ঈশ্বরকে স্মরণ করে বহু কায়দা-কানুন করার পর ওটাকে জলে নামাতে পারলাম। রওয়ানা হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে দেখতে পেলাম ওটাকে!
কিম্ভূতকিমাকার একটা প্রাণী, গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে আমাকে!
আকারে খুবই ছোট ছিল ওটা; একটা কুকুর ছানার চেয়ে বড় হবে না কিছুতেই। তবে দেখতে অদ্ভুত ছিল, ভীষণ অদ্ভুত। না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না তুমি।
একটা গিরগিটির শরীরে যদি বাঘের মাথা বসিয়ে দেয়া হয়, সাথে জুড়ে দেয়া হয় হাতির কানের মত চ্যাপ্টা দুটো কান; দেখতে যেমন হবে, ওটা অনেকটা ওরকমই।
এহেন নমুনা চোখের সামনে পেয়েও ভাল করে না দেখে ফিরে আসতে মন সায় দিল না। নেমে পড়লাম ভেলা থেকে, ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম প্রাণীটার দিকে। ভয় পাচ্ছিলাম, কখন না আবার ছুটে পালিয়ে যায়!
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ওখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল জানোয়ারটা। চোখের তারায় ভয়ের বদলে ফুটে উঠেছে কৌতূহল!
হাঁটু গেড়ে বসলাম ওটার কাছে, বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে রইলাম অদ্ভুত দেহটার দিকে।
কী বুঝল ওটা কে জানে, কুঁই-কুঁই করতে-করতে এগিয়ে এসে আমার গায়ে মুখ ঘষতে শুরু করল! হাত বুলিয়ে খানিকটা আদর করতেই পুরোপুরি ন্যাওটা হয়ে গেল; যেন কতকাল ধরে চেনে আমাকে!
কী ওটা? কোন্ যুগের প্রাণী? তৃণভোজী না মাংসাশী?
অনেকগুলো প্রশ্ন ততক্ষণে কড়া নাড়তে শুরু করেছে মনের দরজায়, যার একটারও জবাব জানা নেই আমার।
জানার একটাই উপায়, প্রাণীটাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা। হয় আমাকে ওটার সাথে ওখানেই থেকে যেতে হবে, নয়তো ওটাকে নিয়ে আসতে হবে সঙ্গে করে। এ দুটো ছাড়া ভিন্ন কোন পথ খোলা ছিল না আমার জন্য।
ওই মুহূর্তে ওখানে থেকে যাওয়াটা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল, তাই দ্বিতীয় পথটা বেছে নিতে বাধ্য হলাম। ওটাকে নিয়েই রওয়ানা হলাম ফিরতি পথে।
প্রথমটায় খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেলার দুলুনির সাথে মানিয়ে নিল ওটা।
স্রষ্টার অপার রহমতে কোনরকম বিপত্তি ছাড়াই তীরে ফিরতে পারলাম। তবে প্রাণীটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে বাড়ি পর্যন্ত আনতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে। সাক্ষাতেই ওসব নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হবে। তবে এটুকু জানিয়ে রাখি, তোমার বন্ধুর উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ না করে পারবে না তুমি।
বাড়ি ফেরার পর প্রথম ক’দিন ভালই কাটল। একটা আদুরে বিড়ালছানার মতই সারাক্ষণ আমার সাথে সেঁটে রইল ওটা। ভীষণ লক্ষ্মী ছিল, কোনকিছু নষ্ট করত না।
আমার কথা বুঝতে পারত, চুপ করে বসে থাকতে বললে এক জায়গাতেই বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শুধু সময়মত খাবার পেলেই হলো, আর কোন ঝামেলা করত না।
ততদিনে বুঝে গিয়েছিলাম, মাংসাশী প্রাণী ওটা; মোষের মাংসের প্রতিই আগ্রহটা বেশি।
তবে গোটা ব্যাপারটা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠল। যখন থেকে ডাকাডাকি শুরু করল, ঝামেলার অন্ত রইল না আর। প্রতিবেশীরা নানারকম প্রশ্ন করতে লাগল। আমিও বাধ্য হলাম শহরের বাড়িটা ছেড়ে এই পারিবারিক বাড়িতে এসে বসবাস করতে।
নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, দ্বীপে যে অদ্ভুত চিৎকারটা আমি শুনতে পেতাম, ওটা এই প্রজাতির প্রাণীরাই করত। ওই দ্বীপে যে এই প্রজাতির অন্তত একজোড়া পূর্ণবয়স্ক প্রাণী রয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই আমার। হয়তো গোটা একটা পালই বসবাস করছে ওখানকার জঙ্গলে, কে জানে!
এই বাড়ির জংলা পরিবেশে এসে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বড় হতে শুরু করল ওটা। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড়সড় একটা বলদের আকৃতি পেয়ে গেল ওটার দেহ!
ভীষণ অবাধ্য হয়ে গেল। চাকরবাকর দূরে থাক, আমার কথাও আর শুনতে চাচ্ছিল না কিছুতেই! শেষে একরকম বাধ্য হয়েই ওটাকে নিয়ে সেলারে পুরলাম। ভাবলাম, জায়গাটা বিশাল, চরে বেড়াতে কোন অসুবিধে হবে না ওটার। পরিচারকদের উপর দায়িত্ব ছিল, সময়মত যেন ওটার খাবার পৌঁছে দেয়।
তবে অচিরেই আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল পরিস্থিতি। ভীষণ হিংস্র হয়ে গেল জানোয়ারটা। খাবার দিতে গিয়ে মারাত্মক আহত হলো এক পরিচারক, কামড়ে তার সারা শরীর রক্তাক্ত করে ফেলেছিল ওটা!
তারপর থেকে আর কখনও সেলারের দরজাটা খোলা হয় না। উপরের পকেট ডোর দিয়েই এখন খাবার দেয়া হয় ওটাকে।
মাঝেমধ্যে নীচ থেকে ভেসে আসা ওটার হিংস্র গর্জন শুনতে পাই। শব্দটা স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করে, অস্বস্তি লাগে। জানি, বেরিয়ে আসতে পারলে কী-কী করতে পারে ওটা। আকারে জলহস্তীকেও ছাড়িয়ে গেছে এখন ওটার দেহ। আরও বড় হবে ওটা। কতটা, কোনদিন কল্পনাও করতে পারবে না তুমি!
খাল কেটে মানুষ আনে কুমির, আমি এনেছি প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা রাক্ষস! কীভাবে এতকাল পরেও এই প্রজাতি পৃথিবীর বুকে টিকে রইল, ব্যাপারটা সত্যিই বিস্ময়কর।
ওরা ভয়ঙ্কর, ভীষণ ভয়ঙ্কর।
শরীরে মাংস আছে, এমন সবকিছুই আছে ওদের খাদ্য তালিকায়; এমনকী মানুষও!
এটাকে লোকালয়ে নিয়ে এসে মস্ত ভুল করেছি আমি, বন্ধু। কাজটা করা মোটেও উচিত হয়নি আমার। মায়া পড়ে গেছে ওটার ওপর, মারতেও মন সায় দিচ্ছে না এখন।
তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ফিরিয়ে নিয়ে যাব ওটাকে আরকেইনে; পৌঁছে দেব ডেথ লেকের সেই দ্বীপটায়।
এ ব্যাপারে তোমার সাহায্য আমার ভীষণ প্রয়োজন, বন্ধু। কীভাবে কী করব, কিছুই মাথায় আসছে না। বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেলে, এতবছর ধরে বিজ্ঞানী হিসেবে আমার যা-যা অর্জন, এক নিমিষে সবকিছু ধুলোয় মিশে যাবে। এত বড় ঝুঁকি নেয়ার জন্য বিজ্ঞানী মহল থেকে শুরু করে সরকার, কেউই আমাকে ক্ষমা করবে না। সভ্য মানুষদের চোখে রীতিমত ভিলেনে পরিণত হব আমি।
