ভোরে হালকা নাস্তা সেরেই কাজে নেমে পড়লাম। দ্বীপটার এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত চষে বেড়ালাম পরম ধৈর্যের সাথে। জঙ্গল, ঝোপঝাড়, খানা- খন্দ, কিছুই বাদ দিলাম না। কিন্তু শিকে ছিঁড়ল না ভাগ্যে, পেলাম না কিছুই।
দুপুরের পর সিদ্ধান্ত নিলাম পাশের দ্বীপটায় চলে যাব। দৃষ্টিসীমার মধ্যেই ওটা, মাঝখানের দূরত্বটা বেশ কম।
গোছগাছ করে দ্রুত রওয়ানা হয়ে গেলাম, বিকেলটাও কাজে লাগাতে চাই।
এতসব উত্তেজনায় প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম কোথায় আছি আমি আর কেনই বা জায়গাটাকে ডেথ লেক বলা হয়! যখন মনে পড়ল, সতর্ক হওয়ার কোন সুযোগই ছিল না আমার।
আচমকাই দেখতে পেলাম জলের ঘূর্ণিটাকে, একেবারে বোটের নাকের ডগায়! হলফ করে বলতে পারি কয়েক মুহূর্ত আগেও ওটা ছিল না ওখানটায়, চোখের পলকে উদয় হয়েছে মূর্তিমান রাহুর মত!
বোটটাকে সামলানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন ফল হলো না! তীব্র স্রোতের টানে ধীরে-ধীরে ওটা এগিয়ে যাচ্ছিল যমদূতের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে!
ওটাকে আর সামলানো যাবে না বুঝতে পেরে নিজেকে বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করলাম আমি। একছুটে চলে গেলাম বোটের পিছন দিকটায়, দ্রুত পরে নিলাম লাইফ জ্যাকেট। পরক্ষণেই ইষ্টনাম জপে ঝাঁপ দিলাম হ্রদের জলে। বোটসুদ্ধ মরণঘূর্ণিতে তলিয়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না আমার।
প্রাণপণে সাঁতরে সবেমাত্র কয়েক ফুট দূরে সরতে পেরেছি, ঠিক তখনই এক ঝটকায় পুরো বোটটা অদৃশ্য হয়ে গেল ঘূর্ণির ভিতরে। দমবন্ধ করে অপেক্ষায় রইলাম কয়েক মুহূর্ত, ওটাকে আবারও দেখতে পাবার আশায়। কিন্তু না, একটিবারের জন্যও আর ভেসে ওঠেনি ওটা!
ঝাঁপ দিতে আর কয়েক সেকেণ্ড দেরি করলে কী যে হাল হত আমার, ভাবতে গিয়ে অথৈ জলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকেও অন্তরাত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল আমার।
ঘূর্ণিটা থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে ধীরে-ধীরে সাঁতরাতে শুরু করলাম দ্বীপটার উদ্দেশে। দুটো দ্বীপের মাঝখানের যে দূরত্বটা এর আগে যৎসামান্য মনে হয়েছিল, সেটাই তখন আমার কাছে তেপান্তরের মাঠের শামিল!
এই বুড়ো শরীর নিয়ে অতখানি পথ সাঁতরাতে পারব কিনা, তা নিয়েই তখন সন্দিহান হয়ে পড়েছিলাম। তবে ঈশ্বর সহায় ছিলেন বলেই সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম আমি। সূর্য ডোবার ঠিক আগ মুহূর্তে গিয়ে পৌছলাম দ্বীপটায়।
আগেরগুলোর তুলনায় আকারে অনেক বড় ছিল ওটা। বনজঙ্গল, পাহাড়, গুহা, কোনকিছুরই অভাব ছিল না।
অন্ধকার নামার আগেই রাত কাটানোর জন্য একটা আশ্রয় খোঁজার প্রয়াস পেলাম। একেবারে খোলা আকাশের নীচে অরক্ষিত থাকাটা ঠিক হবে না।
খুব একটা খুঁজতে হলো না, জুতসই একটা গুহা পেয়ে গেলাম। আকারে মাঝারী, খটখটে শুকনো।
আশপাশ থেকে কিছু ঝরা পাতা খুঁজে এনে বিছানা পাতলাম। পরনের ভেজা কাপড়গুলো শুকানোর জন্য ছড়িয়ে দিয়ে পুরোপুরি দিগম্বর হয়ে নেতিয়ে পড়লাম। শরীরে তখন আর এক বিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না আমার।
কিছু খাবারের সন্ধান করা, নিদেনপক্ষে আগুন জ্বালার চেষ্টা করা উচিত ছিল বটে, কিন্তু জোর পাচ্ছিলাম না। বুড়ো হাড় আর কতই বা ধকল সইবে, তুমিই বলো!
শেষ কবে এতটা গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম, জানা নেই আমার। আবছাভাবে মনে পড়ে, মাঝরাতের দিকে ওই অদ্ভুত ডাকটা আবারও শুনতে পেয়েছিলাম আমি। অনেক বেশি স্পষ্ট, অনেক বেশি কাছে।
মনে হলো, এই দ্বীপেই আছে প্রাণীটা। হয়তো খানিকটা খুঁজলেই পাওয়া যাবে ওটাকে। শতভাগ ইচ্ছে থাকলেও, তখন কাজটা করার কোন উপায় ছিল না আমার। একে শরীরের বেহাল দশা, তার উপর একটা টর্চ পর্যন্ত ছিল না সাথে। খুঁজব কী করে?
তাই মটকা মেরে পড়ে রইলাম। সকাল হোক আগে, তারপর দেখা যাবে কী করা যায়।
ভোরের আলো ফোটার অনেক পরে সেদিন ঘুম ভাঙল আমার। বেঁচে থাকার সহজাত প্রবৃত্তি জানান দিল, খাবার চাইছে শরীর, খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে পেট।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা রুটিফল গাছ পেয়ে গেলাম। কোন একসময় ঝড়ের কবলে পড়েছিল গাছটা, কাণ্ডটা বেঁকে গিয়ে প্রায় মাটির কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে শিকড় উপড়ে যায়নি বলে বেঁচে আছে এখনও, ফলও ধরেছে।
পেটের আগুন নেভামাত্রই ভাবতে বসলাম, কীভাবে এখান থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। বাইরে থেকে কোন সাহায্য আসবে না, জানা ছিল আমার। যা করার নিজেকেই করতে হবে।
সারভাইভাল সম্পর্কিত বইগুলো চিরকাল আগ্রহ নিয়েই পড়তাম। কিন্তু কল্পনাও করিনি কখনও, আমাকেও একদিন এমন পরিস্থিতিতে ফেঁসে যেতে হবে!
বাঁশ দিয়ে ভেলা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এছাড়া আর কোন পথও নেই। দড়ি হিসেবে কাজ চালানোর মত শক্ত লতার অভাব ছিল না, আঠার জোগান দিল রুটিফল গাছের কাণ্ড।
যন্ত্রপাতি ছাড়া কাজ করাটা যে কতটা ঝক্কির, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম সেটা। কয়েক ঘণ্টার কাজ সারতে লেগে গেল কয়েক দিন!
প্রায় প্রতি রাতেই ওই অদ্ভুত ডাকটা শুনতে পেয়েছিলাম। তবে ওটাকে আর খুঁজতে যাওয়ার সাহস ছিল না আমার। ওই কয়দিনে মানসিক শক্তির প্রায় পুরোটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম বলা যায়।
আগে তো নিজে বাঁচি, তারপরই না গবেষণা! একবার বেঁচে ফিরতে পারলে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আবারও আসা যাবে, অসুবিধে নেই। তখন নাহয় খোঁজা যাবে ওটাকে। অবশেষে পাঁচদিনের মাথায় শেষ হলো ভেলা বানানোর কাজটা।
