‘পাঠাব না,’ হেসে তাকে আশ্বস্ত করল মিচেল। ‘তা সোনা বানানোর জন্য কী নিয়ে যাচ্ছিলে তুমি গোল্ড ক্রীকে?’
‘চারটে রূপার স্পার; স্যাডল ব্যাগে আছে। তোমাকে জিনিসগুলো উপহার দিলাম, বাছা। রোডিওতে ওগুলো পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলাম আমি। আর কখনও ওগুলো ব্যবহারের সুযোগ হবে না আমার।’
থমকে গেল মিচেল। আরও খানিকটা এগিয়ে এসে নিজের মুঠোয় তুলে নিল হিউগোর হাত দুটো। ‘ভবিষ্যতের কথা কে-ই বা বলতে পারে, হিউগো! হয়তো আবারও সুস্থ হয়ে উঠবে তুমি; ঘোড়া দাবড়ে বেড়াবে। তখন নাহয় স্পারগুলো ফিরিয়ে দেব তোমাকে।’
মাথা দোলাল বুড়ো; আধশোয়া থেকে পুরোপুরি চিত হয়ে শুয়ে পড়ল বেডরোলে। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে তার, ক্ষতগুলো ভীষণ জ্বালা করছে। মৃদুস্বরে বলল, ‘এখন গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমাকে খানিকটা একা থাকতে দাও। ঈশ্বরকে বলার মত এখনও অনেক কথা বাকি রয়ে গেছে আমার।’
ঘাড় কাত করে সায় জানাল যুবক। নিজের বাড়তি কম্বলটা এনে চাপিয়ে দিল হিউগোর আহত শরীরে। অসুস্থ মানুষ; খানিকটা বাড়তি উষ্ণতায় আরাম পাবে।
ক্যাম্পফায়ারে আরও খানিকটা লাকড়ি চড়িয়ে দিয়ে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল মিচেল। আজ সারাদিনই রাইড করেছে সে। গলা ফাটিয়ে ক্লান্তির ঘোষণা দিচ্ছে পরিশ্রান্ত দেহের সবক’টা পেশি।
মস্ত থালার মত চাঁদ উঠেছে আকাশে; আর একদিন বাদেই পূর্ণিমা। চন্দ্ৰদেবীকে সঙ্গ দেয়া তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের পাতা ভারী হয়ে এল তার; কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।
.
শেষরাতের দিকে মারা গেল হিউগো; ভোরে ঘুম থেকে জেগে তাকে মৃত অবস্থাতেই পেল মিচেল। লাশটাকে জড়িয়ে ধরে অনেকটা সময় অঝোরে কাঁদল ছেলেটা।
অল্প সময়ের মধ্যেই বুড়োকে ভীষণ ভালবেসে ফেলেছিল সে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে যাদের আপন বলতে কেউ থাকে না, তারা একে অন্যকে খুব সহজেই আপন করে নিতে পারে।
মেসার গোড়ায় একটা অগভীর অ্যারোইয়োতে হিউগোকে কবর দিল মিচেল। ফিউনেরালের আচার অনুষ্ঠান কীভাবে সম্পন্ন করতে হয়, এ ব্যাপারে বিশদ জানা নেই তার। তবে হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা সমর্পণ করতে কার্পণ্য করল না সে।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জিনিসপত্র গোছগাছ করে রওনা হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেল মিচেল। কাছের শহর সিটাডলে যাবে। নতুন কিছু বাথান গড়ে উঠেছে ওখানে, কাজ পেতে সমস্যা হবে না।
যাত্রা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তেই আচমকা থমকে দাঁড়াল সে। বিদ্যুৎ চমকের মত একটা সম্ভাবনা মাথায় এসেছে তার। এই এলাকা পরিত্যাগ করার আগে, একবার স্বচক্ষে গোল্ড ক্রীকটা দেখে গেলে কেমন হয়? আর কখনও এ তল্লাটে আসার সুযোগ হবে কিনা, কে জানে!
তাছাড়া আজ রাতেই পূর্ণিমা! কীসের মোহে জীবন উৎসর্গ করল বুড়ো মানুষটা, একবার যাচাই করে দেখলে মন্দ হয় না।
হিউগোকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে গেল মিচেল। রোমাঞ্চকর এক অভিযানের নেশা তখন পুরোদমে চেপে বসেছে তার মাথায়। দুটো ঘোড়া নিয়ে নিষিদ্ধ এলাকার দিকে যাত্রা শুরু করল তরুণ কাউবয়।
আবছা একটা ট্রেইল ধরে অনুচ্চ পাহাড় সারিটা পার হলো মিচেল। বহুকাল অব্যবহৃত থাকায়, প্রায় বুজে এসেছে ট্রেইলটা। ধুঁকতে-ধুঁকতে সামনে এগিয়ে পাহাড়ের শেষপ্রান্তে গিয়ে অক্কা পেয়েছে ওটা।
তবে এ নিয়ে কোন ঝক্কি পোহাতে হলো না মিচেলকে। কারণ ইতোমধ্যেই হিউগোর নির্দেশনা অনুসারে ক্যানিয়নটার দেখা পেয়ে গেছে সে।
ক্যানিয়নটা বেশ সরু। দু’পাশের টিলাগুলো প্রায় গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি দু’জনের বেশি পথ চলা যাবে না এখানে। জায়গায় জায়গায় বেশ অন্ধকার; মেঝে ভীষণ সেঁতসেঁতে। টিলার বাঁকা চূড়ার কারণে সূর্যের আলো ঠিকমত পৌঁছয় না ওসব জায়গায়।
একনাগাড়ে এগিয়ে গেল মিচেল, এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নিল না কোথাও। অবশেষে দুপুর নাগাদ ক্যানিয়নটা অতিক্রম করতে পারল সে।
সামনের ধু-ধু প্রান্তরটার দিকে তাকিয়ে খানিকটা ভড়কে গেল মিচেল আদতেই ভীষণ রুক্ষ ময়দানটা। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে দানবীয় সব পাথুরে বোল্ডার আর পুরো এলাকা ছেয়ে আছে বিষাক্ত চয়ায়। এই চয়ার কাঁটা শরীরে বিধলে ভীষণ ব্যথা হয়; ঘোড়াকেও অবলীলায় খোঁড়া করে ফেলতে পারে চয়া।
একটা পাথুরে চাতালের ছায়ায় যাত্রাবিরতি টানল মিচেল। ক্যান্টিন বের করে পানি খেল, হ্যাটে ঢেলে ঘোড়া দুটোকেও খাওয়াল। কেবল সে নিজে নয়, অবলা জানোয়ার দুটোও বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। খানিকক্ষণ বিশ্রাম না নিলে, সামনে পথ চলা দায় হয়ে পড়বে ওদের জন্য।
গোল্ড ক্রীকের পাড়ে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেল। ক্রীকের ধারে একটা পাইনের জটলায় ক্যাম্প করল মিচেল।
ক্রীকটা বিশাল, অনেকখানি প্রশস্ত। এতটা বিস্তৃত ক্রীক এর আগে কখনও দেখেনি সে। দু’পাশে অনেকদূর পর্যন্ত কোন গাছগাছালি নেই; ডানা ছড়ানো একটা বাদুড়ের আকৃতি পেয়েছে এলাকাটা।
সাপারের পর খানিকক্ষণ ইতিউতি খুঁজল মিচেল, কিন্তু মিশিবিঝিউ-এর টিকিটিরও সন্ধান মিলল না। দানবীয় কোন প্রাণী বসবাস করে এখানে, তেমন কোন আলামতও চোখে পড়ল না কোথাও।
হতাশ ভঙ্গিতে মাথা দোলাল মিচেল। আপনমনে বিড়-বিড় করল, ‘অযথাই একটা ভ্রান্তির পিছনে ছুটেছে বুড়ো হিউগো। নিছকই রূপকথা এসব; বাস্তবে ওই জলার চিতাবাঘের কোন অস্তিত্বই নেই।’
