স্বভাবতই পুলিসের উপর বছরের তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই মহাখাপ্পা হয়ে থাকে সে। সবসময় ওদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চায়। গ্রামে পুলিসের আগমন ওর জন্য সত্যিই সুখকর কিছু নয়।
‘তুই চুপ থাক, মবু,’ খেঁকিয়ে উঠল করিম মাস্টার। ‘চোরের মন পুলিস- পুলিস। তোরে তো আর ধরতে আইতাসে না অহন, তোর এত ডর কীয়ের? যার ডরানোর হেতেই ডরাইব, তুই জুত কইরা বইয়া থাক।’
জনতার সম্মিলিত দৃষ্টি নিজের উপর অনুধাবন করে আচমকা ভীষণ লজ্জা পেল মবু। আড়াল পাওয়ার আশায় জটলার ভিতর আরও খানিকটা সেঁধিয়ে গেল সে। মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করল, সব ধরনের সালিশে এখন থেকে নিজের মুখটা বন্ধ করে রাখবে, একটা শব্দও উচ্চারণ করবে না। চোর হলেও তার তো একটা ইজ্জত আছে, নাকি?
‘তাইলে পুলিস না আনলে আর চলতাসে না। তাই না, মাস্টর?’ হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল মতি চেয়ারম্যান। কেউ জানে না কী খেলা চলছে ধূর্ত লোকটার মাথায়।
‘হ, পুলিস আনতেই হইব,’ জবাব দিতে এক মুহূর্তও দেরি করল না করিম মাস্টার।
‘আইচ্ছা। তুমি যহন এমনে জিদ করতাস, আনুম পুলিস। কোন সমস্যা নাই,’ হাসিমুখে বলল মতি। ‘তোমরা তো হগলেই জান, থানার দারোগা সাবের লগে আমার কীরাম দহরম-মহরম। আমি দাওয়াত দিলে হেয় কোনদিন মানা করত না। অন্য সব কামকাজ ফালাই থুইয়া এক দৌড়ে এইহানে আইয়া পড়ব। তারে আনাডা কোন ব্যাফার না। আমার খালি একটাই চিন্তা, তুমি না আবার মামলাডায় ফাইস্যা যাও, মাস্টর!’
নিজের অজান্তে পায়ের ভার বদল করে দাঁড়াল করিম। অনিশ্চিত কণ্ঠে বলল, ‘আমি ফাঁসমু ক্যান! কী কন এগুলা, চেয়ারম্যান সাব?’
‘মানে, লাশটা কিন্তুক পাওয়া গেসে মীর্জা বাড়ির ঘাড়ে। আর মীর্জা বাড়িত তো অহন তুমি একলাই থাহ। নাকি মিছা কইলাম?
‘তুমি জোয়ান-মর্দ পোলা, কিন্তু অহনতরি বিয়া-শাদী কর নাই। এইদিকে আবার মাখইন্যার বউ মাসের বেশিরভাগ সময় হেতির জামাইরে কাছে পায় না। তোমাগো মইধ্যে একটু ইটিশ-পিটিশ তো হইতেই পারে, হাছা না?
‘ধইরা নিলাম এইগুলান কিছুই হয় নাই, হেরপরেও কিন্তুক কথা থাইক্যা যায়। ধর্ষণ-খুন, এইসব কথা যেহেতু তোমার মাথায় আইয়া পড়সে, দারোগা সাবের মাথাতেও নিচ্চই আইবে। উনি যদি ভাইবা নেন যে, মাইয়াডা রাইতের বেলা খাওয়ার পানি আনতে মীর্জা বাড়ির চাপকলে গেসিল, আর কায়দামত পাইয়া তুমি হেতির উফরে ঝাঁপাইয়া পইড়া…’ ইচ্ছে করেই কথাটা অসমাপ্ত রাখল ধুরন্ধর চেয়ারম্যান। চেহারা পুরোপুরি নির্লিপ্ত তার।
এদিকে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গেছে করিম মাস্টারের মুখ, একেবারে চুপসে গেছে সে। ঘটনার মোড় এভাবে ঘুরে যাবে, এটা সে কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি।
মীর্জারা শহরে চলে গেছে অনেক দিন আগে; বলতে গেলে মীর্জা বাড়ি সারা বছর খালিই পড়ে থাকে। তাই ছোট মীর্জার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ঘাটের পাশের অতিথিশালায় বাচ্চাদের জন্য একটা অবৈতনিক স্কুল খুলেছে করিম মাস্টার। পড়ানোর সুবিধার্থে নিজের বাড়িতে না থেকে বেশিরভাগ সময় ওখানেই থাকে সে।
কোন সন্দেহ নেই, গ্রামের অন্তত অর্ধেক মানুষ ইতোমধ্যেই মতি চেয়ারম্যানের কথা বিশ্বাস করে বসে আছে। বাকি অর্ধেকও দ্বিতীয়বার নেড়েচেড়ে দেখছে যুক্তিগুলো। শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তে জনমত পুরোপুরি করিম মাস্টারের বিপক্ষে
তাছাড়া থানার দারোগার সঙ্গে চেয়ারম্যানের সখ্যের কথা সর্বজনবিদিত। সত্যিই দারোগাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে লোকটা। একবার যদি অপকৌশলে দারোগার মনে সন্দেহের বীজটা বপন করে দিতে পারে সে, তাহলেই কম্ম কাবার। আর কিছু করতে হবে না খচ্চর চেয়ারম্যানকে, বাকিটা দারোগা সাহেব নিজেই করবেন। আর ভাবতে চাইল না করিম মাস্টার, দু’চোখে সর্ষেফুল দেখছে সে।
বহুবছর ধরে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে মতি, এবার বুঝি সুযোগটা পেয়েই গেল হারামিটা। অনেক ভেবেও ফাঁদটা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন পথ খুঁজে পেল না করিম। হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে রইল সে।
‘তাইলে কী কও, মাস্টর? ডাকমু পুলিস?’ ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল চেয়ারম্যান। পুরো ব্যাপারটায় ভীষণ আমোদ পাচ্ছে সে। করিমের নাজেহাল অবস্থাটা তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করছে। দেখা যাক, বড়শিতে গাঁথা মাছটা আর কতটুকু আনন্দের জোগান দিতে পারে!
তবে জবাবটা মাস্টারের কাছ থেকে নয়, এল তার বাবা, রহিম হাজীর কাছ থেকে। পরিস্থিতি বুঝে নিতে বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি ঘাগু বুড়োর। একজন ইউপি মেম্বার হিসেবে বহুবছর ধরে মতির সঙ্গে ওঠাবসা রহিম হাজীর। বদের হাড্ডি মতি কী-কী করতে পারে, এ ব্যাপারে অনেকের চেয়ে স্পষ্ট ধারণা আছে তার। তাই আচমকা পাথরের মূর্তি বনে যাওয়া ঘাড়তেড়া ছেলেকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে, তাকেই শেষতক মাঠে নামতে হলো।
‘কী যে কন, চেয়ারম্যান সাব! পুলিস ডাকনের দরকার কী! আফনে যা কইসেন, হেইডাই হইব। পুলাপান কত কথাই কইব, হেগো লগে তাল মিলাইয়া নাচলে চলব নাকি আমাগো? কী কও, মিয়ারা?
‘হ, হ। ঠিক, ঠিক। বেহুদা ঝামেলা বাড়ানের কাম নাই। আজাইরা জিনিস লইয়া পইড়া থাকলে পেট চলত না। হগলেরই কাজ-কর্ম করন লাগে,’ সমর্থন জোগাল সামনের সারিতে উপবিষ্ট একজন বয়স্ক মানুষ। অন্যরাও মাথা নেড়ে সায় জানাল।
