‘লোকে বলে, প্রায়ই তখন দেখা দিত মিশিবিঝিউ; আর তার ক্ষুধার্ত চেহারা যে কারও পিলে চমকে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই ইণ্ডিয়ান যোদ্ধারা দিন-রাত পালা করে পাহারা দিত হ্রদের ধারে; যেন কম বয়সী কেউ ভুল করেও জলে নেমে পড়তে না পারে।
‘তবে এক উৎসবের রাতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। ভরপেট ঘরে বানানো মদ গিলে বেহেড মাতাল হয়ে পড়ল দুই গাঁয়ের সব ক’জন পুরুষ মানুষ; প্রহরার কথা আর মনে রইল না কারও!
‘সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাল ভিন গাঁয়ের দুই দস্যি মেয়ে। সবার সামনে শত্রুতার অভিনয় করলেও, একে-অন্যের প্রাণের সখী ওরা। দেখা করার এহেন সুবর্ণ সুযোগ কী করে হাতছাড়া করে ওরা?
‘দুটো ক্যানু নৌকা নিয়ে যে-ই না ওরা হ্রদের মধ্যখানটায় একত্রিত হয়েছে, ঠিক তখনই জল ফুঁড়ে বেরিয়ে এল মিশিবিঝিউ! তার পাহাড় প্রমাণ দেহটা ধীরে- ধীরে জেগে উঠল পানির ওপরে; অতিকায় ছায়ার আড়ালে প্রায় ঢাকা পড়ে গেল ছোট্ট নৌকো দুটো। উৎসবের ঢাকের বিকট আওয়াজে চাপা পড়ে গেল মেয়ে দুটির আর্তচিৎকার; দুই গ্রামের কারও কানেই পৌছল না, তাদের গলার স্বর!
‘মরিয়া হয়ে হাতের বৈঠা দিয়ে মিশিবিঝিউকে আঘাত করে বসল একটা মেয়ে; ভয় দেখিয়ে তাড়াতে চায় আজব জন্তুটাকে! কিন্তু তার ছানাবড়া চোখের সামনেই এক পলকে কেটে দু’টুকরো হয়ে গেল বৈঠাটা। সম্ভবত ওই প্রথম কোন মানুষ স্বচক্ষে মিশিবিঝিউ-এর পিঠের ধারাল দাঁতের কামাল দেখল!
‘ভয়ানক রেগে গেল চিতাটা, প্রচণ্ড আলোড়ন তুলে ডুব দিল পানিতে। খানিকক্ষণ নিথর হয়ে রইল চরাচর, সময়ও যেন থমকে গিয়েছিল তখন। পরক্ষণেই ফুঁসে উঠল গোটা হ্রদ; ধীরে-ধীরে বাড়তে লাগল জলের উচ্চতা।
এক লহমায় বিক্ষুব্ধ একটা সমুদ্রে পরিণত হলো গোল্ড লেক। নিমিষেই জলের অতলে হারিয়ে গেল আস্ত দুটো ইণ্ডিয়ান গ্রাম! তবে আশ্চর্যের বিষয়, নৌকায় থাকা মেয়ে দুটোর একটুও ক্ষতি করেনি মিশিবিঝিউ! প্রাণে বেঁচে যাওয়া ওই মেয়েগুলোর কাছেই পরবর্তীতে ঘটনাটার আদ্যোপান্ত শুনতে পায় লোকে।’
‘হায়, ঈশ্বর! হায়, ঈশ্বর!’ বার কয়েক নিচুস্বরে বিড়-বিড় করল মিচেল। ‘এত ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীকে সোনা বানানোর পরশপাথর বলার কারণ কী? ওটা কি সোনার ডিম দেয়?’
মৃদু হাসল হিউগো। ‘না, সোনার ডিম দেয় না। তবে ওটার স্পর্শে সবকিছু সোনা হয়ে যায়। সেদিন ওই মেয়েটার হাতে থাকা বৈঠাটার বাকি অংশ নিখাদ সোনায় পরিণত হয়েছিল! ওটা বিক্রি করে বাকি জীবনটা বেশ সুখেই কাটিয়েছিল ওরা।
‘এর পরেও বেশ কয়েক জন মানুষ গোল্ড ক্রীকে গিয়ে বিভিন্ন জিনিস সোনায় পরিণত করেছে; অন্তত আমার কাছে এমনটাই দাবি করেছে এক সিয়ক্স চিফ। একবার একটা সিংহের কবল থেকে লোকটাকে বাঁচিয়েছিলাম আমি। প্রাণ বাঁচানোর প্রতিদান স্বরূপ আমাকে এই গোপন তথ্যগুলো উপহার দিয়েছে সে। কীভাবে কী করতে হবে, সবকিছু পই পই করে বলে দিয়েছে।’
‘আর তুমি সেগুলো বিশ্বাসও করেছ?’ সতর্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মিচেল।
‘করেছি,’ চটজলদি জবাব দিল হিউগো। ‘জগতে কত অদ্ভুত কিছুই তো ঘটে, তাই না? তাছাড়া হারানোর কী-ই বা ছিল আমার? এমনিতেই এক পা কবরে দেয়া ছিল, ক’বছরই বা বাঁচতাম আর! শেষকালে একবার ভিন্ন পথে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করতে দোষ কী?’
জবাব দিল না মিচেল। কী বলবে?
স্থবিরতা নেমে এল আলাপনে; হঠাৎই যেন সব কথা ফুরিয়ে গেছে ওদের!
আচমকা বলে উঠল মিচেল, ‘কী কী করতে হবে গোল্ড ক্রীক থেকে সোনা পেতে হলে?’
খানিকক্ষণ ওর দিকে অপলক তাকিয়ে রইল পোড় খাওয়া বুড়ো; আপনমনে কী যেন ভাবছে। তারপর ধীর গলায় বলল, ‘তোমার ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না, বাছা। সারা জীবন পড়ে রয়েছে তোমার সামনে, এখনই শর্টকাট খোঁজার কী দরকার! একটু ভুলভাল হলেই আর রক্ষা নেই, প্রাণ খোয়াতে হবে মিশিবিঝিউ- এর হাতে। অযথা ঝুঁকি নেয়ার কোন মানে হয় না।’
হাসল মিচেল। ‘আপাতত ওই পথ মাড়ানোর কোন ইচ্ছে নেই আমার। তবে পদ্ধতিটা জেনে রাখতে চাই। যদি বুড়ো বয়সে এসে তোমার মত জীবন নিয়ে কোন আক্ষেপ থাকে, তখন নাহয় একবার ঘুরে আসব গোল্ড ক্রীক থেকে। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে। তবে আমাকে কথা দাও, বাছা; নিতান্ত ঠেকায় না পড়লে তুমি কখনও গোল্ড ক্রীকের ট্রেইল ধরবে না।’
‘কথা দিলাম,’ হাসিমুখে বলল মিচেল।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলল হিউগো। তার জন্য এই ছেলেটা অযথা প্রাণ হারালে, নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারত না সে। ‘পদ্ধতিটা খুব জটিল নয়। পূর্ণিমার রাতে ক্রীকে নেমে কোমর পানিতে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। তারপর চোখ বন্ধ করে পর-পর তিনবার চিৎকার করে বলতে হবে, ‘মিশিবিঝিউ, আমি হাজির হয়েছি। আমার উপহার গ্রহণ করুন।’ তারপর যে জিনিস তুমি সোনা বানাতে চাও, সেটা বাড়িয়ে ধরতে হবে সামনের দিকে
‘এরপর চারপাশে যত অদ্ভুত শব্দই শুনতে পাও না কেন, ভুলেও চোখ খোলা চলবে না। সবকিছু মিটে গেলে পরিবেশ যখন শান্ত হয়ে যাবে, চোখ বন্ধ রেখেই ধীরে-ধীরে পিছিয়ে আসতে হবে। হাঁটু পানিতে পৌছনোর পর চোখ খোলা যাবে।
‘তারপর তীরে উঠে যত জলদি সম্ভব ওখান থেকে চলে আসতে হবে। সোনা- যেটুকু পাবে, তা দিয়ে তুমি রাতারাতি মস্ত ধনী হতে পারবে না; তবে বাকি জীবনটা বেশ সচ্ছলভাবেই কাটাতে পারবে। এক জীবনে দ্বিতীয়বার আর কখনও গোল্ড ক্রীকের পাড়ে যাওয়া যাবে না। রক্তের সম্পর্ক আছে, এমন কোন স্বজনকেও পাঠানো চলবে না।’
