তবে অচিরেই ক্ষুৎপিপাসার নিগড় থেকে মুক্তি পেতে চলেছে বিড়ালটা! হয়তো একারণেই ওটাকে আজ এখানে টেনে এনেছে নিয়তি!
বাঘের মত হুঙ্কার দিয়ে আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন আফতাব সাহেব, ঝড়ের বেগে বন্ধ করে দিলেন দরজাটা।
সিনেমায় দেখা সামুরাইদের ভঙ্গিমায় হাতের লাঠিটা অনবরত ঘোরাচ্ছেন; চোখজোড়া রীতিমত জ্বল-জ্বল করছে তাঁর।
কয়েক মুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়ল বিড়ালটা, অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আফতাব সাহেবের দিকে। যুগপৎ আতঙ্ক আর বিস্ময় খেলা করছে চোখের তারায়, কী করবে ঠিক ঠাহর করতে পারছে না।
তবে সাময়িক ঘোরটা ভাঙতেই প্রাণভয়ে ভিতর বাড়ির দিকে ছুট লাগাল ওটা; পালাতে চাইছে। রণ নিনাদ ছেড়ে ওটার পিছন-পিছন তেড়ে গেলেন আফতাব সাহেব। আজ তাঁর হাত থেকে কে বাঁচাবে বিড়ালটাকে?
প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলল এই বিড়ালে-মানুষে হুটোপুটি। ইতোমধ্যে আক্ষরিক অর্থেই গোটা বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করে ফেললেন আফতাব সাহেব।
এহেন আকস্মিক ছোটাছুটি করতে গিয়ে নিজেও বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ঘন-ঘন শ্বাস নিতে লাগলেন, গোটা দেহ ঘেমে-নেয়ে একাকার।
তবুও হাল না ছেড়ে ছায়ার মতন ওটার পিছনে সেঁটে রইলেন তিনি। একটা ব্যাপার কিছুতেই তাঁর মাথায় আসছে না, এতগুলো মারাত্মক আঘাত সহ্য করেও এখনও বহাল তবিয়তে ছুটছে কী করে ওটা? প্রথম কয়েকটা ঘা খাওয়ার পরপরই তো অক্কা পাওয়ার কথা!
তাঁকে পুরোপুরি হতবাক করে দিয়ে আচমকা বাথরুমের ভেন্টিলেটর গলে পালিয়ে গেল বিড়ালটা! নিজের ছানাবড়া চোখজোড়াকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। অতটুকু একটা ফুটো দিয়ে কেমন করে গোটা একটা বিড়াল সেঁধিয়ে গেল?!
হতাশায় রীতিমত ভেঙে পড়লেন আফতাব সাহেব; শরীরটা এলিয়ে দিলেন বিছানায়। মাথার ওপর ফুলস্পিডে ফ্যান ঘুরছে, তবুও ভীষণ হাঁসফাঁস লাগছে তাঁর।
আদতেই কি বিড়ালদের নয়টা জীবন? ওদেরকে পিটিয়ে মারা সত্যিই কি অসম্ভব?
মারাত্মক জখম হওয়া মুমূর্ষু বিড়ালটা পরে ঠিকই মারা গিয়েছিল। একটা এঁদো ডোবার ধারে মানকচুর ঝোপের আড়ালে পড়ে ছিল ওটার মৃতদেহ। তবে সেটা আর কোনদিনও জানা হয়নি তাঁর।
.
সাধারণত একটু বেলা করেই বিছানা ছাড়েন আফতাব সাহেব। নিজের ঠিকাদারি ব্যবসা আছে, তাই সকাল-সকাল অফিস ধরার তাড়া নেই তাঁর.১ক
নাস্তা বানানো শেষে স্ত্রী রোকেয়া বেগম ডেকে তোলার আগ পর্যন্ত চোখ মুদেই থাকেন তিনি, ভোরের ঘুমটা বেশ উপভোগ করেন।
এক সকালে অন্যান্যদিনের তুলনায় খানিকটা আগেভাগেই ঘুমটা ভেঙে গেল তাঁর। চোখ খোলা মাত্রই খানিকটা ভড়কে গেলেন তিনি! ঘরটা এমন বড়-বড় লাগছে কেন?
ঘরের সিলিঙটা মনে হচ্ছে যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে, আসবাবগুলোকে তো রীতিমত দানবীয় লাগছে! খাটটাও যেন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেড়ে গেছে অনেকখানি!
প্রথমটায় ভাবলেন, হয়তো স্বপ্ন দেখেছেন। তাই রেশটা কাটাতে বার কয়েক চোখ কচলালেন আফতাব সাহেব; এখনই নিশ্চয়ই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁকে তাজ্জব করে দিয়ে অবিকল একই রইল দৃশ্যপট!
খাটের পাশেই কাঠের একখানা বনেদী ড্রেসিং টেবিল শোভা পাচ্ছে। আয়নাটা বিশাল, ‘ফ্রেমে পিতলের কারুকাজ করা। উত্তরাধিকার সূত্রে ‘ওটার মালিক হয়েছেন আফতাব সাহেব। বিছানায় পাশ ফিরতেই আয়নাটার ওপর চোখ পড়ল তাঁর। পরক্ষণেই পুরোপুরি হকচকিয়ে গেলেন তিনি!
আয়নাটায় দেখা যাচ্ছে, একটা সাদা রঙের বিড়াল শুয়ে আছে বিছানায়! নিষ্পলক তাঁর দিকেই এখন তাকিয়ে আছে ওটা!
লাফিয়ে উঠে বসলেন আফতাব সাহেব, ইতিউতি তাকিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন বিড়ালটাকে। কিন্তু কীসের কী! কোন বিড়াল নেই ঘরে।
কিন্তু আয়নায় তাকাতেই ফের ওটাকে দেখতে পেলেন আফতাব সাহেব! শুয়ে নেই আর ওটা এখন, উঠে বসেছে বিছানায়! নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাঁরই চোখের দিকে! নির্মম সত্যটা উপলব্ধি করতে মিনিট খানেক সময় লাগল তাঁর। পুরোটা সময় পাথরের মূর্তি হয়ে আয়নাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি।
প্রতিবিম্বটা আর কারও নয়, তাঁর নিজের! তিনি নিজেই পরিণত হয়েছেন একটা রোমশ বিড়ালে! তীব্র আতঙ্কে সজোরে চেঁচিয়ে উঠলেন আফতাব সাহের। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। চিৎকারটা তাঁর গলা চিরে বেরোল ঠিকই, কিন্তু সেটা শোনাল হুবহু বিড়ালের আর্তনাদের মত, মানুষের সাথে যার কোন মিলই নেই!
আরও ঘাবড়ে গেলেন আফতাব সাহেব। তাঁর দু’চোখ বেয়ে জল গড়াতে শুরু করল। রান্নাঘর থেকে তড়িঘড়ি ছুটে এলেন রোকেয়া বেগম, বিড়ালের ডাকটা ঠিকই শুনতে পেয়েছেন তিনি। হতচ্ছাড়াটা কোত্থেকে এসে জুটেছে, কে জানে! ওটাকে দেখতে পেলে নির্ঘাত এখন চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে তাঁর স্বামী, তুলকালাম কাণ্ড বাধাতে সময় লাগবে না। যত জলদি সম্ভব আপদটাকে দূর করতে হবে।
ঘরে ঢুকে বেশ অবাক হলেন রোকেয়া বেগম। বিছানা খালি; আফতাব সাহেবকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা মোটাসোটা সাদা বিড়াল।
সাত-সকালে কোথায় গেল লোকটা?
মর্নিং ওয়াকে? কখন গেল?
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললেন রোকেয়া বেগম। আফতাব সাহেব বাড়িতে না থাকায় বিরাট একটা হাঙ্গামার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।
