গাড়িতে বসেই কথার ছলে জেনে নিয়েছে জেফ, মিরাণ্ডা আর লারাও আজকের ব্যাপারটাকে নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে, আর কাউকে জানায়নি।
একজন মেল এসকর্টের সঙ্গে রাত কাটাতে যাচ্ছে, এটা কি আর জনে-জনে বলে বেড়ানোর বিষয়?
লম্বা দম নিল জেফ। অনুভব করছে, দেহের প্রতিটি কোষ থেকে দানবীয় শক্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পরিবর্তনের জন্য সম্পূর্ণ তৈরি সে!
আঁধারের দেবতাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলল না জেফ। বহুদিন বাদে তার ভাগ্যে জোড়া শিকার মিলেছে।
বিবস্ত্র মিরাণ্ডার চর্বিসর্বস্ব শরীরের দিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল তার। থলথলে মাংসপিণ্ডগুলো তার অনেকদিনের খিদে মেটানোর জন্য যথেষ্ট!
লারার ফর্সা ত্বকের নীচে বয়ে চলা উষ্ণ রক্তের শিরাগুলোও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে এখন। আর তাতেই তার পিপাসা বেড়ে গেল বহুগুণে! তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আর সময় নষ্ট করতে ইচ্ছুক নয় জেফ। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সে পুরোদস্তুর নগ্ন মেয়ে দুটোর দিকে।
একধরনের ঘোরের মধ্যে থাকায়, জেফের দানবে রূপান্তরিত হওয়াটা দু’জনের কেউই লক্ষ করেনি। যতক্ষণে ওদের টনক নড়ল, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
পরদিন নর্থ হাইওয়েতে পাওয়া লাশের তালিকায় যুক্ত হলো আরও দুটো নতুন নাম।
মার্জার সমাচার
আফতাব সাহেব বিড়াল পছন্দ করেন না। একদমই না। দানবীয় ট্রাকগুলোর পেছনে যেমন গাঢ় কালিতে লেখা থাকে, ‘একশো হাত দূরে থাকুন’, পৃথিবীর তাবৎ বিড়ালের শরীরেও অনেকটা ওরকম অদৃশ্য একটা লেখা দেখতে পান তিনি।
শৈশবে, কোন এক ঘুঘু ডাকা দুপুরে, খেপাটে একটা মা বিড়াল তাঁর ডান হাতের কড়ে আঙুলে একখানা রাম কামড় বসিয়ে দিয়েছিল। বেচারা বুঝতেও পারেননি, বেখেয়ালে কখন তিনি একটা সদ্য জন্মানো বিড়াল ছানার আঁতুড় ঘরের হাতছোঁয়া দূরত্বে পৌঁছে গিয়েছিলেন! আর ঠিক সেকারণেই, অতর্কিতে সন্তানের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি হয়ে ওঠা মানুষটাকে প্রাপ্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে কোনরকম কসুর করেনি বিড়াল-মাতা।
হাতের ব্যথাটা অবশ্য সেরে যেতে খুব একটা সময় লাগেনি, তবে বিড়ালের প্রতি বিদ্বেষটা চিরকালের জন্য গেঁথে গিয়েছিল আফতাব সাহেবের হৃদয়ে। কালে- কালে সেটা বেড়েছে বৈ কমেনি।
বিড়াল দেখলে মাথায় রক্ত চড়ে যায় তাঁর। ওটাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করার আগ পর্যন্ত শান্তি পান না কিছুতেই।
কারও বাসায় পোষা বিড়াল থাকলে, ওই বাড়ির চৌহদ্দিতে আর ঘেঁষেন না তিনি, দূরে-দূরে থাকেন।
বিড়ালওয়ালা বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকেও দূরত্ব বজায় রাখেন, উৎসব- পার্বণে এড়িয়ে চলেন। ওদের শরীর থেকেও কেমন একটা বিড়াল-বিড়াল গন্ধ পান তিনি! সারাক্ষণ বিড়ালদের আশপাশে ঘুর-ঘুর করলে এমনই তো হওয়ার কথা, তাই না?
তাঁর এই অদ্ভুতুড়ে বাতিকটার ব্যাপারে সব আত্মীয়-স্বজনই ওয়াকিবহাল। বলা বাহুল্য, এটা নিয়ে খুশি নয় কেউই, ভীষণ বিরক্ত।
বাড়াবাড়িরও তো একটা সীমা আছে, নাকি? সামান্য বিড়াল নিয়ে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ মানুষ এহেন হাঙ্গামা করলে, কাঁহাতক সেটা সহ্য করা যায়? এ নিয়ে এযাবৎকালে কেলেঙ্কারিও তো কম হয়নি!
কথাটা অক্ষরে-অক্ষরে সত্যি। বিড়াল নিয়ে বেশ কয়েকবারই বড়সড় ঝামেলা বাধিয়েছেন আফতাব সাহেব। তাঁর ভাতিজী মিলির বিয়েতে কী কাণ্ডটাই না হলো!
মিলির বাবা নেই, বহুকাল আগেই মারা গেছেন। তারপর থেকে অভিভাবকত্বের গুরু দায়িত্বটা একমাত্র চাচা হিসেবে আফতাব সাহেবের কাঁধেই বর্তেছিল 1
বুকে হাত রেখে বলা যায়, দায়িত্বটায় কোনরকম গাফিলতি করেননি তিনি নিজের ছেলেমেয়েদের মতই কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন মিলিকে। পোশাক- আশাক থেকে শুরু করে খাবার-দাবার, কোনকিছুতেই বিন্দুমাত্র বৈষম্য করেননি কখনও।
সেদিনের সেই ছোট্ট মিলি বলতে গেলে একরকম তাঁর চোখের সামনেই ধীরে-ধীরে যুবতী হয়েছে। আফতাব সাহেবের কাছে মনে হয়, এই তো সেদিনও মেয়েটা হাফপ্যান্ট আর ফ্রক পরে আঙিনায় ছোটাছুটি করত। কেমন করে এত বড় হয়ে গেল মেয়েটা?
মিলির বিয়ের আয়োজনটা গোটা তল্লাটে রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছিল। সে এক এলাহি কারবার, রাজকীয় ব্যাপার-স্যাপার। এলাকার একটা পরিবারও বাদ যায়নি দাওয়াতের লিস্ট থেকে।
দু’হাতে পয়সা খরচ করেছিলেন আফতাব সাহেব, কোনরকম খামতি রাখেননি। আপ্যায়নের চোটে বরযাত্রীর দল রীতিমত হাঁপিয়ে উঠেছিল। গর্বে আধ-হাত ফুলে উঠেছিল ঘটক তমিজুদ্দিনের বুক, সারাক্ষণ মুখে লেগে ছিল দাঁত কেলানো হাসি।
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, তবে আচমকা গজব হিসেবে আবির্ভূত হলো একটা হোঁৎকা মোটা হুলো বিড়াল!
বাড়ির পিছনের খড়ের গাদার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ওটা, পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল খাবারের প্যাণ্ডেলের দিকে।
শামিয়ানার খোলা মুখটার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল বিড়ালটা। খাবারের সন্ধানে ইতিউতি তাকাল, বারকয়েক নাক কুঁচকে গন্ধ শুঁকল বাতাসের।
কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে ছিলেন আফতাব সাহেব, অতিথিদের খাওয়া-দাওয়ার তদারক করছিলেন। হাতে বিশাল একখানা দইয়ের হাঁড়ি; মুরুব্বী গোছের মেহমানদের পাতে নিজ হাতে দই তুলে দেবেন, এমনটাই ইচ্ছে ছিল তাঁর।
বিড়ালটার ওপর চোখ পড়তেই জায়গায় জমে বরফ হয়ে গেলেন তিনি। এক লহমায় দাঁড়িয়ে গেল শরীরের সবক’টা লোম।
