একটা শলার ঝাড়ু তুলে নিয়ে বিড়ালটার দিকে তেড়ে গেলেন তিনি।
স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলেন আফতাব সাহেব, কিন্তু মিউ মিউ ছাড়া আর কিছুই বেরোল না তাঁর মুখ দিয়ে।
শেষটায় স্ত্রীর হাতে বেদম প্রহৃত হয়ে নিতান্ত প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই তাঁকে জানালা গলে বাইরে বেরোতে হলো।
মনের দুঃখে বাড়ির আঙিনার আমতলায় বসে-বসে কাঁদলেন কিছুক্ষণ, তারপর ওখান থেকেও পালাতে হলো তাঁকে!
রোকেয়া বেগমের নির্দেশে কাজের বুয়া আমেনা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এসেছিল ঝাঁটাপেটা করতে। কোন্ সাহসে আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন আফতাব সাহেব?
.
পিছনের বারান্দায় একটা বিড়ালকে বসে থাকতে দেখে প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে উঠল মনু গোয়ালা। রোজ-রোজ তার গরুর দোয়ানো দুধ খেয়ে যায় একটা বজ্জাত বিড়াল, কখনওই ওটার নাগাল পাওয়া যায় না।
বহুদিন তক্কে তক্কে থাকার পর অবশেষে আজ ওটার দেখা পাওয়া গেল।
পা টিপে-টিপে বিড়ালটার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল সে, হাতে তুলে নিয়েছে মস্ত একটা রামদা।
অন্য বিড়ালদের মত নয়টা জীবন থাকলে, এ যাত্রায় হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেন আফতাব সাহেব!
প্ৰণয়
একগাদা তেল চিটচিটে কাঁথার দঙ্গলে মুখ গুঁজে রেখেছে মানিক। শ্যামলা মুখখানা লালচে হয়ে গেছে তার। সেই সন্ধ্যা থেকেই একনাগাড়ে কেঁদে চলেছে সে। ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে, শিশুদের মত। সত্যিকারের পুরুষ মানুষরা কাঁদতে শেখেনি, চায়ের দোকানে বসে হাজারবার শোনা বেঁটে মাস্টারের অমোঘ বাণীটাও আজ তার কান্না রুখতে পারেনি।
বেঁটে মাস্টারকে এখন হাতের কাছে পেলে, চাবকে নির্ঘাত তার পিঠের ছাল- চামড়া তুলে নিত মানিক। তাতে যদি লোকটার নাম বেঁটে মাস্টার থেকে ছালছাড়া মাস্টারও হয়ে যেত, তাতেও কোন পরোয়া করত না সে।
সত্যিকারের পুরুষ মানুষেরা তাদের স্ত্রীকে ভালবাসে। আর সেই ভালবাসার মানুষের মৃত্যুতে গলা ফাটিয়ে কাঁদতেও পারে তারা!
মরিয়ম, মানিকের বউ, মাটির উপর বসবাস করা তার সর্বশেষ আপনজন, তিনদিনের জ্বরে ভুগে আজ দুপুরবেলা মারা গেছে। আজকাল জ্বরজারিতে কেউ মরে? সদরে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর সুযোগটাও স্বামীকে দেয়নি সে। চার বছর আগে অগ্রহায়ণের এক বিকেলে, জনা পঞ্চাশেক লোককে সাক্ষী রেখে মরিয়মকে ঘরে তুলেছিল মানিক। লাল শাড়ি ছিল তার পরনে, গলায় ইমিটেশনের ভারী গয়না। পুরোদস্তুর নববধূর সাজে কী সুন্দরই না লাগছিল তাকে সেদিন।
আর আজ কি না গুটিকয়েক লোক মিলে তাকে পুঁতে দিয়ে এল কবরস্থানে! পরনে সাদা কাফন, শুধুই আবরণ, আভরণের বালাই নেই। মরিয়মের এহেন রূপ, কেমন করে সহ্য করবে মানিক? কেমন করে ঠেকাবে দু’চোখের বাঁধভাঙা বানের জল?
তাই তো সমবেদনা জানাতে আসা শেষ মানুষটিও যখন বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে দূরে চলে গেল, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাল মানিক। মরিয়মের শূন্য বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল সে।
ঘড়িতে ঘণ্টা কয়েক পেরিয়ে যাবার পর দেহের শক্তিতে ভাটা পড়ল সত্যি, তবে দুঃখের ভাণ্ডার তখনও কানায় কানায় ঠিকই পূর্ণ। তাই গর্জন কমে এলেও বর্ষণ কমল না এতটুকুও। ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁই-ছুঁই, তখনই কেবল সে রাতে প্রথমবারের মত মাথা তুলল মানিক।
বাইরে তখন ঝিঁঝি পোকারা ডেকে চলেছে অনর্গল। অন্যান্য দিন যে শব্দটায় সে ভীষণরকম বিরক্ত হত, আজ সেই একই শব্দ তার কানে মধু বর্ষণ করল। কারণ ঝিঁঝি পোকার এই ডাকটা খুব পছন্দ করত মরিয়ম।
কতদিন যে ঘরে ফিরে মরিয়মকে জানালার পাশে চুপটি করে বসে থাকতে দেখেছে মানিক, তার কোন ইয়ত্তা নেই। পরে জেনেছে, ঝিঁঝি পোকাদের এই সম্মিলিত নিনাদ মরিয়মকে নেশাতুর করে তুলত। অনেকটা নিশিতে পাওয়া মানুষদের মত। কাজকর্ম সব শিকেয় তুলে রেখে নিজের অজান্তেই নাকি জানালার পাশে বসে পড়ত সে! কতটা সময় কেটে যাচ্ছে, সেটা নাকি টেরও পেত না।
আর নেশা ছাড়াতে চুলের মুঠি খামচে ধরার চেয়ে ভাল কোন পদ্ধতি জানা ছিল না মানিকের! কারণে-অকারণে মরিয়মকে পেটাত সে। সপ্তাহে অন্তত দু’বার। এক সাধুর আখড়ায় শুনেছিল, নিয়মিত না পেটালে স্ত্রীরা কখনও স্বামীর বশে থাকে না। কথাটা মানিকের অবচেতন মনে বেশ ভালভাবেই গেঁথে গিয়েছিল।
ঘরে ফিরে মরিয়মের সঙ্গে নরম করে দুটো ভালবাসার কথা বলেছে মানিক, এমনটা কেউ কখনও দেখেনি। ঠোঁট ফাঁক করে মরিয়মের উদ্দেশে একটা জিনিসই কেবল ওগরাত সে-খিস্তি! অশ্রাব্য সব খিস্তি করতে গোটা তল্লাটে তার জুড়ি মেলা ভার।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার চিরন্তন দৈহিক ব্যাপারটাও অবধারিতভাবে নির্ভর করত মানিকের মর্জির উপর। মরিয়মের ইচ্ছা-অনিচ্ছার থোড়াই কেয়ার করত সে।
সেই মরিয়ম কী কৌশলে, কেমন করে মানিকের পাষাণ হৃদয় দখল করে নিয়েছিল, সেটা মানিকের নিজেরও জানা নেই। আজ বুকের মধ্যখানে আচমকা তৈরি হওয়া শূন্যতাটুকু রীতিমত অসহ্য ঠেকছে তার কাছে।
সহসাই আবিষ্কার করেছে মানিক, স্ত্রীকে যারপরনাই ভালবাসত সে! যদিও আচার-আচরণে এর উল্টোটাই সে প্রকাশ করেছে সবসময়, তবুও ওটা ভালবাসাই। অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা, অনেকখানি অন্যরকম, তবে পুরোপুরি নিখাদ।
রোজ সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় হাত দুটো কখনও খালি থাকত না তার। আলতা, চুড়ি, নাকফুল কিংবা বিলেতি সাবান, কিছু না কিছু সে নিয়ে আসতই মরিয়মের জন্য। যদিও কখনও নিজহাতে ওগুলো বউকে দেয়নি সে! চৌকাঠ পেরিয়েই সজোরে খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলত সে হাতের সদাই। তারপর লাল গামছাটা কাঁধে ফেলে বেরিয়ে যেত পুকুর ঘাটের উদ্দেশে। এটাই ছিল তার রোজকার রুটিন।
