আপনমনে খানিকক্ষণ হাসল বিমল। বহুদিন পর আজ উনুনে হাঁড়ি চড়িয়েছে সে; অথচ একটা সময় রোজই তাকে কিছু না কিছু রাঁধতে হত। রান্নার হাত বরাবরই ভাল ছিল তার। যে-ই খেয়েছে, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা না করে পারেনি।
তবে বিয়ের পর আর খুব একটা বাবুর্চিগিরি করার মওকা পায়নি সে। পুরুষ মানুষ রসুই ঘরের হাঁড়ি-পাতিলের চারপাশে ঘুর-ঘুর করবে, ব্যাপারটা ভীষণ অপছন্দ ছিল মালতির।
সে রাতে তৃপ্তি সহকারে উদরপূর্তি করে আহার করল বিমল। মূষিক-সাধকের নিদান অনুযায়ী, তার পেটের রাক্ষুসে খিদেটাও মিটে গেল পুরোপুরি!
মাংসের সালনটা অবশ্য বেশ ঝাল হয়েছিল, তবে তাতে খুব একটা সমস্যা হয়নি বিমলের।
বেঁচে থাকতে যে পরিমাণ ঝাঁঝ ছিল মালতির, খানিকটা বাড়তি ঝাল না দিলে তার মাংস মুখে রুচত কিনা কে জানে!
সাত
এক বিকেলে বাক্স-পেটরা নিয়ে নিজের গ্রাম, বিজয়পুরে গিয়ে হাজির হলো বিমল। সীমান্তের কাছাকাছি টিলাটক্কর আর খানাখন্দে ভরা একটা পাহাড়ি গ্রাম, বিজয়পুর। বিমলের পৈতৃক ভিটাটা এখনও রয়ে গেছে, বিক্রি করেনি সে।
তার বেশ কিছু চাষবাসের জমিও আছে ওখানে, তবে ওগুলোর খোঁজ খুব একটা রাখে না সে। দূরসম্পর্কের চাচা-জ্যাঠারাই আজতক ভোগদখল করে আসছে জমিনগুলো।
বাড়িটাও এতদিনে জবরদখল হয়ে যেত নির্ঘাত; তবে একটা পুরানো কুসংস্কারই রক্ষা করে চলেছে ওটাকে।
আড়ালে আবডালে পাগল বললেও, বিমলের দাদাকে ঠিকই ভয় পেত লোকে। সেই ভয়টা এখন অবধি কাটেনি। তার যে বিশেষ কিছু ক্ষমতা ছিল, এ নিয়ে দ্বিমত নেই কারও। এমন একজন কামেল তান্ত্রিকের বসতভিটা দখলের কথা কল্পনাও করতে পারে না ওরা। জরাজীর্ণ একটা ইমারতের লোভে নিজেকে নির্বংশ করার কোন মানে হয় না।
আদতেই বেহাল দশা বাড়িটার। কী করে যে এখনও নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটাই বিস্ময়কর! সীমানা প্রাচীর বহু আগেই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, ফটকের কোন বালাই নেই। পুরো বাড়ি জুড়ে ঝোপঝাড় আর আগাছার দঙ্গল, পায়ে হাঁটার পথটুকুও নেই।
দালানটার মুমূর্ষু দশা, রীতিমত ধুঁকছে। বাতাসের একটা জোরদার ধাক্কায়, হুড়মুড় করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। রঙের কোন বালাই নেই, পলস্তারা খসে দেয়ালের হাড় বেরিয়ে পড়েছে বেশিরভাগ জায়গায়।
এক সময় যেখানে দরজা-জানালা নামের বস্তুগুলো ছিল, এখন সেখানে শুধুই শূন্যতা; কালো ফোকর। খানিকটা ডান দিকে হেলে আছে রুগ্ন ছাত; জমিনের আহ্বানে সাড়া দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত!
হাজার টাকা সাধলেও কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ এ বাড়িতে জীবন যাপন করতে রাজি হবে বলে মনে হয় না।
তবে আজ রাতটা বিমলকে এখানেই কাটাতে হবে! কারণ ডাইরির বয়ান মোতাবেক, সাধনার শেষ লগ্নে এ বাড়িরই কোথাও উন্মুক্ত হবে নরকের পথটা!
বিমলের এই আকস্মিক আগমনে তার আত্মীয়স্বজনদের কেউই ঠিক খুশি হতে পারল না। তারা বিমলের সঙ্গে দেখা করতে এল মুখ ভার করে। সবার বদ্ধমূল ধারণা, বিমল এবারে নির্ঘাত সমস্ত জমিজমা বিক্রি করতে এসেছে! হয়তো কোন কারণে টাকাপয়সার টানাটানি চলছে তার, তাই দেখতে এসেছে এখানকার সহায়সম্পত্তি বিক্রিবাট্টা করে কিছু পাওয়া যায় কিনা।
এতদিন ভোগদখল করতে-করতে জমিগুলো নিজেদেরই ভাবতে শুরু করেছিল ওরা। ভাবতেও পারেনি, ন্যায্য দাবি নিয়ে কোন একদিন আচমকা এসে হাজির হবে ওগুলোর প্রকৃত মালিক!
শঙ্কর জ্যাঠার মুখটাই বেজার বেশি; বিমলের সিংহভাগ জমি তার দখলেই আছে কিনা!
শুকনো স্বরে বিমলকে জিজ্ঞেস করল সে, ‘তা হঠাৎ কী মনে কইরা গেরামে আইলা, ভাতিজা?’
হাসল বিমল। ওদের মনে কী চলছে, আন্দাজ করতে কষ্ট হচ্ছে না তার। ‘এমনিতেই এলাম। বিশেষ কোন কারণ নেই। অনেকদিন আসার সুযোগ হয়নি। তাই ভাবলাম, একবার এসে ঘুরে যাই। আপনাদের সবার সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। আপনারা ছাড়া আপন বলতে আর কে-ই বা আছে আমার।’
ঠোঁটে হাসি ফোটানোর বৃথা চেষ্টা করল শঙ্কর। ‘ভালাই করসো, ভাতিজা। সেই যে শহরে চইলা গেলা, আর তো গেরামে পা-ও ফেললা না।’
সেজন্যই এলাম এবার। দিন দুয়েক থাকব, তারপর আবার ফিরে যাব শহরে।’
‘জমি-জিরাতের কোন কারবার আছেনি, ভাতিজা?’ খুব সাবধানে প্রশ্নটা করল শঙ্কর।
‘আরেহ, না, না,’ তাকে আশ্বস্ত করল বিমল। ‘আমি কেবল দাদার ভিটায় দুটো দিন থাকতে এসেছি। অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই।’
এবারে দাঁত কেলানো হাসি ফুটল শঙ্করের মুখে; অন্যদেরও যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। আচমকা বিমলকে সমাদর করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই।
‘এই বাড়িতে তো আর রাইতে থাহনের উপায় নাই। তুমি আমাগো বাড়িতে চলো। সকালে নাহয় সবকিছু ঘুইরা দেইখো,’ বলে উঠল বিমলের চাচা, আদিত্য।
মাথা নাড়ল বিমল। ‘না, খুড়ো মশাই। আমাকে রাতে এই বাড়িতেই থাকতে হবে। যদি একটা ঘর খানিকটা পরিষ্কার করে দেন, আর রাতে জ্বালানোর মত একটা লণ্ঠন পাওয়া যায়; তাহলেই চলবে।’
‘কও কী তুমি! এইহানে ক্যামনে থাকবা রাইতে! ভূত-প্রেতের কথা নাহয় বাদই দিলাম, সাপ-খোপেরও তো অভাব নাই পুরা বাড়িতে।’
কাঁধ ঝাঁকাল বিমল; হাসছে। ‘সমস্যা হবে না, খুড়ো মশাই। সঙ্গে করে কার্বলিক এসিড নিয়ে এসেছি আমি।’
একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল সমবেত জনতা, ঠোঁটে কোন রা নেই কারও। কেন এই পোড়ো বাড়িতে রাত কাটাতে গোঁ ধরেছে বিমল, এটা কারোরই মাথায় আসছে না!
