‘মোটেও না, মালতি। একেবারেই সুস্থ একজন মানুষ ছিলেন তিনি। আমাদের যে কারও চেয়ে বেশি বুদ্ধি রাখতেন মাথায়,’ চটজলদি বলে উঠল বিমল। ‘ইঁদুরদের ক্ষমতা সম্পর্কে তেমন কোন ধারণাই নেই মানুষের। একারণেই হয়তো সবার কাছে এতটা অস্বাভাবিক লাগে ব্যাপারটা।’
‘তাই বুঝি?’ ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল মালতির কণ্ঠে। ‘তা কী-কী ক্ষমতা আছে মহা পরাক্রমশালী ইঁদুরদের?’
তার গলার উপহাসের সুরটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করল বিমল। ‘অনেক ক্ষমতা, অনেক। সারা রাত বর্ণনা করেও শেষ করা যাবে না সেসব। তবে তুমি জানতে চাইলে, ওদের একটা বিশেষ ক্ষমতার কথা বলতে পারি তোমাকে।’
‘বলো তাহলে। শুনে ধন্য হই।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল বিমল; পুরো বিষয়টায় খানিকটা বাড়তি গুরুত্ব আরোপের প্রয়াস পাচ্ছে। ‘নরকের সন্ধান জানে ইঁদুরেরা। এই সাধনায় সফল হলে, জীবিত মানুষ হয়েও নরক দর্শন করতে পারব আমি।
‘অন্যদেরকে নরক দেখানোর ক্ষমতা তো তোমার এখনই আছে,’ চিবিয়ে- চিবিয়ে বলল মালতি। ‘আমার জীবনটা কোন দোজখের চাইতে কম কীসে?’
চমকে উঠল বিমল। কথাটার মর্মার্থ অনুধাবন করতে, বেশ খানিকটা সময় লাগল তার। পরক্ষণেই চেহারাটা রক্তবর্ণ ধারণ করল, ভীষণ রেগে গেছে।
তবে সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপও করল না মালতি; অনল বর্ষণ অব্যাহত রাখল। ‘এক সপ্তাহ সময় দিলাম তোমাকে। ভাল চাইলে এসব পাগলামি ছেড়ে ছুড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরত এসো। নইলে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তোমার জন্য, এই আমি বলে দিলাম।’
এক মুহূর্তের বিরতি নিয়ে আবারও মুখ খুলল সে, ‘যদি ভেবে থাকো, বাপের বাড়িতে চলে যাব আমি; তাহলে ভুল ভাবছ। যেতে চাইলে অনেক আগেই যেতে পারতাম, এতদিন অপেক্ষা করতাম না। আমি নই, তোমাকেই বরঞ্চ জায়গামত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। সেটা কোথায়, বুঝতে পারছ তো? পাগলা গারদে। আমার মনে হয়, দিনে-দিনে মানব সমাজে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছ তুমি!’
সশব্দে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল মালতি, হন হন করে হেঁটে চলে গেল তার শোবার ঘরের উদ্দেশে।
.
আরও বহুক্ষণ সেখানেই ঠায় বসে রইল বিমল, উথলে ওঠা ক্রোধটাকে দমন করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে।
মধ্যযুগে বন্দিদের ওপর ইঁদুরদের দিয়ে অত্যাচার চালাত সম্রাটরা। একটা ইঁদুরকে কয়েকদিন ধরে অভুক্ত রাখা হত, এতে করে ভীষণ ক্ষুধার্ত আর হিংস্র হয়ে উঠত জানোয়ারটা।
নির্দিষ্ট দিনে একজন বন্দিকে নগ্ন করে হাত-পা বেঁধে ফেলা হত। তারপর একটা খাঁচা সমেত ইঁদুরটাকে এনে রাখা হত লোকটার পেটের ওপর!
লোহার তৈরি খাঁচাটার অন্য সবদিক বন্ধ থাকলেও, কেবল নীচের দিকটা খুলে দেয়া হত। অনেকটা বাধ্য হয়েই বন্দির পেটের নরম চামড়া খুঁড়তে শুরু করত ইঁদুরটা, ধীরে-ধীরে সেঁধিয়ে যেত উদরের গভীরে! বাঁচার পথ এবং খাবার, দুটোই চাই তার।
পুরোটা সময় সজ্ঞানে ওই ভয়াবহ যন্ত্রণাটা অনুভব করত হতভাগা মানুষটা। তারপর একসময় তীব্র বেদনা অথবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যেত। কিংবা বলা ভাল, মুক্তি পেত।
মালতিকে এখনই ওই ধরনের কোন শাস্তি দিতে ইচ্ছে করছে বিমলের!
রোমান সম্রাটদের মত ক্ষুধার্ত ইঁদুর ভর্তি একটা গোপন কুঠুরি যদি তার থাকত, নির্ঘাত এখন মালতিকে ওটাতে ঠেলে ফেলে দিত সে।
শত-সহস্র ইঁদুর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ছে মালতির নধর দেহটার ওপর; দৃশ্যটা মানসপটে কল্পনা করতেই ভীষণ পুলক অনুভব করল বিমল!
পাঁচ
প্রয়াত মূষিক-সাধকের ডাইরির ভাষ্য অনুযায়ী, সাধনার পরবর্তী ধাপের জন্য বেশ কিছু জিনিসপত্র জোগাড় করল বিমল।
একেকটা উপকরণ খুঁজে বের করতে রীতিমত গলদঘর্ম হতে হলো বেচারাকে। সাধনার জন্য যে এসব জিনিসেরও প্রয়োজন পড়তে পারে কখনও, এটা সে কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি।
মিয়ানো মুড়ি
খানিকটা ঝোলা গুড়
গোটা দুয়েক পচা ডিম
মাকড়সার ঝুল
দুটো নোনতা বিস্কিট
চালের রুটি
ডুবো তেলে ভাজা সিঙ্গাড়া
গোটা চারেক বাতাসা
একটা মরা টিকটিকি
বাসি পাউরুটি
খানিকটা মাখন
কয়েক বছরের পুরনো গম
আধ কাপ মোরগের রক্ত
কয়েক ছটাক আমন ধানের চিটা
এক মুঠো শুকনো দূর্বাঘাস
কয়েক গাছি বিড়ালের লোম
খানিকটা লাল মাটি
আরও কত কী…!
এসব জোগাড়যন্ত্র করা কি চাট্টিখানি কথা?
তবুও শেষতক ঠিকই সবকিছু এক জায়গায় জড় করল বিমল। একখানা বড় পোড়ামাটির পাত্র খুঁজে নিয়ে, তাতে আধ লিটার পানি ভরে নিল। তারপর সবগুলো উপকরণ ভালমত মিশিয়ে এক ধরনের শরবত মতন তৈরি করল।
জিনিসটা দেখতে অবিকল থকথকে কাদার মত। আর গন্ধটা এমন যে, মরণাপন্ন কোন মানুষের নাকের সামনে ধরলেও লাফিয়ে উঠে পালিয়ে যেতে দিশা পাবে না বেচারা!
একটা বড় মগে তরলটা ছেঁকে নিল বিমল, তারপর কিচেনের মিটসেফে তুলে রাখল সকালে ব্যবহার করার জন্য। ওটাকে পুরো রাত নিজের কাছে রাখার কোন উপায় নেই; রসুইঘরের আলমারিতে লুকিয়ে রাখাটাই নিয়ম। সারা রাতের পর ভোরের একেবারে শুরুর দিকে একদমে পান করতে হবে তাকে জিনিসটা, এর কোন অন্যথা করা যাবে না।
যদিও ওটা গেলার কথা কল্পনা করামাত্রই ভিতর থেকে সমস্তকিছু বেরিয়ে আসার উপক্রম হচ্ছে বিমলের। কিন্তু করার কিছুই নেই তার; হাত-পা বাঁধা। সাধনার উপরিস্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য অদ্ভুত এই শরবতটা গলাধঃকরণের কোন বিকল্পই নেই।
