মরিয়মকে কবরের ভিতরে আশা করেছিল সে, বাইরে নয়!
ধবধবে সফেদ কাফনে জড়ানো মরিয়মের লাশটা এই আবছা আঁধারেও বেশ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে মানিক। সদ্য খোঁড়া কবরটার পাশেই পড়ে আছে লাশটা। আর যা কিছুই কবরটা খুবলে খুঁড়ে থাকুক না কেন, ওটা এখনও এখানেই আছে! ঝুঁকে আছে শ্বেতবসনা মরিয়মের উপর!
ওটা কি শিয়াল? নিজেকেই প্রশ্ন করল মানিক।
উঁহুঁ। গঠনে মেলে না।
ছায়ামতন কিম্ভূতকিমাকার একখানা অবয়ব, চেনাজানা কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাচ্ছে না ওটাকে। তবে আর যা-ই হোক না কেন, শিয়াল যে নয়, একথা ঈশ্বরের দিব্যি করে বলতে পারে মানিক। তাহলে কী ওটা? নিজের অজান্তেই অস্ফুট শব্দ করে উঠল মানিক। আর ঠিক তখনই নড়ে উঠল ওটা!
আঁতকে উঠে চোখজোড়া বন্ধ করতে বাধ্য হলো মানিক। কয়েক মুহূর্ত পর আবার যখন খুলল, ওটাকে আর ওখানে দেখতে পেল না সে। শুধু মরিয়মের লাশটাই দৃশ্যপটে পড়ে আছে প্রকট হয়ে। এখানে-ওখানে আগের মতই দাবড়ে বেড়াচ্ছে জোনাকির দল।
সত্যিই কি কিছু ছিল ওখানটায়? নাকি সবই চোখের ভুল?
নিশুতি রাতে একা-একা গাঁয়ের শেষ মাথার গোরস্তানে আসাটা সহজ কাজ নয়। নির্ঘাত মনের উপর ভীষণ চাপ পড়েছে তার। আর তাতেই হয়তো ভুলভাল দেখতে শুরু করেছে সে। তাই না? নিজেকে প্রবোধ দেয়ার প্রয়াস পেল মানিক।
চকিতে কঠিন একখানা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে। মরিয়মকে কিছুতেই এখানে একাকী ফেলে রাখা যাবে না। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে সে। ঘরের উঠনে কবর দেবে। যেন দিবানিশি নিজেই পাহারা দিতে পারে।
তার ভালবাসার ধনকে শিয়ালে খাবে আর সে কি না আরামসে পৃথিবীর মজা লুটবে? কক্ষনো না।
কোন সন্দেহ নেই, লোভী শিয়ালগুলোই মরিয়মকে কবর থেকে বের করে এনেছে। নইলে এই মাঝরাতে আর কে-ই বা কবরের মাটি খুবলাতে যাবে?
নিশিতে পাওয়া মানুষের মত এলোমেলো পায়ে লাশটার দিকে এগিয়ে গেল মানিক। মরিয়মের শরীর থেকে এখনও আতর লোবানের গন্ধ বেরোচ্ছে। কাছাকাছি যেতেই সেই গন্ধের তীব্র একটা ঝাপটা এসে লাগল মানিকের নাকে। কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করল তার।
পরোয়া করল না সে। দেহের সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরল লাশটা। তারপর সেটা ডান কাঁধে ফেলে উঠে দাঁড়াল। অনেকটা ঘোরের মধ্যেই ফিরতি পথ ধরল সে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘরে ফিরতে চায়।
যদিও পুরো গ্রাম এখন ঘুমিয়ে কাদা, ভোর হতে এখনও ঢের দেরি। তবুও কারোর চোখে পড়ার ঝুঁকিটা নিতে চায় না সে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যে কেউ জেগে উঠতে পারে যখন-তখন। যদি তাদের কারও চোখে পড়ে যায় ঘটনাটা?
কিছুদূর এগোতেই পিছনে একটা আওয়াজ শুনতে পেয়ে সচকিত হয়ে উঠল মানিক। খুব ক্ষীণ একটা শব্দ, যেন আলতো পায়ে কেউ তার পিছন-পিছন আসছে!
কে?
চেনাজানা কেউ? নাকি ভিনগাঁয়ের কেউ?
ভয়ে-ভয়ে ঘাড়ের উপর দিয়ে ফিরে তাকাল মানিক। জানা নেই, ঠিক কাকে দেখতে পাবে। যে-ই হোক, কপালে দুঃখ আছে মানিকের।
মাঝরাতে বউয়ের লাশ কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক লোক, গ্রামের মানুষের জন্য এরচেয়ে বেশি মুখরোচক গল্প আর কী হতে পারে?
মানিক অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, তার পিছনটা পুরোপুরি ফাঁকা! যতদূর চোখ যায়, কোন জনমানব দূরে থাক, একটা ঘেয়ো কুকুর পর্যন্ত নেই। এখানে- ওখানে, দূরে-দূরে কিছু মিটমিটে আলো জ্বলছে। গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন মানুষজনের কাছারি ঘরের বাইরে ঝোলানো বাতি ওগুলো। সারা রাত ধরে জ্বলে, ফজরের আজানের পরই কেবল নেভানো হয়।
আবারও হাঁটতে শুরু করল মানিক। ডান কাঁধটা প্রায় অবশ হয়ে এসেছিল তার। তাই ভার বদলে মরিয়মকে বাম কাঁধে চালান করে দিয়েছে সে।
আর খানিকটা পথ পেরোলেই নিজের বাড়ির আঙিনায় পৌঁছে যাবে, তাই দ্রুত পা চালাল মানিক।
কিন্তু কিছুদূর যেতেই আবারও থামতে হলো তাকে। এবার কেবল পদশব্দ নয়, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছে সে পিছনে! যেন তার দ্রুতগতির চলনের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে অনুসরণকারী! আর সেজন্যই লম্বা দম নিতে বাধ্য হচ্ছে সে!
সীমাহীন আতঙ্কে জমে বরফ হয়ে গেল মানিক। স্পষ্ট বুঝতে পারছে, গোরস্তানের সেই ভয়ানক অবয়বটাই পিছু নিয়েছে তার! এহেন ভয়ঙ্কর নিঃশ্বাসের শব্দ কিছুতেই কোন মানুষের হতে পারে না।
কী এটা? মড়াখেকো পিশাচ?
ছোটবেলা থেকে শুনে আসা কবরস্তানের পিশাচদের লোমহর্ষক সব গল্পগুলো একের পর এক মনে আসতে লাগল তার। সদ্য গোর দেয়া লাশের প্রতি একটা আলাদা আকর্ষণ থাকে ওদের। কে কার আগে চেটেপুটে খাবে, তারই প্রতিযোগিতায় মাতে পিশাচের দল। তারই একটা হয়তো এখন খেতে এসেছে মরিয়মের লাশ।
ভাবনাটা অনেকটা শক্তি জোগাল মানিককে। প্রাণ থাকতে মরিয়মকে কোন পিশাচের খোরাক হতে দেবে না সে। কোনমতেই না।
পিছন ফিরে তাকানো থেকে অনেক কষ্টে নিজেকে নিবৃত্ত করল সে। ভয়ঙ্কর কোন চেহারার মুখোমুখি হয়ে সাহস হারানোর ঝুঁকিটা নিতে চায় না ও। তাহলে মরিয়মকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না তার পক্ষে।
মরিয়মকে দু’হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল মানিক। তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে আচমকা সজোরে দৌড়তে শুরু করল! ভেজা ঘাসে বারকয়েক পিছলে পড়তে-পড়তেও কোনমতে বেঁচে গেল সে। যতটা সম্ভব দ্রুত ছুটছে, দম ফুরাবার আগে আমার ইচ্ছে নেই তার।
