ছুটতে-ছুটতেই অনুধাবন করল, মড়াখেকোটা ঠিকই এখনও ছায়ার মত পিছনে লেগে আছে! ওটার ছুটে আসার শব্দটাও খুব একটা পিছিয়ে নেই।
কীভাবে নিজের বাড়ি পৌঁছেছে, সেটা মানিক নিজেও জানে না। সে শুধু জানে, প্রাণ বাজি রেখে জীবনের সবচেয়ে দ্রুতগতির দৌড়টা আজ দৌড়েছে।
ঘরে ঢুকে মরিয়মকে আলগোছে খাটের উপর নামিয়ে রাখল সে। চেনা খাট, চেনা শরীর, শুধু অমূল্য প্রাণটাই অনুপস্থিত।
দ্রুত হাতে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল মানিক। পরিশ্রমে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেছে সে। বুকটা হাপরের মত ওঠানামা করছে ক্রমাগত।
ভয়টা এখনও কাটেনি ওর। জানে, তার পিছু-পিছু এখান পর্যন্ত ঠিকই পৌঁছে গেছে পিশাচটা। ঘরে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তেও পিছনে ওটার তেড়ে আসার শব্দ শুনতে পেয়েছে সে। উঠনের কোন ঝোপেই হয়তো ঘাপটি মেরে বসে আছে এখন।
অনিশ্চয়তার সময়টা খুব একটা দীর্ঘ হলো না। কেননা কিছুক্ষণের মধ্যেই ওটা তার উপস্থিতি জানান দিল! দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, সেই সঙ্গে আলতো থাবার আঘাত। মানিকের দেহে কাঁপুনি তুলতে এর বেশি কী লাগে আর?
কাঁপতে-কাঁপতেই দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল সে। কাঠের এই পাটাতন কতক্ষণ বাইরের রাক্ষসটাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে, কে জানে!
কেবল মরিয়মের কথা ভেবেই এখনও চিৎকার করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে মানিক। প্রকাণ্ড একখানা আর্তচিৎকার গলার কাছটায় এসে দানা বেঁধে আছে অনেক আগে থেকেই।
থেমে গেল দরজায় করাঘাতের আওয়াজ। ওটা সরে গেছে ওখান থেকে, ঘুরে বেড়াচ্ছে এখন ঘরের চারধারে।
বেড়ার দেয়ালের এখানে-ওখানে ওটার আঁচড়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। যেন নখ দিয়ে আঁচড়ে-আঁচড়ে দেয়ালের দুর্বল জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছে ওটা।
শব্দটাকে ভিতর থেকে অনুসরণ করে চলল মানিক। হাতে তুলে নিয়েছে ভয়ালদর্শন একখানা রাম-দা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে, মরতে যদি হয়, লড়াই করেই মরবে।
আচমকা ঘরের ছাদটা মচমচ করে উঠল! কিছু একটা আছে ওখানে!
পিশাচটা কি ওখানে উঠে গেছে? কীভাবে উঠল?
যেভাবেই হোক, উঠেছে ওটা। আর এখন হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রান্নাঘরের দিকে।
বিদ্যুচ্চমকের মত কথাটা মনে পড়ে গেল মানিকের। রান্নাঘরের ছাদে একটা ফোকর আছে!
অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উপরে তুলে রাখার জন্যই করা হয়েছিল ফোকরটা। চাইলেই ওই পথে নেমে আসতে পারবে পিশাচটা। সম্ভবত এটাই করতে চলেছে ওটা এখন।
পড়িমরি রান্নাঘরে ছুটে গেল মানিক। রাম-দাটাকে সজোরে আঁকড়ে ধরে তাকিয়ে রইল কালো ফোকরটার দিকে। থর-থর কাঁপছে তার গোটা শরীর।
মিঁয়াও।
তাকে হতভম্ব করে দিয়ে সিলিং থেকে নেমে এল একটা হোঁতকা মোটা হুলো বিড়াল! অচেনা নয়, অনেকবারই ওটাকে দেখেছে মানিক। তাই আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা সশব্দেই ছাড়ল সে।
আর ঠিক তখনই শুনতে পেল সদর দরজা খোলার শব্দটা! কেউ একজন দরজাটা খুলে ফেলছে। কে?
ফিরে এসে দরজার কবাটগুলো পুরোপুরি খোলাই দেখতে পেল সে। খোলা দরজা দিয়ে বাইরের চাঁদের আলো অবাধে ঢুকে পড়ছে ঘরে।
সেই সঙ্গে ঢুকে পড়েছে লম্বামতন একখানা ছায়া!
ছায়াটা রতন চোরার, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে এক পলকে তাকিয়ে আছে সে মানিকের হতবাক চেহারার দিকে! সারা দেহে এখানে-ওখানে মাটি লেগে আছে রতনের। চোখদুটো আধবোজা। মুখে ঝুলে আছে ভয়ানক অশুভ একচিলতে হাসি।
মানিকের বেহাল দশা দেখে বেশ আমোদ পাচ্ছে সে।
সপ্তাহখানেক আগে কবর দেয়া একজন মানুষকে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুরোপুরি নির্বাক হয়ে গেল মানিক। তাছাড়া কিছুতেই তার মাথায় আসছে না, বাইরে থেকে রতন দরজাটা খুলল কীভাবে। দরজার হুড়কোগুলো সব ভিতরের দিকে, বাইরে থেকে খোলার কোন উপায়ই নেই।
জবাবটা খুব তাড়াতাড়িই পেয়ে গেল মানিক।
তার পিছন থেকে ভেসে এল হালকা হাসির শব্দ!
খাটের উপর বসে আছে মরিয়ম!
সফেদ কাফনের পরিবর্তে তার দেহে জড়িয়ে আছে টুকটুকে লাল একখানা বেনারসি শাড়ি। গা-ভর্তি সোনার গয়না।
ঘোমটা সরিয়ে মানিকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল মরিয়ম।
কিন্তু যখন মুখ খুলল, বোঝা গেল হাসিটা মানিকের জন্য নয়, ছিল তার পিছনে দাঁড়ানো রতনের জন্য!
‘কেমুন আছেন, রতন বাই?’
এরপর আর কিছু মনে নেই মানিকের!
ট্যাবু
রিজের ওপর এক চিলতে খোলা জায়গাকে ঘিরে রেখেছে একসারি কটনউড গাছ। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে ঘন মেসকিটের ঝোপ।
পরিশ্রান্ত সূর্যটা পশ্চিমের পর্বতমালার আড়ালে ডুব মেরেছে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক আগে। তবে ফ্যাকাসে আলো পাতলা একখানা চাদরের মত ঠিকই এখনও ঝুলে আছে খোলা প্রেইরিতে।
ফাঁকা জায়গাটার একেবারে মধ্যখানে ছোট মতন একটা ক্যাম্পফায়ার জ্বলছে। তাতে রান্না চড়িয়েছে কম বয়সী এক কাউবয়। সবেমাত্র তার ঠোঁটের ওপর পাতলা গোঁফের রেখার আবির্ভাব ঘটেছে; তবে ছেলেটার শীতল চোখজোড়া জানান দেয়, পৃথিবীর কদর্যের অনেকখানি দেখা হয়ে গেছে তার।
রান্নার আয়োজন আহামরি কিছু নয়। গরুর শুকনো জার্কি আর সদ্য শিকার করা একটা সেজ মুরগির মাংস মিশিয়ে, থকথকে কাদার মত অর্ধতরল একধরনের খাবার তৈরি করা হচ্ছে।
জিনিসটা দেখতে যেমন বিদঘুটে, খেতেও তেমনই বিচ্ছিরি। রাঁধুনি নিজে অবশ্য এটাকে স্টু বলেই দাবি করে এসেছে এযাবৎকাল। তবে আজ অবধি, তাকে সমর্থন দেয়া দ্বিতীয় কারও সার্টিফিকেট জোগাড় করতে পারেনি সে।
