কুয়োর ভিতরের দেয়ালটা আগে একেবারে মসৃণ ছিল। এখন সেখানে খানিক বাদে-বাদে খোঁড়ল তৈরি করে একটা মইমতন বানানো হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা ইঁদুরদেরই কাজ।
এক মুহূর্তের জন্যও ইতস্তত করল না বিমল, ধাপগুলো বেয়ে নীচে নামতে শুরু করল। দ্রুত হাত-পা চালাচ্ছে সে; যত জলদি সম্ভব কুয়োর তলায় পৌঁছতে চায়।
ছায়ার মত তার সঙ্গে সেঁটে রইল মূষিকের পাল, জলস্রোতের মত কুয়োর দেয়াল বেয়ে নামতে শুরু করেছে ওরা।
বিমল নামছে তো নামছেই; এই অবরোহণের যেন কোন সমাপ্তি নেই! তার হাত-পায়ের পেশিগুলোঁ প্রচণ্ড ব্যথা করছে, মস্তিষ্কের আদেশ আর শুনতে চাইছে না।
মাথার ওপরের কুয়োমুখটা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে-হতে একসময় একটা বিন্দুর আকার ধারণ করল, তবুও শেষ হলো না উলম্ব পথটা। অবশেষে যে-ই না হাল ছেড়ে দিয়ে নীচের অন্ধকারে নিজেকে সঁপে দিতে যাবে বিমল, ঠিক তখনই কুয়োর তলায় পৌঁছে গেল সে!
মেঝেতে শরীর এলিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিল বিমল। শ্বাসের তালে-তালে হাপরের মতন ওঠানামা করছে তার পাঁজরের হাড়। টনটন করছে গোটা দেহের সবক’টা মাংসপেশি।
আচমকা একটা গুঞ্জন কানে এল তার। গুঙিয়ে উঠেছে ইঁদুরের দল, যেন তাড়া দিচ্ছে তাকে!
ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল বিমল। কুয়োর বাম পাশে একটা সুরঙ্গমুখ দেখতে পেয়ে হাঁটা শুরু করল ওটা ধরে। পথটা নতুন, সদ্যই খোঁড়া হয়েছে। ভিতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, খুব একটা প্রশস্তও নয়। খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে বিমলকে।
চোখে তেমন কিছু দেখতে না পেলেও আশপাশে ইঁদুরদের উপস্থিতি স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। এখনও তার চলনদারের ভূমিকা পালন করে চলেছে ওরা।
সুরঙ্গ পথে মাটির তলা দিয়ে ক্রমাগত দক্ষিণে এগিয়ে চলেছে বিমল। গাঁয়ের সবচেয়ে বড় পাহাড়টা ওদিকেই। ওখানকার মাটিতে কী যেন একটা সমস্যা আছে; কখনওই ওখানে ফসল ফলানো যায় না! এমনকী জুম চাষের চেষ্টাও বিফল হয়েছে প্রতিবার।
বিমলের মনে হচ্ছে, অনন্তকাল ধরে বুঝি পথ চলছে সে। তেপান্তরের মাঠ পেরোতেও তো এর চেয়ে কম সময় লাগার কথা!
আচমকা দৃষ্টিসীমার শেষপ্রান্তে খানিকটা আলোর আভা দেখতে পেল বিমল, সেই সঙ্গে অনুভব করল অদ্ভুত এক ধরনের খরতাপ!
যতই সে সামনে এগুতে থাকল, ততই বাড়তে লাগল ব্যাপারটার তীব্রতা। তাহলে কি সত্যিই অবশেষে নরকের দেখা পেতে চলেছে সে? নাকি আদতে কোন সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ওটা?
এদিকে তার মাথার ওপর আমূল বদলে গেছে প্রকৃতি! বিনা নোটিশে ভয়াবহ এক ঝড় আঘাত হেনেছে বিজয়পুর গ্রামে। গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো কেউই নিজেদের জীবদ্দশায় এতখানি তীব্র ঝড় ইতিপূর্বে কখনও চাক্ষুষ করেনি।
দমকা হাওয়ার প্রথম ঝাপটাতেই বিমলের পৈতৃক বসতবাড়িটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। শতবর্ষী গাছগুলো হেলে পড়ে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলল রুগ্ণ দালানটাকে।
বানের জল তীব্র বেগে ছুটে গেল কুয়োটার দিকে। প্রচণ্ড আক্রোশে ভেঙে খান-খান করে ফেলল ফুট চারেক উঁচু চাড়িটা, তারপর ভয়ানক তর্জন-গর্জন করতে-করতে রওয়ানা হলো পাতাল অভিমুখে!
ধেয়ে আসা জলের গর্জনটা যতক্ষণে শুনতে পেল বিমল, কিছুই আর তখন করার নেই তার।
আচমকা সুনসান পাতালপুরীতে নিজেকে ভীষণ একা লাগল তার। মূষিকের পাল কোন্ ফাঁকে বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে, সেটা সে টেরও পায়নি। পরক্ষণে মালতির মায়াকাড়া মুখ আর অমলের নিষ্পাপ চাহনি ভেসে উঠল তার মনের পর্দায়। পাষাণ মাটির বুকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রুজল।
ঘোরলাগা দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ পিছনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল বিমল। মাথার ওপরের চেনা পৃথিবীটাতে আর কখনও ফেরা হবে না তার; ভাবনাটা ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে তাকে।
আচমকা প্রাণপণে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করল সে; জীবিত অবস্থায় একটিবারের জন্য হলেও নরক দেখতে চায়!
জলের স্তম্ভটা তাকে ছুঁয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েনি বিমল কর!
প্রাগৈতিহাসিক
ডক্টর ব্যারনের এই বাড়িটা অনেকটা দুর্গের মত। শহর থেকে দূরে টিলার ওপর অনেকখানি জায়গা জুড়ে বিশালকায় দালান, চারপাশে আকাশছোঁয়া সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। পুরো এলাকায় প্রাচীরটাকে সঙ্গ দিচ্ছে সুগভীর একটা পরিখা। শোনা যায়, এককালে এই পরিখায় জীবন্ত কুমিরের বসবাস ছিল; কোথাও- কোথাও ছিল প্রাণঘাতী চোরাকাদা।
প্রধান ফটকটা ছাড়া বাড়িটা থেকে বেরনোর দ্বিতীয় কোন পথ নেই। ওখানটায় পরিখার ওপর লোহার একটা ঝুলসেতু আছে, প্রয়োজনমত ওঠানো-নামানো যায়।
সম্ভবত কাৰ্কান দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যই এহেন নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করার প্রয়োজন হয়েছিল।
পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া বাড়িটা তৈরি করেছিলেন ডক্টর ব্যারনের প্রপিতামহ। তাঁর আমলে প্রায়ই এদিকটায় কার্কানদের উৎপাতের কথা শোনা যেত। ওদের নৃশংসতার কাহিনিগুলো এতটাই নির্মম যে, আজও ওগুলো শুনলে যে কারও গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাবে।
বাড়ির লনটা বিশাল। যত্ন নেয়ার জন্য বাঁধা মালি রয়েছে, তাই পুরো আঙিনার সবুজ ঘাসের গালিচা একই রকম পুরু।
লনের শেষপ্রান্তে গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একসারি ইউক্যালিপটাস গাছ; আচমকা তাকালে গা ছম ছম করে ওঠে। মনে হয়, অশুভ একদল প্রেত এসে হাজির হয়েছে জায়গাটায়, যে কোন মুহূর্তে হামলে পড়বে সবার ওপর!
