গোসল শেষে ফিরে এসে খাটের উপর গরম খাবার সাজানো পেত সে। কারণ মরিয়মের জানা ছিল, ক্ষুধার্ত মানিকের হাতের চড় গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ ফেলে দেয়!
গঞ্জের বাজারে ছোট একখানা মুদি দোকান চালায় মানিক। আর বাজার মাত্রই নানা কিসিমের লোকজনের আনাগোনা, সেই সঙ্গে হরেক রকম কানকথার উড়োউড়ি। মরিয়মকে নিয়েও অমন উড়ো খবর বেশ কয়েকবারই কানে এসেছে তার! শুনেও না শোনার ভান করেছে মানিক। পুরোপুরি নির্লিপ্ত থেকেছে, কোনরকম উচ্চবাচ্য করেনি।
এমনকী মরিয়মকে এসব নিয়ে একটি প্রশ্নও কখন করেনি সে। তার ভয় হত, যদি দুম করে স্বীকার করে বসে মরিয়ম! যদি বলে দেয়, সব সত্যি! তাহলে কেমন করে বেঁচে থাকবে মানিক? কাকে নিয়ে বেঁচে থাকবে?
যদি সত্যিই রতন চোরার সঙ্গে মরিয়মের কোন সম্পর্ক থেকে থাকে, তাতে বাগড়া দিতে চায়নি মানিক! প্রতিটি মানুষেরই সুখী হবার অধিকার আছে, তাই না? বিধাতা কার সুখ কোথায় লিখে রেখেছেন, কে বলতে পারে!
তাই দুপুরের পর বাজার ক্রেতাশূন্য হয়ে গেলেও কখনও সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরত না মানিক। সবসময় একই রুটিন মেনে চলত, কখনও এর ব্যতিক্রম করেনি সে। সদা সতর্ক থাকত, উল্টোপাল্টা কোন কিছু যেন তার নজরে না আসে। তার চোখের আড়ালে যা খুশি হোক, কী করার আছে তার?
তবে গেল সপ্তাহে যখন সর্দার বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে গণধোলাই খেয়ে পটল তুলল রতন চোরা, স্বস্তির নিঃশ্বাসটা ঠিকই ফেলেছিল মানিক। যাক, বাবা, এবার বুঝি সমস্ত নষ্ট কথার ইতি ঘটল। দিন কয়েক পর মরিয়মও যে তাকে ফাঁকি দিয়ে ওপারে পাড়ি জমাবে, এটা তো আর তার জানা ছিল না।
কাছেপিঠে কোথাও একটা শিয়াল ডেকে উঠল। রাতের নিস্তব্ধতাকে যেন চিরে দিল ডাকটা। ঝিঁঝি পোকার দলের সঙ্গে চমকে উঠল মানিকও।
ডাকটা কবরস্থানের ওদিক থেকেই এসেছে। আর সেখানেই শুয়ে আছে মরিয়ম, একা। যে কি না বেঁচে থাকতে শিয়ালকে প্রচণ্ড ভয় পেত। দূরে কোথাও শিয়াল ডাকলেও ভয়ে রীতিমত কুঁকড়ে যেত মেয়েটা।
খুব ছোটবেলায় ভর সন্ধ্যায় একবার শিয়ালের তাড়া খেয়েছিল মরিয়ম। ছুটে ‘পালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে গর্তমতন একটা জায়গায় পড়ে গিয়েছিল সে। শিয়ালটা গর্তের মুখে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, জ্ঞান হারাবার আগে এটাই ছিল তার সর্বশেষ স্মৃতি। স্বভাবতই মনের গভীরে শিয়ালের ভয়টা ঢুকে গিয়েছিল তার। বড় হবার পরও ভয়টা আর কোনদিনও কাটেনি।
আর এখন এই মধ্যরাতে, এসব ভাবনাই রীতিমত অস্থির করে তুলল মানিককে। শিয়ালটাকে দেখতে পেয়ে খুব কি ভয় পাচ্ছে মরিয়ম? আতঙ্কে কবরের এক কোনায় জড়সড় হয়ে নেই তো মেয়েটা? কাঁপছে থর-থর করে? নাকি নিঃশব্দে কাঁদছে? কার বুকে মুখ লুকাবে সে এখন? হাত বাড়িয়ে মানিককে না পেলে কী করবে পাগলি মেয়েটা?
আচ্ছা, শিয়ালটা মরিয়মকে খেতে আসেনি তো? সে জানে, শিয়ালের দল কবর খুঁড়ে লাশ বের করে খেয়ে ফেলে। তাহলে কি সেটাই হতে চলেছে এখন? নতুন কবরের খবর পেয়ে খাবারের সন্ধানে হাজির হয়ে গেছে শিয়ালের পাল?
আর ভাবতে পারল না মানিক। নিজের অজান্তেই সটান উঠে দাঁড়াল। পড়িমরি ছুটল দরজার দিকে। অসাবধানতায় দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে হাত- পা ছড়িয়ে মাটিতে পড়ল সে। প্রথমটায় ব্যথার চোটে ককিয়ে উঠলেও, তড়িঘড়ি আবার উঠে দাঁড়াল সে। সারা শরীর ধুলোয় মাখামাখি, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপও নেই। তার সমস্ত চিত্ত জুড়ে রয়েছে মরিয়ম, যত দ্রুত সম্ভব তার কাছে পৌছতে চায় সে।
আকাশে ভাঙা থালার মত আধখানা চাঁদ উঠেছে। তার ঘোলাটে আলোয় কেটে গেছে জমাট অন্ধকার। শীত এখনও পুরোপুরি আসেনি। তবে তার আগমনী বার্তা নিয়ে হাজির হয়ে গেছে মিহি কুয়াশা। আর সেই শিশিরের আলতো স্পর্শে ভিজে আছে খেতের আইলের ঘাস।
তাই চেনা পথে ডাকহরকরাদের মত গতি তুলে ছুটতে গিয়ে বার কয়েক হোঁচট খেল মানিক। তবে তাতে তার চলার গতি এতটুকুও মন্থর হলো না। মিনিট পাঁচেকের মাথায়ই সে পৌছে গেল গোরস্তানের প্রবেশদ্বারে।
আজ বিকেলেই মরিয়মকে দাফন করতে গাঁয়ের লোকের সঙ্গে এখানে এসেছিল মানিক। কিন্তু এখন এই মধ্যরাতে, কুয়াশাভেজা চাঁদের আলোয়, চারপাশটা কেমন যেন অচেনা ঠেকছে তার কাছে! তবে মরিয়মের কবরটা সে চেনে ঠিকই। সোজাসুজি কিছুদূর গিয়ে হাতের ডানদিকে ঝাঁকড়া একখানা জারুল গাছ। সেটা পেরিয়ে দ্বিতীয় সারির প্রথম কবরটাই মরিয়মের।
রতন চোরাকে বাদ দিলে গত ক’দিনে নতুন কবর বলতে গেলে ওই একটাই। যে কারোরই চিনতে পারার কথা। দু’সারি কবরের মধ্যখান দিয়ে হাঁটতে শুরু করল মানিক। এগুলো সব গ্রামের সম্ভ্রান্ত মানুষজনের কবর। বেঁচে থাকতে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিতে যারা পিছিয়ে ছিল, মরে গিয়েও তারা সে ব্যবধান ঘুচাতে পারেনি! তাই তাদের কবরগুলো ঠাঁই পেয়েছে গোরস্তানের অপেক্ষাকৃত পিছনের অংশে।
বড়-বড় গাছের ডালপালার আড়ালে চাঁদের আলোর অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে ওখানে। তবে আলোর বার্তাবাহক হয়ে আছে অগণিত জোনাকির দল। এখানে-ওখানে, ঝোপ-জংলায়, মনের সুখে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা।
জারুল গাছের নীচে, তেমন একটা জোনাকিছাওয়া ঝোপ পেরোতেই মরিয়মের কবরটা নজরে এল মানিকের। পরক্ষণেই আচমকা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো সে।
