‘তাইলে হেই কথাই রইল। লাশটা সৎকারের ব্যবস্থা নিতাসি আমি। আফনেরা যে যার কামে যান, এইডা লইয়া আর চিন্তার কিছু নাই।’
উঠে দাঁড়াল মতি। পা বাড়াল ভিতর-বাড়ির দিকে। মুখে ফুটে উঠেছে কুটিল হাসি। ঝামেলাটা এত সহজে মিটে যাবে, ভাবেনি সে। উপরি পাওনা হিসেবে পাকনা মাস্টারকেও কিছুটা শায়েস্তা করা গেছে। আশা করা যায়, কিছুদিন অন্তত চুপচাপ থাকবে হারামজাদা।
.
ভিড় কমতে-কমতে একসময় পুরোপুরি খালি হয়ে গেল জামতলাটা। তবে একজন বয়স্কমতন অচেনা মানুষ আরও বহুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ওখানটায়।
লোকটার পরনে সফেদ আলখাল্লা, কাঁধ থেকে ঝুলছে একখানা বাহারী রঙের ঝোলা। ক্ষণে-ক্ষণেই খিক্-খিক্ করে হাসছে সে, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে। মুখের হাসি তার চোখ দুটোকে ছুঁতে ব্যর্থ হয়েছে, ছাইচাপা আগুনের মতই ধিকিধিকি জ্বলছে ওগুলো!
চার
একখানা লণ্ঠন মৃদু আলো বিলাচ্ছে চেয়ারম্যান বাড়ির কাছারি ঘরে। দরজাটা খোলা থাকায় সে আলোর কিয়দংশ চৌকাঠ ডিঙিয়ে অবলীলায় চলে আসছে লাগোয়া বারান্দায়।
আলোর সীমারেখার খানিকটা বাইরে কাঠের একটা নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসে আছে লতিফ মিয়া। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ঝিম মেরে বসে আছে সে, গায়ে একখানা পাতলা চাদর জড়ানো; ক্লান্ত। আজ সারাদিন ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে তাকে, দম ফেলারও ফুরসত মেলেনি। তাই এই ভর সন্ধ্যায়, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া আরামদায়ক আলস্যটুকু চুটিয়ে উপভোগ করছে সে। সকালটা কেটে গেছে মাখনলালের স্ত্রীর সৎকারে। পুরোহিত ডাকা, শ্মশানঘাট পরিষ্কার করা, আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র জোগাড়যন্ত্র করা; ঝক্কি তো নেহায়েত কম নয়। তাছাড়া উপরি হিসেবে অতি উৎসাহী জনতার ভিড় সামলানোর ধকলটা তো আছেই।
কাজটা শেষ করেই ছুটতে হয়েছে বাবুর্চি খুঁজতে, তারপর তাকে সঙ্গে নিয়ে মাড়াতে হয়েছে হাটের পথ; শিরনি রাঁধার প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার জন্য।
আচমকা মতি চেয়ারম্যানের মনে হয়েছে, বিশাল একখানা ফাঁড়া কেটেছে আজ। শোকরানা স্বরূপ পীরের দরগায় এক হাঁড়ি শিরনি না পাঠালেই নয়।
নীলগঞ্জের বড়পীরের মস্ত বড় ভক্ত সে, মুরিদ। যে কোন বিপদ-আপদে পীরের দরগায় ছুটে যায়, গুরুর আশীর্বাদ নিয়ে আসে। লোকজন যদিও আড়ালে- আবডালে মানুষটাকে ভণ্ড বলে, তবে মতির কাছে সে-ই এ জগতের সবচেয়ে কামেল পীর।
আগামী নির্বাচনের পর হুজুরের দরগায় গোটা তিনেক ষাঁড় দেয়ার কথা মানত করে রেখেছে সে মনে-মনে। বিষয়টা অবশ্য পুরোপুরি নিজের ভিতরেই গোপন রেখেছে, কাউকে বলেনি; এমনকী ছায়াসঙ্গী লতিফ মিয়াকেও না। প্রকাশ হয়ে গেলে সেই মানতের আর জোর থাকে না, আশৈশব এটাই শুনে এসেছে সে।
নীলগঞ্জ থেকে ফিরতে-ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। অবেলায় গোসল করে কোনরকমে মুখে ক’টা ভাত গুঁজে, বারান্দায় এসে বসেছে লতিফ মিয়া। জ্বলন্ত বিড়ি হাতে চকের দিকে তাকিয়ে অলস সময় পার করতে ভীষণ আমোদ পায় সে। অধিক পরিশ্রমের কারণেই কি না কে জানে, বসে থাকতে-থাকতে খানিকটা ঝিমুনি এসে গেল তার। নিজের ছন্নছাড়া জীবনের কথা ভাবছে, আদৌ কি ভবিষ্যৎ বলে কিছু আছে?
বয়স চল্লিশের কোঠায়, কিন্তু এখনও বিয়ে-শাদী করা হয়নি। অন্তরে সংসার পাতার একটা গভীর টান অনুভব করে সে, কিন্তু মুখ ফুটে চেয়ারম্যান সাহেবকে কিছু বলার সাহস হয় না। তার জানা নেই, রাহেলা ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার মতির কানে তার বিয়ের কথাটা তুলেছে। শুনেও কোন রা করেনি মতি।
বিয়ে করালে এখনকার মত সকাল-সন্ধ্যা খাটতে পারবে না লতিফ মিয়া, এটা তার ভালই জানা আছে। এমন আরেকজন যোগ্য লোক না পাওয়া পর্যন্ত লতিফ মিয়াকে বিয়ে করানো কি ঠিক হবে?
অদ্ভুত একটা বোটকা গন্ধে তন্দ্রা টুটে গেল লতিফ মিয়ার। চোখ খুলেই ভয়ানক চমকে উঠল সে।
বুড়োমতন একজন লোক একেবারে তার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁত কেলিয়ে হাসছে, মুখের কশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানের পিক। লালচে দাঁতগুলো ভীষণ এলোমেলো, ফাঁক দিয়ে ভিতরের কালো গহ্বর নজরে আসে; রীতিমত গা গুলিয়ে ওঠে।
‘কেডা? কেডা আফনে?’ নিজের অজান্তেই গলার স্বর খানিকটা চড়ে গেল লতিফ মিয়ার। জবাব না দিয়ে, স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় এগিয়ে এসে তার পাশে বেঞ্চিতে বসে পড়ল লোকটা। মুখে এখনও বিশ্রী হাসিটা ধরে রেখেছে।
বাধ্য হয়েই খানিকটা সরে বসল লতিফ মিয়া। ভয়ানক দুর্গন্ধে দম আটকে আসার জোগাড় হলো তার।
গন্ধটা আসছে কোত্থেকে! লোকটার গা থেকে? নাকি সঙ্গের ঝোলাটা থেকে? কয়দিন ধরে গোসল করে না, খোদা মালুম! পরনের আলখাল্লাটা কয়দিন ধরে গায়ে আছে তা-ই বা কে জানে!
‘কেমুন আছ, লতিপ মিয়া?’ মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল লোকটা।
‘ভালাই। কিন্তু আফনে কেডা? চিনলাম না তো।’ হড়বড়িয়ে বলল লতিফ মিয়া। এখনও ধাতস্থ হতে পারেনি সে।
‘আমি কেডা, হেইডা গুরুত্বপুন্ন না। আমি কিতা কইতে আইসি হেইডা গুরুত্বপুন্ন।’
‘কী কইতে আইসেন? চেরম্যান সাবরে ডাকুম?’
‘নাহ, হেরে ডাইক্কা কাম নাই। বজ্জাতটারে দেখলেই শইলডা জ্বলে। ‘মুখ সামলাইয়া কথা কন, মুরুব্বী।’
‘ক্যান? হেয় কি ভালা মানুষ নাকি, লতিপ?’
চুপ করে রইল লতিফ মিয়া, জবাব দিল না প্রশ্নটার। মতি চেয়ারম্যান কেমন মানুষ, এটা তার চেয়ে ভাল আর কে-ই বা জানে?
