‘কিন্তু কী থেকে যে কী হয়ে গেল, টেরই পেলাম না! বিনা দোষেই ফেঁসে গেলাম একটা ওয়াগন ট্রেন লুটের কেসে। সবার চোখে আউট’ল বনে গেলাম।
‘তারপর থেকে শুধু ছুটে চলা আর নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখা। এভাবেই কেটে গেল অনেকটা সময়। বেঁচে রইলাম ঠিকই, কিন্তু জীবনটাকে আর উপভোগ করা হলো না কখনও।
‘আদতে আউট’ল ছিলাম না বলে অর্থনৈতিকভাবে চরম অসচ্ছল ছিলাম। কোন শহরেই বেশিদিন থাকতাম না, পাছে আমার আউটল পরিচয় লোকের কাছে ফাঁস হয়ে যায়! তাই স্থায়ী কোন কাজও জোটেনি কপালে।
‘এই ছন্নছাড়া জীবনের সঙ্গে কাউকে জড়াতে চাইনি বলে, বিয়ে থা করা হয়নি। র্যাঞ্চ গড়ার স্বপ্নটাও চিরকাল স্বপ্নই রয়ে গেল। ..
‘অবশেষে এই বুড়ো বয়সে এসে গভর্নরের ক্ষমা পেলাম; আউট’ল তালিকা থেকে নাম কাটা গেল আমার। ভাবলাম, শেষ একটা চেষ্টা করে দেখি, ভাগ্যটা ফেরানো যায় কিনা। যদি আচমকা কিছু পয়সাকড়ি পেয়ে যাই, বাথান গড়ার ইচ্ছেটা হয়তো আর অপূর্ণ থাকবে না! সেজন্যই একটানা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে এখানটায় ছুটে এসেছি আমি।’
হতভম্ব দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল মিচেল। এই বিজন প্রান্তরে একজন মানুষের ভাগ্য ফেরানোর মতন কী আছে! ‘কীসের খোঁজে? স্বর্ণখনি?’
দ্রুত মাথা নাড়ল হিউগো। ‘খনিতে সোনা যা ছিল, সেসব বহু আগেই মাইনাররা চেটেপুটে সাফসুতরো করে ফেলেছে। তোমার-আমার জন্য সামান্য একটা শিরাও আর অবশিষ্ট নেই কোথাও।’
‘তাহলে?’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল হিউগো। তারপর বলল, ‘গোল্ড ক্রীকের নাম শুনেছ কখনও?’
এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল মিচেল; শোনেনি। ‘কী আছে ওই ক্রীকে? সোনা?’ মৃদু হাসল ধূর্ত বুড়ো। ‘অনেকটা ওরকমই। তবে ঠিক সোনা নয়, সোনা বানানোর পরশপাথর।’
‘মানে?’
ওই ক্রীকের জলের তলায় এমন একটা জিনিস আছে, যার স্পর্শে যে কোন কিছু খাঁটি সোনায় পরিণত হয়।’
‘গাঁজাখুরি গল্প বলার আর জায়গা পেলে না তুমি? এখন বুঝি রসিকতা করার সময়?’ প্রচণ্ড বিরক্তি ঝরে পড়ল মিচেলের কণ্ঠে 1
নিমেষেই গম্ভীর হয়ে গেল হিউগো; চেহারায় ভর করল বিষাদের কালো ছায়া। ভারী গলায় বলল, ‘একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ তোমার সঙ্গে মজা করবে না, বাছা। রসিকতা করার মত মানসিক অবস্থা থাকে না তার।’
লজ্জা পেল মিচেল; বুড়ো ঠিকই বলেছে। মৃদু গলায় বলল, ‘ক্রীকটা কোথায়?’
হাত তুলে পিছনের একটা মাঝারি উচ্চতার পাহাড় দেখাল হিউগো। ‘ওই টিলার ওপাশে একটা ক্যানিয়ন পাবে। ওটা ধরে সোজা উত্তরে গেলে সামনে পড়বে একটা শুষ্ক উপত্যকা। জায়গাটা পার হয়ে মাইল দশেক সামনে এগুলেই পেয়ে যাবে গোল্ড ক্রীক।’
আঁতকে উঠল যুবক। ‘ওটা তো রীতিমত ভুতুড়ে এলাকা। ইণ্ডিয়ানদের পুরনো গোরস্থানটা ওদিকেই না?
‘হ্যাঁ। তবে শুধু গোরস্থানই নয়, ইণ্ডিয়ান উপকথা অনুসারে, আস্ত দুটো গ্রামই সুদূর অতীতে বিলীন হয়ে গেছে গোল্ড লেকের অতলে।’
‘গোল্ড লেক! ওদিকটায় কোন হ্রদ আছে বলে তো শুনিনি কখনও!’
‘একসময় ছিল, এখন নেই। অতীতের গোল্ড লেকই পরিণত হয়েছে আজকের গোল্ড ক্রীকে।’
‘আর ওই ক্রীকের জলেই বুঝি লুকানো আছে সোনা বানানোর পরশপাথর?’ হালকা গলায় জানতে চাইল মিচেল।
—হুম। ঠিক তাই,’ শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল হিউগো। দম নেয়ার জন্য কয়েক মুহূর্ত বিরতি নিল সে; কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। ‘তবে ওটা কিন্তু কোন জড় বস্তু নয়; মস্ত দেহের বিশাল একটা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী!’
‘হায়, ঈশ্বর! বলছ কী এসব!’ রীতিমত চেঁচিয়ে উঠল মিচেল।
খানিকক্ষণ সরু চোখে তাকে নিরীখ করল হিউগো। তার চোখের তারায় নিখাদ বিস্ময় ব্যতীত উপহাসের ছায়াও খুঁজে পেল না কট্টর বুড়ো। তাই সন্তুষ্টচিত্তে বলতে শুরু করল, ‘চিপেওয়া উপকথায় পাওয়া যায়, গোল্ড লেকের একেবারে মধ্যখানটায় প্রাচীন কালে মাঝারি আকারের একটা দ্বীপ ছিল। ওতে বসবাস করত বিশালকায় এক জলজ চিতাবাঘ! অন্যান্য সাধারণ চিতার সঙ্গে মস্ত তফাৎ ছিল তার; জলে-ডাঙায় সমান স্বচ্ছন্দ ছিল প্রাণীটা!
‘ইণ্ডিয়ানদের জলদেবতা ছিল ওই অদ্ভুতুড়ে চিতাবাঘ। ওরা ওটাকে ডাকত মিশিবিঝিউ বলে।
‘ওদের বিশ্বাস ছিল, নদী-হ্রদ-ক্রীক এমন সমস্ত প্রাকৃতিক জলাধারে একটা করে মিশিবিঝিউ বসবাস করে! তবে গোল্ড লেকের মিশিবিঝিউই কেবল লোকচক্ষুর সামনে আসে। প্রয়োজনে শত-শত বছর ধরে না খেয়ে থাকতে পারে মিশিবিঝিউ; কারণ খাদ্য হিসেবে ডুবন্ত মানুষ ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করে না ওরা!
‘ওদের পুরো দেহ লাল-লাল লোমে ঢাকা; আকারে একটা পূর্ণবয়স্ক মোষের মতই প্রকাণ্ড। একেবারে কপালের মধ্যখানে একটা লোমে ঢাকা পেল্লায় শিঙ থাকে ওদের; তার ঠিক নীচেই থাকে রক্তবর্ণের মস্ত একখানা কুঁতকুঁতে চোখ। ‘কুমিরের মত লম্বা একটা লেজ আর হাঙরের মত ত্রিকোণ একটা পাখনা আছে ওদের পিঠে। একারণেই জলের তলায় ইচ্ছেমতন সাঁতরাতে পারে ওরা। মেরুদণ্ড বরাবর করাতের মত ধারাল একসারি দাঁত বসানো, যেগুলো ছড়িয়ে আছে একেবারে লেজের ডগা পর্যন্ত। সম্ভবত নিজের আত্মরক্ষার্থেই ওগুলো ব্যবহার করে মিশিবিঝিউ।
‘গোল্ড ক্রীকের দুই তীরে বসতি গেড়েছিল দুই দল সিয়ক্স ইণ্ডিয়ান। বংশানুক্রমে একে অপরের জাত শত্রু ছিল ওরা। প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণা কিংবা মিশিবিঝিউ-এর প্রতি ভয়, যে কারণেই হোক, দুই গ্রামের কেউই কখনও হ্রদের জলে নামত না।
