প্রত্যূষে পা টিপে-টিপে রান্নাঘরে গিয়ে মগটা বের করে আনল বিমল। বাইরে তখনও পুরোপুরি আলো ফোটেনি; নিজের ঘরে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে মালতি।
খানিকক্ষণ ইতস্তত করে ঠিকই শেষটায় নিজের গলায় ঢেলে দিল বিমল নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতে চাইল তার, শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো; তবুও হাল ছাড়ল না সে। নিজের ওপর জোর খাটিয়ে গিলে নিল সবটুকু শরবত, খালি করে ফেলল মগটা। তারপর চোখ বুজে বসে রইল নিজের জায়গায়; শরীরটা কেমন- কেমন যেন করছে তার।
এহেন অখাদ্য একটা জিনিস পেটে চালান করার পর প্রচণ্ড অস্বস্তি লাগার কথা, পেট নেমে যাওয়ার কথা। উল্টো নিজের ভিতরে রাজ্যের ক্ষুধা অনুভব করল বিমল! এই মুহূর্তে প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথ সামনে পেলেও যেন কাঁচা চিবিয়ে সাবাড় করে ফেলতে পারবে সে!
ঠিক এমনটাই অবশ্য লেখা ছিল ডাইরিটায়!
অপরিমেয় ক্ষুধা একটা প্রাণীকে ঠিক কতটা বিচলিত করে তুলতে পারে, সেটাই এখন অনুভব করবে বিমল। কোন সাধারণ খাবারেই এই বিশেষ ক্ষুৎপিপাসা মিটবার নয়। গোটা একটা দিন দুর্যোগটা কাটানোর পর, রাতে খুলতে হবে ডাইরির পরবর্তী পাতাটা; ওতেই মিলবে সমাধান।
বহুদিন পর আবারও সেদিন অফিসের উদ্দেশে তৈরি হলো বিমল। যাত্রাপথে আবুল মিয়ার টঙ দোকানে রোজকার এক কাপ চা আর দুটো টোস্ট বিস্কিটের বদলে, ভরপেট খাবার খেল সে।
চার প্যাকেট মিষ্টি বিস্কিট, দুটো বড় পাউরুটি, দশ কাপ চা আর গোটা পনেরো সেদ্ধ ডিম খেয়ে, আবুল মিয়ার ছানাবড়া চোখজোড়াকে পেছনে রেখে অফিসের উদ্দেশে পা বাড়াল বিমল। তখনও তার পেটের আগুন একরত্তিও নেভেনি!
কিন্তু আবুলের দোকানে এর বেশি আর খাওয়ার উপায় ছিল না। কারণ কেবল দোকানীই নয়, অন্য সব খদ্দেররাও বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে ছিল তার দিকে! এতগুলো মানুষ অপলক তাকিয়ে থাকলে, কারই বা আর খেতে ইচ্ছে করে!
অফিসে ঢুকেই রাঘবকে উচ্চস্বরে বার কয়েক ডাকল বিমল। কান দিল না রাঘব; বিমলকে পাত্তা না দিয়েই অভ্যস্ত সে। গড়িমসি করে অনেকটা সময় কাটিয়ে, তবেই বিমলের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।
মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘কী কাম?’
‘কিছু খাবার এনে দাও। জলদি।’
‘অহন পারুম না। অন্য কাম আছে। বড় সাব যে কোন সময় ডাকবার পারে।’
নিজের ভাগ্যের লিখন সম্পর্কে যদি বিন্দুমাত্রও ধারণা থাকত রাঘবের, ভুলেও, আজ বিমলের সঙ্গে বেয়াদবি করত না সে!
বিদ্যুৎ গতিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিমল, সজোরে চেপে ধরল রাঘবের ইউনিফর্মের কলার। তারপর দেহের সর্বশক্তি দিয়ে একখানা রামচড় বসিয়ে দিল তার ডান গালে। ছিটকে দু’হাত দূরে গিয়ে পড়ল রাঘব, মাথাটা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে তার। বিমলের হাতটা তার গাল ছোঁয়ার আগ পর্যন্ত ঘটনার কিছুই আঁচ করতে পারেনি সে।
কোনমতে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে উঠে দাঁড়াল সে, চেয়ারের হাতল খামচে ধরে নিজেকে ফের পতনের হাত থেকে রক্ষা করল। তারপর হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকাল বিমলের অগ্নিশর্মা চেহারাটার দিকে।
চার চোখের মিলন হতেই আতঙ্কে রীতিমত কুঁকড়ে গেল রাঘব। চোখ তো নয়, যেন এক জোড়া অঙ্গার!
কী হয়েছে লোকটার? রাতারাতি এভাবে বদলে গেল কেমন করে? আজ কেবল ভগবানই পারেন এই দানবের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে।
‘ছোটলোকের বাচ্চা,’ হিসহিসিয়ে বলল বিমল। ‘আর কখনও যদি আমার মুখে-মুখে কথা বলিস, জুতোর তলা দিয়ে তোর ঠোঁট দুটো একদম থেঁতলে দেব আমি।’
তীব্র আতঙ্কে কাঁপতে-কাঁপতে বিমলের কথাগুলো শুনল রাঘব; নড়াচড়া করার সাহসটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। অবশ্য ভয় কেবল সে-ই নয়, অফিসের বাদবাকি সবাই-ই পেয়েছে। উপস্থিত সবক’টা চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার চেষ্টায় মত্ত; পলক পড়ছে না কারও চোখে! নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে সব ক’জন মানুষ, সত্যিই কি খানিকক্ষণ আগে কিছু ঘটেছিল এখানে? নাকি সবটাই ভ্ৰম?
সেদিন অন্তত দশ বার বিমলের জন্য খাবার আনতে বাইরে গেল রাঘব, ভুলেও একটা সেকেণ্ড বাড়তি সময় নষ্ট করেনি সে। অন্য কেউও রাঘবকে সেদিন কোন কাজের ফরমায়েশ দিল না; পাছে ওকে না পেয়ে রেগে যায় বিমল!
মিনিট পাঁচেকের জন্য বিমল একবার টয়লেটে যেতেই জাদুমন্ত্রের মত উধাও হয়ে গেল তার টেবিলের বেশিরভাগ ফাইল! সবাই আজ নিজেদের কাজ নিজেরাই করবে; জলদি বাড়ি ফেরার তাড়া নেই আজ কারও!
সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার আগে অন্তত পাঁচটা রেস্টুরেন্টে ঢু মারল বিমল। প্রতিটাতেই অন্তত দশ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের খাবার পেটে চালান করল সে।
বিরিয়ানি, সাদা ভাত, মোরগ-পোলাও, মণ্ডা-মিঠাই, কিছুতেই কিছু হলো না; উদরের এক কোনাও ভরল না তার। পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো; প্রশান্ত মহাসাগরের সমস্ত জল গিললেও যেন সেই রাক্ষুসে পিপাসা মিটবার নয়!
বিফল মনোরথে ঘরে ফিরে আবারও দাদার ডাইরিটা হাতে তুলে নিল বিমল, তড়িঘড়ি করে খুলল সমাধান লেখা সেই বিশেষ পাতাটা।
পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে কেবল একটামাত্র শব্দই লেখা ছিল, তাতে, ‘মানুষের মাংস!’
ছয়
গভীর রাতে নিজের জন্য রাঁধতে বসল বিমল। পুরো মহল্লা ততক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা, সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে চরাচরে।
অন্যান্য দিন রাত-বিরেতে চৌকিদারের হাঁকডাক শোনা যায় বটে, তবে আজ সেটাও অনুপস্থিত। নেড়ি কুকুরের দল কোথায় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে, কে জানে! ওদেরও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
