অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলা কথাগুলো হয় নির্জলা মিথ্যা! যার জ্বলন্ত উদাহরণ, কিছুক্ষণ আগে মিরাণ্ডাকে বলা তার স্তুতিবাক্যটা। শতভাগ মিথ্যা, সত্যের লেশমাত্রও নেই ওতে।
মেয়েটা দেখতে বিশ্রী। মুখের গড়ন দেখলে মনে হয়, কেউ রাগের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আচ্ছামত পিটিয়েছে তাকে! তাতেই ওটা অমন এবড়ো-খেবড়ো হয়ে গেছে!
গায়ের রঙ ফ্যাকাসে। যেন বহুদিন একনাগাড়ে কয়লা খনিতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে সে, সূর্যের দেখা পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি!
শরীরটা স্থূলকায়। দূর থেকে দেখলে হাতির বাচ্চা বলে ভুল করবে যে কেউ। শরীরের মতই ইয়া মোটা একজোড়া ঠোঁট, মুখের অনেকটা জায়গা দখল করে রেখেছে। আর তাতে মাখানো টুকটুকে লাল রঙের লিপস্টিক আরও বেশি করে চোখে লাগছে। হাতের লম্বা নখেও একই রঙের নেলপলিশের প্রলেপ। কোন সন্দেহ নেই, এটা মিরাণ্ডার পছন্দের রঙ।
দুই কানে আরব্য রজনীর দানবদের পরার উপযোগী একজোড়া রিং ঝুলিয়েছে সে। ওগুলোর ভারে কখন যে কানদুটো ছিঁড়ে পড়বে, কে জানে!
অত্যন্ত নিম্নমানের রুচি মেয়েটার। তবুও আজ রাতটা এর সঙ্গেই কাটাতে হবে জেফকে।
মিরাণ্ডাকে মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিল সে। ‘বলুন, কোথায় যাব এখন? কোন হোটেলে যেতে চান? আপনি চাইলে ডিসকাউন্টের ব্যাপারে আমি সাহায্য করতে পারি।’
রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল মিরাণ্ডা। ‘ক’দিন পরেই আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে। এই অবস্থায় হোটেলে রাত কাটানো কি ঠিক হবে? যদি কারও চোখে পড়ে যাই! কোন বিশ্বস্ত বন্ধুর বাসায় গেলে কেমন হয়?’
‘আপনার যেমন ইচ্ছে, মিস।’
‘ঠিক আছে। তাহলে প্রথমে নর্থ হাইওয়েতে চলুন। ওখান থেকেই আমার বান্ধবীকে তুলে নেব।’
নর্থ হাইওয়ে! চমকে উঠল জেফ। ওখানে কেন?
গত কয়েকমাসে ওই রাস্তায় বেশ কিছু রহস্যময় খুনের ঘটনা ঘটেছে ভিকটিমদের লাশগুলো কেবল পাওয়া গেছে, খুনি এখনও ধরা পড়েনি। লাশ বলতে অবশ্য শুধুই কঙ্কাল, গায়ে একরত্তি মাংসও ছিল না কারও! তাই চেনার জো নেই, কাদের লাশ ওগুলো। তবে শেষ অবধি ডিএনএ টেস্ট করে বেশ কিছু ভিকটিমের পরিচয় বের করতে পেরেছে পুলিশ।
সব ক’জনই সাধারণ মানুষ, কারোরই অতীতে কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। প্রাণে মেরে ফেলতে পারে, এমন বড় কোন শত্রুও খুঁজে পাওয়া যায়নি কারও।
তাই পুলিশের ধারণা, বিকৃত মস্তিষ্কের কোন সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাব ঘটেছে ওই এলাকায়। তবে গোয়েন্দা বিভাগের মতে, খুনি একজন নয়, একাধিক। তাই ওই এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে জনসাধারণকে। বাড়ানো হয়েছে পুলিশি নজরদারি।
কোন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি, তবুও সন্ধ্যার পর পারতপক্ষে ওই রাস্তাটা এড়িয়ে চলে এখন লোকজন। আর রাত দশটার পর তো রীতিমত খাঁ-খাঁ করে পুরো তল্লাট।
এই রাতদুপুরে অপরিচিত দুটো মেয়েসহ যদি পুলিশের কোন টহল দলের সামনে পড়তে হয়, কী জবাব দেবে জেফ?
ওদেরকে আলাদা করে মাত্র মিনিট দুই জেরা করলেই প্রকৃত সত্যটা বের করে ফেলতে পারবে পুলিশ। আর তাতে করে এজেন্সির অস্তিত্ব ফাঁস হয়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা তৈরি হবে।
‘অন্য কোথাও থেকে আপনার বান্ধবীকে পিক করা যায় না? জানেনই তো, আজকাল নর্থ হাইওয়েতে পুলিশের বড্ড কড়াকড়ি চলছে।’
‘লারা ওখানেই একটা বারে কাজ করে। রাত বারোটায় তার শিফট শেষ হয়। আমি ওকে কথা দিয়েছি, যাবার সময় তুলে নেব। অপেক্ষায় থাকবে ও। তাছাড়া ওর বাসাতেই যাচ্ছি আমরা, জায়গাটা নর্থ হাইওয়ের একেবারে শেষ মাথায়।’
জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল জেফ। সে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে, এটা ক্লায়েন্টকে বুঝতে দিতে চায় না। ‘চলুন তাহলে। কী আর করা। প্রার্থনা করুন, কোন পেট্রোল কারের সামনে যেন পড়তে না হয়।’
‘কিংবা সেই সাইকো খুনিটার সামনে,’ যোগ করল মিরাণ্ডা।
হাসল জেফ। সাইকোকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না সে, তার যত ভয় পুলিশকেই। একবার হাতেনাতে ধরতে পারলে, ঠিকই কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের করে আনবে হতচ্ছাড়ার দল।
কিন্তু জেফের জানা নেই, টহল দেবার মত একজন পুলিশও আজ নেই নর্থ হাইওয়েতে! পুলিশ কমিশনারের ছেলের বিয়ে, ওখানেই ফুর্তি করছে বেশিরভাগ অফিসার। আর যাদেরকে দুঃখজনকভাবে আজকের এই বিশেষ রাতে বাধ্যতামূলক ডিউটি দেয়া হয়েছে, তারাও টহল চৌকিতে বসে তাস পেটাচ্ছে। অন্যরা মৌজ করবে, আর তারা বুঝি রাস্তায় ঘুরে মরবে? উঁহু, সেটি হচ্ছে না। কোথাও কিছু ঘটলে, দেখা যাবে ‘খন। অন্তত আজকের রাতে অহেতুক পণ্ডশ্রম করতে রাজি নয় কেউ।
তিন
লারা যেখানে কাজ করে, সে বারটাকে দেখে অবাক না হয়ে পারল না জেফ। গ্র্যাণ্ড স্ট্রীটের বারগুলোর সঙ্গে এটার আকাশ-পাতাল ফারাক। ওগুলোর ঝকমকে সাইনবোর্ডের বদলে এখানে ঝুলছে রঙজ্বলা একখানা নেমপ্লেট। আলোক স্বল্পতার কারণে সেটিও ভাল করে পড়ার উপায় নেই।
গ্র্যাণ্ড স্ট্রীটের বর্ণিল আলোর জৌলুশের বিপরীতে এখানে ঝুলছে কম পাওয়ারের একখানা হলদে বাতি। ভিতর থেকে ভেসে আসছে না কোন কোলাহল, বাজছে না কোন মিউজিক!
একজন খদ্দেরও বোধহয় নেই ভিতরে, কর্মচারীরাই হয়তো বসে মাছি মারছে। অথচ গ্র্যাণ্ড স্ট্রীটে রাত বারোটা মানে কেবলই সন্ধ্যারাত। প্রতিটা বারে লোকজন রীতিমত গিজগিজ করে।
