পরক্ষণেই সবাইকে চমকে দিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন আফতাব সাহেব! হাতে ধরা পাতিলটা সজোরে ছুঁড়ে মারলেন বিড়ালটার উদ্দেশে।
উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ ভীষণ কাঁপছিল তাঁর, তাছাড়া ছুঁড়ে মারার জন্যে দইয়ের হাঁড়ি জিনিসটাও খুব একটা সুবিধের নয়। ফলে যা হওয়ার, তা-ই হলো।
চোখের পলকে উধাও হয়ে যাওয়া বিড়ালটার বদলে পাতিলটা গিয়ে পড়ল বরের বাবার মাথার ওপর!
মুরগির রান চিবুনো শেষ করে সবেমাত্র খাসীর কালিয়ার বাটিটার দিকে হাত বাড়াচ্ছিলেন ভদ্রলোক, ঠিক তখনই তাঁর ওপর গজবটা নাযিল হলো।
খুলির হাড়ের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে সশব্দে ভেঙে গেল মাটির পাতিলটা; মিষ্টি দইয়ে ঢেকে গেল বেচারার গোটা অবয়ব!
উপস্থিত দর্শকদের কাছে মনে হলো, কয়েক মুহূর্তের জন্য বুঝি থমকে গেছে পৃথিবী! যে যার জায়গায় ঠায় বসে রইল সবাই, কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না কেউই।
তবে আকস্মিক চমকের রেশটা কাটতেই সংবিৎ ফিরে পেল সবাই, একযোগে হল্লা করে উঠল। আফতাব সাহেব সহ বেশ কয়েকজন মানুষ দ্রুত ছুটে গেলেন ভিক্টিমের দিকে।
ভদ্রলোক ততক্ষণে আহারে ইস্তফা দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন; রাগে গর্জাতে- গর্জাতে হাঁটা শুরু করেছেন বেসিনের উদ্দেশে। আপাদমস্তক লেপ্টে থাকা দইয়ের প্রলেপ থেকে যতটা সম্ভব মুক্তি পেতে চান।
ঘটনাটা নিয়ে প্রচুর জল ঘোলা হলো। কীভাবে-কীভাবে যেন রটে গেল, দোষ আছে আফতাব সাহেবের মাথায়; তিনি মৌসুমি পাগল!
বেঁকে বসলেন ছেলের বাবা, একটা উন্মাদের পরিবারের সাথে কিছুতেই তিনি আত্মীয়তা করতে রাজি নন! পাগলামো বংশগতও হয়; কনের মধ্যেও যে এর ছিটেফোঁটা রেশ নেই, এর কী নিশ্চয়তা আছে?
বিস্তর বচসার পর শেষতক এলাকার মুরুব্বীদের হস্তক্ষেপে বরপক্ষকে শান্ত করা গেল। সন্ধ্যার ঠিক আগে-আগে বিয়ে হয়ে গেল মিলির। মেয়েটা ভীষণ কেঁদেছিল সেদিন, বাবার মত চাচার অপমান কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না তার।
বরযাত্রী বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত নিজেকে ঘরেই বন্দি করে রেখেছিলেন আফতাব সাহেব। সবার সামনে মুখ দেখানোর আর জো ছিল না তাঁর।
বিড়াল নিয়ে তাঁর বাতিকটার কথা যে ক’জন মানুষের জানার বাকি ছিল, সেদিনের হাঙ্গামায় তাদেরও জানা হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটার আদ্যোপান্ত।
তাঁকে দেখলে অনেকেই এখন উপহাস করে, মুখ টিপে হাসে। দুষ্টু ছেলের দল আড়াল থেকে ‘ম্যাও, ম্যাও’ বলে চিৎকার করে।
এসব কিছু দেখেও না দেখার ভান করেন আফতাব সাহেব, নীরবে সহ্য করেন। এছাড়া আর কী-ই বা করার আছে তাঁর?
এই ঘটনার পর থেকে বিড়ালদের প্রতি রাগটা আরও অনেকখানি বেড়ে গেল তাঁর। রীতিমত নৃশংস আচরণ করতে শুরু করলেন তিনি। একবার কোত্থেকে যেন শুনলেন, বিড়ালদের নাকি পিটিয়ে মারা যায় না; যেভাবেই হোক পালিয়ে যায় ওরা! সাধে তো আর বলে না, একটা বিড়ালের নয়টা জীবন!
রোখ চেপে গেল আফতাব সাহেবের, যে কোন মূল্যে একটা বিড়ালকে পিটিয়ে মারবেন! নইলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবেন তিনি। বাসর রাতে বিড়াল মারার ব্যর্থতার কারণে আজও খেসারত দিতে হয় তাঁকে; একই ভুল দ্বিতীয়বার করতে চান না!
তবে সহসাই কাজটা করার সুযোগ মিলল না তাঁর, বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হলো। কোন এক অগ্রহায়ণে দূরসম্পর্কের এক শালীর বিয়ে উপলক্ষে ঘরসুদ্ধ লোক গ্রামের বাড়িতে চলে গেল। অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও কিছুতেই পরিবারের সঙ্গী হতে রাজি হলেন না তিনি। ব্যবসার কাজের চাপের দোহাই দিয়ে শহরেই রয়ে গেলেন। বিড়াল নিধনের এহেন সুবর্ণ সুযোগটা হেলায় হারানোর কোন মানে হয়?
বাড়ি খালি হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই কাজে নেমে পড়লেন তিনি। গোটা কয়েক বাটিতে বেশ যত্ন করেই খাবার সাজালেন। মাছ, মাংস, দুধ…মোদ্দাকথা বিড়ালরা পছন্দ করে এমন কোনকিছুরই কমতি ছিল না তাঁর আয়োজনে।
বাড়ির সবক’টা দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলেন আফতাব সাহেব, খোলা রইল কেবল সদর দরজাটা।
দরজার পাশেই বিশাল একখানা কাঠের বাক্স রাখা। পুরনো, বেশ পোক্ত। শীতের পোশাক-আশাক আর কাঁথা-কম্বলে বোঝাই থাকে ওটা। দেয়াল থেকে খানিকটা সরানো বলে মাঝখানে একটা ফোকরমতন তৈরি হয়েছে।
জায়গাটা অন্ধকার; ভাল করে না তাকালে কিংবা আগে থেকে জানা না থাকলে চট করে কারও চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ওখানটাতেই আত্মগোপন করলেন আফতাব সাহেব। শুরু হলো তাঁর প্রতীক্ষার পালা। ঘড়ির কাঁটায় সেকেণ্ড পেরিয়ে মিনিট হলো, মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা; কিন্তু শিকারের টিকিটিরও দেখা মিলল না। যেন দৈববলে এলাকার সমস্ত বিড়াল বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে! অথচ আজ সকালেও বাজার থেকে ফেরার পথে অন্তত গোটা তিনেক বিড়ালের দেখা পেয়েছেন আফতাব সাহেব।
অপেক্ষার প্রহর বরাবরই দীর্ঘ হয়, তাঁর কাছে সেটা রীতিমত অসহ্য ঠেকতে লাগল। উত্তেজনা থিতিয়ে এল, ধীরে-ধীরে অধৈর্য হয়ে উঠলেন তিনি।
ইতোমধ্যেই ঝিঁঝি ধরে গেছে পায়ে, কায়দামত পেয়ে মশারাও সমানে কামড়ে চলেছে। শেষমেশ তিতিবিরক্ত হয়ে যেই না তিনি উঠে পড়তে যাবেন, ঠিক তখনই অভাগা বিড়ালটা চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকল।
গায়ের রঙ বাদামি, এখানে-ওখানে রোম উঠে গেছে; ভীষণ নোংরা।
হাড়জিরজিরে বেহাল দশা দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, পেটে নিয়মিত দানা- পানি পড়ে না ওটার। কোনমতে ধুঁকে-ধুঁকে বেঁচে আছে।
