংশ পরিচালনা করার দ্বায়িত্ব নিয়েছে কম্পিউটার, শুধু সামরিক কৌশলই না, সব ক্ষেত্রেই, অনাগত কাল সম্বন্ধে যেখানে ভবিষ্যদ্বাণী করার দরকার। অর্থনীতি, পরিবেশবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান ও আরো অনেক ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার হচ্ছে এখন। এই প্রক্রিয়া কাজ করে এভাবে। কম্পিউটারে পৃথিবী সংক্রান্ত কিছু বিষয়ের মডেল আগে থেকেই তৈরী করা হয়। এর মানে এই না যে, আপনি যদি ঢাকনী সরিয়ে ⇒ খুলে দেখেন আপনি সেখানে ক্ষুদ্রকার অনুরুপ কোনো মডেল বা ডামি দেখতে পাবেন এর ভিতরে যে বিষয়টিকে সিমুলেট করা হচ্ছে সেই বিষয়টির আকার অনুসারে। দাবা খেলতে পারা কম্পিউটারে ভিতরে কোনো ‘মানসিক ছবি’ নেই তার স্মৃতির ব্যাঙ্কের ভিতর, যা কিনা দেখে মনে করা যেতে পারে দাবার গুটি সাজিয়ে রাখা কোনো দাবা খেলার বোর্ড দাবার বোর্ড ও তার বর্তমান অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করবে ইলেকট্রনিক সাংকেতিক কিছু সংখ্যা। আমাদের কাছে কোনো একটি মানচিত্র হচ্ছে ক্ষুদ্রতর স্কেলে বা মাত্রায় বানানো পৃথিবীর কোনো একটি অংশের মডেল, যাকে দ্বিমাত্রিক একটি রুপে উপস্থাপন করা হয়েছে সব উপাত্ত জড়ো করার মাধ্যমে। কোনো একটি কম্পিউটারে একটি মানচিত্রকে বিকল্পভাবে প্রতিনিধিত্ব করা যেতে পারে শহরের তালিকা ও অন্যান্য কিছু স্পটের তালিকা হিসাবে। যাদের প্রত্যেকের দুটো সংখ্যা মান থাকবে, অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশ। কিন্তু কিছু যায় আসে না কম্পিউটার আসলে কিভাবে মডেলটি ধারণ করে এর মাথায়, শুধুমাত্র বিবেচ্য বিষয় এটি এমন একটি রুপে ধারণ করবে, যার উপর সে কাজ করতে পারে, নিয়ন্ত্রণ ও নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারে এবং মানুষ অপারেটরের কাছে সে রিপোর্টগুলো পাঠাতে পারে এমন একটি রুপে যা মানুষ অপারেটররা বুঝতে পারেন। সিমুলেশনের এই কৌশল ব্যবহার করে, মডেল যুদ্ধ জেতা ও হারা যেতে পারে, কাল্পনিক বিমান ওড়ে অথবা ধ্বংস হয়,অর্থনৈতিক নীতি উন্নতির বা ধ্বংসের কারণ হয়; প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে একটি কম্পিউটারের মধ্যে, বাস্তব জীবনের এমন কিছু করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের সামান্য খণ্ডাংশ ব্যবহার করে। অবশ্যই পৃথিবীর জন্য ভালো মডেল আছে আবার খারাপ মডেল আছে, এমনকি সবচেয়ে ভালোটাই প্রকৃত পরিস্থিতির নিকটবর্তী একটি রুপ মাত্র। কোনো পরিমান কাল্পনিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবো না বাস্তবে আসলেই কি ঘটবে। কিন্তু কোনো ভালো সিমুলেশন অবশ্যই অনেক বেশী ভালো কোনো ধরনের অন্ধ প্রচেষ্টা আর ভুল করার প্রক্রিয়ার চেয়ে। সিমুলেশনকে বলা যেতে পারে ট্রায়াল ও এরর’ প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিক ট্রায়াল অ্যান্ড এরর, যে নামটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহু আগেই করায়ত্ত করেছেন ইঁদুর মনোবিজ্ঞানীরা।

যদি সিম্যুলেশন এতটাই উত্তম ধারণা হয়ে থাকে, আমরা হয়তো আশা করতে পারি সারভাইভাল মেশিনও হয়তো এটি প্রথম আবিষ্কারও করেছিল। মোটকথা তারা বহু আগে মানব প্রকৌশলীদের অনুকরণ করা বহু কৌশল উদ্ভাবন করেছিল, আমাদের যখন কারোরই অস্তিত্ব ছিলনা সেই সময়ে :যেমন ফোকাস করার লেন্স, প্যারাবলিক রিফ্লেকটর, শব্দ তরঙ্গর ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস, সার্ভো-কন্ট্রোল, সোনার, আগত তথ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বাফার এবং দীর্ঘ-নামসহ অসংখ্য কৌশল, যাদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখানে অপ্রয়োজনীয়। তাহলে সিমুলেশনের ব্যপারটি কি? বেশ, যখন আপনি নিজে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে ভবিষ্যত সংক্রান্ত কিছু অজানা উপাত্ত বিদ্যমান, আপনাকে সেখানে একধরনের সিমুলেশনের সাহায্য নিতে হয়। আপনি কল্পনা করেন কি কি হতে পারে আপনি যদি আপনার সামনে থাকা প্রতিটি বিকল্প পরীক্ষা করে দেখেন। আপনি আপনার মস্তিষ্কে একটি মডেল তৈরী করে নেন, পৃথিবীর সব কিছু নিয়ে নয় বরং কিছু সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় বা নিয়ামকের সেট, যাদের আপনি ভাবছেন সেই বিশেষ সিদ্ধান্ত নেবার জন্য প্রাসঙ্গিক। আপনি হয়তো স্পষ্টভাবে আপনার মানসচক্ষতে পুরো বিষয়টি দেখতে পারেন অথবা সেই সব বিষয়গুলোর কোনো রুপকে আপনার মনের সিমুলেশন আপনি দেখতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যেকোনো ক্ষেত্রেই খুবই কম সম্ভাবনা আছে যে আপনার মস্তিষ্কের কোথাও আসলেই একটি জায়গায় আপনি যা কল্পনা করছেন সেটির সত্যিকারের একটি স্থান দখলকারী মডেল আছে। কিন্তু, ঠিক কম্পিউটারের মতই, কিভাবে আপনার মস্তিষ্ক এর মডেলটি ব্যবহার করছে তার বিস্তারিত প্রক্রিয়াটি, এটি যে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কোনো ঘটনা পূর্বধারণা করতে সক্ষম তার থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সারভাইভাল মেশিনগুলো যারা কিনা ভবিষ্যতের কিছু কাল্পনিকভাবে সিমুলেট করতে পারে তারা অন্য সেই সব সারভাইভাল মেশিন থেকে বহু ধাপ এগিয়ে যায়, যারা শুধুমাত্র কিছু করা ও ভুল করার মাধ্যমে শেখে। সুস্পষ্টভাবে ট্রায়ালের সমস্যা হচ্ছে যে, এটি সময় আর শ্রমসাপেক্ষ একটি ব্যাপার। আর সুস্পষ্টভাবে ভুল হচ্ছে প্রায়শই প্রাণঘাতি। সিমুলেশন এ-কারণেই নিরাপদ আর দ্রুততর।

সিমুলেশন করার দক্ষতার বিবর্তন খুব সম্ভবত তার চূড়ান্ত রুপ পেয়েছিল আত্মগত সচেতনার উদ্ভব হবার মাধ্যমে। আর কেন এমনটাই ঘটার কথা, আমার মতে আধুনিক জীববিজ্ঞানে এটাই সবচেয়ে গভীরতম রহস্য। কোনো কারণ নেই মনে করার যে, ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটার সচেতন যখন তারা কোন কিছু সিমুলেট করে, যদিও আমাদের স্বীকার করতে হবে ভবিষ্যতে তারা হয়ত সেটাই হতে পারে। হয়তো সচেতনার উদ্ভব হয়েছিল যখন মস্তিষ্কের পৃথিবীকে সিমুলেশন করার ক্ষমতা এতটাই সম্পূর্ণ হয়েছিল যে, এটি অবশ্যই তার নিজের একটি মডেলও সংযুক্ত করেছিল (৪)। কোন সারভাইভাল মেশিনের শরীর ও হাত-পা অবশ্যই কল্পনার পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তৈরী করে। অনুমান করা যায় একই ধরনের কোনো কারণে, সিমুলেশনটাকেই মনে করা যেতে পারে পৃথিবীর কোনো একটি অংশের মত, যাকে সিমুলেশন করা হবে। আসলেই এর জন্য আরেকটি শব্দ হতে পারে ‘আত্ম-সচেতনতা। কিন্তু আমি এটাকে সচেতনতা বিবর্তনের পুরোপুরিভাবে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা হিসাবে মনে করিনা। আর এর কারণ আংশিকভাবে শুধুমাত্র এর সাথে নিরন্তর পশ্চাৎমুখী যুক্তি বা রিগ্রেসের আশ্রয় নিতে হয়– যদি কোনো একটি মডেলের মডেল থাকে, তাহলে কেনই বা মডেলের মডেলের মডেলের মডেল .. হবে না?

সচেতনতা যে দার্শনিক সমস্যাই সৃষ্টি করুক না কেন, এই কাহিনীর উদ্দেশ্যে এটিকে ভাবা যেতে পারে তাদের মূল নিয়ন্ত্রক মনিব, ‘জিনদের নিয়ন্ত্রণ থেকে সারভাইভাল মেশিনদের নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী হিসাবে মুক্তি লাভ করা একটি প্রক্রিয়া হিসাবে। শুধুমাত্র দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক হিসাবে তারা সারভাইভালে মেশিনের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডই পরিচালনা করে না, তারা একই সাথে সেই যোগ্যতাও অর্জন করে, যে যোগ্যতার বলে তারা ভবিষ্যত সম্বন্ধে পূর্বধারণাও করতে পারে এবং সেই অনযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমনকি তাদের সেই জিনের নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার ক্ষমতাও আছে, যেমন তাদের যতটা সন্তান নেবার ক্ষমতা আছে ততটা সন্তান নিতে অস্বীকার করা। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মানুষ অবশ্যই বিশেষ একটি উদাহরণ, আমরা পরে সেটাই দেখতে পাবো।

কিন্তু পার্থবাদীতা আর স্বার্থপরতার কি সম্পর্ক? আমি চেষ্টা করছি। সেই ধারণাটি গড়ে তুলতে যে, কোনো জীবের আচরণ, স্বার্থপরতার অথবা পরার্থবাদীতা– জিনদের নিয়ন্ত্রণাধীন, তবে শুধুমাত্র পরোক্ষভাবে, কিন্তু তাসত্ত্বেও খুব শক্তিশালী অর্থে। কিভাবে সারভাইভাল মেশিন ও তার স্নায়ুতন্ত্র তৈরী হবে সেই বিষয়টির নির্দেশনা দেবার মাধ্যমে জিনরা আচরণের উপর তাদের চূড়ান্ত ক্ষমতার প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু প্রতি মুহূর্তের সিদ্ধান্তগুলো, যেমন এরপর কি করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেয় স্নায়ুতন্ত্র। জিনরাই প্রাথমিক নীতিনির্ধারক, আর মস্তিষ্ক হচ্ছে তাদের নীতি বাস্তবায়নকারী। যখন মস্তিস্ক আরো বেশী উচ্চ পর্যায়ের সংগঠন আর উন্নত হতে থাকে, তারা ক্রমান্বয়ে আরো বেশী পরিমান সত্যিকারের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নিতে থাকে, নানা ধরনের কৌশল, যেমন কোনো কিছু শেখার মাধ্যমে বা সেটা করার কোনো কাল্পনিক পরিস্থিতির মডেল বা সিমুলেশন সৃষ্টি করে। আর এই প্রবণতার যৌক্তিক উপসংহার হচ্ছে, এখনো কোনো প্রজাতি যা অর্জন করতে পারেনি, সেটি হবে জিনদের জন্য তাদের সারভাইভাল মেশিনকে একটি মাত্র সার্বিক কোনো নীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা: সেটাই করো যা কিছু তোমার মনে হয় ভালো আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

কম্পিউটার আর মানুষের সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়াটির সদৃশ্যতার বিষয় সব ঠিকই আছে, কিন্তু এখন অবশ্যই আমাদের বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে বিবর্তন আসলেই ঘটে ধাপে ধাপে ক্রমান্বয়ে, জিনপুলে জিনদের বৈষম্যমূলকভাবে টিকে থাকার মাধ্যমে। সুতরাং, কোনো একটি আচরণের প্যাটার্ন, সেটি স্বার্থপরতা আর পরার্থবাদী যাই হোক না– তার বিবর্তন হবার জন্যে প্রয়োজন যে সেই আচরণের জন্য দায়ী জিনের জিন পুলে বেশী সফলভাবে বাঁচা, তার অন্য কোন প্রতিদ্বন্দ্বী জিনে বা অ্যালিলের তুলনায়, যারা ভিন্ন কোনো আচরণের জন্য দায়ী। পার্থবাদী আচরণের জন্য জিনের অর্থ হচ্ছে এমন কোনো জিন যা স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের উপর এমন ভাবে তাদের প্রভাব বিস্তার করে, যা তাদের পরার্থবাদী আচরণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় (৫)। পরার্থবাদী আচরণের জিনগত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত পরীক্ষামূলক কি কোনো প্রমাণ আছে? না, কিন্তু সেটি নিয়ে বিস্মিত হবার কারণ প্রায় নেই বললেই চলে, কারণ কোনো আচরণের জিনতত্ত্ব নিয়ে খুব কম কাজই হয়েছে। বরং আমি আপনাদের একটি গবেষণা নিয়ে কিছু বলি। যে গবেষণাটি করা হয়েছিল আচরণের প্যাটার্নের উপর, যা দেখতে খুব স্পষ্টভাবে পরার্থবাদী আচরণ হিসাবে মনে হয় না। কিন্তু জটিল কৌতূহল মেটানোর জন্য সেটি যথেষ্ট, এটি একটি মডেল হিসাবে কাজ করতে পারে, কিভাবে পরার্থবাদী আচরণ উত্তরধিকার সূত্রে অর্জন করা সম্ভব হতে পারে।

মৌমাছিরা একটি সংক্রামক ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়, যার নাম ‘ফাউল ব্রুড’। মৌচাকের কোষের মধ্যেই থাকা অবস্থায় লার্ভা বা গ্রাবদের আক্রমণ করে। গৃহপালিত মৌমাছিদের যে জাত মৌচাষীরা ব্যবহার করে থাকেন, তাদের কোনো কোনোটি ফাউল ব্রুডে আক্রান্ত হবার জন্য বেশী ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেখা গেছে যে এই জাতগুলোর মধ্যে পার্থক্য অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু আচরণগত। যেমন, তাদের স্ট্রেইনটি যাকে বলা হয় “হাইজেনিক’ স্ট্রেইন, তারা খুব সহজে এই রোগের মহামারী থেকে বাঁচতে পারে আক্রান্ত লার্ভাটিতে শনাক্ত করার মাধ্যমে, তারা কোষ থেকে সেটি বের করে আনে ও মৌচাকের বাইরে ফেলে দেয়। নাজুক ঝুঁকিপুর্ণ স্ট্রেইনটি এই ‘হাইজেনিক’ শিশুহত্যার মত কোনো আচরণ করে না। এখানে যে আচরণটি সংশ্লিষ্ট সেটি আসলেই জটিল। কর্মী মৌমাছিরা সেই কোষ খুঁজে বের করে, যেখানে আক্রান্ত লার্ভাটি থাকে, কোষের মুখে মোমের ঢাকনীটি সরিয়ে ফেলে, লার্ভাটিকে সেখান থেকে বের করে, তারা তাদের মৌমাচের ঢোকার মুখের দরজার কাছে টেনে নিয়ে এসে বাইরে ময়লার স্তূপে ছুঁড়ে ফেলে।

মৌমাছির উপর কোনো জিনতাত্ত্বিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা বেশ জটিল একটি বিষয় বেশ কয়েকটি কারণে। কর্মী মৌমাছিরা নিজেরা সাধারণত প্রজনন করে না সুতরাং আপনাকে একটি জাতের রানির সাথে অন্য একটি জাতের ড্রোন (পুরুষ) এর আন্তঃপ্রজনন করাতে হবে। তারপর ভালোভাবে কন্যা শ্রমিকদের আচরণ লক্ষ করতে হবে। এটাই করেছিলেন,ডাবলিউ জি রথেনবুহলার। প্রথম প্রজন্মের সব হাইব্রিড বা সংকর কন্যাদের মৌচাকগুলো ‘নন–হাইজিনিক’ প্রকারের: তাদের ‘হাইজেনিক’ পিতামাতার আচরণ হারিয়ে গেছে বলেই মনে হয়। দেখা গেছে হাইজিনিক জিন সেখানে এখনও আছে কিন্তু তারা সেখানে রিসেসিভ, যেমন, মানুষের নীল চোখের রিসেসিভ জিন। যখন রোথেনবুহলার আবার ব্যাক ক্রস বা আন্তঃপ্রজনন ঘটান প্রথম প্রজন্মের সংকরদের সাথে বিশুদ্ধ হাইজেনিক জাতের (আবারো অবশ্যই রাণী ও ড্রোন ব্যবহার করে), তিনি এবার বিস্ময়কর কিছু ফলাফল দেখতে পান। কন্যাদের মৌচাক মোট তিন প্রকারের হয়, একটি গ্রুপ সঠিক হাইজিনিক আচরণ করে, দ্বিতীয়টি কোনো হাইজিনিক ব্যবহার দেখায় না আদৌ। আর তৃতীয়টি আংশিক হাইজিনিক হয়। শেষ গ্রুপটি মৌচাকের আক্রান্ত লার্ভাসহ কোষের মুখে মোমের আবরণটি সরায় ঠিকই, তারা আর বাকী কাজটা করে না, অর্থাৎ আক্রান্ত লার্ভাদের বাইরে নিয়ে এসে ফেলে দেয়ার কাজটি তারা করেনা। রোথেনবুহলার বিষয়টির ব্যাখ্যা করেন এভাবে, আসলে সেখানে দটি ভিন্ন জিন আছে, একটি জিন মোমের আবরণ খোলার জন্য আর একটি জিন আক্রান্ত লার্ভাদের বাইরে ফেলে দিয়ে আসার জন্য। সাধারণ হাইজেনিক জাতদের দুটো জিনই থাকে, আর যারা হাইজিনিক না তাদের থাকে এর বদলে তাদের অ্যালিল বা প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি জিন। আর সংকর স্ট্রেইনটি যারা এর অর্ধেক কাজ করে তাদের ধারণা করা হয় তারা কেবল হয়তো মোমের আবরণ খোলা বা ‘আনকাপিং’ জিনটি পায় (দ্বিগুণ মাত্রায়) কিন্তু লার্ভাদের বাইরে বের করে এনে ফেলে দেবার বা ‘থ্রোইং আউট’ জিনটি না। রোথেলবুহলার অনুমান করেছিলেন তার পরীক্ষাধীন গ্রুপের পুরোপুরি নন হাইজিনিক মৌমাছিরা হয়তো একটি সাবগ্রুপকে লুকিয়ে রাখে যারা গ্রোয়িং আউট জিন ধারণ করে কিন্তু সেটি দেখাতে পারেনা কারণ তাদের আনক্যাপিং জিনটি থাকে না। তিনি এটি নিশ্চিৎ করেন চমৎকার একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেই মোমের ঢাকনীগুলো সরিয়ে রেখে, দেখা যায় আসলেই আপাতদৃষ্টিতে নন হাইজিনিক মৌমাছিদের অর্ধেক মৌমাছি পুরোপুরি ভাবে বিশুদ্ধ ‘গ্লোয়িং আউট’ আচরণটি প্রদর্শন করে(৬)।

এই কাহিনীটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ব্যাখ্যা করে যা আগের অধ্যায়ে আলোচনায় এসেছিল। এটি প্রদর্শন করছে যে খুব সঠিকভাবে বলা যেতে পারে, এই জিনটি এই আচরণের জন্য এমনকি যদিও আমাদের ন্যূনতম কোনো ধারণা নেই সেই ভ্রূণতাত্ত্বিক কারণের রাসায়নিক ধারাবাহিকতার শৃঙ্খল যা জিন থেকে কোনো একটি আচরণের দিকে নির্দেশিত হতে পারে। শঙ্খলের কার্যকারণ এমন কি হতে পারে কোনো কিছু শেখার সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন, হতে পারে যে আনক্যাপিং বা মৌচাকের কোষের ঢাকনীটি খোলার জিনটি প্রভাব খাটায় মৌমাছিদের আক্রান্ত মোমের স্বাদ নেবার ক্ষমতা দিয়ে। তার মানে তারা আক্রান্ত কোষের মোমের ঢাকনী খাওয়ার ব্যাপারটা সুখকর বা এক ধরনের পুরষ্কারের মত মনে করে এবং সেই কারণে এর পুনরাবৃত্তি করার তাদের একটি প্রবণতা থাকে। এমনকি যদি এভাবে জিন কাজ করে থাকে, তারপরও আসলেই এটি একটি সত্যিকারের জিন যা আনক্যাপিং এর জন্য চিহ্নিত, তবে শর্ত হচ্ছে যে, অন্য সব কিছু যদি অপরিবর্তিত থাকে, মৌমাছিরা যারা এই জিনটি বহন করে তারা আনক্যাপিং এর কাজটি করে এবং যে মৌমাছিদের এই জিনটি নেই তারা কোন অ্যানক্যাপিং প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়না।

দ্বিতীয়ত, এটি আরো একটি বাস্তব সত্যকে ব্যাখ্যা করে, সেটি হচ্ছে। তাদের সমাজবদ্ধ সারভাইভাল মেশিনের আচরণের উপর কোন প্রভাব ফেলার জন্য জিনরা পারস্পরিক সহযোগিতা করে। গ্লোয়িং আউট জিনটি কোনো কাজে আসে না যদি না তার সাথে আনক্যাপিং জিনও উপস্থিত না থাকে, একইভাবে থ্রোয়িং আউট জিন ছাড়া আনক্যাপিং জিনও কোনো কাজ করে না। তারপর জিনগত এই পরীক্ষা দেখিয়েছে, একই সাথে স্পষ্টভাবে নীতিগতভাবে দুটি জিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাদের সেই যাত্রায় সহজেই বিচ্ছিন্নযোগ্য। তাদের উপযোগী কাজটি নিয়ে নিয়ে যদি ভাবেন, আপনি তাদের একটি পারস্পরিক সহযোগিতাময় ইউনিট হিসাবে ভাবতে পারেন, কিন্তু অনুলিপনকারী জিন হিসাবে তারা দুটি মুক্ত এবং স্বতন্ত্র এজেন্ট।

এই তর্কের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রয়োজন হবে সেই সব জিনগুলো সম্বন্ধে অনুমান করার জন্য, যারা সব ধরনের অসম্ভাব্য কাজের ‘জন্য দায়ী। আমি যদি কথা বলি, যেমন– এমন কোনো হাইপোথেটিকাল জিনকে নিয়ে, যা তাদের সঙ্গীকে বাঁচায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়া থেকে এবং আপনি হয়তো এমন কোনো ধারণাকে অবিশ্বাস্য মনে করতে পারেন, তখন হাইজিনিক মৌমাছিদের গল্পটা স্মরণ করবেন। মনে করে দেখবেন, আমরা জিনকে নিয়ে এমন ভাবে কোনো কথা বলছি না, যেখানে তারা একক ভাবে পূর্বকারণ হবে সব জটিল মাংসপেশী সংকোচন, সংবেদনশীল উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ এবং এমনকি কোন সচেতনভাবে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো, যেগুলো সব জড়িত কাউকে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচানেরা জন্যে। আমরা সেই প্রশ্নটি নিয়ে এখনও কিছু বলছি না, অর্থাৎ কোনো আচরণের গড়ে ওঠান প্রক্রিয়ায় কিছু শেখা,অভিজ্ঞতা বা পরিবেশের প্রভাব কতটুকু ভূমিকা পালন করে। আপনার শুধু মানতে হবে, এটা সম্ভব যেকোনো একটি একক জিনের জন্য, যদি আর সব কিছু অপরিবর্তিত থাকে এবং আরো অনেক জিনের সেখানে উপস্থিতি ও পরিবেশ জণিত শর্ত নিশ্চিৎ হয়, তাহলে এর বিকল্প অ্যালিলের তুলনায় সে এমন কোনো শরীর তৈরী করবে যার ডুবন্ত কাউকে বাঁচানোর সম্ভাবনা থাকবে বেশী। দুটি জিনের পার্থক্যে হয়তো দেখা যেতে পারে সামান্য কিছু পরিমানবাচক পার্থক্য। ভ্রূণগত বিকাশের বিস্তারিত প্রক্রিয়া, যতই কৌতূহলোদ্দীপক তারা হোক না কেন, এখানে তারা অপ্রাসঙ্গিক বিবর্তনীয় বিবেচনায়। কনরাড লরেনজ বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

জিনরা হচ্ছে মাষ্টার প্রোগ্রামার,আর তারা প্রোগ্রামিং করছে তাদের জীবন বাঁচাতে। তাদের বিচার করা হয় তাদের প্রোগ্রামের সফলতার উপর নির্ভর করে, কতটা সফলভাবে তারা খাপ খাইয়ে নেই জীবনের সব ঝুঁকি থেকে যা তাদের সারভাইভাল মেশিনকে মোকাবেলা করতে হয়। আর এর বিচারক হচ্ছে নিষ্ঠুর বিচারক, টিকে থাকার আদালতে। আমরা পরে সেই পথে আসবো যেখানে জিনের টিকে থাকাটা প্রতিপালিত আর সংরক্ষিত হয় এমন কিছু দিয়ে যা আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় পরার্থবাদী বা পরোপকারী আচরণ। কিন্তু স্পষ্টতই প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে, সেই সারভাইভাল মেশিনের এবং সেই মস্তিষ্কটির, যা এর হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়-একক সদস্যটির টিকে থাকা ও প্রজনন সাফল্য। কলনিতে বাস করা সব জিন একমত হয়ে এই অগ্রধাধিকারের ব্যপারটিতে। প্রাণীরা সেকারণেই অনেক জটিল আর বিস্তারিতভাবে পরিকল্পনায় কালক্ষেপণ করে খাদ্য খোঁজা ও সংগ্রহে, নিজেদের কারো খাদ্য হওয়া থেকে বাঁচাতে, কোনো অসুখ বা দুর্ঘটনা থেকে থেকে বাঁচিয়ে রাখতে, নিজেদের কোনো বৈরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা করতে, বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের প্রজনন করার জন্য রাজী করাতে, তাদের সন্তানদের জন্য সেই সুযোগ সুবিধাগুলো ব্যবস্থা করতে, তারা নিজেরা যা ভোগ করেছে। আমি কোনো উদাহরণ দেবো না– যদি আপনি কোনো উদাহরণ চান, শুধুমাত্র খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করুন কোনো বণ্য প্রাণী যার সাথে আপনার দেখা হতে পারে এরপর কোনো এক সময়ে। কিন্তু আমি একটি বিশেষ ধরনের কারণের কথা উল্লেখ করতে চাই কারণ আমাদের সেই আচরনের প্রতি তথ্যসূত্রের ইঙ্গিত দিতে হবে যখন আমরা পরার্থবাদীতা ও স্বার্থপরতা নিয়ে কথা বলবো। এই আচরণটিকে ব্যাপকার্থে কমিউনিকেশন বা সংযোগ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে (৭)।

বলা যেতে পারে একটি সারভাইভাল মেশিন আরেকটি সারভাইভাল মেশিনের সাথে যোগাযোগ করছে যখন সে এটির আচরণ বা এর। স্নায়ুতন্ত্রের কোনো অবস্থাকে প্রভাবিত করছে। এটি এমন কোনো সংজ্ঞা নয়, যা খুব দীর্ঘ সময় ধরে আমার সমর্থন করতে পছন্দ করা উচিৎ। ‘প্রভাব’ শব্দটি দিয়ে আমি বোঝাতে চাইছি সরাসরি কারণ সংক্রান্ত প্রভাব। সংযোগ বা কমিউনিকেশনের উদাহরণ অগণিত পাখিদের গান, ঝিঁঝি পোকার গান, কুকুদের লেজ নাড়ানো বা এর ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে দাঁড়ানো, শিম্পাঞ্জিদের দাঁত বের করা হাসি, মানুষের অঙ্গভঙ্গী ও ভাষা। সারভাইভাল মেশিনদের বহু সংখ্যক কাজই পরোক্ষভাবে তাদের জিনদের কল্যাণ নিশ্চিৎ করে অন্যান্য সারভাইভাল মেশিনদের আচরণ প্রভাবিত করার মাধ্যমে। সংযোগ যেন কার্যকরী হয় সেটা নিশ্চিৎ করতে প্রতিটি জীবই অনেক পরিশ্রম করে। পাখিদের গান বহু প্রজন্মের মানুষকে মুগ্ধ করে এসেছে, আন্দোলিত করেছে এর রহস্যময়তায়। আমি ইতিমধ্যে হাম্পব্যাক তিমিদের আরো বেশী বিস্তারিত আর রহস্যময় সঙ্গীতের কথা বলেছি, এর বিস্ময়কর ব্যপ্তি এবং এর শব্দ তরঙ্গ সৃষ্টি করার ক্ষমতা মানুষের শ্রাব্যক্ষমতা তো বটেই, এছাড়াও সাবসনিক (শ্রাব্যতার সীমার নীচে) গোঙ্গানী থেকে আন্ট্রাসনিক (শ্রাব্যতার সীমার উপরে) চিৎকারও অন্তর্ভুক্ত। মোল-ক্রিকেটরা তাদের গানের তীব্রতা বাড়াতে পারে অনেক উচ্চ শব্দে, যখন মাটির নীচের গর্তে তারা গান গায়, খুব সতর্কতার সাথে যারা গর্ত খোড়ে দ্বিগুণ হারে বাড়ানো শিঙ্গা বা মেগাফোনের আকৃতি সৃষ্টি করে। অন্ধকারে মৌমাছিরা নাচে অন্য মৌমাছিদের কোথায় খাদ্য আছে তার দুরত্ব আর নির্দেশনা বোঝাতে, এই ধরণের যোগাযোগের শ্রেষ্ঠত্বের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে শুধু মানুষের ভাষা।

প্রাণীদের আচরণ নিয়ে কাজ করেন এমন বিজ্ঞানী বা ইথোলজিষ্টদের চিরাচরিত কাহিনীর একটি হচ্ছে যোগাযোগের সংকেত বিবর্তিত হয় যে সংকেত প্রেরণকারী আর গ্রহীতা, উভয়ের পারস্পরিক কল্যাণে স্বার্থে। যেমন, ধরুন পাখির বাচ্চারা তাদের মায়ের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে খুব তীব্র স্বরে আওয়াজ করে যখন তারা হারিয়ে যায় বা ঠাণ্ডায় কাতর হয়। এই আচরণের প্রত্যক্ষ ফলাফল হচ্ছে ঘটনাস্থলে মায়ের উপস্থিত হওয়া, যে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাকে নিরাপদ আশ্রয়ে অন্যান্য বাচ্চাদের সংস্পর্শে ফিরিয়ে আনে। এই আচরণকে বলাই যেতে পারে পারস্পরিক সুবিধার জন্য বিবর্তিত হয়েছে, এই অর্থে যে প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব বাচ্চাদের আনুকুল্য প্রদর্শন করে যারা এভাবে ডাকে যখন তারা হারিয়ে যায় এবং এধরনের ডাক শোনার পর সঠিক প্রত্যুত্তর দেবার জন্য মায়েদেরকেও সুবিধা দেয়।

যদি আমরা চাই (যদিও আসলেই সেটা আবশ্যিক নয়), আমরা এই সব সংকেত বা চিপ কল’ কে নিয়ে ভাবতে পানি তাদের একটি অর্থ আছে বা তারা কোনো তথ্য বহন করছে: এই ক্ষেত্রে ‘আমি হারিয়ে গেছি। ছোট পাখিদের দেয়া কোনো সতর্কবাণী, যা আমি প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি, বলা যায় এমন কোনো তথ্য বহন করে, ‘বাজ-পাখি আছে নিকটে’; কোনো প্রাণী যে এই তথ্যটি পাবে এর উপর ভিত্তি করে সে তার আচরণ করবে ও এর ফলে সে উপকৃত হবে; সুতরাং বলা যায় এই তথ্যটি সত্যি। কিন্তু প্রাণীরা কি কখনো মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে, তারা কি কখনো মিথ্যা বলে?

কোনো প্রাণী মিথ্যা কথা বলছে এই ধারণাটিকে খুব সহজে ভুল। বোঝার সম্ভাবনা থাকে, সুতরাং আমি আগে থেকেই সেই ভ্রান্ত ধারণাটিকে ঠেকাতে চেষ্টা করবো। আমার মনে পড়ছে বিয়েত্রিস ও অ্যালেন গার্ডনারের দেয়া একটি লেকচারে আমি উপস্থিত ছিলাম, যেখানে তারা কথা বলতে পারা বিখ্যাত শিম্পাঞ্জি ওয়াশো (তিনি আমেরিকার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করেছিলেন এবং তার গবেষণা ও অর্জন আসলেই ভাষার শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়) সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য আদান প্রদান করছিলেন। দর্শকের সারিতে বেশ কিছু দার্শনিকও ছিলেন এবং লেকচার পরবর্তী আলোচনায় তারা বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা বিতর্কও করছিলেন, ওয়াশো কি মিথ্যা বলতে পারে কিনা। আমার সন্দেহ যে গার্ডনাররা ভেবেছিলেন এর চেয়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে সেখানে আলোচনা করার এবং আমি তাদের সাথে একমত এ ব্যাপারে। এই বইতে আমি প্রতারণা বা ছলনা আর মিথ্যার মত শব্দগুলো উচ্চারণ করছি আরো সরাসরি কোনো অর্থে, সেই দার্শনিকদের প্রস্তাবিত অর্থে না। তারা ছলনা বা প্রতারণা করার ‘সচেতন’ উদ্দেশ্য নিয়ে আগ্রহী। আমি শুধুমাত্র কথা বলছি কোনো একটি প্রভাবের কথা, যা কার্যকরীভাবে ছলনা বা প্রতারণার সমতুল্য হতে পারে। যদি কোনো পাখি “বাজ পাখি কাছে কাছে এমন কোনো সংকেত ব্যবহার করে যখন কিনা সেখানে কোনো বাজ পাখি সেখানে নেই, যার মাধ্যমে তার সহকর্মী পাখিরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়, আর সে একা তাদের সবার খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়, তখন আমরা হয়তো বলতে পারি এই পাখিটি মিথ্যা কথা বলেছে।, সে পরিকল্পিত উপায়ে সচেতনভাবে ছলনা করতে চেয়েছে কিনা, আমরা এমন কোনো অর্থ করছি না। যে বিষয়টি আমাদের অর্থ বোঝাচ্ছে সেটি হলো, এখানে মিথ্যাবাদী অন্য পাখিদের বঞ্চিত করে তাদের খাদ্য খাবার সুযোগ পেলো। এবং যে কারণে অন্য পাখিরা সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল তাহলে তারা মিথ্যাবাদী পাখির ডাকে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল এমন ভাবে যা কোন বাজ পাখির উপস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।

বহু খাওয়ার উপযোগী কীটপতঙ্গ, যেমন আগের অধ্যায়ের প্রজাপতিরা, তাদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাজে স্বাদের বা কামড় দেয় এমন পোকামাকড়ের বাইরের রুপটি মিমিক বা অনুকরণ করে। আমরা নিজেরাই কোনো হলুদ কালো ডোরা কাটা হোভার-ফ্লাইকে ভয়ঙ্কর বোলতা ভেবেপ্রায়ই বোকা বনে যাই। মৌমাছিদের অনুকরণ করা কিছু মাছিরা আরো বেশী নিখুঁত তাদের ছলনাময় ছদ্মরুপে। শিকারী প্রাণীরা মিথ্যা কথা বলে। অ্যাঙলার মাছ। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে সাগরের তলদেশে, চারপাশের পরিবেশের সাথে শনাক্ত করা সম্ভব না এমনভাবে, তাদের একটি মাত্র চোখে পড়ার মত অঙ্গ হচ্ছে কেঁচোর মত আকাবাকা একটুকরো মাংস যা লেগে থাকে একটা দীর্ঘ ‘মাছ ধরার ছিপের মত মাথা থেকে সামনের দিকে বেরিয়ে আসা একটি বর্ধিত অংশে। যখনই কোনো ছোট মাছ নিকটে আসে, অ্যাঙলার তার কেঁচোর মত টোপটাকে নাড়ায় তার সামনে এবং এটিকে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসে তাদের লুকিয়ে রাখা মুখের কাছে, হঠাৎ করে এটি তার মুখ হা করে, এবং সেখানে টেনে নেয় মাছটাকে তার খাদ্য হিসাবে। এখানে অ্যাঙলার যেন মিথ্যা কথা বলেছে, সে ব্যবহার করছে কেঁচোর মত মোচড়ানোর ভঙ্গি করা কোন বস্তুর প্রতি মাছদের আকর্ষিত হবার প্রবণতাকে : সে এখানে বলছে, “দেখো এই যে একটা কেঁচো এবং যেকোনো ছোট মাছ যে এই মিথ্যাকে বিশ্বাস করে, দ্রুত সে প্রাণ হারায় অ্যাঙলার মাছের খাদ্য হিসাবে।

কিছু সারভাইভাল মেশিন অন্যদের যৌন কামনাকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। ‘বি’ অর্কিড মৌমাছিদের তাদের ফুলের সাথে সঙ্গম করতে প্ররোচিত করে, কারণ তাদের ফুলগুলো স্ত্রী মৌমাছিদের মত দেখতে। এখানে ছলনার আশ্রয় নিয়ে অর্কিডের লাভ হচ্ছে পরাগায়ন, কারণ কোনো মৌমাছি দুটি অর্কিড ফুলের দ্বারা বোকা বনে গেলেও ঘটনাচক্রে সে একটি থেকে অন্য ফুলে পরাগরেণু বহন করে নিয়ে যায়। জোনাকীরা (যারা মূলত বীটল) তাদের সঙ্গীদের আকর্ষণ করে আলো জ্বলিয়ে নিভিয়ে তাদের দিকে নির্দেশ করে। প্রতিটি প্রজাতির নিজস্ব এই আলো জ্বালানো নিভানোর নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা মোর্স কোডের ডট-ড্যাশের মত প্যাটার্ন আছে, যা ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে যে কোনো ধরনের সংশয় দূর করে, যা ক্ষতিকর সংকর তৈরী হওয়া থেকে প্রজাতিকে সুরক্ষা করে। ঠিক যেভাবে নাবিকরা কোনো নির্দিষ্ট বাতিঘরের আলো জ্বলা আর নেভার প্যাটার্নের প্রতি লক্ষ রাখে, তেমনি জোনাকীরাও তাদের নিজেদের প্রজাতির সদস্যদের সেই আলোর সাংকেতিক বার্তা খুঁজে বের করে। ফোটুরিস (Photuris) গণর স্ত্রী সদস্যরা ‘আবিষ্কার করেছে যে তারা ফোটিনাস (Photinus) গণর পুরুষ সদস্যদের আকর্ষণ করতে পারে, যদি তারা ফোটুরিস গণর কোনো স্ত্রী সদস্যর আলো জ্বলা-নেভার সাংকেতিক কোডটি অনুকরণ করতে পারে। এবং তারা সেটি করে, এবং যখন কোনো একটি ফোটিনাস পুরুষ সেই সংকেতের ডাকে বোকা বনে গিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়, তাকে দ্রুত খাদ্য হিসাবে খেয়ে ফেয়ে ফোটুরিস স্ত্রী সদস্যরা। সাইরেন বা লোরেলেইদের কথা মনে পড়ে যেতে পারে এর সদৃশ্য কোনো একটি উদাহরণ হিসাবে। কিন্তু কর্নিশ কেউ (ইংল্যান্ডের কর্নওয়ালে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী) পছন্দ করবেন সেই প্রাচীন যুগের ‘রেকারদের কথা ভাবতে, যারা লন্ঠন বাতি ব্যবহার করে জাহাজদের পাথুরে উপকুলের দিকে প্রলোভিত করে নিয়ে যেত, তারপর লুট করতে পাথরের আঘাতে ভেঙ্গে পড়া জাহাজের সব মালামাল।

যখনই যোগাযোগের কোনো পদ্ধতি বিবর্তিত হয়, তখন সবসময়ই বিপদের আশঙ্কা থাকে কেউ হয়তো নিজেদের স্বার্থে এই পদ্ধতিটিকে ব্যবহার করতে পারে। প্রজাতির জন্য মঙ্গল’, বিবর্তনের এমন একটি ধারণা নিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠার কারণে স্বাভাবিকভাবে আমরা প্রথমে মিথ্যাবাদী আর প্রতারকদের ভিন্ন। কোনো প্রজাতির সদস্য হিসাবেই ভাবি: শিকারী প্রাণী, শিকার, পরজীবি এরকম আরো অনেক। তবে আমাদের অবশ্যই মিথ্যা আর ছলনা এবং যোগাযোগ পদ্ধতির স্বার্থপর অপব্যবহার প্রত্যাশা করতে হবে, যার উদ্ভব হয় যখনই ভিন্ন ভিন্ন একক সদস্যদের জিনগত স্বার্থগুলো আলাদা হয়। আর এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত একই প্রজাতির সদস্যরাও। আমরা পরে দেখবো, অবশ্যই আমরা এমনকি আশা করতে পারি যে শিশুরা তাদের পিতামাতার সাথে ছলনা করবে, স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের সাথে প্রতারণা করবে এবং ভাই ভাইকে মিথ্যা বলবে।

এমনকি সেই বিশ্বাসটিও, প্রাণীদের যোগাযোগের সংকেত মূলত বিবর্তিত হয়েছে পারস্পরিক সুবিধা আদান প্রদানের বিষয়টি লালন করার জন্য এবং তারপর সেটি অপব্যবহৃত হয়ে খারাপ উদ্দেশ্যপূর্ণ কিছু সদস্যদের দারা, আসলেই খুব বেশী সরল একটি ধারণা হতে পারে যে সব প্রাণীদের যোগাযোগের মধ্যে ছলনার কোনো উপাদান শুরু থেকেই থাকে, কারণ সব প্রাণীদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় অন্ততপক্ষে কিছু না কিছু স্বার্থের সংঘাত আছে। পরের অধ্যায়টি স্বার্থের সংঘাতকে বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবার একটি শক্তিশালী উপায় উপস্থাপন করবে।

নোটস (অধ্যায় ৪)

(১) এই ধরনের কোনো বক্তব্য, আক্ষরিক অর্থ নিয়ে ভাবেন এমন সমালোচকদের প্রায়শই উৎকণ্ঠিত করে। তারা অবশ্য সঠিক, কারণ মস্তিস্ক কম্পিউটার থেকে অবশ্যই অনেকভাবেই ভিন্ন। তাদের অভ্যন্তরীণ কাজ করার প্রক্রিয়া, যেমন, খুবই আলাদা কোনো বিশেষ ধরনের কম্পিউটারদের চেয়ে, যা আমাদের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু তাদের কাজের সাথে সদৃশ্যতার বিষয়ে সেটি আমার বক্তব্যটির সত্যতাকে কোনোভাবে হ্রাস করেনা। কাজের দিক থেকে, মস্তিস্ক ঠিক অন বোর্ড কম্পিউটারের মত কাজ করে– উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ, প্যাটার্ন রিকগনিশন, স্বল্প মেয়াদী বা দীর্ঘ মেয়াদী উপাত্ত সংরক্ষণ, নানা কাজের সমন্বয় সাধন ইত্যাদি বহু কাজ।

যখন আমরা কম্পিউটার নিয়ে কথা বলছি, তাদের সম্পর্কে আমার মন্তব্য তৃপ্তিদায়ক বা ভীতিকরভাবে নির্ভর করবে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির উপর সময় নির্ভর। আমি লিখেছিলাম যে, (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৬২) মাথার খুলির মধ্যে আপনি শুধু কয়েকশ টানজিস্টরের জায়গা দিতে পারবেন। আধুনিক যুগের টানজিস্টররা এখন ইনটিগ্রেটেড সার্কিটের সাথে যুক্ত। আজ টানজিস্টরে সমতূল্য কিছু যা আপনার মাথার খুলির মত জায়গায় রাখতে পারেন, তার সংখ্যা বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। আমি আরো বলেছিলাম (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৬৬), যে কম্পিউটাররা যারা দাবা খেলে তারা একজন ভালো শখের খেলোয়াড়ের দক্ষতা ছুঁতে পরেছে। তবে আজ দাবার প্রোগ্রামগুলো যা খুব ভালো পেশাজীবি খেলোয়াড়দেরও হারাচ্ছে, সেগুলো এখন খুব সহজে আমরা বাসার কম্পিউটারেও দেখতে পাই। আর পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা প্রোগ্রামটা এখন দাবার গ্রান্ড মাষ্টারদের জন্যেও জোরালো চ্যালেঞ্জ। এখানে যেমন, স্পেক্টেটর পত্রিকার দাবা বিষয়ক সংবাদদাতা রেমন্ড কিনি, ১৯৮৮ সালে ৭ অক্টোবর এর সংখ্যায় লিখেছিলেন:

‘এখনও এটি বেশ চমক সৃষ্টি করে যখন শিরোপাধারী কোনো খেলোয়ারকে হারিয়ে দেয় কোনো কম্পিউটার, কিন্তু না, হয়তো এই চমক বেশী দিন থাকবে না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধাতব দানব যে কিনা মানুষের মস্তিস্ককে চ্যালেঞ্জ করেছে, অদ্ভুতভাবে তার নামও রাখা হয়েছে ‘ডিপ থট’, সন্দেহ নেই ডগলাস অ্যাডামসে প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। ‘ডিপ থটের সবচেয়ে সাম্প্রতিকমত কর্মকাণ্ডটি হচ্ছে, গত আগষ্টে বোস্টনে ইউএস ওপেন দাবা চ্যাম্পিয়নশীপে মানব বিপক্ষকে সন্ত্রস্ত করে রাখা। আমার কাছে ডিপ থটের খেলার সার্বিক রেটিং নেই, তবে ওপেন সুইস সিস্টেম কম্পিটিশনে এবার তার অগ্নিপরীক্ষা হবে, কিন্তু আমি দেখেছি একটি আকর্ষণীয় জয় শক্তিশালী কানাডীয় খেলোয়াড় ইগর ইভানভের বিরুদ্ধে যিনি কোনো একসময় কারপভকে পরাজিত করেছিলেন! খুব ভালো করে নজর রাখুন, এটি হতে পারে দাবার ভবিষ্যত’।

এরপর ‘ডিপ থটের প্রতিটি পৃথক পৃথক দানের বিবরণ। এটি হচ্ছে ‘ডিপ থটের’ ২২ তম দানের প্রতি তার প্রতিক্রিয়া:

‘অত্যন্ত চমৎকার একটি দান, মূল ধারণাটি হচ্ছে রাণিকে কেন্দ্রের দিকে টেনে নিয়ে আসা, আর এই ধারণাটি বিস্ময়কর রকম দ্রুতগতির সাফল্যের কারণ। বিস্ময়কর এর ফলাফল .. কালোর রাণির দুই পাশে এখন পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে সাদা রাণির প্রবেশে।

এর প্রত্যুত্তরে ইভানভের চালের বিবরণ দেয়া হয়েছে এভাবে:

‘একটি বেপরোয়া মরিয়া চাল, যা কম্পিউটার কোনো হৃক্ষেপ ছাড়াই অনায়াসে মোকাবেলা করে। চূড়ান্ত অবমাননা। “ডিপ থট’ গ্রাহ্যই করেনা রাণির পুনরায় বন্দী হওয়ার বিষয়টি, এর চেয়ে বরং সে এগিয়ে যায় দ্রুত বাজিমাতের চালে, কালো হার স্বীকার করে নেয়।

‘ডিপ থট’ যে বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন দাবা খেলোয়াড়, সেটাই শুধু নয়। আমার কাছে যা বিস্ময়কর মনে হয় সেটি হচ্ছে মানব ‘সচেতনতার ভাষা’, যা সাংবাদিক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ডিপ থট ‘অবজ্ঞা সহকারে অগ্রাহ্য করলো, ইভানভের ‘মরিয়া চাল’। ডিপ থটকে বর্ণনা করা হয়েছে আক্রমণাত্মক বিপক্ষ হিসাবে, কিনি ইভানভ সম্বন্ধে বলেছেন, তিনি আশা করছেন কোনো ফলাফলের, কিন্তু তার ভাষা দেখাচ্ছে, তিনি একই রকম ভাবে খুশী হন ডিপ থটের জন্য ‘আশা’ র মতো কোনো শব্দ ব্যবহার করতে পারলে। ব্যক্তিগতভাবে আমি আশা করছি এমন কোনো একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ জিতবে। কিভাবে নম্র হতে হয় মানবতার সেটা শেখার দরকার আছে।

(২) A for Andromeda এবং তার সিকুয়েল Andromeda Breakthrough বইতে কিছু তথ্যবিভ্রাট লক্ষ করা যায়, ভীনগ্রহবাসীদের সেই সভ্যতা কি বহু দূরের অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী অথবা কাছের কোনো নক্ষত্র, অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জ যেমনটি আমি বলেছি। প্রথম উপন্যাসটিতে গ্রহটি ২০০ আলোকবর্ষ দূরে, আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সীর খুব কাছে অবস্থিত ছিল। কিন্তু এর পরের খণ্ডে সেই একই ভীনগ্রহবাসীদের সভ্যতাকে দেখানো হয়েছে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সীতে অবস্থিত, যা ২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমার (মূল বইয়ের পষ্ঠা ৬৮ র পাঠকরা হয়তো ২০০ কে ২ মিলিয়ন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে পারেন তাদের অভিরুচি অনুযায়ী। আমার আলোচনার উদ্দেশ্যে অবশ্য কাহিনীটির প্রাসঙ্গিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে। ফ্রেড হয়েল, যিনি এই উপন্যাসের লেখকদ্বয়ের মধ্যে উর্ধতন, একজন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং আমার সবচেয়ে প্রিয় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী The Black Cloud এর লেখক। অসাধারণ বৈজ্ঞানিক যে অন্তর্দৃষ্টিটি তিনি তার উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন, সেটি একটি বেদনাদায়ক বৈষম্যকে চিহ্নিত করেছে তার আরো সাম্প্রতিক কিছু বইতে, যা তিনি যৌথভাবে লিখেছিলেন, সি. বিক্রমাসিংহের সাথে। ডারউইনবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা (একটি শুধুমাত্র বিশুদ্ধ চান্স বা সুযোগ নির্ভর কোনো তত্ত্ব হিসাবে) এবং স্বয়ং ডারউইনের উপর তাদের বোলতাসদৃশ আক্রমণ কোনভাবেই তাদের সাহায্য করেনি অন্যথায় কৌতূহলোদ্দীপক ‘আন্তঃনক্ষত্রীয় জীবনের উৎপত্তি (যদিও অসম্ভব) সংক্রান্ত ধারণাটিকে। প্রকাশকদের নিজেদের সেই ভ্রান্ত ধারণাটি সংশোধন করা উচিৎ, যা দাবী করে কোনো একজন বিশেষঞ্জের একটি ক্ষেত্রে পারদর্শিতা মানে অন্য আরেকটি ক্ষেত্রে দক্ষতা নয়। এবং যতদিন এই ভ্রান্ত ধারণাটি থাকবে, বিখ্যাত বিশেষজ্ঞরা এটির অপব্যবহার করার প্রলোভনটি সহজে উপেক্ষা করতে পারবে না।

(৩) কোনো একটি প্রাণী বা উদ্ভিদ বা কোনো জিন সম্বন্ধে এইভাবে কৌশলগতভাবে কথা বলা, যেন তারা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিভাবে তাদের সাফল্যটি বৃদ্ধি করা যায়, যেমন, ‘পুরষরা বড় দানের বড় ঝুঁকির জুয়াড়ী এবং স্ত্রীদের নিরাপদ বিনিয়োগকারী’ (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ৭৩), গবেষণারত জীববিজ্ঞানীদের কাছে এটি খুব স্বাভাবিক একটি ব্যপার। এটি সুবিধাজনক একটি ভাষা, যা ক্ষতি করেনা যদি না ঘটনাক্রমে এটি এমন কারো হাতে পড়ে যারা এটি বোঝার জন্য যে যথেষ্ট দক্ষ নয় এটি ভুল বোঝার জন্য বেশী মাত্রায় দক্ষ? যেমন আমি আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিনা এই প্রবন্ধটির অর্থ বুঝতে যা The Selfish Gene কে সমালোচনা করে লেখা হয়েছে Philosophy শীর্ষক একটি জার্নালে। এর লেখকের নাম মেরি মিজলে, এর প্রথম পংক্তিটাই বৈশিষ্ট্যসূচক: ‘জিনরা স্বার্থপর বা অস্বার্থপর হতে পারে না, যেমন করে কোনো পরমাণুরা হিংসুটে হতে পারে না, হাতিরা ভাবতে পারে না বা বিস্কুট কোনো পূর্বকারণবাদের কারণও নয়। আমার নিজের In Defence of Selfish Genes প্রবন্ধটি এর পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি প্রাসঙ্গিকভাবে এই অত্যন্ত অসংযত আর আক্রমণাত্মক পেপারটির পূর্ণাঙ্গ উত্তর ছিল। মনে হতে পারে কিছু মানুষ, যারা শিক্ষাগতভাবে অতিমাত্রায় যোগ্য হয়েছে দর্শনের নানা কৌশল ব্যবহার করার মাধ্যমে, এবং তাদের বিদ্বান যন্ত্রটি নিয়ে তারা খোঁচা দেয়ার লোভ সংবরণ করতে পারেন না যেখানে সেটা অপ্রাসঙ্গিক। পি. বি. মেডোয়ারের, ‘দর্শন-কাহিনীর; প্রতি আকর্ষণ সংক্রান্ত সেই মন্তব্যের কথা মনে, যা একটি বিশাল সংখ্যক মানুষের আছে, যারা প্রায়শই সাহিত্য অন্যান্য বিদ্বান রুচির দ্বার আশীর্বাদপুষ্ট, যারা তাদের ধারণ ক্ষমতার বাইরে এমনভাবে শিক্ষিত হয়েছেন যে, তারা আর কোনো বিশ্লেষণী চিন্তা করার ক্ষমতা রাখেননা।

(৪) আমি মস্তিস্কের পৃথিবী ‘সিমুলেশন’ করার ধারণাটি আলোচনা করেছিলাম ১৯৮৮ সালে আমার গিফোর্ড লেকচারে, Worlds in Microcosm শিরোনামে। আমি এখনও স্পষ্ট না, সচেতনতা সংক্রান্ত গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার জন্য আসলেই এটি আমাদের কোনো সাহায্য করতে পারে কিনা। কিন্তু আমি স্বীকার করছি আমার বেশ তৃপ্তি হয়েছিলো যখন এই ধারণাগুলো স্যার কার্ল পপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তার ডারউইন লেকচারে। দার্শনিক ড্যান ডেনেটও সচেতনতার একটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন, যা কম্পিউটার সিমুলেশনের রুপকে আরো বিস্তারিত করেছে তার আলোচনায়। তার সেই তত্ত্বটি বুঝতে হলে, আমাদের দুটো কারিগরী ধারণা বুঝতে হবে কম্পিউটারের জগত থেকে, সেটি হচ্ছে: ভার্চুয়াল মেশিনের ধারণাটি, এবং সিরিয়াল ও প্যারালেল প্রসেসরের মধ্যে পার্থক্য। আমি এইসব বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা প্রথমেই দিয়ে নিতে চাই।

কোনো একটি কম্পিউটার হচ্ছে আসল মেশিন, বাক্সবন্দী একটি হার্ডওয়্যার। কিন্তু যেকোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি একটি প্রোগ্রাম চালায় যা এটিকে অন্য একটি মেশিনের মত অনুভুত করায়, একটি ভার্চুয়াল মেশিন। সব কম্পিউটারের জন্য এটি বহুদিন ধরেই সত্যি, কিন্তু আধুনিক ব্যবহারকারী-বান্ধব’ কম্পিউটারগুলো এই ধারণাটিকে খুব সহজে বুঝতে সাহায্য করে। যখন আমি এটি লিখেছিলাম, ‘ব্যবহারকারী-বান্ধব হিসাবে বাজারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল অ্যাপল মাকিনটশ কম্পিউটার। এর সফলতার কারণ ছিল, এর ভিতরের একগুচ্ছ প্রোগ্রাম, যা সত্যিকারের হার্ডওয়ার মেশিনটিকে যার মেকানিজমটি, যেকোনো কম্পিউটারের মত, অসম্ভব জটিল এবং মানুষের সহজাত ধারণাবোধের সাথে খুব বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ না, ভিন্ন ধরনের একটি মেশিনের মত দেখতে লাগে: ভার্চুয়াল মেশিন, বিশেষ করে সেটি মানুষের মস্তিস্ক আর হাতের সাথে যেন দারুনভাবে মিশে যায় সেভাবেই পরিকল্পিত থাকে। Macintosh User Interface হিসাবে পরিচিত ভার্চুয়াল মেশিনটি শনাক্তযোগ্যভাবে একটি মেশিন। এর বেশ কিছু বোম থাকে যা টেপা যায় এবং নানা ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় যেমন, হাই-ফাই মেশিনের মত কোনো স্লাইড কন্ট্রোল। কিন্তু এটি হচ্ছে “ভার্চুয়াল মেশিন’। বোতাম বা স্লাইডার সেখানে ধাতব বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরী নয়। তারা পর্দায় থাকা ছবি এবং আর আপনি তাদের চাপ দেন বা স্লাইড করেন পর্দায় আপনাদের ভার্চুয়াল আঙ্গুল ব্যবহার করে। মানুষ হিসাবে আপনি অনুভব করেন আপনি নিয়ন্ত্রণে আছেন, কারণ আপনার আঙ্গুল ব্যবহার করে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে আপনি অভ্যস্ত। আমি নিজেই বহু ধরনের ডিজিটাল কম্পিউটারের একজন অত্যন্ত জটিল স্তরের প্রোগ্রামকারী ও ব্যবহারকারী ছিলাম এবং আমি সাক্ষ্য দিতে পারি যে ম্যাকিনটশ (ও তাদের অনুকরণকারী যে কোনো কম্পিউটার) গুণগতভাবে এর আগের অন্য কোনো ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা থেকে একেবারে ভিন্ন একটি অভিজ্ঞতা। একটি প্ররিশ্রমহীন, প্রাকৃতিক একটি অনভূতি আছে এর ব্যবহারে, যেন ভার্চুয়াল মেশিনটি কারো নিজের শরীরেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ। বিস্ময়কর পরিমান মাত্রায় কোনো ভার্চুয়াল মেশিন কোনো ম্যানুয়াল ব্যবহার করে আপনাকে আপনার সহজাত অনুভূতিকে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়।

আমি এখন অন্যান্য কিছু প্রাসঙ্গিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করবো, যা আমাদের কম্পিউটার বিজ্ঞান থেকে আমদানী করতে হবে, সিরিয়াল এবং প্যারালেল প্রসেসরের ধারণা।আজকের ডিজিটাল কম্পিউটারগুলো মূলত সব সিরিয়াল প্রসেসর। তাদের একটি কেন্দ্রীয় ক্যালকুলেটিং ‘মিল আছে, একটি একক ইলেকট্রনিক বটলনেক, প্রক্রিয়াকরণ হতে যার মধ্য দিয়ে সব উপাত্তকে অতিক্রম করতে হয়। তারা একই সাথে বহু কাজ করছে বলে একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, কারণ তারা খুবই দ্রুতকাজগুলো করছে। একটি সিরিয়াল কম্পিউটার হচ্ছে একটি দাবার মাস্টারের মত যে ‘একই সাথে বিশ জনের বিপক্ষে খেলছে কিন্তু আসলে সে একে পর একজনের কাছে যাচ্ছে, রোটেশন করে। আসল কোনো দাবার মাস্টারের সাথে পার্থক্য হচ্ছে, কম্পিউটার এত দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন এবং এত শান্তভাবে এর কাজগুলো সম্পাদন করে যে, প্রতিটি মানব ব্যবহারকারীর একটি বিভ্রম হয় যে, সে একাই কম্পিউটারের একচ্ছত্র মনোযোগ পাচ্ছে। মৌলিকভাবে যদিও, কম্পিউটার ধারাবাহিকভাবে এর ব্যবহারকারীদের সময় দিচ্ছে।

সম্প্রতি আরো বেশী দক্ষ কম্পিউটার, আরো বেশী দ্রুতগতির সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় প্রকৌশলীরা আসলেই সত্যিকারভাবে প্যারালাল প্রসেসিং মেশিন সৃষ্টি করেছে। এরকম একটি হচ্ছে এডিনবরা সুপারকম্পিউটার, যা সম্প্রতি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। এটি মূলত সমান্তরালভাবে সাজানো কয়েকশ ‘ট্রান্সপিউটার’, যাদের প্রত্যেকেই তাদের ক্ষমতায় সমসাময়িক ডেক্সটপ কম্পিউটারের সমতুল্য। সুপারকম্পিউটার কাজ করে সমস্যাটি নিয়ে এটিকে খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করে নিয়ে, যা স্বতন্ত্রভাবে সমাধান করা হয়, যে কাজটি করে ট্রান্সপিউটারদের একটি দল। ট্রান্সপিউটার আংশিক সমস্যা নেয়, সমাধান করে এর উত্তর দেবার পর নতুন কাজের জন্য আবার প্রস্তুত হয়। সেই সময় আরো একগুচ্ছ ট্রান্সপিউটার তাদের সমাধান প্রস্তুত করে, এভাবে পুরো কম্পিউটারটি তাদের সর্বশেষ উত্তরটি পায় সাধারণ সিরিয়াল কম্পিউটার যত দ্রুত পারে তারচেয়ে বহুগুণ দ্রুত।

আমি বলেছিলাম যে, সাধারণ সিরিয়াল কম্পিউটার প্যারালেল প্রসেসর হবার একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে, যদি এর মনোযোগ যথেষ্ট পরিমান দ্রুত সে বেশ কিছু কাজের উপর রোটেট করতে পারে। আমরা বলতে পারি যে একটি ভার্চুয়াল প্যারালেল প্রসেসর সিরিয়াল হার্ডওয়ার উপর বসে আছে। দার্শনিক ডেনেটর ধারণা হচ্ছে, মানুষের মস্তিস্ক ঠিক একই কাজ করে তবে এর বিপরীত ক্রমে। আমাদের মস্তিস্কে হার্ডওয়্যার মৌলিকভাবে প্যারালাল, এডিনবরা মেশিনের মত। এবং এটি এমন সফটওয়্যার চালায় যার পরিকল্পনা করা হয়েছে সিরিয়াল প্রসেসিং মত একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে: কোনো সিরিয়ালভাবে প্রক্রিয়াজাত করা ভার্চুয়াল মেশিন যা প্যারালাল গঠনের উপর অবস্থান করে। গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা আমরা সাবজেকটিভ বা আত্মগত অভিজ্ঞতা, যেমন চিন্তা করার প্রক্রিয়ায় শনাক্ত করতে পারি, সেটি ডেনেটের মতে, ধারাবাহিক একটা-পর অন্যটা, অনেকটা জয়েসিয়ান চেতনার প্রবাহ। তিনি বিশ্বাস করেন বেশীর ভাগ প্রাণী এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতাটা অনুভব করতে পারেনা এবং তারা তাদের মস্তিষ্কটা ব্যবহার করে এর আদি, প্যারালেল প্রসেসিং এর মোডে। সন্দেহ নেই যে মানুষের ব্রেইনও, এর প্যারালাল আর্কিটেকচার সরাসরি ব্যবহার করে এর বহু নৈমিত্তিক কাজের জন্য যা জটিল সারভাইভাল মেশিনকে চালাতে সাহায্য করে। কিন্তু এছাড়াও, মানুষের মস্তিস্ক একটি ভার্চুয়াল মেশিনের সফটওয়্যার তৈরী করেছে যা সিরিয়াল প্রসেসরের বিভ্রম সষ্টি করে। মন, এর ধারাবাহিক চেতনার প্রবাহসহ হচ্ছে একটি মেশিন, মস্তিষ্কের অভিজ্ঞতাকে অনুভব করার জন্য একটি উপায়, ঠিক যেমন Macintosh User Interface যন্ত্র কম্পিউটারকে ধূসর বাক্সের মধ্যে অভিজ্ঞতায় অনুভব করানোর ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী-বান্ধব’ একটি উপায়।

খুব স্পষ্ট নয় কেন আমাদের মানুষদের কোনো সিরিয়াল ভার্চুয়াল মেশিনের প্রয়োজন, যখন অন্য প্রজাতিরা ভালোই আছে তাদের অনাড়ম্বর প্যারালাল মেশিনসহ। হয়তো বন্য মানুষকে যে কঠিন কাজগুলোর মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেই কাজগুলো মূলত সিরিয়াল। অথবা হয়তো ডেনেট হয়তো ভুল করেছেন শুধুমাত্র আমাদের আলাদা করে। তার আরো বিশ্বাস হলো এই সিরিয়াল সফটওয়্যার বিকাশ মূলত সাংস্কৃতিক একটি প্রপঞ্চ এবং আমার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট নয় কেন ঠিক এটাই হতে হবে। কিন্তু আমার এখানে যোগ করা উচিৎ, আমার লেখার সময়, ডেনেটের পেপারটি প্রকাশ হয়নি এবং আমার এই ব্যাখ্যাটি মূলত তার ১৯৮৮ সালে লন্ডনে জ্যাকোবসেন লেকচারের স্মৃতির উপর নির্ভর করে প্রস্তাবিত। আমার নিঃসন্দেহে কিছুটা ক্রটিপূর্ণ আর স্মৃতি-নির্ভর ধারণা, এমনকি খানিকটা অলঙ্কৃত কোনো ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করার চেয়ে, পাঠকদের আমি উপদেশ দিচ্ছি ডেনেটের নিজস্ব ব্যাখ্যাটা পড়তে, যখন তা প্রকাশ হবে।

মনোবিজ্ঞানী নিকোলাস হামফ্রে একটি চমৎকার হাইপোথিসিস প্রস্তাব দিয়েছেন, কিভাবে কোনো কিছু সিমুলেট করার ক্ষমতার বিবর্তনের ফলাফল হিসাবে সচতেনতার উদ্ভব হয়েছে। তার The Inner Eye বইটিতে হামফ্রে বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন, খুব বেশী মাত্রায় সামাজিক প্রাণী, যেমন, আমরা আর শিম্পাঞ্জিদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ স্তরের মনোবিজ্ঞানী হতে হবে। মস্তিস্কগুলো পৃথিবীর বহু বিষয়কে একই সাথে মোকাবেলা করতে হয় বা সিমুলেট করতে হয়। কোনো সামাজিক প্রাণী আরেকজনের পথিবীতে বসবাস করে, যে পথিবী সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গীদের, প্রতিদ্বন্দ্বীদের, সহযোগী এবং শত্রুদের। এমন কোনো জগতে টিকে থাকা ও উন্নতি করতে এই সব অন্য সদস্যরা কি ভাবছে সেটা বুঝতে আপনাকে খুব দক্ষ হতে হবে, পূর্বধারণা করতে হবে তারা এর পরে কি করতে যাচ্ছে। সামাজিক বিশ্বেকি হতে যাচ্ছে এমন কোনো কিছু পূর্বধারণা করার তুলনায় কোনো প্রাণহীন জগতে কি হতে যাচ্ছে এমন ভবিষ্যদ্বাণী অনেক সহজ। প্রাতিষ্ঠানিক মনোবিজ্ঞানীরা, বৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করার মাধ্যমে, মানুষের আচরণ পূর্বধারণা করতে তারা আসলে খুব বেশী দক্ষ না। সামাজিক সঙ্গীরা, মুখের মাংসপেশীর সামান্য নড়াচড়া ও আরো সূক্ষ্ম কোনো ইঙ্গিত দেখে মনোভাব এবং কোন আচরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে প্রায়শই বিস্ময়করভাবে দক্ষ। হামফ্রে বিশ্বাস করেন যে, এই স্বভাবজাত প্রাকৃতিক মনোবৈজ্ঞানিক দক্ষতা সামাজিক প্রাণীদের মধ্যে অত্যন্ত অগ্রসরভাবেই বিবর্তিত হয়েছে, অনেকটা একটা বাড়তি চোখ বা অন্য কোনো জটিল অঙ্গ বিবর্তনের মতই। এই ‘ইনার আই’ হচ্ছে বিবর্তিত সামাজিক ও মনোজাগতিক অঙ্গ, ঠিক যেমন করে বাইরের চোখ একটি দেখার অঙ্গ।

এ-পর্যন্ত হামফ্রের যুক্তি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। তিনি আরো যুক্তি দেন, এই ‘ইনার আই’ কাজ করে আত্ম-সমীক্ষার উপর নির্ভর করে। প্রতিটি প্রাণী নিজের ভিতরে তাকায় তার নিজেদের অনুভূতি আর আবেগের প্রতি, অন্যদের অনুভূতি আর আবেগকে বোঝার জন্য। মনোজাগতিক অঙ্গ কাজ করে আত্ম সমীক্ষার মাধ্যমে। আমি নিশ্চিৎ না বিষয়টিতে একমত কিনা যে এটি আমাদের সচেতনাকে বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু হামফ্রে খুবই চমৎকার লেখক, এবং তার বই জোরালো আবেদন রেখেছে সেটি বোঝাতে।

(৫) মাঝে মাঝে অনেকেই খুবই বিচলিত হয়ে ওঠেন পরার্থবাদীতার ‘জন্য’ জিনদের বিষয়ে বা আপতদৃষ্টিতে তাদের জটিল আচরণ নিয়ে। তারা (ভুল ভাবে) ভাবেন কিছু ক্ষেত্রে আচরণের এই জটিলতা অবশ্যই নিহিত আছে একটি জিনের ভিতরে। কিভাবে পরার্থবাদীতার জন্য একটি একক জিন থাকতে পারে, তারা জানতে চান, যখন কোনো জিনের কাজ শুধু একটি প্রোটিন অনু তৈরীর সংকেত বহন করা? কিন্তু কোনো কিছুর জন্যে’ জিন এইভাবে কোন কথা বলা যা বোঝায়, তা হলো জিনটিতে কোনো ‘পরিবর্তন অন্য কোথাও কোনো পরিবর্তনের কারণ হবে। একটি জিনগত ‘পার্থক্য, কোষের অণুদের কোনো বিশেষ কিছু পরিবর্তন করার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জটিল জণবিকাশ প্রক্রিয়ায় কোনো পার্থক্যের সৃষ্টি করে এবং সেভাবেই, বলা যায়, আচরণের পরিবর্তন করে।

যেমন, পাখিদের মধ্যে ভাতৃসূলভ পরার্থবাদীতার জন্য একটি পরিবর্তিত জিন অবশ্যই নিঃসন্দেহে এককভাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন জটিল আচরণে জন্য দায়ী হবে না। বরং এটি ইতিমধ্যে অস্তিত্ব আছে সম্ভবত জটিল এমন কোনো আচরণের প্যাটার্ন পরিবর্তন করবে। এই ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পূর্বসূরি কারণ হচ্ছে পিতামাতার আচরণ। পাখিদের নিয়মিতভাবে জটিল স্নায়বিক অঙ্গাণুর দরকার হয় তাদের নিজেদের সন্তানের প্রতিপালন ও খাদ্য সরবরাহের জন্যে। এটি, আবার, বহু প্রজন্ম ধরে ধীর ধাপে ধাপে তৈরী হয় পূর্বসূরি থেকে তার নিজের স্নায়ুতন্ত্র অবধি। (ঘটনাচক্রে ভাতৃসূলভ পরার্থবাদী জিনদের নিয়ে সন্দেহবাদীরা প্রায়শই তাদের মনস্থির করতে পারেন না। কেন তারা আগে একই রকম সংশয় প্রকাশ করেনা পিতামাতার প্রতিপালনের সমপরিমান জটিল আচরণটির ক্ষেত্রে?)। আগে থেকে বিদ্যমান আচরণের প্যাটার্ন– এই ক্ষেত্রে বাবা-মার সন্তান প্রতিপালন– মধ্যস্ততা করবে একটি সুবিধাজনক গড়পড়তা নিয়ম রা রুল অব থাম্ব। যেমন, নীড়ের মধ্যে সব জোরে জোরে চিৎকার করা আর মুখ হা করে থাকা জিনিসগুলো খাওয়াতে হবে। ছোট ভাইবোনদের খাওয়ানোর জন্য জিনটিও কাজ করতে পারে, তারপর, বয়স তরান্বিত করা, যে বয়সে এই গড়পড়তা নিয়মটি পুরোপুরি পূর্ণতা পায়। কোনো পাখির ছানা যে ভাতৃপ্রতিম জিনটা বহন করে একটি নতুন মিউটেশন হিসাবে, সেটি শুধুমাত্র পিতামাতার সেই গড়পড়তা নিয়মটাকেই অন্যান্য পাখিদের তুলনা একটু আগে সক্রিয় করে তোলে। এটিও তারা বাবা-মার নীড়ে ‘চিৎকার করা, মুখ হা করে থাকা সদস্যদের’– তার ছোট ভাই ও বোনরা –যেমন, তারা যেন তার নিজের নীড়ে হা করে খেতে চাওয়া জিনিসগুলো– তার নিজের সন্তান। নতুন হওয়া তো অনেক দুরের কথা, জটিল আচরণগত কিছু নতুনত্ব, ভাতৃপ্রতিম আচরণ উদ্ভব হবে একটুখানি ভিন্ন ইতিমধ্যে বিদ্যমান আচরণ বিকশিত হবার একটি সামান্য প্রকরণ হিসাবে। প্রায়ই যা ঘটে, ফ্যালাসি বা ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয় যখন আমরা অত্যাবশ্যকীয় ধীর গতিতে ধাপে ধাপে বিবর্তন হবার কথাটি ভুলে যাই। বাস্তব সত্যটি যে অভিযোজনীয় বিবর্তন অগ্রসর হয় ক্ষুদ্র, ধাপে ধাপে আগে থেকেই বিদ্যমান কোনো গঠন বা আচরণকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে।

(৬) যদি মূল বইটির কোনো পাদটীকা থাকতো, তাদের একটি নিবেদিত হতো ব্যাখ্যা করতে যেমন রোথেনবুহলার নিজেই খানিকটা সতর্কতার সাথে করেছিলেন, মৌমাছিদের নিয়ে গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। অনেক কলোনির মধ্যে যাদের, এই তত্ত্বানুযায়ী, ‘হাইজিনিক’ আচরণ দেখানোর কথা ছিল না, তাসত্ত্বেও তাদের একটি সেই আচরণটি প্রদর্শন করেছিল। রোথেনবুহলারের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, “আমাদের এই ফলাফলটি অস্বীকার করা উচিৎ নয়, কিন্তু আমরা আমাদের জেনেটিক হাইপোথিসিসের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করেছি অন্য উপাত্ত। অ্যানোলোমাস বা স্বাভাবিক নয় এমন কোনো কলোনি কোনো একটি মিউটেশন সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, যদিও এর সম্ভাবনা খুব কম।

(৭) প্রাণীদের কমিউকেশন বা সংযোগের বিষয়টি এমনভাবে আলোচনা করার জন্য আমি এখন অসন্তুষ্ট বোধ করছি। জন ক্রেবস এবং আমি দুটি প্রবন্ধে এই বিষয়ে যুক্তি দিয়েছিলাম যে বেশীর ভাগ প্রাণীদের সংকেত যেমন কোনো তথ্য সমৃদ্ধ ভাবা ঠিক না তেমনি তাদের ছলনাপূর্ণ হিসাবে না দেখাটাই উত্তম, বরং দেখা উচিৎ ম্যানিপুলেটিভ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় হিসাবে। কোনো একটি সংকেত হচ্ছে এমন কোনো উপায় যার মাধ্যমে একটি প্রাণী অন্য আরেকটি প্রাণীর মাংসপেশীর শক্তি ও ক্ষমতা ব্যবহার করে। কোনো একটি নাইটিঙ্গলের গান তথ্যপূর্ণ নয়, এমনকি কোনো ছলনাপুর্ণ তথ্য নয়, এটি প্ররোচনা দিতে পারে, মন্ত্রমুগ্ধ করে, হতবাক করে দেবার মত স্বর তৈরী করার ক্ষমতা দিয়ে। এই ধরনের যুক্তি এর যুক্তিসঙ্গত উপসংহার অবধি আলোচিত হয়েছে The Extended Phenotype বইটিতে, যার কিছুটা অংশ আমি সংক্ষিপ্ত আকারে সংযুক্ত করেছি এই বইয়ের ১৩ তম অধ্যায়ে। ক্রেবস ও আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে, সংকেত বিবর্তিত হয় আমরা যাকে বলি মানসিকতা পড়া এবং সেটি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা, এই দুটি প্রক্রিয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়। প্রাণীদের সংকেত বা যোগাযোগের পুরো বিষয় নিয়ে একটি বিস্ময়কর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে। জীববিজ্ঞানী আমেজ জাহাভীর দৃষ্টিভঙ্গি। অধ্যায় ৯ এর একটি নোটে আমি জাহাভীর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করেছি আরো সহানুভূতির সাথে, এই বই এর প্রথম সংস্করণে আমি যেভাবে করেছিলাম, তার চেয়ে বেশী।

০৫. আগ্রাসন: স্থিতিশীলতা এবং স্বার্থপর মেশিন

অধ্যায় ৫: আগ্রাসন: স্থিতিশীলতা এবং স্বার্থপর মেশিন

এই অধ্যায়টি মূলত বহু ভুল বোঝা একটি বিষয়, আগ্রাসন সংক্রান্ত। আমরা প্রতিটি একক সদস্যকে স্বার্থপর মেশিন হিসাবে মনে করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবো, তাদের ধারণকৃত জিনের সর্বোপরি যেন ভালো হয় এমন সবকিছু করার জন্য যাদের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। ব্যাখ্যার সুবিধার জন্যই এই ভাষার ব্যবহার। এই অধ্যায়ের শেষে আবার আমরা একক জিনের ভাষায় ফিরে আসবো।

একটি সারভাইভাল মেশিনের জন্য অন্য একটি সারভাইভাল মেশিন (যে তার নিজের সন্তান নয় বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়ও নয়) তার পরিবেশের একটি অংশ, একটি পাথর অথবা নদী বা এক টুকরো খাদ্যের মত। এটি এমন কিছু যা তার পথে বাধা হতে পারে বা এমন কিছু যাকে নিজের সার্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। কোনো একটি পাথর বা নদী থেকে এটি ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে: এর পাল্টা আক্রমণ করার প্রবণতা আছে। এর কারণ এটি একটি যন্ত্র, ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা করবে বলে যা এর অমর জিনকে ধারণ করে এবং এটিও তাদের সুরক্ষা করার জন্য কোন কিছু করতে পিছপা হয়না। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব জিনগুলোকে আনুকুল্য দেয়, যা তাদের সারভাইভাল মেশিনদের নিয়ন্ত্রণ করে এমনভাবে যে, তারা তাদের পরিবেশের সর্বোত্তম ব্যবহার করে। আর একই এবং ভিন্ন প্রজাতির অন্যান্য সারভাইভাল মেশিনদের সর্বোত্তম ব্যবহার করার প্রচেষ্টা তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সারভাইভাল মেশিনগুলো পরস্পরের জীবনে খুব কমই হস্তক্ষেপ করে বলে মনে হয়, যেমন মোল আর ব্ল্যাকবার্ডরা পরস্পরকে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করেনা, তারা নিজেদের মধ্যে প্রজনন করে না বা বসবাসের জায়গার জন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেনা। এমনকি তারপরও, তাদের পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবা অবশ্যই আমাদের উচিৎ হবেনা। তারা হয়তো অন্য কোনো কিছুর জন্য দ্বন্দ্বরত, হয়তো মাটিতে থাকা কেঁচোদের জন্য। এর মানে এই না যে, আপনি কখনো এমন কোনো দৃশ্য দেখবেন যেখানে একটা মোল ও একটা ব্ল্যাকবার্ড, একটা কেঁচোর জন্যে দড়ি টানাটানি করছে। আসলেই এমনও হতে পারে কোন একটি ব্ল্যাকবার্ড তার জীবনে কখনোই হয়তো কোনো মোলের সাথে দেখা হবার সুযোগ পায় না। কিন্তু যদি আপনি মোলদের জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন, সেই ঘটনাটির একটি নাটকীয় প্রভাব পড়বে ব্ল্যাকবার্ডদের জীবনে। যদিও আমি বিস্তারিতভাবে খুঁটিনাটি কি হতে পারে বা কতটা ঘুরপথে পরোক্ষভাবে সেটি ঘটে, তা অনুমান করার কোনো ঝুঁকি নেবো না।

ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সারভাইভাল মেশিনগুলো নানা বিচিত্র উপায়ে একে অপরকে প্রভাবিত করে। তারা হতে পারে শিকারী প্রাণী বা শিকার হওয়া কোনো প্রাণী, পরজীবি বা তাদের পোষক, কোনো দুষ্প্রাপ্য সম্পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা স্বার্থের কারণে ব্যবহৃত হতে পারে বিশেষ বিশেষ উপায়ে, যেমন, যখন মৌমাছিদের তাদের পরাগরেণুর বাহক হিসাবে ব্যবহার করে ফুল। একই প্রজাতির সারভাইভাল মেশিনগুলো পরস্পরের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলে আরো। এবং এটি হয় বহু কারণে। একটি কারণ হচ্ছে, কারো নিজের প্রজাতির অর্ধেক হতে পারে তার সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গী এবং সম্ভাব্য কঠোর-পরিশ্রমী আর সার্থের জন্য ব্যবহারযোগ্য, কোনো সন্তানদের পিতামাতা। আরেকটি কারণ হচ্ছে যে, একই প্রজাতির সদস্যরা, পরস্পরের সদৃশ্য, একই ধরনের জায়গায় তাদের জিন সুরক্ষা করা, একই ধরনের জীবনাচরণসহ, জিন সংরক্ষণের মেশিন হবার কারণে সুনির্দিষ্টভাবে তারা জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় সম্পদের জন্য তারা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী।

কোনো একটি ব্ল্যাকবার্ডে জন্যে একটি মোল হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে অন্য একটি ব্ল্যাকবার্ড যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মোল তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে কিছুই না। মোল আর ব্ল্যাকবারা হয়তো খাদ্য হিসাবে কেঁচোর জন্য দ্বন্দ্বরত, কিন্তু ব্ল্যাকবার্ডরা কেঁচোসহ আরো প্রয়োজনীয় সব সম্পদের জন্য নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বরত। যদি তারা একই লিঙ্গের সদস্য হয়, তারা হয়তো প্রজনন সঙ্গী পাওয়ার জন্যে দ্বন্দ্বরত। আমরা পরে জানতে পারবো কিছু কারণে, সাধারণত পুরুষরা স্ত্রী-সঙ্গী পাওয়ার জন্যে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্ব করে। এর অর্থ পুরুষরা হয়তো তাদের জিনদের কোনো উপকার করে, যদি সে এমন কিছু করে যা তার সাথে দ্বন্দ্বরত কোনো পুরুষ সদস্যদের প্রতি ক্ষতিকর হিসাবে প্রতীয়মান হয়।

একটি সারভাইভাল মেশিনের জন্যে যুক্তিসঙ্গত নীতি সুতরাং হয়তো হতে পারে এর প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করা এবং তারপর, বরং তাদের খাওয়া। যদিও হত্যা ও স্বজাতি ভক্ষণের ব্যপারটি প্রকৃতিতে ঘটে, কিন্তু সেই অর্থে তেমন ঘটনা খুব সচরাচর ঘটতে দেখা যায় না, যেমন, স্বার্থপর জিনতত্ত্বের অতি সরল কোনো ব্যাখ্যা হয়তো পূর্বধারণা করতে পারে। আসলেই কনরাড লরে, তার On Aggression বইয়ে, প্রাণীদের দ্বন্দ্বের সংযত, ভদ্রোচিত প্রকৃতির উপর জোর দিয়েছিলেন। তার মতে প্রাণীদের মধ্যে যুদ্ধে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে সেগুলো আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার কোনো। মত হয়, মুষ্টিযুদ্ধ কিংবা তলোয়ার লড়াইয়ের মত, যা কিছু নিয়ম মেনে চলে। প্রাণীরা যুদ্ধ করে হাতে ‘দস্তানা’ পরে বা ‘ভোতা” তলোয়ার ব্যবহার করে। সেখানে ভয় দেখানো বা ধোকা দিয়ে বোকা বানানো সব কিছু ঘটে তীব্র আন্তরিকতার সাথে। পরাজয় মেনে নেবার ভঙ্গিমা শনাক্ত করতে পারে বিজেতা, যিনি তারপর সংযত থাকেন কোন মরন আক্রমণ বা কামড় দেয়া থেকে, যা আমাদের সরল তত্ত্বটি হয়তো পূর্বধারণা করতে পারে।

প্রাণীদের আগ্রাসী আচরণের সংযত ও আনুষ্ঠানিক এই ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। বিশেষ করে, পুরোনো বেচারা Homo sapiens হচ্ছে একমাত্র প্রজাতি, যারা কিনা তাদের স্বজাতিদের হত্যা করে, কেইনের কলঙ্কের একমাত্র উত্তরাধিকারী এবং ইত্যাদি, নানা নাটুকে অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা অবশ্যই ভুল। একজন প্রকৃতিবিদের প্রাণীদের আগ্রাসনে সহিংসতা বা সংযম বিষয়ক দাবী আংশিক নির্ভর করছে কি ধরনের প্রাণীদের নিয়ে তিনি। গবেষণা করছেন এবং আংশিকভাবে নির্ভর করে তার বিবর্তনীয় পূর্বধারণার উপর– তবে যাই হোক না কেন, লরেন্জ, সর্বোপরি, ‘প্রজাতির সবার জন্য কল্যাণ’ ঘরানার মানুষ। এমনকি যদিও বিষয়টিকে নিয়ে অতিশয়োক্তিও করা হয়, মনে হতে পারে ‘দস্তানা’ পরে মুষ্টিবদ্ধ হাতে প্রাণীদের সংযত দ্বন্দ্বের দৃষ্টিভঙ্গিটির ন্যূনতম পর্যায়ে কিছুটা সত্যতা আছে। উপরিভাবে এটি দেখতে এক ধরণের পরার্থদের মত। আর ‘স্বার্থপর জিন’ তত্ত্বটিকে অবশ্যই সেটি ব্যাখ্যা করার কঠিন কাজটির মুখোমুখি হতে হবে। কেনই বা সব প্রাণীরা সুযোগ পাওয়া মাত্রই তাদের প্রজাতির প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্যদের হত্যা করছে না?

এই প্রশ্নটির সাধারণ উত্তর হচ্ছে এধরনের সরাসরি দ্বন্দ্বপ্রিয়তার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতির সুবিধা যেমন আছে, তেমনি শুধুমাত্র সময় আর শক্তি ব্যবহার করা সুস্পষ্ট মূল্য ছাড়াও আরো অনেক বিনিময় মূল্য পরিশোধও করতে হয়। যেমন, মনে করুন যে ‘খ’ এবং “গ” দুজনেই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, ঘটনাচক্রে আগে ‘খ’ এর সাথে আমার আগে দেখা হয়, একজন স্বার্থপর সদস্য হিসাবে আমার জন্য বোধগম্য একটি ব্যাপার হবে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা। কিন্তু না অপেক্ষা করুন। ‘গ’ ও কিন্তু আমার প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ‘গ’ আবার ‘খ’ এরও প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘খ’ কে হত্যা করার ফলশ্রুতি হবে, আমি ‘গ’ এর জন্য সম্ভাব্য ভালো একটি কাজ করছি, তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে একজনকে সরিয়ে ফেলে। আমি হয়তো ভালো করতাম ‘খ’ কে বাঁচার সুযোগ দিয়ে, সে হয়তো তারপর ‘গ’ এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও যুদ্ধ করতে, এবং সেভাবে আমাকে পরোক্ষভাবে সুবিধা দিতো। এই সাধারণ হাইপোথেটিকাল উদাহরণের মূল নীতিবাক্যটি হচ্ছে, নির্বিচারে প্রতিন্দীদের হত্যা করার চেষ্টা করায় সুস্পষ্টভাবে কোনো উপকারিতা নেই। বিশাল ও জটিল প্রতিদ্বন্দ্বীতারপুর্ণ কোনো পদ্ধতিতে, কোনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দিলে আবশ্যিকভাবে সেটি কোনো উপকারী পদক্ষেপ নয়: সেখানে অন্য প্রতিদ্বন্দীদের এমনকি তার নিজের চেয়ে আরো বেশী সুবিধা পাবার সম্ভাবনা আছে। এই ধরনের একটি কঠিন শিক্ষা বহু দিন আগেই পেয়েছেন পেষ্ট-কন্ট্রোল অফিসাররা। ধরুন আপনাকে গুরুতর সমস্যা দিচ্ছে কৃষিকাজের জন্য ক্ষতিকর কোন একটি পতঙ্গ, এবং তাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য আপনি একটি ভালো উপায় আবিষ্কার করলেন। এবং খুব আনন্দের সাথে আপনি কাজটিও করলেন। এবং আপনি এরপরই আবিষ্কার করলেন যে মানুষের কৃষিকাজের চেয়ে এই নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়ায় লাভবান হয়েছে অন্য কোন একটি ক্ষতিকর পতঙ্গ। আর আপনার অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ।

আবার অন্যদিকে, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বীদের খানিকটা বৈষম্যমূলক উপায়ে হত্যা বা ন্যূনতম পর্যায়ে যুদ্ধ করা একটি ভালো পরিকল্পনা মনে হতে পারে। যদি ‘খ’ কোনো একটি এলিফ্যান্ট সীল হয়, যার বহু স্ত্রী এলিফেন্ট সীল এর একটি বিশাল হারেম আছে এবং যদি আমি, আরেকটি এলিফ্যান্ট সীল, তাকে হত্যা করে তার হারেমটির দখল নিতে পারি, সেটি করার চেষ্টা করাটা আমার জন্য ভালো হবে। কিন্তু এর সাথে যুক্ত ঝুঁকি ও মূল্য পরিশোধের ব্যাপার আছে, এমনকি যখন এই দ্বন্দ্বপ্রিয়তা সুনির্দিষ্ট কারো প্রতি নির্দিষ্ট। আর ‘খ’ এর জন্য সুবিধাজনক অবস্থানটি হবে তার মূল্যবান সম্পদ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এর উপরে আক্রমনের প্রতি আক্রমণ করা। যদি আমি যুদ্ধ শুরু করি, সেই যুদ্ধে তার কিংবা আমার মারা যাবার খুবই সম্ভাবনা আছে। হয়তো আমার মারা যাবার সম্ভাবনা খানিকটা বেশী। তার কাছে আছে মূল্যবান সম্পদ, আর সে কারণে আমি তার সাথে যুদ্ধ করতে চাইছি। কিন্তু সে কিভাবে সেই সম্পদের অধিকারী হয়েছিল? হয়তো কোনো যুদ্ধে সেটি সে জয় করেছিল, নিশ্চয়ই আমার আগে অন্য আরো চ্যালেঞ্জকারীদের সে যুদ্ধে হারিয়েছে। সম্ভবত সে খুব ভালো যুদ্ধ করতে পারে। এমনকি যদি আমি যুদ্ধে জিতি এবং হারেমটির উপর আমার কর্তৃত্ব স্থাপন করি, আমি সেই যুদ্ধে এতটাই আহত, ক্ষতবিক্ষত হতে পারি যে, আমি হয়তো আমার জয়ের সেই সুফলটি ভোগ করতে পারবো না। এছাড়া যুদ্ধ করতে সময় ও শক্তির খরচ হয়। হয়তো আপাতত কিছু সময়ের জন্য সেই শক্তিটা সঞ্চয় করতে পারি, যদি আমি খাওয়ায় ও সব ধরনের বিপদজনক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলি কিছু সময়ের জন্য, তাহলে আমি আকারে আরো বড় ও শক্তিশালী হবে। এবং আমি কোনো না কোনো এক সময় তার হারেম দখলের জন্য তার সাথে যুদ্ধ করবো ঠিকই কিন্তু আমার হয়তো জেতার ভালো সম্ভাবনা থাকে যদি আমি খানিকটা সময় অপেক্ষা করি, এক্ষুনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে।

এই আত্মগত সলিলোকুই বা আত্মকথন হচ্ছে দেখানোর একটি উপায় যে, সিন্ধান্ত, সেটি যুদ্ধ করার জন্য বা না করার জন্যই হোক না কেন, আদর্শগতভাবে সিদ্ধান্তটি নেবার পুর্বে একটি জটিল, যদিও সচেতন পর্যায়ে না, ‘লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ থাকে। সম্ভাব্য উপকারিতার সবটুকু যুদ্ধ করার পক্ষে থাকে না, যদিও নিঃসন্দেহে কিছুটা অবশ্যই থাকে। একইভাবে, যুদ্ধের সময়, প্রতিটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যুদ্ধটির তীব্রতা বাড়ানো বা কমানো হবে কিনা, সেটিরও নীতিগতভাবে লাভ ক্ষতির ব্যাপার আছে, যা বিশ্লেষিত হয়। খানিকটা অস্পষ্ট একটি উপায়ে প্রানি-আচরণবিদরা বহুদিন ধরে বিষয়টি অনুধাবন করেছেন, তবে এই ধারণাটি স্পষ্ট আরো দৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্যে প্রয়োজন হয়েছে একজন জন মেনার্ড স্মিথ-এর, যদিও প্রচলিত অর্থে যাকে প্রানি-আচরণবিদ হিসাবে গন্য করা হয় না। জি. আর. প্রাইস ও জি, এ. পার্কারের সহযোগিতায়, তিনি গণিতের একটি শাখার ব্যবহার করেছিলেন এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে, সেটি হচ্ছে: ‘গেম থিওরী। তাদের চমৎকার ধারণাগুলো কোনো ধরনের গাণিতিক সংকেত ছাড়াই তারা প্রকাশ করেছিলেন বোধগম্য ভাষায়, যদিও কিছু অনমনীয়তার বিনিময় মূল্যে।

যে মূল প্রয়োজনীয় ধারণাটি মেনার্ড স্মিথ উপস্থাপন করেছিলেন, সেটি হচ্ছে evolutionarily stable strategy (ESS) বা ‘বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল কৌশল (ইএসএস)-এর ধারণা। তার এই ধারণাটির উৎস আরো আগে ডাবলিউ. ডি. হ্যামিলটন ও আর. এইচ, ম্যাকআর্থারের প্রস্তাবিত কিছু ধারণা। একটি কৌশল’ বা ‘স্ট্রাটেজী’ হচ্ছে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা আচরণ নীতিমালা। একটি স্ট্রাটেজীর উদাহরণ যেমন, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করো। যদি সে পালায়, তার পিছু ধাওয়া করো, যদি সে প্রতি আক্রমণ করে, তাহলে পালিয়ে আসো। এখানে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা কিন্তু এমন কোনো স্ট্রাটেজীর কথা বলছি না, সচেতনভাবে কোন একক সদস্য হিসাব নিকাশ করে যে স্ট্রাটেজী বা কৌশলে উপনীত হয়েছে। মনে রাখবেন আমরা প্রাণীদের দেখছি রবোট সারভাইভাল মেশিনের মত, যাদের একটি আগেই প্রোগ্রাম করা কম্পিউটার আছে যা তাদের মাংসপেশীর সংকোচন নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কৌশলটি একগুচ্ছ সাধারণ নির্দেশনা হিসাবে ইংরেজীতে লেখাটি বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবার জন্য শুধুমাত্র সুবিধাজনক একটি উপায় মাত্র। কিছু অনির্দিষ্ট অজানা প্রক্রিয়ায় কোনো প্রাণী আচরণ করে এমনভাবে যেন মনে হয় তারা এই সব নির্দেশাবলী অনুসরণ করছে।

কোনো একটি evolutionarily stable strategy বা ESS (ইএসএস)-কে সংজ্ঞায়িত করা হয় এমন কোনো একটি স্ট্রাটেজী হিসাবে, যদি কোনো একটি জনগোষ্ঠীর বেশীর ভাগ সদস্যরা এটিকে গ্রহন করে মেনে নেয়, এবং এর চেয়ে উত্তম কোনো বিকল্প স্ট্রাটেজী দিয়ে এটি প্রতিস্থাপিত হবার নয় (১)। এটি খুব সুক্ষ্ম আর গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। আরেকভাবে এটি বলা যেতে পারে, কোনো একক সদস্যের জন্যে সেরা স্ট্রাটেজীটি হচ্ছে তার জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা যা করছে সেটি করা। যেহেতু জনগোষ্ঠীর বাকী সদস্যরা একক সদস্য দিয়ে তৈরী, প্রত্যেকেই তাদের সাফল্য সর্বোচ্চ করতে আগ্রহী, শুধু একটি কৌশল যা টিকে থাকবে সেটি, একবার বিবর্তিত হবার পর, আর কোনো ভিন্নপন্থী সদস্যর অবলম্বনকৃত কৌশল দিয়ে উন্নতিকরণ সম্ভব না। কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের পরে বিবর্তনীয় অস্থিতিশীলতার একটি সংক্ষিপ্ত পর্ব থাকে, হয়তো এমনকি দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করা একটি দোদুল্যমানতা জনসংখ্যায় লক্ষ করা যায়। কিন্তু একবার যখন একটি ‘ইএসএস’ অর্জিত হয়, এটি টিকে থাকে, এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন এর থেকে কোনো বিচ্যুতিকে শাস্তি দেয় এবং আনুকুল্যতা বর্জন করে।

এই ধারণাটিকে আগ্রাসী আচরণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে মেনার্ড স্মিথ সরলতম হাইপোথেটিকাল কেসগুলোর একটিকে বিবেচনা করুন। ধরুন, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে শুধুমাত্র দুই ধরনের যুদ্ধ করার কৌশল বিদ্যমান, কৌশল দুটির নাম ‘হক’ এবং ‘ডোভ’ (hawk ও dove) : এই নামগুলো যে পাখিদের নাম থেকে নেয়া হয়েছে এখানে তাদের বৈশিষ্ট্য ও আচরণ সম্বন্ধে মানুষের প্রচলিত ধারণার কোনো সম্পর্ক কিন্তু নেই। (ডোভরা বাস্তবিকভাবেই বেশ আগ্রাসী আচরণের একটি পাখি)। আমাদের কল্পিত জনগোষ্ঠীর যেকোনো একক সদস্যকে শ্রেণীভুক্ত করা হয়, ‘হক’ অথবা ‘ডোভ’ হিসাবে। ‘হকরা সবসময় লাগামছাড়াভাবেই যুদ্ধ করে, তাদের পক্ষে যতটা শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করা সম্ভব ততটাই তীব্রভাবে। ‘ডোভরা’ শুধু প্রচলিত উপায়ে সম্মানজনকভাবে হুমকি দেয়, কখনো কাউকে আঘাত করে না। যদি কোনো ‘হক’, কোনো ‘ডোভের সাথে যুদ্ধ করতে আসে ‘ডোভ’ দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায় সুতরাং কখনোই আহত হয় না। যদি কোনো ‘হক’ আরেকটি ‘হকের সাথে যুদ্ধ করে তারা সেই যুদ্ধ থামায় না যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ মারা না যায় বা খুব ভয়ঙ্করভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যদি কোন ‘ডোভের আরেকটি ‘ডোভের সাথে সাক্ষাৎ হয়, সেখানে কেউই আহত হয়না, তারা একে অপরকে ভয় দেখায় নানা ভঙ্গিমা করে অনেকক্ষণ ধরে, যতক্ষণ না একজন ক্লান্ত হয়ে পড়ে বা সিদ্ধান্ত নেয়। এসব করার আর কোনো মানে নেই, সুতরাং সে পিছু হটে আসে। আপাতত কিছু সময়ের জন্য আমরা ধরে সেই, কোনো একটি একক সদস্যর পক্ষে কোনোভাবেই আগে থেকে বলা সম্ভব না, যে বিশেষ প্রতিদ্বন্দীর মুখোমুখি সে দাঁড়িয়ে, সে কি ‘হক’ নাকি একটি ডোভ’। তার জন্যে এটি জানার উপায় হচ্ছে তার সাথে যুদ্ধ করা, এবং সেই নির্দিষ্ট সদস্যটির সাথে তার কোনো অতীত যুদ্ধের স্মৃতি নেই, কৌশল নির্ধারণে যা কিনা তাকে সহায়তা করতে পারতো।

এখন পুরোপুরি কাল্পনিক কোনো নিয়ম মেনে আমরা যোদ্ধাদের জন্য ‘নম্বর বরাদ্দ করি। ধরুন, ৫০ পয়েন্ট একবার জেতার জন্য, ০ পয়েন্ট একবার হারার জন্য, ১০০ খুব গুরুতরভাবে আহত হবার জন্য, দীর্ঘ যুদ্ধের পেছনের লম্বা সময় নষ্ট করার জন্য–১০। এই পয়েন্টগুলোকে জিনের টিকে থাকার সরাসরি রুপান্তরযোগ্য বিনিময় মূল্য হিসাবে ভাবা যেতে পারে। কোনো একক সদস্য যে অনেক বেশী নম্বর পায়, অনেক উঁচু গড়পড়তা উপকারিতা বা পে অফ পায়, সেটি হচ্ছে সেই সদস্য যে মারা যাবার আগে জিন পুলে অনেক জিন রেখে যায়। বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে সত্যিকারের গাণিতিক মানের বিশাল সীমানায় এটি অর্থবহ না, কিন্তু বিষয়টি আমাদেরকে সাহায্য করে সমস্যাটি নিয়ে ভাবতে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে ‘হকরা’ কি ‘ডোভদের পরাজিত করে যখন তারা তাদের সাথে যুদ্ধ করে, সে ব্যপারে আমরা আদৌ চিন্তিত নই। আমরা ইতিমধ্যেই এর উত্তরটা জানি, ‘হক’ সবসময়ই জেতে। আমরা জানতে চাই ‘হক’ অথবা ‘ডোভ’ কোনটি আসলে বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল একটি স্ট্রাটেজী। যদি এর মধ্যে কোনোটি তাদের জন্যে একটি ‘ইএসএস’ হয়, তাহলে অন্যটি ‘ইএসএস’ নয়। আমাদের অবশ্যই প্রত্যাশা করতে হবে যেটি ‘ইএসএস’, সেটি বিবর্তিত হবে। তাত্ত্বিকভাবে দুটি ‘ইএসএস’ হওয়া কিন্তু সম্ভব, এটি সত্য হবে জনগোষ্ঠীতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের যে স্ট্রাটেজিই থাকুক না কেন, সেটি ‘হক’ কিংবা ‘ডোভ’ যাই হোক না কেন, কোনো সদস্যের জন্য সেরা কৌশলটি হচ্ছে এটি অনুসরণ করা। এই ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর প্রবণতা থাকবে এই দুটি স্থিতিশীল অবস্থার যে স্ট্রাটেজীতে তারা প্রথম উপনীত হয়েছে সেটি অনুসরণ করা। যদিও আমরা এখন দেখবো, এই দুটি স্ট্রাটেজীর কোনটাই, ‘হক বা ‘ডোভ’, আসলে বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল না সেই কৌশলটির একার উপর ভিত্তি করে এবং সেকারণে তাদের কোনোটা বিবর্তিত হবেই আমাদের এমন কিছু প্রত্যাশা করা উচিৎ না। সেটা করতে আমাদের গড়পড়তা চূড়ান্ত লাভক্ষতিটা হিসাব নিকাশ করে বের করতে হবে।

ধরুন আমাদের একটি জনগোষ্ঠী আছে, যাদের পুরোটাই তৈরী ‘ডোভ’ সদস্যদের নিয়ে। যখনই তারা দ্বন্দ্ব করছে কেউ আহত হচ্ছে না। তাদের দ্বন্দ্বের আচারটি দীর্ঘমেয়াদী, হয়তো চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকার কোনো প্রতিযোগিতা, সেটি শেষ হয় তখনই যখন এক পক্ষ পিছু হটে আসে। বিজয়ী তাহলে এখানে ৫০ পয়েন্ট পায় এই দ্বন্দ্বে জেতার জন্য, কিন্তু এর শাস্তি হিসাবে যে– ১০ পয়েন্ট পায়, এই দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার প্রতিযোগিতায় সময় নষ্ট করার কারণে। সুতরায় কোনো বিজেতা এই প্রতিযোগিতায় মোট ৪০ পয়েন্ট আশা করতে পারে। সময় নষ্ট করার জন্য পরাজিত যে তার শাস্তি হয়,–১০ পয়েন্ট। গড়ে, কোনো একটি একক ‘ডোভ’ তার প্রতিযোগিতায় অর্ধেকবার জেতার প্রত্যাশা করতে পারে, বাকী অর্ধেক সময় তার হারার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং এখানে গড়ে তার পে-অফ বা লাভ হচ্ছে +৪০ আর–১০ এর গড়, সেটি হচ্ছে ‘+১৫’; সুতরাং ‘ডোভদের জনসংখ্যায় প্রতিটি ডোভ সদস্য মোটামুটি ভালোভাবেই তাদের জীবনধারণ করে।

কিন্তু এবার ভাবুন একটি ‘মিউট্যান্ট’ বা পরিবর্তিত আচরণের ‘হক’ এই জনসংখ্যায় উদ্ভূত হলো। যেহেতু সে একাই ‘হক’ সেখানে, প্রতিটি যুদ্ধে তার প্রতিপক্ষ আরেকটি ‘ডোভ’। “হকরা সবসময়ই ‘ডোভদের পরাজিত করে। সুতরাং প্রতিটি প্রতিযোগিতায় সে +৫০ পয়েন্ট অর্জন করে। এবং এটাই তার গড় পে-অফ। ডোভদের উপর সে অত্যন্ত বেশী মাত্রায় সুবিধা পায়। যাদের মোট পে-অফ মাত্র +১৫। এর ফলাফলে ‘হক’ জিন খুব দ্রুত সেই জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এখন প্রতিটি ‘হক আর আগের মত নিশ্চিৎ হতে পারে না, তার সব প্রতিপক্ষই হবে ‘ডোভ। আরো একটি চূড়ান্ত উদাহরণ আমরা নিতে পারি, যদি ‘হক’ জিন সফলভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করে যে পুরো জনগোষ্ঠীতে, দেখা যায় ‘হক’ ছাড়া আর কোনো কিছু নেই, তখন সব যুদ্ধ হবে ‘হকদের’ যুদ্ধ। পরিস্থিতি এখন খুবই আলাদা। যখন কোনো ‘হকের’ আরেকটি ‘হকের সাথে সাক্ষাৎ হয়, তাদের একজন খুব মারাত্মকভাবে আহত হয়, সুতরাং সে–১০০ পয়েন্ট পায়, অন্যদিকে যে জেতে সে পায় +৫০, হকদের জনগোষ্ঠীতে প্রতিটি হক প্রত্যাশা করতে পারে অর্ধেক সংখ্যক যুদ্ধে সে জিতবে আর অর্ধেক সংখ্যক যুদ্ধে সে হারবে; তার গড় পে-অফ হবে প্রতিটি যুদ্ধে +৫০ ও ১০০ র মাঝামাঝি একটি সংখ্যা, সেটি হচ্ছে ‘-২৫’। এবার সেই হকদের জনগোষ্ঠীতে একটি ‘ডোভ’ সদস্যর কথা ভাবুন। নিশ্চিৎভাবে সে সব যুদ্ধে হারবে কিন্তু অন্যদিকে সে কখনোই গুরুতরভাবে আহত হবে না। এই হক জনসংখ্যায় তার গড়পড়তা অর্জন হবে ‘০’, অন্যদিকে ‘হক’ জনসংখ্যায় গড়পড়তা ‘হকের’ অর্জন ‘-২৫’, ‘ডোভ’ জিন সে কারণে জনগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে।

আমি যেভাবে গল্পটা বলেছি, মনে হতে পারে একটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল দোদুল্যমানতা জনগোষ্ঠীতে কাজ করছে। ‘হক’ জিন পুরো জনসংখ্যায় ছড়িয়ে পড়বে প্রথমে, তারপর ‘হকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ‘ডোভ’ জিনরা একটা বাড়তি সুবিধা পাবে এবং সংখ্যায় বাড়বে যতক্ষণ না অবধি ‘হক’ জিন আবার প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পারে এবং এভাবে পালাক্রমে চলতে থাকবে। যদিও এরকম পালাবদলের প্রয়োজন নেই।’ডোভদের তুলনায় ‘হকদের সংখ্যার একটি ভারসাম্যময় স্থিতিশীল অনুপাত আছে। একটি কাল্পনিক পয়েন্ট সিস্টেম, যা আমরা ব্যবহার করেছি, স্থিতিশীল অনুপাত, আপনি যদি সেটি হিসাব নিকাশ করে বের করেন, দেয়া যাবে ৭/১২ ‘হক’ প্রতি ৫/১২ ‘ডোভ’ আছে। যখন এই স্থিতিশীল অনুপাতটি অর্জিত হয়, ‘হকদের’ গড়পড়তা লাভ ‘ডোভদের’ গড়পড়তা লাভের সমান হয়। সুতরাং সেখানে প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনোটাকেই অন্যটির চেয়ে বেশী আনুকুল্য প্রদর্শন করে না। যদি ‘হকদের সংখ্যা জনসংখ্যায় বাড়তে থাকে সেই অনুপাত বরাবর যে সেটি আর ৭/১২ নয়, ‘ডোভরা’ তখন বাড়তি সুবিধা পেতে শুরু করে, এবং অনুপাতটি আবার স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরে আসে। ঠিক যেমন করে আমরা একটি স্থিতিশীল লিঙ্গ অনুপাত পাই ‘৫০: ৫০, সেভাবেই এই কাল্পনিক উদাহরণে ‘ডোভ’ প্রতি ‘হকদের’ স্থিতিশীল অনুপাত হবে: ৭:৫। যেকোনো ক্ষেত্রেই, যদি স্থিতিশীল বিন্দুটির আশে পাশে কোনো দোদুল্যমানতা হয়, খুব বড় কোনো মাত্রায় তা হবার প্রয়োজন নেই।

বাহ্যত, এটি শুনতে খানিকটা গ্রুপ সিলেকশনের মত শোনায়, কিন্তু আসলে এটি সেরকম কোনো কিছু নয়। এটি গ্রুপ সিলেকশনের মত মনে হয় কারণ এটি আমাদের এমন একটি জনগোষ্ঠীর কথা ভাবতে শেখায় যেখানে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্যতা আছে, যে বিন্দুতে এটি প্রত্যাবর্তন করে বা আবার ফিরে আসে যখনই কোনো কারণে এর ভারসাম্যটি ব্যহত হয়। কিন্তু গ্রুপ সিলেকশনের তুলনায় ‘ইএসএস’ আরো অনেক বেশী সূক্ষ্ম একটি ধারণা। কোনো একটি গ্রুপ অন্য একটি গ্রুপ থেকে বেশী সফল এমন কোনো ধারণার সাথে এর কোনো যোগাযোগ নেই। আমাদের এই হাইপোথেটিকাল উদাহরণে কাল্পনিক একটি পয়েন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে খুব সুন্দরভাবে এটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব। একটি একক সদস্যের জন্য গড় পে-অফ, কোনো স্থিতিশীল জনসংখ্যায় যেখানে ৭/১২ ‘হক আর ৫/১২ ‘ডোভ’ থাকে,দেখা যায় ৬১/৪ (৬.২৫)। আর এটি সত্য সেই একক সদস্যটি একটি ‘ডোভ’ কিংবা ‘হক’ যাই হোক না কেন। এখন ৬ ১/৪ কিন্তু কোনো ‘ডোভ’ জনগোষ্ঠীতে একটি ডোভ গড় পড়তা পে অফের তুলনায় (+১৫) অনেক কম। যদি শুধুমাত্র সবাই রাজী হতো ‘ডোভ’ হবার জন্যে, প্রতিটি একক সদস্য সেখানে ‘লাভবান’ হতো। খুব সাধারণ গ্রুপ সিলেকশনের দ্বারা, কোনো গ্রুপ যেখানে সব সদস্যই ঐক্যমতে পৌঁছায় ‘ডোভ’ হবার জন্য তারা অনেক কম সফল কোনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের তুলনায় যারা তাদের ‘ইএসএস’ অনুপাতে স্থিতিশীল আছে। (আসলেই বাস্তব সত্য হচ্ছে, কোনো ষড়যন্ত্র’ যে গ্রুপে ‘ডোভ’ ছাড়া আর কোনো কিছু নেই, সেটি কিন্তু সবচেয়ে সম্ভাব্য সফল গ্রুপ না, কোনো একটি গ্রুপ যেখানে ১/৬ ‘হক’ আর ৫/৬ ‘ডোভ’, সেখানে প্রতিটি প্রতিযোগিতায় গড় পে অফ হচ্ছে ‘১৬ ২/৩’; এটাই সবচেয়ে সফল ষড়যন্ত্র, কিন্তু বর্তমান উদ্দেশ্যের জন্য ব্যাপারটি আমরা উপেক্ষা করতে পারি। একটি সরলতর সব ‘ডোভ’-ষড়যন্ত্রতে, যার গড় পে-অফ প্রতিটি একক সদস্যর জন্য ১৫, যা অনেক বেশী ভালো প্রতিটি একক সদস্যর জন্য, কোনো ‘ইএসএস’ যা হতে পারে তার চেয়ে বেশী)। গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্ব সেকারণে এমন কোনো বিবর্তন প্রবণতার ভবিষ্যদ্বাণী করবে, যেখানে সবাই ‘ডোভ’ হবে এমন ষড়যন্ত্রে থাকবে, কারণ কোনো গ্রুপ যার ৭/১২ অংশ ‘হক’ ধারণ করে সে। কম সফল হবে। কিন্তু ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত সমস্যা হচ্ছে, এমনকি যেগুলো পরিশেষে সবাইকে লাভবান করে, সেগুলো অপব্যবহৃত হবার জন্যে ‘উন্মুক্ত। যেকোনো একটি ‘ইএসএস’ গ্রুপের তুলনায় সত্যি যে, সবাই ‘ডোভ’ এমন কোনো গ্রুপে প্রত্যেকেই বেশী লাভবান হবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ‘ডোভদের এই ষড়যন্ত্রে, একটি একক ‘হক’ এতটাই ভালো করে যে, কোনো কিছু সেখানে ‘হকদের’ বিবর্তনকে থামাতে পারেনা। সেকারণে এর অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এই ‘ষড়যন্ত্র’ ভাঙতে বাধ্য। কোনো একটি ‘ইএসএস’ স্থিতিশীল, এর কারণ এখানে অংশগ্রহন করা সদস্যদের জন্যে এটি বিশেষভাবে ভালো তা কিন্তু না বরং এটি এর ভিতর থেকে উদ্ভুত কোন বিশ্বাসঘাতকতা থেকে সুরক্ষিত।

মানুষের পক্ষে যদিও সম্ভব এমন কোনো চুক্তি বা ষড়যন্ত্রে জড়াতে যেখানে প্রত্যেকেই লাভবান হবে, এমনকি যদিও তারা ‘ইএসএস’ অর্থে স্থিতিশীল নয়। কিন্তু এটা শুধুমাত্র সম্ভব কারণ প্রতিটি একক সদস্য তাদের সচেতন পূর্বদষ্টি ব্যবহার করে এবং তারা সক্ষম এটি বুঝতে যে, এই ঐক্যমতের চুক্তি মেনে চললে তার নিজেরই দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থগুলো সুরক্ষিত হবে। কিন্তু এমনকি মানুষের এই চুক্তিতেও একটি সার্বক্ষণিক আশঙ্কা থাকে কারণ কোনো সদস্য যদি চুক্তি ভঙ্গ করে ‘স্বল্প মেয়াদী পর্যায়ে, তার এতটাই বেশী লাভ করার থাকে যে সেটা করার জন্যে তার প্রলোভন অত্যন্ত শক্তিশালী হবে। হয়তো সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে ‘প্রাইস ফিক্সিং’ বা কোন কিছু বিক্রয়মূল্য পূর্বনির্ধারণ। একক ভাবে সব গ্যারেজ মালিকদের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ হচ্ছে পেট্রোলের দাম একটি কৃত্রিম উচ্চ মাত্রায় ঠিক করা। এবং এভাবে জোট বদ্ধ হয়ে করা ‘প্রাইস রিং’, যা সচেতনভাবে ভবিষ্যতের স্বার্থরক্ষার উপর ভিত্তি করে তৈরী করা হয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু প্রায়শই এর মাঝে কেউ কেউ, দ্রুত লাভ করার জন্যে তার দাম কমিয়ে সেই প্রলোভনের কাছে হার স্বীকার করে। সাথে সাথেই তার প্রতিবেশীরাও সেই একই কাজ করে এবং দেশ জুড়ে দাম কমানোর হিড়িক পড়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাকী সবার জন্য, গ্যারেজ মালিকদের সচেতন পূর্বদৃষ্টি এরপর আবারো ফিরে আসে, তারা আবার নতুন একটি দাম বেধে দেবার চুক্তিতে যোগ দেয়। সুতরায় এমনকি মানুষও, যে প্রজাতি সচেতন দূরদর্শিতার গুণে আশীর্বাদপুষ্ট, সেখানে দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রক্ষার উপর ভিত্তি করে কোনো চুক্তি বা ষড়যন্ত্রটি, এই গ্রুপটির ভিতর থেকে উদ্ভূত কোনো বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ভেঙ্গে পড়ার সার্বক্ষণিক একটি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বন্যপ্রাণীরা, যারা জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি সংগ্রামে লড়ছে, এমনকি সেখানে সেই সব উপায়গুলো দেখা আরো বেশী কঠিন, যেখানে পদের উপকার অথবা ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত স্ট্রাটেজী সম্ভবত বিবর্তিত হতে পারে। অবশ্যই প্রত্যাশা করতে হবে বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল কৌশলগুলো আমরা সব জায়গায় খুঁজে পাবো।

আমাদের ‘হাইপোথেটিকাল’ উদাহরণে আমরা একটি সরল পূর্বধারণা করেছিলাম যে, কোনো একজন একক সদস্য হয় একটি ‘হক বা একটি ‘ডোভ’। পরিশেষে আমরা ‘ডোভদের সাথে ‘হকদের’ বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল একটি অনুপাত পাই। ব্যবহারিক পর্যায়ে, এর অর্থ হচ্ছে যে জিনপুলে ‘ডোভ’ জিনের সাথে ‘হক’ জিনগুলোর একটি স্থিতিশীল অনুপাত অর্জিত হবে। এই অবস্থাটির জিনগত কারিগরী নাম হচ্ছে ‘স্টেবল পলিমরফিজম’। যত দুর গণিতের সাথে জড়িত, একটি ঠিক সমতুল্য ‘ইএসএস’ আমরা অর্জন করতে পারি কোনো ‘পলিমরফিজম’ ছাড়া এভাবে। যদি প্রতিটি একক সদস্য’ সক্ষম হয় আচরণ করতে হয় “হকদের’ মত বা ‘ডোভদের মত প্রতিটি নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায়, একটি ‘ইএসএস’ অর্জিত হতে পারে যেখানে সব একক সদস্যেরই ‘হকের মত আচরণ করার একই ‘সম্ভাবনা থাকবে, অর্থাৎ আমাদের সেই বিশেষ উদাহরণে: ৭/১২। ব্যবহারিক পর্যায়ে এর অর্থ হচ্ছে যে প্রতিটি একক সদস্য প্রতিটি প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করে একটি ‘র্যানডোম’ সিদ্ধান্ত নেবার মাধ্যমে, সেই বিশেষ ক্ষেত্রে সেকি ‘হকের মত আচরণ করবে, নাকি ‘ডোভের’ মত আচরণ করবে। র‍্যানডোম কিন্তু একটি ৭:৫ অনুপাত ‘হকদের অভিমূখে পক্ষপাতিত্ব করছে। খুব বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, সিদ্ধান্তগুলো, যদিও হকের দিকে পক্ষপাতিত্ব করছে, সেটি হবার কথা র‍্যানডোমভাবে এমন অর্থে, যে কোনো এক প্রতিদ্বন্দ্বীর যেন কোনোভাবেই অনুমান করার কোনো উপায় না থাকে সেই নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায় তার বিপক্ষ ঠিক কিভাবে আচরণ করবে। যেমন, একটানা সাতটি যুদ্ধে ‘হকের’ মত আচরণ করা, তারপর পরের পাঁচটি যুদ্ধে পর পর ‘ডোভের’ মত আচরণ করা.. ভালো হবে না। যদি কোনো একক সদস্য এমন কোনো সরল অনুক্রম অনুসরণ করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী খুব সহজে কৌশলটি বুঝে যাবে এবং তার সুযোগ নেবে। সাধারণ ধারাবাহিক এই পর্যায়ক্রমিক কৌশলের সুযোগ নেবার একটি পথ হচ্ছে তার বিরুদ্ধে ‘হকের’ মত আচরণ করা যখন আপনি জানবেন সে ‘ডোভের’ মত আচরণ করবে।

‘হক’ ও ‘ডোভের’ গল্প, অবশ্যই, খুবই সহজ সরল। এটি হচ্ছে একটি ‘মডেল’, এমন কিছু যা আসলে প্রকৃতিতে ঘটে না, কিন্তু এটি প্রকৃতিতে ঘটা নানা বিষয়গুলো বোঝার জন্যে বা কোনো ধারণা পাবার জন্য আমাদের সাহায্য করে। মডেল হতে পারে খুব সাধারণ, এটার মত এবং তারপরও উপযোগী মূল বিষয়টি বোঝার জন্য বা ধারণাটি অনুভব করার জন্য। সাধারণ মডেল বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে আর ধীরে ধীরে সেটি আরো জটিল হয়। যদি সব ঠিক মত কাজ করে, তাহলে তারা যতই বেশী জটিল হতে শুরু করবে তারা ততই বাস্তব পৃথিবী সদৃশ হতে শুরু করবে। ‘হক’ ও ‘ডোভ’ মডেলকে আরো বেশী বিস্তারিত করে গড়ে তোলা কাজটি শুরু করার একটি উপায় হচ্ছে আরো কিছু স্ট্রাটেজী সেখানে উপস্থাপন করা। ‘হক’ আর ‘ডোভ’ শুধুমাত্র একক সম্ভাবনা নয়, আরো জটিল একটি স্ট্রাটেজি যা মেনার্ড স্মিথ ও প্রাইস উপস্থাপন করেছিলেন, সেটি হচ্ছে ‘রিটালিয়েটর’ বা ‘প্রতিশোধ গ্রহনকারী।

একজন ‘রিটালিয়েটর’ প্রতিটি প্রতিযোগিতার শুরুতে ‘ডোভের’ মত খেলে, অর্থাৎ, ‘হকের মত সে সর্বস্ব নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে না বরং সেই ভয় দেখানোর প্রথাগত যুদ্ধ দিয়ে শুরু করে। যদি তার বিপক্ষ তাকে আক্রমণ করে, তখন অবশ্য সে পাল্টা আক্রমণ করে তার বদলা নেয়। অন্যভাবে বললে কোনো রিটালিয়েটর’ ‘হকের মত আচরণ করে যখন তাকে কোনো ‘হক আক্রমণ করে এবং ‘ডোভের মত আচরণ করে যখন তার প্রতিপক্ষ হয় একটি ‘ডোভ। যখন সে অন্য কোনো রিটালিয়েটরের মুখোমুখি হয় সে ‘ডোভের’ মত ব্যবহার করে। একজন ‘রিটালিয়েটর’ শর্ত স্বাপেক্ষে তার কৌশল নির্ধারণ করে। কারণ তার আচরণ নির্ভর করে তার প্রতিপক্ষের আচরণের উপর।

আরো একটি শর্তাধীন কৌশুলী যাকে বলা হয় “বুলি। “বুলি’ ‘হকের মত আচরণ করে বেড়ায় যতক্ষণ না তাকে ‘হকের’ মতই কেউ পাল্টা আক্রমণ করে। তখন সাথে সাথেই সে পালিয়ে যায়। আরো একধরনের কৌশলী হচ্ছে ‘প্রোবার-রিটালিয়েটর’; একজন ‘প্রোবার-রিটালিয়েটর’ মূলত একজন রিটালিয়েটরের’ মত, কিন্তু মাঝে মাঝে সে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কোনো প্রতিযোগিতায় তার আচরণের তীব্রতা বাড়ায়, সে ‘হকের’ মত আচরণ ধরে রাখে, যদি তার প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতি আক্রমণ না করে। কিন্তু যদি এর বিপরীত, তার প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে, সে ‘ডোভের’ মত তার প্রথাগত ভয় দেখানোয় প্রত্যাবর্তন করে। আর যদি সে আক্রান্ত হয়, সেও যে কোনো সাধারণ ‘রিটালিয়েটরের’ মত পাল্টা আক্রমণ করে।

যদি এই পাঁচটি স্ট্রাটেজী যা আমি উল্লেখ করলাম তাদেরকে যদি পরস্পরের বিরুদ্ধে ছেড়ে দেয়া হয় একটি কম্পিউটার সিমুলেশনে, তাদের মধ্যে শুধু রিটালিয়েটর’, বিবর্তনভাবে স্থিতিশীল হিসাবে প্রমাণিত হয় (২)। “প্রোবার-রিটালিয়েটর’ প্রায় স্থিতিশীল। “ডোভ’ স্থিতিশীল নয়, কারণ কোনো ‘ডোভ’ পূর্ণ জনগোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ করবে ‘হক’ এবং ‘বুলিরা। হকও স্থিতিশীল নয়। কারণ ‘হকদের’ জনগোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ করবে ‘ডোভ’ ও ‘বুলিরা’। “বুলিরা’ স্থিতিশীল না, কারণ ‘বুলিদের’ জনগোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ করবে ‘হকরা। কোনো একটি রিটালিয়েটরদের’ জনগোষ্ঠীতে, অন্য কোনো স্ট্রাটেজীর অনুপ্রবেশ ঘটে না, কারণ অন্য কোনো স্ট্রাটেজী আসলে ‘রিটালিয়েটরদের চেয়ে বেশী ভালো কাজ করেনা। যদিও, ‘ডোভরা’ কোনো রিটালিয়েটর জনসংখ্যায় সমানভাবে ভালো থাকে। তার মানে হচ্ছে অন্য সব কিছু একই থাকলে, ‘ডোভদের’ সংখ্যা খুব ধীরে উপরের দিকে বাড়তে থাকতে পারে। এখন যদি ‘ডোভদের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ কোনো একটি স্তর অবধি বেড়ে যায়, ‘প্রোবার-রিটালিয়েটর’ (এবং ঘটনাক্রমে, ‘হক’ এবং “বুলিরা’) ধীরে ধীরে সুবিধা পেতে শুরু করে কারণ তারা ‘ডোভদের সাথে ‘রিটালিয়েটরদের চেয়ে প্রতিযোগিতায় ভালো করে। প্রোবার রিটালিয়েটর’ নিজে, ‘হক’ ও ‘বুলির’ ব্যতিক্রম, প্রায় একটি ‘ইএসএস’, এই অর্থে যে, কোনো একটি প্রোবার-রিটালিয়েটর জনগোষ্ঠীতে, শুধু মাত্র অন্য আরেকটি স্ট্রাটেজী, রিটালিয়েটর ভালো করে এবং তাও শুধুমাত্র খানিকটা বেশী। যেমনটা আমরা আশা করতে পারি, ‘রিটালিয়েটর’ ও ‘প্রোবার-রিটালিয়েটরদের’ একটি মিশ্রণ সেখানে প্রাধান্য বিস্তার করে,হয়তো খুব সামান্য দুটি গ্রুপের মধ্যে দোদুল্যমানতাসহ, সংখ্যালঘু ‘ডোভদের ছোট একটি গ্রুপে দোদুল্যমানতাসহ। আরো একবার, আমাদের পলিমরফিজমের ভাষায় ভাবতে বাধ্য হতে হয় না, যেখানে প্রত্যেকটি সদস্য কোনো না কোনো একটি স্ট্রাটেজী ব্যবহার করে সবসময়। প্রতিটি সদস্য একটি জটিল মিশ্র স্ট্রাটেজী ব্যবহার করতে পারে, রিটালিয়েটর’, ‘প্রোবার-রিটালিয়েটর’ এবং ‘ডোভ।

এই তাত্ত্বিক উপসংহার সত্যিকারভাবে অধিকাংশ বন্য প্রাণীদের মধ্যে কি ঘটছে তার থেকে খুব বেশী দূরের না। আমরা এক অর্থে প্রাণীদের আগ্রাসনের ‘গ্লোভড ফিস্ট’ বা দস্তানা পরা হাত এর ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করলাম। অবশ্যই বিস্তারিত খুঁটিনাটি নির্ভর করছে সঠিক সংখ্যক নম্বর’ এর উপরে– যা দিয়ে বিজয়ীকে, আহত হওয়া, সময় নষ্ট এবং ইত্যাদি নানা পরিস্থিতিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এলিফ্যান্ট সীলদের ক্ষেত্রে কোনো কিছু জেতার পুরষ্কার হয়তো অসংখ্য স্ত্রী এলিফ্যান্ট সীলের হারেমের উপর প্রায় একচ্ছত্র আধিপাত্য করার অধিকার। এই যুদ্ধে জেতার পুরষ্কার তাই অবশ্যই মূল্যায়িত হয় খুব উঁচু হিসাবে। খুব অবাক হবার কোনো কারণ নেই যে সে কারণে যুদ্ধগুলো খুবই সহিংসতাপুর্ণ এবং গুরুতর আহত হবার সম্ভাবনাও অনেক বেশী। যুদ্ধে আহত হওয়া আর যুদ্ধে জিতার পর পাওয়া সুফলগুলো মূল্যের সাথে তুলনামূলক বিবেচনায় সময় নষ্ট করা মূল্য কম ধারণা করা হয়েছে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় কোনো একটি ছোট পাখির জন্য সময় নষ্ট করার মাশুল অত্যন্ত বেশী হতে পারে। কোনো একটি গ্রেট টিট যখন তার বাচ্চাদের খাওয়াবে, তখন প্রতিটি ত্রিশ সেকেন্ডে তাকে একটি করে শিকার ধরতে হয়, দিনের আলোর প্রতিটি মুহূর্ত তার জন্যে মহামূল্যবান। এইসব পাখিদের জন্যে এমনকি হক/হক যুদ্ধে অপেক্ষাকৃত কম সময় নষ্ট হওয়া হয়তো গুরুতর আহত হবার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ পরিগণিত হতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমানে প্রকৃতিতে এই সব প্রতিটি কৌশলের পরিণতির জন্যে সত্যিকার বাস্তবসম্মতভাবে নম্বর বন্টন করার বিষয়টি সম্বন্ধে আমরা খুবই কমই জানি (৩)। আমাদের অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এমন কোনো উপসংহার না টানার জন্য, যে ফলাফলগুলো শুধুমাত্র আমাদের কাল্পনিকভাবে পছন্দ করা নম্বরগুলোর উপর ভিত্তি করেই উপস্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ যে উপসংহারটি আরো গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে যে ‘ইএসএস’ গুলো বিবর্তিত হতে থাকে, কোনো একটি ‘ইএসএস’ সবচেয়ে অনুকূল কৌশলের সমতুল্য নয়, যা কিনা কোনো গ্রুপ যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করে অর্জন করতে পারে এবং সেই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানটি বিভ্রান্ত করতে পারে।

অন্য আরেক ধরনের যুদ্ধ খেলার কথা মেনার্ড স্মিথ বিবেচনা করেছিলেন সেটি হচ্ছে war of attrition বা শক্তি ক্ষয়ের যুদ্ধ। কোনো একটি প্রজাতিতে এটি উদ্ভব হতে পারে বলে ভাবা যেতে পারে, যারা কখনো সহিংস দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় না, হয়তো বর্ম দিয়ে সুরক্ষিত কোনো প্রজাতি যাদের গুরুতর আহত হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই প্রজাতির মধ্যে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা হয় প্রথাগতভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করার মাধ্যমে। এবং প্রতিযোগিতা সবসময় শেষ হয় যখন একটি প্রতিদ্বন্দ্বী পিছু হটে যায়। জেতার জন্য এই প্রজাতির কোনো সদস্যকে শুধু তার জায়গায় আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এবং প্রতিপক্ষের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতে হবে, যতক্ষণ না সে পিছু হটে। অবশ্যই ভয় দেখিয়ে কোনো প্রাণী অনির্দিষ্টকাল সময় অপচয় করতে পারে না, অন্য কোথাও করার জন্য আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। যে সম্পদের জন্য সে যুদ্ধ করছে সেটি হতে পারে খুব মূল্যবান, কিন্তু অসীমভাবে মূল্যবান না। এটির জন্য সীমিত একটি সময়ই শুধু খরচ করা যেতে পারে। এবং যেমন কোনো নিলামে বিক্রির সময়, প্রতিটি একক সদস্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিমান টাকা তার পেছনে খরচ করার জন্য প্রস্তুত, সময় হচ্ছে দুজন ক্রেতার নিলামের বিনিময় মূল্য বা কারেন্সি।

মনে করুন, এরকম সব সদস্যরাই আগে থেকেই নির্ধারণ করে ঠিক কতটা সময় তারা কোনো একটি বিশেষ ধরনের ‘সম্পদ’, ধরুন, কোনো স্ত্রী সদস্যের জন্য ব্যয় করা যেতে পারে। কোনো একটি মিউট্যান্ট (পরিবর্তিত) সদস্য যে কিনা আরো অল্প খানিকটা দীর্ঘ সময় সেই কাজে ব্যয় করার জন্য প্রস্তুত, সে সবসময় সেখানে জয়লাভ করবে। সুতরাং স্ট্রাটেজী হিসাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট মূল্যসীমা টিকিয়ে রাখাঁটি অস্থিতিশীল। এমনকি যদি সম্পদের মূল্য খুব সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করা যায় এবং সব সদস্যই সঠিক মূল্যটি দর হিসাবে প্রস্তাব করে, তারপও এই স্ট্রাটেজীটি অস্থিতিশীল। এই ম্যাক্সিমাম স্ট্রাটেজী অনুযায়ী দর ডাকা যেকোনো দুটি সদস্য এই সাথে হাল ছেড়ে দেয় এবং দুজনের কেউই সেই সম্পদটি পায় না! সুতরাং কেউই যদি শুরুতেই হাল ছেড়ে দেয়, প্রতিযোগিতার জন্যে অযথা সময় নষ্ট না করে, সে সময় বাঁচিয়ে লাভবান হয়। এই শক্তি ক্ষয়ের যুদ্ধ এবং সত্যিকারের নিলামের যুদ্ধের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, মোটকথা, কোনো শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধে ‘দুই প্রতিযোগীই মূল্য পরিশোধ করে তবে তাদের একজন সম্পদটি অর্জন করে। কোনো একটি জনসংখ্যায় যারা সবচেয়ে বেশী দাম প্রস্তাব করে, সেখানে শুরুতেই হাল ছেড়ে দেবার কৌশলটি সফল হবে এবং জনসংখ্যায় সেটি বিস্তার লাভে করবে। এর ফলশ্রুতিতে কিছু উপযোগিতা ধীরে ধীরে জমা হবে সেই সব সদস্যদের কাছে যারা সাথে সাথে হাল ছাড়ছেনা, বরং হাল ছেড়ে দেবার আগে কিছু সেকেন্ড তারা অপেক্ষা করে। আর এই স্ট্রাটেজী ভালোই পুরষ্কার দেয় যখন যুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে হাল ছেড়ে দেয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে এটি ব্যবহৃত হয়। নির্বাচন তখন ক্রমশ বাড়তে থাকা হাল ছেড়ে দেবার সময়ের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে আনুকুল্য প্রদর্শন করবে যতক্ষণ না এটি আরো একবার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়, যে সর্বোচ্চ সীমানাটি কি হবে সেটি নির্ধারণ করে যে সম্পদের জন্য দ্বন্দ্ব হচ্ছে তার সত্যিকারের অর্থনৈতিক মূল্যের উপর।

আরো একবার, শব্দ ব্যবহারে, আমরা আমাদের জনসংখ্যায় দোদুল্যমানতার এই দৃশ্যকল্পটি বোঝার জন্য চেষ্টা করলাম। আরো একবার, গাণিতিক বিশ্লেষণ প্রদর্শন করে এটি সঠিক না। এটাই একটি বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল কৌশল। যাকে গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে প্রকাশ করা যেতে পারে, কিন্তু এমন শব্দে এটি প্রকাশিত যে এটি দাঁড়ায় এমন কিছু, প্রতিটি সদস্য পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী। করা সম্ভব না এমন একটি সময় বেছে নেয়, যে কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য পূর্বধারণা করা সম্ভব না, অর্থাৎ সম্পদের সত্যিকার মূল্যে গড়পড়তার মূল্যের কাছাকাছি তার অবস্থান। যেমন ধরুন, যে সম্পদটির জন্য যুদ্ধ করছি সেটির আসল মূল্য হচ্ছে পাঁচ মিনিটের জন্য প্রদর্শনী। ইএসএস’ এর সেই পর্যায়ে, কোনো একটি নির্দিষ্ট সদস্য ৫ মিনিটের বেশীও চলতে পারে বা ৫ মিনিটের আরো কম হয়তো সে চালাতে পরে, বা সে এমনকি সঠিকভাবে ৫ মিনিটই ব্যয় করে। আসল বিষয়টি হচ্ছে কোনো একটি নির্দিষ্ট দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের বোঝার কোনো উপায় নেই সে আসলেই কতক্ষণ টিকে থাকার জন্য প্রস্তুত।

অবশ্যই, এই শক্তি ক্ষয়ের যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদস্যরা কখন তারা হাল ছেড়ে দিচ্ছে সেই বিষয়ে আগে কোনো ধরনের আভাস দেবে না। কেউই যদি এই তথ্যটি লুকাতে ব্যর্থ হয়, সামান্যতম কোনো আভাস বা ইঙ্গিত তাদের গোপন তথ্যটি ফাস করে দেয়, যে হাল ছেড়ে দেবার জন্য সে চিন্তা শুরু করেছে, সে সাথে। সাথে সুযোগ বঞ্চিত হয়। ধরুন যদি, এই গোফ নাড়ানো বা শরীরের কোনো অঙ্গভঙ্গী পিছু হটার জন্যে নির্ভরযোগ্য একটি চিহ্ন হয়ে থাকে যে সে হাল ছেড়ে দিচ্ছে এক মিনিটের মধ্যে, তাহলে খুব সহজ একটি কৌশল থাকবে জেতার জন্য: যদি প্রতিপক্ষের গোফ নাড়ানো দেখা যায় তাহলে আরো এক মিনিট অপেক্ষা করা দরকার, হাল ছেড়ে দেবার জন্য অতীতে যে পরিকল্পনাই থাকুক না কেন আপনার, যদি আপনার প্রতিপক্ষের গোফ এখনও না কাপে এবং আপনি যদি এক মিনিট সময়ের মধ্যে থাকেন যখন আপনি নিজেই হাল ছেড়ে দেবার কথা ভাবছেন, এখনই হাল ছেড়ে দিন এবং আর কোনো সময় নষ্ট করবেন না, আপনার নিজেদের গোফ নাড়াবেন না কখনোই। সুতরাং প্রাকৃতিক নির্বাচন খুব দ্রুত গোফ নাচানো এবং অন্য কোনো সমরুপী আচরণ যা কারো পরিকল্পনা ফাস করে দেয় ভবিষ্যতের কোনো আচরণ সম্বন্ধে, সেগুলোকে শাস্তি দেয়, সুতরাং ভাবলেষহীন মুখ বা পোকার ফেস’ বিবর্তিত হবে।

কেন তাহলে পোকার ফেস, সরাসরি মিথ্যা বলা না কেন? আবারো, কারণ মিথ্যা স্থিতিশীল নয়। ধরুন, দেখা গেল বেশীর ভাগ সদস্য তাদের ঘাড়ের লোম খাড়া করে যখন তারা সত্যিকারভাবেই অনেক ক্ষণ ধরে শক্তি ক্ষয়ের যুদ্ধ চালাতে চায়। অবশ্যই এর বিপরীত কৌশল বিবর্তিত হবে: সেই সদস্যরা যারা সাথে সাথে হার স্বীকার করে যখন প্রতিপক্ষ তাদের ঘাড়ের লোম খাড়া করে, কিন্তু এখন, মিথ্যাবাদীরা হয়তো বিবর্তিত হতে শুরু করবে। সেই সব সদস্যরা যাদের আসলেই কোনো ইচ্ছা নেই দীর্ঘ সময় ধরে দ্বন্দ্ব করার, কিন্তু তারা তাদের ঘাড়ের লোম খাড়া করবে প্রতিবার এবং প্রতিবারই সহজ আর দ্রুত বিজয়ের সুফল ভোগ করবে। সুতরাং মিথ্যাবাদী জিনটি বিস্তার লাভ করবে। যখন মিথ্যবাদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, নির্বাচন তখন সেই সব সদস্যদের আনুকুল্যতা দেবে যারা তাদের ছলনাটি ধরতে পারে। সুতরাং মিথ্যাবাদীরা সংখ্যায় আবার কমে যাবে। শক্তিক্ষয়ের এই যুদ্ধে মিথ্যা কথা বলা সত্যি কথা বলার চেয়ে অধিকতর বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল না। ভাবলেশহীন মুখ বা পোকার ফেসই বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল। আত্মসমর্পন করুন, যখন এটি অবশেষে আসবে, খুব হঠাৎ করে হবে আর আর আগে থাকে যা ধারণা করা যায় না।

আপাতত আমরা শুধু সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি, যা মেনার্ড স্মিথ বলেছেন ‘সিমেট্রিক’ বা প্রতিসম প্রতিযোগিতা। এর মানে আমরা পূর্বধারণা করে নিয়েছি প্রতিযোগিরা সবাই একই রকম সব ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র তাদের যুদ্ধ করার কৌশল ভিন্ন। ‘হক আর ‘ডোভদের’ মনে করে নিয়েছি তারা সমপরিমান শক্তিশালী, এবং একই ভাবে তারা সুসজ্জিত নানা অস্ত্র আর বর্মে এবং বিজয়ী হলে তারা একই পরিমান সুফল পায়। কোনো একটি মডেল তৈরীর জন্য এটি সুবিধাজনক একটি ধারণা, কিন্তু বেশী বাস্তবসম্মত নয়। পার্কার ও মেনার্ড স্মিথ এর পর ‘অ্যাসিমেট্রিক’ বা অপ্রতিসম প্রতিযোগিতার কথা বিবেচনা করেন, যেমন, যদি সদস্যরা তাদের আকারে ও যুদ্ধ করার ক্ষমতায় ভিন্ন হয় এবং প্রতিটি সদস্য যদি তার নিজের তুলনায় তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের আকার মাপার মত দক্ষতা থাকে, সেটা কি’ইএসএস’ কে কোনোভাবে প্রভাবিত করে, যেটি বিবর্তিত হয়? অবশ্যই করে।

ধারণা করা হয় তিনটি প্রধান ধরনের এসিমেট্রি বা অসাম্যতা আছে। প্রথমটি আমরা কেবলই দেখলাম: সদস্যরা তাদের আকার আর যুদ্ধ করার অস্ত্রে ভিন্ন হতে পারে, দ্বিতীয়ত, সদস্যরা হয়তো ভিন্ন হতে পারে জেতার পরে তারা কতটা সুফল ভোগ করবে সেই ক্ষেত্রে। যেমন, একজন বৃদ্ধ মানুষ, যার বেশী দিন বেঁচে থাকার কথা না এমনিতেও, হয়তো অনেক কম কিছু হারাবার আছে যদি সে আহত হয়, কোনো একটি তরুণ পুরুষদের চেয়ে, যার অনেক বেশী প্রজনন জীবন পড়ে আছে।

তৃতীয়ত, এই তত্ত্বটির অদ্ভুত একটি পরিণতি হচ্ছে যে, পুরোপরিভাবে মনগড়া, আপাতদৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক অপ্রতিসাম্যতা একটি ‘ইএসএস’ এর জন্ম দিতে পারে, কারণ এটি যে কোনো দ্বন্দ্ব দ্রুত নিরসনে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, সাধারণত যা ঘটে থাকে, কোনো একজন প্রতিযোগী প্রতিযোগিতার স্থানে আগে এসে উপস্থিত হয় অন্যদের তুলনায়। তাদের ডাকা যেতে পারে যথাক্রমে ‘রেসিডেন্ট বা স্থানীয় এবং “ইনট্রডার’ বা অনুপ্রবেশকারী। তর্কের খাতিরে, আমি ধরে নিচ্ছি যে, স্থানীয় কিংবা অনুপ্রবেশকারী হবার কারণে কেউই সাধারণত কোনো বাড়তি সুবিধা পাবে না। যেমনটা আমরা দেখবো পরে, খুব ব্যবহারিক কারণে আমরা বলতে পারি, কেন এই ধারণাটি সত্যি নাও হতে পারে, কিন্তু সেটি মূল বিষয় না। মূল বিষয়টি হচ্ছে যে, এমনকি যদি সাধারণ কোনো কারণ নাও থাকে যে অনুপ্রবেশকারীদের উপর স্থানীয়দের বাড়তি সুবিধা আছে, কোনো একটি ‘ইএসএস’ যা অপ্রতিসাম্যতার উপর নির্ভর করে, নিজেই সেটি বিবর্তিত হবার সম্ভাবনা থাকে। একটি খুব সাধারণ তুলনামূলক দৃষ্টান্ত হচ্ছে মানুষের ক্ষেত্রে, যারা দ্রুত কোনো তর্ক মিমাংসা করে কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়া, কয়েন বা মুদ্রা টস করে।

শর্তসাপেক্ষে একটি কৌশল, আপনি যদি স্থানীয় হন, আক্রমণ করুন: আপনি যদি অনুপ্রবেশকারী হন, পালান, হতে পারে একটি ‘ইএসএস’, কারণ অপ্রতিসাম্যতা যা এখানে ধারণা করা হয়েছে সেটি মনগড়া, এর বিপরীত কৌশলটি: যদি আপনি স্থানীয় হন, প্রস্থান করুন, যদি অনুপ্রবেশকারী হন, তাহলে আক্রমণ করুন’ এটাও স্থিতিশীল হতে পারে। এই দুটোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে কোনটা গ্রহনযোগ্য হবে সেটা নির্ভর করবে কোনটি প্রথম সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যখনই সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা এই দুটি শর্তাধীন কৌশলের যেকোনো একটিকে অনুসরণ করবে, সেই কৌশল থেকে যারা ভিন্ন, তারা শাস্তি পাবে। সেকারণে সংজ্ঞানুযায়ী, এটি একটি ‘ইএসএস’।

যেমন, ধরুন সব সদস্যরা খেলছে, “স্থানীয়রা জিতবে, অনুপ্রবেশকারীরা পালাবে নিয়ম মেনে, এর মানে তারা তাদের অর্ধেক যুদ্ধ জিতবে আর অর্ধেক যুদ্ধ হারবে। তারা কখনোই আহত হবে না এবং তারা কখনোই সময় নষ্ট করবে না। কারণ সব দ্বন্দের মিমাংসা হচ্ছে দ্রুত খেয়ালমাফিক নিয়ম মেনে। এবার বিবেচনা করুন, একটি নতুন ‘মিউট্যান্ট’ বিদ্রোহী। ধরুন, সে বিশুদ্ধভাবে ‘হকদের’ স্ট্রাটেজী অনুসরণ করে, সবসময় আক্রমণ করছে, কখনোই পিছু হটে না। সে জিতবে যখন তার বিরোধীপক্ষ একজন অনুপ্রবেশকারী। যখন তার বিরোধীপক্ষ একজন স্থানীয়, তার গুরুতরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবার সম্ভাবনা আছে। সেই সব সদস্যদের তুলনায় গড়পড়তা তার লাভ হবে কম, যারা সেই ‘ইএসএস’ এর মনগড়া নিয়ম মেনে চলছে। কোনো একটি বিদ্রোহী সে এর বিপরীত নিয়মটি চেষ্টা করে, “যদি স্থানীয়, পালিয়ে যাও,যদি অনুপ্রবেশকারী, আক্রমণ করো, তারা আরো কম সুফল পায়। শুধুমাত্র যে প্রায়শই আঘাতপ্রাপ্ত হবে না, সে মাঝে মাঝে যুদ্ধেও জিতবেও। ধরুন যদিও, কোনো একটি ঘটনাচক্রে সেই সদস্যরা যারা এর বিপরীত নিয়মে খেলে, তারা কোনোভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলো, এই ক্ষেত্রে তাদের কৌশলটি হবে স্থিতিশীল কোনো নর্ম বা সাধারণ প্রচলিত নিয়ম, এবং এর কোনো ব্যতিক্রম শাস্তি পাবে। বোধগম্যভাবে, যদি কোনো জনগোষ্ঠীকে আমরা বহু প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করি, আমরা ধারাবাহিক মাঝে মাঝে বিপরীতমুখী কৌশলকে ব্যবহার করতে দেখবো একটি স্থিতিশীল অবস্থা থেকে অন্য আরেকটি স্থিতিশীল অবস্থায়, যার রদবদল হয়।

যদিও বাস্তব জীবনে, সত্যিকারের খেয়ালমাফিক অপ্রতিসাম্যতার কোনো অস্তিত্ব নেই। যেমন, স্থানীয়দের অনুপ্রবেশকারীদের চেয়ে একটি বাড়তি সুবিধা পাবার প্রবণতা থাকে, তাদের স্থানীয় ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত ভালো ধারণা থাকে। কোনো একজন অনুপ্রবেশকারী হয়তো ক্লান্ত হয়ে প্রবেশ করে, পরে যুদ্ধক্ষেত্রে আসে অথচ সেখানকার সবসময়ই অবস্থান করছে স্থানীয়রা। আরো কিছু বিমূর্ত কারণও আছে কেন, এই দুটি স্থিতিশীল অবস্থার, স্থানীয়রা জেতে, অনুপ্রবেশকারীরা পিছু হটে’, প্রকৃতিতে এটি ঘটার সম্ভাবনা বেশী; সেটি হচ্ছে সেই বিপরীতমুখী কৌশলটির, “অনুপ্রবেশকারীরা জিতবে, স্থানীয়রা পিছু হটবে’- একটি আত্ম-ধ্বংস করার অন্তর্নিহিত প্রবণতা আছে- এটাই যা মেনার্ড স্মিথ বলবেন, একটি ‘প্যরাডক্সিকাল’ বা আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী একটি কৌশল। এই প্যরাডক্সিকাল ‘ইএসএস’ এ অবস্থান করছে এমন কোনো জনগোষ্ঠী, যারা সবসময়ই চেষ্টা করবে স্থানীয় হিসাবে ধরা না দিতে তারা সবসময়ই প্রতিটি যুদ্ধে নিজেদের অনুপ্রবেশকারী হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করবে; এবং নিরন্তর আর অন্যথায় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার মাধ্যমে তারা এটি অর্জন করবে। অর্থহীনভাবে সময় ও শক্তির মূল্য পরিশোধ যা তাদের করতে হবে, সেটি ছাড়াও এই বিবর্তনীয় প্রবণতাটি, নিজেই, স্থানীয় শ্রেণীটির বিলুপ্তির কারণ হবে। কোনো একটি জনগোষ্ঠী যারা স্থিতিশীল পর্যায়ে বসে আছে, স্থানীয়রা জিতবে আর অনুপ্রবেশকারীরা পিছু হটবে, প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব সদস্যকে আনুকুল্যতা দেবে যারা স্থানীয় হবার চেষ্টা করবে। প্রতিটি সদস্যের জন্য, এটি হচ্ছে কোনো একটি নির্দিষ্ট টুকরো মাটি আঁকড়ে ধরে থাকা, সেটিকে কদাচিৎ ছেড়ে যাওয়া, এবং সেটি সুরক্ষা করার প্রচেষ্টার একটি আপাতগ্রাহ্য রুপ। প্রদর্শন করা। যেমন, এখন এটি সবাই জানে, এমন আচরণ খুব সাধারণভাবে প্রকৃতিতে প্রায়শই দেখা যায় এবং এটি পরিচিত ‘টেরিটরিয়াল ডিফেন্স বা আঞ্চলিক সুরক্ষা নামে।

এ ধরনের আচরণগত অপ্রতিসাম্যতার সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ যা আমি জানি সেটি ব্যাখ্যা করেছিলেন বিখ্যাত প্রানি-আচরণ বিজ্ঞানী নিকো টিনবার্গেন, তাঁর উদ্ভাবনী ও বুদ্ধিমত্ত্বাময় সরলতার বৈশিষ্ট্যসূচক একটি পরীক্ষার মাধ্যমে (৪)। তিনি এজন্য দুটি পুরুষ স্টিকলব্যাক মাছকে একটি মাছের ট্যাঙ্কে রাখেন। পুরুষ মাছ দুটি প্রত্যেকেই একটি করে ঘর তৈরী করে সেই ট্যাঙ্কের দুই বিপরীত প্রান্তে, এবং প্রত্যেকে তার এলাকা প্রতিরক্ষা করে, তার নিজের বানানো ঘরের আশে পাশের এলাকাটি। এরপর টিনবার্গেন দুটি পুরুষ মাছকে আলাদা আলাদাভাবে একটি কাঁচের টিউবে রাখন, এবং তিনি এই দুটি টিউবকে একে অপরের পাশাপাশি রাখেন এবং লক্ষ করেন পুরুষ মাছ দুটি কাঁচের টিউবের মধ্য দিয়েই পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। এরপর আসে পরীক্ষার সবচেয়ে মজার অংশ, যখন তিনি এই দুটি টিউবকে পুরষ ‘ক’ মাছের ঘরের কাছে আনেন, ‘ক’ মাছটি আক্রমনাত্মক অবস্থান নেয় এবং ‘খ’ মাছটি পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন তিনি টিউব দুটি পুরষ ‘খ’ এর বাসার কাছে নিয়ে আছে, ঠিক বিপরীত জিনিসটি ঘটে। শুধুমাত্র দুটি টিউব ট্যাঙ্কের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত নাড়াবার মাধ্যমে, টিনবার্গেন দেখাতে পেরেছিলেন কোন পুরুষটি আক্রমণ করে আর কোনটি সেই যুদ্ধ থেকে সরে আসে। দুটি পুরুষই সেই সাধারণ শৰ্তমূলক কৌশলটি অবলম্বন করে, ‘যদি স্থানীয়, আক্রমণ, যদি অনুপ্রবেশকারী, পলায়ন।

জীববিজ্ঞানীরা প্রায়ই প্রশ্ন করেন, এই আঞ্চলিক প্রতিরক্ষার আচরণটির কি কিছু ‘জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধা আছে? অসংখ্য মতামত ও প্রস্তাব আছে, তাদের কিছু পরে উল্লেখ করা হবে। কিন্তু আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি সেই প্রশ্নটাই আসলে বাহুল্য মাত্র হতে পারে। আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা হয়তো সাধারণভাবে একটি ‘ইএসএস’, যার উদ্ভব হয় কারণ সেখানে উপস্থিত হবার সময়ের অসাম্যতা যা সাধারণ কোনো এক টুকরো জায়গা দুটো একক সদস্যর সম্পর্ক নির্ধারণ করে।

প্রাণীদের আকার ও যুদ্ধ করার সাধারণ যোগ্যতা সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরনের খামখেয়ালী নয় এমন অপ্রতিসাম্যতার উদাহরণ হতে পারে। কোনো যুদ্ধে জেতার জন্য আকারে বড় হওয়া আবশ্যিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ নয়, কিন্তু সম্ভবত সেটি তাদের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ। যদি সবসময়ই দ্বন্দ্বরত দুই সদস্যদের মধ্যে যে আকারে বড় সে জেতে এবং যদি প্রতিটি সদস্য জানে নিশ্চিভাবে যে সে তার প্রতিপক্ষ থেকে আকারে বড় কিংবা ছোট, সেখানে একটি কৌশলই অর্থবহ হয়: “আপনার বিপক্ষ আপনার চেয়ে যদি বড় হয়, তাহলে প্রস্থান করুন সেখান থেকে, শুধু আপনার চেয়ে আকারে ছোট এমন কারো সাথে যুদ্ধ করুন। কিন্তু বিষয়টি আরো খানিকটা জটিলতর হয় যদি আকারের গুরত্ব অপেক্ষাকৃতভাবে অনিশ্চিৎ থাকে। যদি কোনো বড় আকৃতি আপনাকে অল্প কিছু সুবিধা দেয়, যে কৌশল আমি এই মাত্র উল্লেখ করলাম, সেটি তখনও স্থিতিশীল। কিন্তু যদি গুরুতর আহত হবার ঝুঁকি বেশী থাকে, সেখানে হয় আরো একটি প্যারাডক্সিকাল স্ট্রাটেজী থাকতে পারে। সেটি হচ্ছে, আপনার চেয়ে যারা আকারে বড় তাদের বেছে নিন যুদ্ধ করার জন্য, এবং আপনার চেয়ে যারা আকারে ছোট তাদের থেকে দূরে পালান’! খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে কেন এটিকে ‘প্যারাডক্সিকাল’ আপাত স্ববিরোধী কৌশল বলা হচ্ছে, এটি সম্পূর্ণভাবে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের বিপরীত। যে কারণে এটি স্থিতিশীল হবে সেটি হচ্ছে এটি:কোনো একটি জনগোষ্ঠী যা পুর্ণ শুধুমাত্র প্যারাডক্সিকাল কৌশুলীদের দিয়ে, কেউ কখনো আঘাতপ্রাপ্ত হয় না। এর কারণ প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন প্রতিযোগী, যে বড়, সবসময় পালিয়ে যায়। গড়পড়তা আকারের কোনো ‘মিউট্যান্ট’, যে যুক্তিসঙ্গত কোনো স্ট্রাটেজী নিয়ে খেলে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের প্রতিপক্ষ বাছাই করে, সে তার দেখা হওয়া অর্ধেক সদস্যদের সাথে গুরুতরভাবে তীব্র হয়ে ওঠা যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়ে। এর কারণ, যদি সে এমন কারো দেখা পায় তার চেয়ে আকারে ছোট, সে আক্রমণ করে, আকারে ছোট সদস্যরাও তীব্রভাবে এর প্রতি আক্রমণ করে, কারণ তিনি প্যারাডক্সিকাল খেলা খেলছেন; যদিও কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন কোনো কৌশুলীর প্যারাডক্সিকাল কৌশুলীর চেয়ে যুদ্ধে জেতায় বেশী সম্ভাবনা থাকে, তাসত্ত্বেও তার হারার বা গুরুতর আহত হবার বেশী সম্ভাবনা থাকে। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী প্যরাডক্সিকাল, কোনো বুদ্ধিমান কৌশুলীর কোনো একজন প্যারাডক্সিকাল কৌশুলীর চেয়ে আহত হবার অপেক্ষাকৃত বেশী সম্ভাবনা থাকবে।

এমনকি যদিও কোন প্যারাডক্সিকাল স্ট্রাটেজী স্থিতিশীল হতে পারে, সেটি সম্ভবত অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট বা গবেষণা খাতিরে কৌতূহল জাগাতে পারে মাত্র। প্যারাডক্সিকাল যোদ্ধারা শুধুমাত্র গড়পড়তার বেশী পুরষ্কার পায় যদি তারা বুদ্ধিমানদের তুলনায় সংখ্যা অনেক বেশী হয়। খুব কঠিন কল্পনা করা যে, শুরুতেই কিভাবে এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এমনকি যদি সেটি হয়ও,প্যারাডক্সিকাল এর সাথে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্নদের অনুপাত জনসংখ্যায় শুধুমাত্র কিছুটা কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্নদের দিকে সরে যেতে হবে অন্য ‘ইএসএস’ এর ‘আকর্ষণীয় জোনটিতে পৌঁছাতে, সেই ‘সেন্সিবল স্ট্রাটেজী। আকর্ষণের জোনটা হচ্ছে পপুলেশন অনুপাতের একগুচ্ছ অনুপাত যেখানে, এই ক্ষেত্রে কোনো সেন্সিবল কৌশুলীরা কিছু বাড়তি সুবিধা আছে, যখনই জনসংখ্যা এই জোনটিতে পৌঁছায়, এটি সাথে সাথেই অবশ্যম্ভাবীভাবে জনগোষ্ঠীর অনুপাতকে ‘সেনসিবল’ স্থিতিশীল গন্তব্য-বিন্দুর দিকে নিয়ে আসে। আসলেই খুব উত্তেজনার ব্যপার হতো, যদি প্রকৃতিতে প্যারাডক্সিকাল ‘ইএসএস’ এর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যেত, কিন্তু আমার সন্দেহ আমরা কি আসলেই পারি এমন কিছু আশা করতে?(আমি মনে হয় বেশী তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম, এই শেষ বাক্যটি লেখার পর, অধ্যাপক মেনার্ড স্মিথ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, মেক্সিকোর একটি সামাজিক মাকড়শা প্রজাতি, ০ecobius civitas সংক্রান্ত জে. ডাবলিউ, বুরজেসের নিম্নে উল্লেখিত বিবরণটির প্রতি: ‘যদি একটি মাকড়শা কোনো কারণে বিরক্ত করা হয় এবং তার বিশ্রামের জায়গা থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়, এটি দ্রুত পাথরের উপর দিয়ে সরে যায় এবং কোনো খালি খাজে লুকোনোর জায়গার অভাবে, সে হয়তো অন্য আরেকটি একই প্রজাতির মাকড়শার লুকোনোর জায়গায় আশ্রয় খুঁজতে পারে। যদি অন্য মাকড়শাটি সেখানে উপস্থিত থাকে, যখন এই অনুপ্রবেশকারী সেখানে প্রবেশ করে, সে কোনো প্রতি আক্রমণ করে না, বরং দ্রুত নিজেই সেখান থেকে সরে যায় এবং তার জন্য অন্য একটি আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করে। এভাবে একবার যখন প্রথম মাকড়শাকে বিরক্ত করা হয়, এই ধারাবাহিকভাবে একটি মাকড়শার জাল থেকে অন্য একটি মাকড়শার জালে এই অবস্থান পরিবর্তনের ধারাটা চলতে থাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। প্রায়ই যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মাকড়শাকে একসাথে তাদের ঘর থেকে উৎখাত করে নতুন অজানা কোনো ঘরে আশ্রয় নেবার কারণ হয় (Social Spiders, Scientific American, March ১৯৭৬)}, আর ইতিপূর্বে উল্লেখ করা ধারণাটি অর্থে এটি প্যারাডক্সিকালই বটে (৫)।

কি হতে পারে সেই সদস্যদের ক্ষেত্রে যারা তাদের অতীত যুদ্ধের পরিণতি সংক্রান্ত কিছু স্মৃতি ধারণ করে? এটি নির্ভর করে এ-ধরনের স্মৃতিটি কি ‘সাধারণ’, নাকি খুব বেশী ‘সুনির্দিষ্ট। ক্রিকেট বা ঝিঁঝি পোকাদের একটি সাধারণ স্মৃতি আছে, অতীতের যুদ্ধে কি হয়েছিল তারা সেটি মনে রাখতে পারে। কোনো ঝিঁঝি পোকা যে কিনা সাম্প্রতিক কোনো সময়ে বহু যুদ্ধে জিতেছে, সে ‘হকের মত আচরণ করতে শুরু করে। আর যে ঝিঁঝি পোকাটি সম্প্রতি বেশ কয়েকবার হেরেছে, সে আচরণ করে ‘ডোভদের’ মত। খুব স্পষ্টভাবে এটি দেখিয়েছিলেন আর, ডি, আলেক্সান্ডার। তিনি একটি নকল ঝিঁঝি পোকা ব্যবহার করেছিলেন আসল ঝিঁঝি পোকাদের যুদ্ধে হারানোর জন্য। এই আচরণের পর আসল ঝিঁঝি পোকারা অন্যান্য আসল ঝিঁঝি পোকাদের সাথে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে হারতে দেখা যায়। প্রতিটি ঝিঁঝি পোকাকে তার জনগোষ্ঠীতে গড়পড়তা সদস্যদের তুলনায় ভাবা যেতে পারে সারাক্ষণই সে তার যুদ্ধ করার যোগ্যতাকে হালনাগাদ করছে। যদি ঝিঁঝি পোকার মত কোনো প্রাণী যারা তাদের অতীতে করা যুদ্ধের ফলাফলের একটি সাধারণ স্মৃতি নিয়ে কাজ করে, তাদের যদি কিছু সময়ের জন্য একটি আবদ্ধ গ্রুপ হিসাবে আটকে রাখা হয়, সেখানে প্রাধান্য বিস্তারের একটি পরম্পরা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (৬)। কোনো একজন পর্যবেক্ষক একটি ক্রমানুসারে প্রতিটি সদস্যকে সাজাতে পারবেন। যারা নীচের স্তরের সদস্য তারা উপরের স্তরের সদস্যদের সাথে দ্বন্দ্বে সহজে পরাজয় মেনে নেয়। এমন কিছু মনে করার কোনো প্রয়োজন নেই যে প্রতিটি সদস্য একে অপরকে শনাক্ত করতে পারে। সেখানে যা ঘটে তাহলো, সদস্যরা যারা বিজয়ী হতে অভ্যস্ত তাদের বিজয়ী হবার আরো সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদিকে যে সদস্যরা, যারা হারতে অভ্যস্ত তারাও ক্রমেই আরো হারতে অভ্যস্ত হবে। এমনকি যে সদস্যরা যারা বিজয় বা পরাজয় দিয়ে শুরু করেছিল কোনো গবাধা নিয়ম না মেনে, তারা নিজেদের নানা স্তরে ক্রমানুসারে সাজিয়ে ফেলে। ঘটনাচক্রে এর প্রভাব হচ্ছে, সেই গ্রুপে কোনো গুরুতর যুদ্ধ হবার ঘটনা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।

আমাকে সেই বাক্যটি ব্যবহার করতে হবে, এক ধরনের প্রাধান্য বিস্তারের পরম্পরা’, কারণ বহু মানুষ প্রাধান্য বিস্তারের পরম্পরা শব্দটি ব্যবহার করেন সেই সব ক্ষেত্রে যেখানে একক সদস্যদের স্বীকৃতি সংশ্লিষ্ট থাকে। এই সব ক্ষেত্রে সাধারণ কোনো পরিস্থিতির বদলে অতীতের যুদ্ধের স্মৃতি খুব সুনির্দিষ্ট। ঝিঁঝি পোকারা তাদের নিজেদের আলাদা আলাদা সদস্য হিসাবে শনাক্ত করে না, কিন্তু মুরগী বা বানররা তা করতে পারে। যদি আপনি একটি বানর হন, যে বানরটি আপনাকে অতীতে কোনো যুদ্ধে হারিয়েছে, সে আপনাকে ভবিষ্যতেও হারাতে পারবে। একটি সদস্যের জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হচ্ছে, কিছুটা ‘ডোভের মত আচরণ করা সেই সব সদস্যদের সাথে যারা ইতিপুর্বে তাকে হারিয়েছিল। যদি কোনো একদল মুরগী, পরস্পরের সাথে যাদের পূর্বে কখনো দেখা হয়নি, পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়, সাধারণত তাদের মধ্যে বেশ যুদ্ধ হয়, কিন্তু কিছু সময় পর পারস্পরিক যুদ্ধের সংখ্যা কমে আসে। কিন্তু ঝিঁঝি পোকাদের মত একই কারণে না, যদিও। মুরগীদের ক্ষেত্রে এর কারণ প্রতিটি সদস্য অন্য সদস্য অপেক্ষা তার নিজের অবস্থানটি সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করে। এবং বিষয়টি ঘটনাচক্রে পুরো গ্রুপের জন্য ভালো, এবং এর নির্দেশক হিসাবে বিষয়টি লক্ষ করা হয়েছে মুরগীদের প্রতিষ্ঠিত গ্রুপের মধ্যে, যেখানে তীব্র কোনো সহিংস যুদ্ধ কদাচিৎ হয়ে থাকে, সেখানে ডিম উৎপাদনের সংখ্যা অন্য মুরগীর গ্রুপের চেয়ে অনেক বেশী, যেখানে তাদের সদস্য কাঠামো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে এর ফলশ্রুতিতে যেখানে সহিংসতা অনেক বেশী মাত্রায় সংঘটিত হয়।

জীববিজ্ঞানীরা প্রায়শই প্রাধান্য পরম্পরার যে জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধা বা ফাংশনের কথা বলেন, সেটি হচ্ছে এটি কোনো গ্রুপের মধ্যে এটি প্রকাশ্য সহিংসতা হ্রাস করে। তবে, এটি মূল বিষয়টাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করছে না। কোনো একটি প্রাধান্য পরম্পরাকে বলা যেতে পারে না যে বিবর্তনীয় অর্থে এর কোন কাজ আছে, কারণ এটি কোনো গ্রুপের বৈশিষ্ট্য, কোন একক সদস্যের কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। একক সদস্যদের ব্যবহারের প্যাটার্ন, যা তাদের নিজেদের প্রকাশ করে প্রাধান্য পরম্পরা রুপে, যখন তাদের গ্রুপ পর্যায়ে দেখা হয়, হয়তো বলা যেতে পারে তার কিছু কাজ কাছে। তবে, ভালো হয় যদি এই ‘ফাংশন’ শব্দটি পুরোপুরি বাদ দেয়া যায় এবং বিষয়টি নিয়ে ESS (ইএসএস)-এর ভাষায় অপ্রতিসম কোনো প্রতিযোগিতার কথা ভাবা যায়, যেখানে একক সদস্যরা পরস্পরকে চেনে এবং তাদের স্মৃতি আছে।

আমরা এতক্ষণ একই প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে যুদ্ধে কথা ভাবছিলাম। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে তাহলে কি ঘটে? যেমনটি আমরা এর আগে দেখেছিলাম, ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্যরা পারস্পরিকভাবে অপেক্ষাকৃত কম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের একই প্রজাতির সদস্যদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতির তুলনায়। আর একারণে আমাদের আশা করা উচিৎ সম্পদের কারণে তাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম বিতর্ক হবে এবং আমাদের প্রত্যাশাটাও সঠিক হয়। যেমন, রবিন অন্য রবিনদের বিরুদ্ধে তাদের আধিপাত্য এলাকা প্রতিরক্ষা করে, কিন্তু গ্রেট-টিটদের বিরুদ্ধে নয়। কোনো একটি বনভুমিতে কেউ চাইলে একক রবিন সদস্যদের আধিপাত্য করার এলাকার মানচিত্র আঁকতে পারবেন এবং এই একই ম্যাপের উপর প্রতিটি গ্রেট টিট পাখির আধিপাত্য করার এলাকা প্রতিস্থাপিত করা যেতে পারে। দুই প্রজাতির এলাকা কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনেই একে অপরের এলাকায় অনুপ্রবেশ করে। অন্য কোনো গ্রহেও সেটা হতে পারে।

কিন্তু আরো উপায় আছে যেখানে কোনো একক সদস্যদের স্বার্থ ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের স্বার্থের সাথে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক হয়। যেমন, কোনো একটি সিংহ অ্যান্টিলোপের শরীর খেতে চায়, কিন্তু অ্যান্টিলোপদের তাদের শরীর নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা আছে। সাধারণত এটিকে কোনো সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা হিসাবে গণ্য করা হয়না কিন্তু যৌক্তিকভাবে এটিকে প্রতিযোগিতা হিসাবে না দেখতে পারাটা কিন্তু কঠিন। এখানে যে সম্পদের কথা বলা হচ্ছে সেটি হচ্ছে ‘মাংস’। সিংহের জিন ‘মাংস’ চাইছে খাদ্য হিসাবে তাদের সারভাইভাল মেশিনের জন্য। অ্যান্টেলোপের জিন ‘মাংস’ চাইছে তার শরীরের কাজের জন্য, এবং তার নিজের সারভাইভাল মেশিনের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য। মাংসের এই দুটি ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে ভিন্ন, পারস্পরিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সুতরাং সেখানে স্বার্থের সংঘাত আছে।

নিজের প্রজাতির সদস্যরাও মাংস দিয়ে তৈরী। তাহলে স্বজাতি ভক্ষণ বা ক্যানিবালিজম এত দূর্লভ কেন? আমরা যেমনটি দেখেছিলাম ব্ল্যাক হেডেড গালদের ক্ষেত্রে, পূর্ণবয়স্ক সদস্যরা মাঝে মাঝে সেখানে নিজেদের প্রজাতির শিশু সদস্যদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু তারপরও পূর্ণ বয়স্ক কোনো মাংসাশী প্রাণীকে সক্রিয়ভাবে খাদ্য বানানো ইচ্ছায় তার নিজের প্রজাতির কোনো পুর্ণবয়স্ক প্রাণীদের তাড়া করতে দেখিনা। কেন নয়? আমরা এখনও এত বেশী অভ্যস্ত প্রজাতির জন্য কল্যাণকর’ এই শর্তাধীন বিবর্তন সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবতে যে, আমরা পায়শই খুবই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন করতে ভুলে যাই, যেমন, ‘কেন সিংহরা তাহলে অন্য সিংহদের শিকার করেনা”? আরো একটি ভালো প্রশ্ন হচ্ছে জিজ্ঞাসা করা, যা কদাচিৎ আমরা জিজ্ঞাসা করি, সেটি হচ্ছে, পাল্টা আক্রমণ করার বদলে কেনই বা অ্যান্টিলোপরা সিংহ থেকে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে?

কেন সিংহরা অন্য সিংহদের শিকার করেনা তার কারণ তাদের জন্য সেটি করা বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল স্ট্রাটেজী বা ‘ইএসএস’ হবে না। স্বজাতি-ভক্ষণ বা ক্যানিবলিজম কৌশল হবে খুব অস্থিতিশীল, সেই একই কারণে, আমাদের আগের উদাহরণে যে কারণে ‘হক’ কৌশলটি অস্থিতিশীল। কারণ পাল্টা আক্রমণে বিপদের আশংকা সেখানে অনেক বেশী। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে এটি ততটা সত্যি না হবার সম্ভাবনা বেশী, সেকারণে অনেক বেশী প্রাণী, যারা শিকার হয় অন্য প্রাণীদের, তারা পালিয়ে বেড়ায় প্রতিআক্রমণ না করে। সম্ভবত এর উৎস হচ্ছে মূলত সেই বাস্তব সত্যটি, দুটি ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত অপ্রতিসাম্যতা টিকে থাকে, যা একই প্রজাতির সদস্যেদের মধ্যে থাকা অসাম্যতার চেয়ে অনেক বেশী। যখনই কোনো প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অসাম্যতা থাকে, ‘ইএসএস’ খুব সম্ভবত শর্তসাপেক্ষ কোনো কৌশল হয় যা অপ্রতিসাম্যতার উপর নির্ভর করে। কোনো কৌশল যেমন: “যদি আকারে ছোট, পালিয়ে যাও, যদি বড় আকারের, আক্রমণ করো’ এর সমতুল্য কোনো কৌশল বিবর্তিত হবার খুব সম্ভাবনা আছে ভিন্ন প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্বে, কারণ বহু ধরনের অসাম্যতা সেখানে বিদ্যমান। সিংহ আর অ্যান্টিলোপরা বিবর্তনীয় বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে এক ধরনের স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, যা প্রতিযোগিতার মূল অপ্রতিসাম্যতাকে ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে আরো প্রকট করেছে। তারা তাদের কৌশল, যথাক্রমে, পিছু ধাওয়া ও পালিয়ে বাঁচার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করেছে। কোনো পরিবর্তিত (মিউট্যান্ট) অ্যান্টিলোপ, সিংহদের বিরুদ্ধে যে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ করার কোনো কৌশল গ্রহন করে, সে অপেক্ষাকৃত কম সফল হবে সেই অ্যান্টিলোপটি থেকে, যে কিনা সিংহকে দেখে দিগন্তের ওপারে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

আমার একটি অনুমান যে, কোনো এক সময় আমরা অতীতের দিকে তাকিয়ে ‘ইএসএস’ ধারণাটির আবিষ্কারকে ডারউইনের পর বিবর্তন তত্ত্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসাবে দেখবো (৭)। এটি প্রযোজ্য সবক্ষেত্রে যেখানে আমরা স্বার্থের সংঘাত খুঁজে পাই এবং তারমানে প্রায় সব জায়গায়। প্রাণি-আচরণ বিদ্যায় শিক্ষার্থীদের ‘সামাজিক সংগঠনের মত কিছু নিয়ে আলোচনা করার অভ্যাস করতে হবে। প্রায়শই কোনো একটি প্রজাতির সামাজিক সংগঠনকে তাদের একটি একক সত্তা হিসাবে ভাবা হয়ে থাকে, যাদের নিজেদের জৈববৈজ্ঞানিক সুবিধা আছে। একটি উদাহরণ আমি ইতিমধ্যেই দিয়েছিলাম, সেটি হচ্ছে ‘ডমিনেন্স হায়ারার্কি’ বা ‘প্রাধান্য পরম্পরা। আমি বিশ্বাস করি এই গোপন গ্রুপ সিলেকশনবাদী ধারণাগুলোকে আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জীববিজ্ঞানীদের বক্তব্যে আমরা পাই, যখন তারা সামাজিক সংস্থাগুলো নিয়ে কথা বলেন। মেনার্ড স্মিথের ‘ইএসএস’ এর ধারণাটি আমাদের সক্ষম করেছে, প্রথমবারের মত, স্পষ্টভাবে দেখাতে, কিভাবে একগুচ্ছ স্বতন্ত্র স্বাধীন স্বার্থপর সত্তাগুলো সুসংগঠিত একটি একক কোনো সত্তা সদশ আচরণ করতে পারে। আমি মনে করি প্রজাতির সামাজিক সংগঠনের মধ্যেই শুধুমাত্র এটি সত্যি নয়, বরং বহু প্রজাতি সম্বলিত কোনো ইকোসিস্টেম বা কমিউনিটিতেও এটি সত্যি। দীর্ঘমেয়াদীভাবে, আমি আশা করি, ‘ইএসএস’ ধারণাটি ইকোলজী বিজ্ঞানে বিপ্লবের সূচনা করবে।

আমরা এটিকে আরো একটি বিষয়ে প্রয়োগ করতে পারি, যে বিষয়টি আমি তৃতীয় অধ্যায়ের আলোচনায় স্থগিত রেখেছিলাম। এটিও এসেছে নৌকা প্রতিযোগিতার নৌকা-চালকদের তুলনামূলক উদাহরণ থেকে (যারা কোনো শরীরে থাকা জিনদের প্রতিনিধিত্ব করে), যাদের প্রয়োজন ভালো ‘টিম স্পিরিট। জিনরা নির্বাচিত হয়, একক বিচ্ছিন্ন ভাবে তারা “ভালো’ সে কারণে না, বরং তারা ‘ভালো’ কারণ জিনপুলে থাকা অন্যান্য জিনদের প্রেক্ষাপটে তারা ‘ভালো’ কাজ করতে পারে। কোনো একটি ‘ভালো’ জিনকে অবশ্যই, অন্যান্য সব জিনদের সাথে সংগতিপুর্ণ ও পরিপুরক হতে হয়, যাদের সাথে সুদীর্ঘ একটি সময় ধারাবাহিকভাবে নানা শরীরে তাকে সহাবস্থানে থাকতে হয়। কোনো গাছের পাতা পিষ্ট করার উপযোগী দাঁত তৃণভোজী প্রজাতির জিনপুলে একটি ‘ভালো’ জিন, কিন্তু কোনো মাংশাসী প্রাণীর জিনপুলে এটি খারাপ’ একটি জিন।

একটি সুসংগতিপুর্ণ জিনদের সন্নিবেশ কল্পনা করা সম্ভব, যারা নির্বাচিত হয় একটি ইউনিট’ হিসাবে। তৃতীয় অধ্যায়ে প্রজাপতির মিমিক্রি বা অনুকরণের উদাহরণে, এটাই ঠিক ঘটে, কিন্তু ‘ইএসএস’-এর ধারণার শক্তি হচ্ছে এটা এখন আমাদের দেখতে সক্ষম করে তুলেছে, কিভাবে একই ধরনের ফলাফল বিশুদ্ধভাবে স্বাধীন জিনের স্তরে অর্জন করা যেতে পারে। একই ক্রোমোজোমে জিনদের সংযুক্ত থাকতে হবে এমন কোনো আবশ্যিকতা নেই।

নৌকাবাইচের অনুরুপ উদাহরণ আসলেই এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করতে যথেষ্ট নয়। এর সবচে নিকটবর্তী যে তুলনায় আমরা আসতে পারি সেটি হচ্ছে, ধরুন খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সত্যিকারের কোনো সফল নৌকাবাইচ দলের সদস্যরা তাদের ভাষা ব্যবহার করে কাজ সুসমন্বয় করে, আরো খানিকটা ভাবুন যে, কোনো একটি নৌকা চালকদের পুল বা সমষ্টি, যেখান থেকে কোচ সবচেয়ে আদর্শ টিমটি নির্বাচন করতে পারবেন, তারা কেউ শুধু ইংরেজী ভাষায় কথা বলে, আর কেউ কেউ শুধু জার্মান ভাষা জানেন। ইংরেজীভাষীরা জার্মানভাষীদের চেয়ে নিয়মমাফিকভাবে খারাপ নৌকাচালকও না আবার ভালো নৌকাচালকও না। কিন্তু যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে শুধু ইংরেজীভাষী অথবা শুধু জার্মানভাষী দলের চেয়ে মিশ্র ভাষাভাষীদের দল অপেক্ষাকৃত কম প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়।

কোচ বিষয়টি অনুধাবন করেননি, তিনি যেটা করেন তাহলে প্রতিটি দলের সদস্যদের বহু বার অদল বদল করেন, এবং প্রতিবার বিজয়ী নৌকার দলের প্রতিটি সদস্যদের জন্য ক্রেডিট পয়েন্ট” দেবার ব্যবস্থা করেন, আর কম পয়েন্ট দেন সেই নৌকার দলের সবাইকে যারা হারছে। এখন যদি বাছাই করার জন্য যে খেলোয়াড়রা তার কাছে আছে, সেই পুলটি যদি ইংরেজী ভাষাভাষীরা প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে, তাহলে কোনো একটি শুধু জার্মানভাষী যে সেই নৌকায় ওঠে, নৌকাটি হারার জন্য তার সম্ভাব্য ভূমিকা থাকতে পরে, কারণ সেখানে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সংযোগ হোঁচট খাবে। এর বিপরীত, যদি সেই পুলে জার্মানভাষীদের প্রাধান্য থাকে, শুধু ইংরেজীভাষী কেউ তাদের একটি দলে থাকলে সে নিজেকে পরাজিতদের দলেই আবিষ্কার করবে। তবে সেরা টিম বাছাই করার জন্য কোচের খেলোয়াড় অদল বদল করার প্রক্রিয়ার শেষে সর্বোপরি সেরা দল হবে দুটি স্থিতিশীল অবস্থার যে কোনো একটি– বিশুদ্ধ ইংলিশ অথবা বিশুদ্ধ জার্মান, কিন্তু কোনো মিশ্রণ নয়। উপরিভাবে মনে হতে পারে যে যেন কোচ পুরো একই ভাষাভাষীদের গ্রুপ নির্বাচন করেছেন ‘একক ইউনিট হিসাবে’, কিন্তু তিনি সেটা করেননি। তিনি আলাদা আলাদাভাবে নৌকাচালকদের প্রতিযোগিতা জেতার ক্ষমতা বাছাই করার মাধ্যমে সেটি করেছেন। কিন্তু যেটা ঘটে সেটি হলো কোনো একজন একক সদস্যের প্রতিযোগিতায় জয়ী হবার প্রবণতা অন্য সদস্যদের উপর নির্ভর করে, সে উপস্থিত আছে সেই প্রার্থীদের পুলে। সংখ্যালঘু প্রার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শাস্তি পায়, তারা যে খারাপ নৌকা চালায় সে কারণে না, বরং শুধুমাত্র তারা সংখ্যালঘু সে কারণে। একইভাবে, বাস্তব সত্য হচ্ছে যে জিনরা তাদের পারস্পরিক সুসংগতিপূর্ণতার কারণে নির্বাচিত হয়, আবশ্যিকভাবে তার মানে এমন নয় যে, আমাদের ভাবতে হবে যে, এক গ্রুপ জিন নির্বাচিত হয়েছে ইউনিট হিসাবে, যেমনটি হয় প্রজাপতির ক্ষেত্রে। একক জিন পর্যায়ে নীচু স্তরের নির্বাচন উঁচু পর্যায়ের নির্বাচনের ধারণা দিতে পারে।

এই উদাহরণে, নির্বাচন সাধারণ প্রথাগত নিয়ম মানাকে সহায়তা করে। আরো বিশেষভাবে, জিনরা নির্বাচিত হতে পারে কারণ তারা একে অ