আগুনের আঁচ থেকে খানিকটা দূরে, নিজের বেডরোলে শুয়ে কাতরাচ্ছে একজন মুমূর্ষু মানুষ। লোকটার বয়স ষাটের কোঠায়; তবে পেটা শরীরে ভাঙন ধরেনি এখনও। অন্তত গোটা চারেক তীর ঢুকেছিল তার দেহে; প্রচুর রক্ত হারিয়েছে। এখনও সে বেঁচে আছে কী করে, সেটাই বিস্ময়কর!
ইণ্ডিয়ান টেরিটরির ভিতর দিয়ে পথ চলার সময় আচমকা একটা কোমাঞ্চি ওয়ার পার্টির সামনে পড়ে যায় সে। কাল বিলম্ব না করে ওকে ধাওয়া করে ইণ্ডিয়ানরা। ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে এই মেসার ওপরে পালিয়ে আসার আগ পর্যন্ত অন্তত দশ জন ইণ্ডিয়ান প্রাণ হারিয়েছে তার রাইফেলের গুলিতে।
শেষ বিকেলে একটা রক্তমাখা ট্র্যাক দেখতে পেয়ে, এই টিলার ওপর তাকে আবিষ্কার করে তরুণ কাউবয়। লোকটা তখন অচেতন অবস্থায় ঝুলছিল নিজের স্যাডল থেকে।
মালিকের কাছ থেকে বহুক্ষণ কোন দিক নির্দেশনা না পেয়েই হয়তো দাঁড়িয়ে পড়েছিল তার ঘোড়াটা। তবে ঘন হয়ে জন্মানো ওখানকার কচি ঘাসগুলোও যে তাকে সিদ্ধান্তটা নিতে প্রলুব্ধ করেছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
প্রৌঢ়ের নাম হিউগো; আর তরুণ কাউবয়কে লোকে মিচেল বলেই চেনে। ঘণ্টাখানেক সেবা-শুশ্রূষার পরই কেবল হিউগোর চেতনা ফেরাতে সক্ষম হয়েছিল বেচারা।
তীরগুলো খুলে নিয়ে, ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দেয়া হয়েছে। রক্তপাত আপাতত বন্ধ হয়েছে বটে; তবে ইতোমধ্যেই ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। হিউগো এবারের ধকলটা ঠিকঠাক সামলে নেবে; এহেন বাজি ধরার লোক এই মুহূর্তে গোটা পশ্চিমে একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
স্যাডল ব্যাগ হাতড়ে একটা পুরনো বাটি বের করল মিচেল। মগভর্তি তেতো কফি আর বাটিভরা স্টু নিয়ে এগিয়ে গেল হিউগোর বেডরোলের দিকে
বহু কসরত করে তাকে আধশোয়া করল মিচেল; তারপর মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগল। খানিকক্ষণ নীরবেই বিনা প্রতিবাদে খাবারটা গলাধঃকরণ করল হিউগো, তারপর হাত তুলে বাধা দিল। ইশারায় কফি দিতে বলে হেলান দিল পিছনে রাখা স্যাডলে; ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
‘ঈশ্বর আমার ওপর এতটা নাখোশ হয়ে আছেন, সেটা আজকের আগে কখনও বুঝতেই পারিনি! বলতে বাধ্য হচ্ছি, এতটা জঘন্য খাবার এই জনমে আর খাইনি আমি। সত্যিই এটাকে মানুষের খাবার বলো তুমি?’
দাঁত কেলিয়ে হাসল মিচেল। কফি মগটা ধরিয়ে দিল হিউগোর হাতে।
‘যদি নরকে যাও, ওখানকার খাবার কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা হয়ে গেল তোমার,’ হাসিমুখে বলল সে। ‘জন্মের পর-পরই অনাথ হয়েছি; বলতে গেলে পথে পথেই মানুষ হয়েছি আমি। একটি দিনের জন্যও কোন সভ্য পরিবারের সঙ্গে বসবাস করার সুযোগ পাইনি। কে আর আমাকে রাঁধতে শেখাবে, বলো? পেটের তাগিদে কোনরকমে স্রেফ সেদ্ধ করাটা শিখে নিয়েছি। ওতেই দিব্যি চলে যায় আমার। যতদিন বেঁচে আছ, তোমাকেও ওই খেয়েই থাকতে হবে।’
হাসার চেষ্টা করল হিউগো, কিন্তু যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে হাসিটা ঠিকঠাক ফুটল না। ‘অতটা অভাগাও বোধহয় নই আমি। সকাল অবধি টিকব বলে মনে হয় না। তোমার হাতের রান্না, তুমিই খাও, বাপু!’
চুপ করে রইল মিচেল, কোন প্রতিবাদ করল না। তার নিজেরও ধারণা, রাত ফুরাবার আগেই মারা যাবে হিউগো। কাশির সঙ্গে এখনও সমানে রক্ত আসছে লোকটার; নিশ্চয়ই ভিতরে কোথাও মস্ত ক্ষত হয়ে গেছে।
প্রসঙ্গ পাল্টানোর প্রয়াস পেল সে। ‘এই বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছিল নাকি? কী মনে করে ওই ইণ্ডিয়ান টেরিটরিতে ঢুকতে গেলে? এই উপত্যকায় আসার বিকল্প পথ যেহেতু রয়েছে; প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ইণ্ডিয়ানদের মুখে হামলে পড়ার কোন মানে হয়?’
‘বিকল্প পথ ধরলে অনেকটা ঘুরপথে এখানে আসতে হত আমাকে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই শর্টকাট ধরেছিলাম, সময় ছিল না হাতে,’ শান্ত গলায় জবাব দিল হিউগো। ‘অনেক দূর থেকে আসছি আমি, অহেতুক বাড়তি পথ পাড়ি দিতে মন সায় দিচ্ছিল না। ইণ্ডিয়ানদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকার কৌশল জানতাম। নিরাপদে টেরিটরি পার হতে পারব, সেই বিশ্বাসটাও ছিল। কিন্তু কপাল মন্দ; ওয়ার পার্টির সামনে পড়ে গেলাম। নাহয় ঠিকই অক্ষত দেহে পাড়ি দিতে পারতাম ট্রেইলটা।’
‘হুম। বুঝলাম,’ সমঝদারের ভঙ্গিতে মাথা দোলাল মিচেল। ‘তা এত হন্তদন্ত হয়ে যাচ্ছিলে কোথায়?’
‘এদিকেই আসছিলাম। ওক কাউন্টি থেকে রওনা দেয়ার পর আর একদিনের বেশি বিশ্রাম নিইনি কোথাও।’
‘এদিকে?! কিন্তু কেন? দলে দলে লোকে যখন আরও পশ্চিমে পাড়ি জমাচ্ছে, তুমি কেন উল্টোদিকে ফিরে এলে?’
‘ভাগ্য ফেরাতে, বাছা। ভাগ্য ফেরাতে,’ হতাশ গলায় বলল হিউগো। বার কয়েক খুক-খুক করে কাশল; কাশির দমকে আবারও ছলকে বেরিয়ে এল খানিকটা তাজা রক্ত। নিজের ব্যাণ্ডানা দিয়ে পরম যত্নে সেগুলো মুছে দিল মিচেল। বুড়োর জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে মমতা অনুভব করছে সে।
নিচু স্বরে বলল, ‘ভাগ্য ফেরানোর মত কী-ই বা আছে এদিকে? মাইলের পর মাইল বিরান প্রান্তর ছাড়া আর তো কিছু চোখে পড়েনি আমার।’
নড়েচড়ে খানিকটা সোজা হয়ে বসার প্রয়াস পেল হিউগো। তারপর বলল, ‘সারাটা জীবনই প্রচণ্ড দরিদ্রতার ভিতর দিয়ে কাটালাম, বাছা। তারুণ্যে স্বপ্ন ছিল একখানা র্যাঞ্চ গড়ব; বিয়ে করব, সংসার পাতব। পাহাড়ের গহীনে পছন্দসই একটা জায়গাও ঠিক করে রেখেছিলাম বসতি গড়ার জন্য।
