বয়স্ক একজন মানুষকে তো আর জোরও করা যায় না তেমন। কী বলবে, কিছুই মাথায় আসছে না ওদের।
অবশেষে অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাঙল শঙ্কর। হতাশ গলায় বলল, ‘খাওন? রাইতের খাওড়া তো অন্তত আমাগো লগে খাইবা, নাকি?’
‘তা খাওয়া যায়। এতে কোন আপত্তি নেই আমার,’ হাসিমুখে জবাব দিল বিমল।
হাঁফ ছাড়ল সবাই। সদলবলে বিমলকে এগিয়ে নিয়ে গেল শঙ্করের বাড়ির উদ্দেশে।
অল্প সময়ে বেশ জমকালো আয়োজনই করা হলো বিমলের জন্য। জানা- অজানা অজস্র পদে বোঝাই হয়ে গেল খাবার টেবিল।
আরও বহুবছর ফসলের খেতগুলো ভোগদখল করতে পারবে, এই নিশ্চয়তা পেয়ে হাত খুলে খরচ করেছে শঙ্কর; কোন কার্পণ্য করেনি
দ্বিগুণ মাইনেতে ঠিক করা দু’জন দিনমজুর গিয়ে বাড়িটার সবচেয়ে বড় ঘরটা যথাসম্ভব সাফসুতরো করে দিল; ওটাতেই রাত কাটাবে বিমল। একটার বদলে দুটো লণ্ঠনের ব্যবস্থা করা হলো, সারা রাত ধরে আলো দেবে ওগুলো। চারপাশে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়া হলো কার্বলিক এসিড; সাপের দল এই জিনিসটা একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
অবশেষে ভূরিভোজের পর গ্রামের মান্যগণ্য মানুষজনের সঙ্গে ভাব বিনিময় শেষে, নিজের বাড়ির উদ্দেশে পা বাড়াল বিমল। দু’জন জোয়ানমর্দ লোক তাকে বাড়িটার সীমানা অবধি এগিয়ে দিয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটায় সময় রাত এগারোটা বেজে ত্রিশ মিনিট।
.
নিশুতি রাতে আগের চেয়েও অনেক বেশি ভুতুড়ে দেখাচ্ছে বাড়ির কাঠামোটাকে কোণের ঝাঁকড়া নিম গাছটার ডালগুলো এমনভাবে দুলছে, যেন প্রচণ্ড আমোদে মাথা ঝাঁকাচ্ছে কোন দুষ্ট প্ৰেত!
আকাশে চাঁদ আছে, তবে জোছনাটা কেমন যেন ঘোলাটে। পাতলা মেঘের সার্বক্ষণিক আনাগোনা স্বচ্ছন্দে আলো বিলাতে বাধা দিচ্ছে ওটাকে।
দ্রুত কাপড়-চোপড় ছেড়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে গেল বিমল। হাত বাড়িয়ে কমিয়ে দিল লণ্ঠনগুলোর আঁচ। এখন আর কেউ আচমকা ঘরে ঢুকলে আবছা আলো- আঁধারিতে চট করে দেখতে পাবে না তাকে।
অবশ্য কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসীদের কেউই যে মাঝরাতে এ বাড়িমুখো হবে না, এই ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত বিমল। তবুও সতর্ক থাকা ভাল। গাঁয়ে একটা সম্মান আছে তার, অযথা সেটা খোয়ানোর ঝুঁকি নেয়ার কোন মানেই হয় না।
পুঁটলির ভিতর থেকে দুর্গন্ধময় একটা তেলের শিশি বের করল বিমল; আচ্ছামতন মেখে নিল সারা শরীরে। সিন্দুকে পাওয়া বোতাম আকৃতির পাথরগুলো বের করে বড় একটা বর্গ তৈরি করল মেঝেতে। তারপর ওর ভিতর গিয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছাতের একটা ফাটলের দিকে; মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করছে।
তারপর ধীরে-ধীরে চোখ মুদল সে; মূষিক-সাধনার মন্ত্র জপতে শুরু করল। পুরো দেহটা মূর্তির মত অনড় তার, শুধু ঠোঁটদুটো ক্রমাগত ওঠানামা করছে।
দেখতে-দেখতে পেরিয়ে গেল অনেকটা সময়, কিন্তু তেমন কিছুই ঘটল না। শুধু ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে গেল বিমলের বিবস্ত্র শরীরটা।
এক মুহূর্তের জন্যও মন্ত্র জপা থামাল না সে, ঠোঁটজোড়া নড়ে চলল অনর্গল। বাইরে ততক্ষণে একাকী চাঁদকে ঘিরে ধরেছে দস্যু মেঘেরা।
অনেক-অনেকক্ষণ পর মাটির গভীরে মৃদু একটা কম্পন অনুভব করল বিমল; সেই সঙ্গে দূরাগত মেঘের গর্জনের মতন ভোঁতা একটা আওয়াজ। যেন বহুদূর থেকে ধেয়ে আসছে বিশাল একটা অশ্বারোহীর দল!
পলকের জন্য এক চিলতে হাসি ফুটল বিমলের ঠোঁটের কোনায়, মন্ত্র জপার গতি আরও বাড়িয়ে দিল সে। অন্ধকার জগতের সমস্ত মূষিক অপশক্তিকে আহ্বান করছে সে। আগের মতই বুজে রেখেছে চোখ দুটো; খোলার সময় হয়নি এখনও।
ধীরে-ধীরে বাড়তে লাগল কম্পনটা, মেঘের গর্জনটাও যেন অনেকখানি কাছিয়ে এল। মন্ত্র জপা চালিয়ে গেল বিমল।
অবশেষে একটা বোটকা গন্ধ ভক্ করে এসে ধাক্কা দিল তার নাকে। গন্ধটা তার অতি চেনা, ইঁদুরের গন্ধ!
নিজের ওপর অসংখ্য চোখের দৃষ্টি অনুভব করল বিমল, একেকটা সুচের মতই যেন ছুটে এসে শরীরে বিঁধছে ওগুলো!
বার কয়েক কেঁপে উঠল বিমলের নেত্র-পল্লব; ধীরে-সুস্থে চোখ মেলল সে। জানে, কী দেখতে পাবে; তবুও এপাশ-ওপাশ মাথা ঘুরাল ও।
লক্ষ-কোটি ইঁদুর সারিবদ্ধভাবে ঘিরে রেখেছে বর্গটাকে। কুঁতকুঁতে চোখে তার দিকেই অপলক তাকিয়ে আছে নরকের বাসিন্দাগুলো!
ওকে চোখ মেলতে দেখেই নড়ে উঠল ইঁদুরের দল; সার বেঁধে এগিয়ে গেল বাইরের দিকে।
দ্রুত উঠে দাঁড়াল বিমল। ইঁদুরের দলের পিছু নিয়ে সম্মোহিতের মত বেরিয়ে এল খোলা বারান্দায়।
আকাশের চাঁদ ততক্ষণে হার মেনে নিয়েছে কালো মেঘের কাছে, তবে সামনের দৃশ্যটা ঠিকই পরিষ্কার দেখতে পেল বিমল।
আগাছার দঙ্গলের মধ্যখান দিয়ে প্রশস্ত একখানা রাস্তা তৈরি হয়েছে, এই পথেই ঘর অবধি এগিয়ে এসেছে অগণিত ইঁদুর।
পথটা গিয়ে শেষ হয়েছে আঙিনার একেবারে শেষ প্রান্তে, একটা কুয়োর মুখে। আজ বিকেলেও কুয়ার চাড়িটা আবর্জনা আর জংলায় ঢাকা ছিল। আগে থেকে জানা না থাকলে, কেউ ভাবতেও পারবে না, ওখানে একটা মান্ধাতা আমলের কুয়োমুখ লুকিয়ে আছে!
কিন্তু এই মুহূর্তে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওটাকে। কোন সন্দেহ নেই, ওই কুয়োর ভিতর দিয়েই পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে ইঁদুরের দল; ওটাই নরকে যাওয়ার পথ!
মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গিয়ে কুয়োটার ভিতরে উঁকি দিল বিমল, তাকে সঙ্গ দিল সুশৃঙ্খল মূষিকের পাল।
