ঠিক কী কারণে বিবর্তনের ধারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জায়গাটা হাজার বছর ধরে অবিকল একইরকম রয়ে গেছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ওসব অপ্রাসঙ্গিক সায়েন্টিফিক থিওরির কচকচানি তোমার অসহ্য লাগবে বলে সেদিকে আর গেলাম না এখন। তবে সাক্ষাতে তোমার সাথে এসব নিয়ে জম্পেশ আড্ডা দেয়ার খায়েশ আছে আমার। কিছু-কিছু ব্যাপারে তোমার মতামত জানতেও আগ্রহী আমি।
যা হোক, আরকেইনে ডেথ লেক নামে প্রকাণ্ড একখানা প্রাকৃতিক লেক আছে। ওটা এতটাই বিশাল যে, অনায়াসে ছোটখাট একটা উপসাগর বলে চালিয়ে দেয়া যাবে।
অসংখ্য ছোট-ছোট দ্বীপ আছে ওটায়, যার বেশিরভাগই এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। কারণ ডেথ লেক ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ, নামকরণটা অকারণে করা হয়নি। ক্ষণে-ক্ষণেই ওটার পানিতে প্রচণ্ড ঘূর্ণি তৈরি হয়, অনেকটা নদীর জোয়ার-ভাটার মত। তবে তফাৎ শুধু এটুকুই যে, জোয়ার-ভাটার মত নির্দিষ্ট কোন নিয়ম মানে না ঘূর্ণিটা। কখন এবং কোথায় যে আচমকা উদয় হবে ওটা, আগে থেকে বলার কোন উপায় নেই।
টানা তিরিশ দিন গবেষণা করেও নির্দিষ্ট কোন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি ওটার।
বেশ কয়েকবার ওটার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ। তাই আপাতত জলপথ এড়িয়ে চলছেন বিজ্ঞানীরা, আকাশপথে যেসব দ্বীপে যাওয়া সম্ভব কেবল সেগুলোতেই গবেষণা চালাচ্ছেন।
তবে আমাকে তো তুমি চেনই, ঘাড়ের রগ কতখানি বাঁকা সেটাও জান। সেই একগুঁয়েপনা থেকেই কিনা কে জানে, আমি ঠিক করলাম নৌপথেই দ্বীপগুলো চষে বেড়াব; উড়ুক্কু যান ব্যবহার করব না।
কোনরকম পিছুটান না থাকায় সিদ্ধান্তটা নেয়া আমার জন্য খুব একটা কঠিন ছিল না। তাছাড়া হাওয়াই যান ভীষণ ব্যয়বহুল, ল্যান্ডিং-এর সুবিধা না থাকলে সব জায়গায় যাওয়াও যাবে না ওগুলো দিয়ে। তাই অহেতুক ঝক্কি পোহানোর চেয়ে ঝুঁকি নেয়াটাই বরং সমীচীন মনে হলো আমার কাছে।
আমাকে অবশ্য একাই যেতে হলো, সফরসঙ্গী হিসেবে পেলাম না কাউকে। অনিশ্চিত যাত্রায় জান খোয়ানোর ঝুঁকি নিতে নারাজ সবাই।
প্রায় সবাই বিবাহিত, পরিবার-পরিজন রয়েছে, তাই আমিও কাউকে জোর করিনি। কী দরকার? একাকী মানুষ একসময় নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একারণেই সঙ্গী-সাথীর অভাব কখনও কোন কাজে পিছপা করতে পারেনি আমাকে।
কোনরকম বিপত্তি ছাড়াই কাঙ্ক্ষিত প্রথম দ্বীপটায় পৌছলাম। আকারে ছোট, প্রায় ন্যাড়া। পুরোটা রেকি করতে ঘণ্টা দুয়েকের বেশি সময় লাগল না। উৎসাহব্যঞ্জক কিছু খুঁজে না পেয়ে রওয়ানা হলাম পরবর্তী দ্বীপটার উদ্দেশে।
পুরো এলাকাটার একটা ম্যাপ ছিল আমার কাছে, তবে ওটা ছিল আকাশ থেকে করা। পানির গভীরতা কিংবা ডুবো পাথরের কথা উল্লেখ ছিল না ওতে। তাই খুব সাবধানে দেখে-শুনে এগোতে হচ্ছিল আমাকে।
দ্বিতীয় দ্বীপটাতে পৌঁছতে-পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেল। তক্ষুণি আর কাজে নামলাম না। বোটের কেবিনেই রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিলাম।
নিজের রাঁধা খাবার দিয়ে উদরপূর্তি করে শুয়ে পড়লাম। রান্নাটা আমি ভালই করি, কখনও সুযোগ পেলে চেখে দেখো।
ক্লান্ত ছিলাম, তাই চোখের পাতা ভারী হতে সময় লাগল না। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঠিক কতক্ষণ পর ঘুমটা ভেঙে গেল, নিশ্চিত করে বলতে পারব না; শোয়ার সময় ঘড়ি দেখিনি। তবে খুব বেশি সময় পেরোয়নি, ঘুমটা তখনও কাঁচা ছিল, এটুকু জোর গলায় বলতে পারি। কী কারণে ঘুমটা ভাঙল, ভাবছিলাম; ঠিক তখনই শুনতে পেলাম আওয়াজটা।
অদ্ভুত একটা চিৎকার; হাতি আর সিংহের গর্জন একত্রে মেশালে যেমন শোনাবে, অনেকটা ওরকম। একঘেয়ে, বিষণ্ণ, টানা-টানা।
অকারণেই ঘাড়ের কাছটা শির-শির করে উঠল।
তড়াক করে বিছানা ছাড়লাম। কোত্থেকে ভেসে আসছে, কীসে করছে চিৎকারটা, জানতে হবে আমাকে।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মনে-মনে বেশ ভয় পাচ্ছিলাম আমি। তবে বৈজ্ঞানিকের সহজাত কৌতূহলী মন ভয়টাকে জয় করতে পেরেছিল।
সাথে শক্তিশালী টর্চ লাইট ছিল, বোটের ডেকে দাঁড়িয়ে আলো ফেললাম পাশের দ্বীপটার ওপর। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম চেনা-অচেনা গাছ, পাথুরে টিলা, কাঁটাঝোপের দঙ্গল। সেই সাথে কান পেতে রইলাম চিৎকারটা আবার শুনতে পাবার আশায়।
কিন্তু হতাশ হতে হলো আমাকে। অনেকক্ষণ সময় পেরিয়ে গেলেও আর শোনা গেল না ডাকটা। খোঁজাখুঁজিও সার হলো, কোন প্রাণীর দেখা পাওয়া গেল না।
গোটা কয়েক ব্যাঙ অবশ্য টর্চের আলোয় বিরক্ত হয়ে স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়েছিল লেকের জলে। তাদের ঝাঁপাঝাঁপি থেমে যাওয়া মাত্রই নীরব হয়ে গেল গোটা চরাচর, কোথাও কোন শব্দ নেই। যেন চির নৈঃশব্দ্যের রাজত্ব ওখানে!
ভেবে দেখলাম, চিৎকারটা দূরের কোন দ্বীপ থেকেও ভেসে আসতে পারে। একে নিশুতি রাত, জলের ওপর দিয়ে শব্দও অনেক দ্রুত ছোটে। তাই সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দেয়ার কোন জো নেই। শুনে হয়তো অবাক হবে, বেশ খুশি মনেই সে রাতে দ্বিতীয়বারের মত বিছানায় গিয়েছিলাম আমি। নতুন কিছু খুঁজে পাবার আশাতেই আরকেইনে গিয়েছিলাম, অভিযানের শুরুতেই এতটা আগ্রহ জাগানিয়া কোন কিছুর সন্ধান পেয়ে যাব, কখনও কল্পনাও করিনি। উত্তেজনায় বলতে গেলে ঘুমই এল না আর, ছটফট করতে-করতেই কেটে গিয়েছিল বাকি রাতটা।
