তবুও হাল ছাড়ল না বিমল, লেগে রইল। মনে-মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল, যেভাবেই হোক, এর শেষ দেখে ছাড়বে সে। মাঝামাঝি গিয়ে সটকে পড়ার লোক নয় সে মোটেও; অন্য দশজন মানুষের চেয়ে তার ধৈর্যের পরিমাণ বেশি বৈ কম নয়। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও যজ্ঞগুলো করতে পিছপা হবে না সে।
এক রাতে কৌতূহলবশত বিমলের ঘরে উঁকি দিল মালতি। দরজাটা ভেজানো, লক করেনি বিমল। ঘরের সবক’টা বাতি নেভানো; তবে জানালা- দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে বাইরের খানিকটা আলো ঠিকই ঢুকে পড়ছে ঘরে। তাতে অবশ্য ভিতরের গুমট অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি, তবে চেনা ঘরে অতটুকু আলোই যথেষ্ট মালতির জন্য।
অন্দরের দৃশ্যটায় চোখ পড়তেই ভীষণ চমকে উঠল মালতি। অকারণেই ধক্ করে উঠল বুকের ভিতরটা। যা দেখছে, ঠিক দেখছে তো?
ঘরের মধ্যখানটায় চোখ মুদে পদ্মাসনে বসে আছে বিমল। পুরোপুরি দিগম্বর, একরত্তি সুতোও নেই তার পরনে। গায়ে কী যেন একটা মেখেছে সে। আবছা আলো-আঁধারিতেই রীতিমত চকচক করছে তার শ্যামবরণ দেহটা।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে অচেনা একটা গন্ধে। গন্ধটা ভীষণ বিশ্ৰী, চট করে নাকে লাগে। বিমলের শরীরে মাখা, তেলটা থেকেই এই বিচ্ছিরি গন্ধের উৎপত্তি কিনা, খোদা মালুম!
চোখজোড়া বন্ধ থাকলেও ঠোঁটদুটো অনর্গল নড়ছে তার। নিচু স্বরে কী যেন জপে চলেছে সে। শ্বাসের সঙ্গে বুকের ওঠানামার গতিটা এতটাই ক্ষীণ যে, ভালমত না তাকালে প্রায় নজরেই পড়ে না। কেবল ওই ঠোঁটজোড়া অনড় থাকলে, অবলীলায় একখানা পাথুরে মূর্তি বলে চালিয়ে দেয়া যেত তাকে।
চটজলদি ওখান থেকে সরে এল মালতি; সারা শরীর ঘামছে তার। নাড়ির গতি বেড়ে গেছে অনেকখানি; হাঁটু দুটোতেও ঠিক জোর পাচ্ছে না সে। দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে, চোখের তারায় স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। কোনমতে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে নিজের ঘরে ফিরে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিল সে।
কী হয়েছে লোকটার? মাথা-টাথা খারাপ হয়ে যায়নি তো? পাগল তো সে আগেই ছিল, এখন কি তাহলে বদ্ধ উন্মাদ বনে গেছে? কী করা উচিত এখন মালতির? ভাইদেরকে সবকিছু খুলে বলবে?
বহুদিন ধরেই বিমলকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছে মালতির আত্মীয়-স্বজনেরা, কিন্তু মালতি কখনও রাজি হয়নি। লোকটাকে পছন্দ না করলেও, কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে। অতীতে একে অপরকে ভালবাসত ওরা, সুখের একটা সংসার ছিল। চাইলেই সেসব দিনের অজস্র টুকরো-টুকরো সুখের স্মৃতিগুলো মন থেকে তাড়ানো যায় না।
ভালবাসা নেই; কিন্তু বিমলকে ছেড়ে অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে নতুন করে ঘর বাঁধার কথা কল্পনাও করতে পারে না মালতি। স্বামীকে ছাড়া যায় ঠিকই, কিন্তু নিজের সন্তানের পিতাকে কি অস্বীকার করা যায় কখনও?
এতদিন ঘরে সুখ ছিল না সত্যি, তবে জীবন ঠিকই চলছিল তার নিজস্ব গতিতে। কিন্তু এখন? একজন উন্মাদের সঙ্গে সংসার করাটা কতটা নিরাপদ?
আজ অবধি মালতির শীতল আচরণের জন্য কখনও কৈফিয়ত চায়নি বিমল, নীরবেই সহ্য করে গেছে সমস্ত অবহেলা। এজন্যই হয়তো তাকে ছেড়ে যেতে মন সায় দেয়নি মালতির। তার অবচেতন মন হয়তো দেখতে চেয়েছে, তাকে ঠিক কতটা ভালবাসে বিমল!
পরের সন্ধ্যায় বিমল খেতে বসলে, নিজের অজান্তেই টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল মালতি। নিজ হাতে খাবার তুলে দিল বিমলের টিনের থালায়।
ব্যাপারটা বহু বছর পর ঘটলেও, খুব স্বাভাবিকভাবেই নিল বিমল। এমন ভাব করল, যেন রোজই তাকে খাবার বেড়ে দেয় মালতি!
হালকা গলায় বলল, ‘তুমি খাবে না?’
মুখ তুলে তার দিকে তাকাল মালতি। জবাব দেবে কিনা, সেটাই বোধহয় ভাবল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, ‘পরে খাব। তুমি খাও।’
আলতো করে মাথা নাড়ল বিমল, মুখে কিছু বলল না। প্লেটের খাবারের দিকে মনোযোগ দিল সে। হাত বাড়িয়ে খানিকটা নুন তুলে নিয়ে, ভাত মাখিয়ে,
খেতে শুরু করল।
হতবাক মালতি, কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল বিমলের নিরাসক্ত চেহারার দিকে। তারপর হতাশ গলায় বলল, ‘তোমার সমস্যাটা কী?’
খাওয়া অব্যাহত রাখল বিমল। ‘কই! কোন সমস্যা নেই তো!’
‘সমস্যা না থাকলে অফিসে যাচ্ছ না কেন? চাকরি চলে গেছে?’
‘চাকরি চলে যাবে কেন! কয়েক দিনের ছুটি নিয়েছি।
‘কেন? কী করো তুমি সারাদিন ঘরে বসে?’ সতর্ক গলায় জিজ্ঞেস করল মালতি।
এতক্ষণে মুখ তুলে তাকাল বিমল; আগ্রহ ফুটে উঠেছে দু’চোখে। ‘জীবনটা পাল্টাতে চাইছি, বুঝলে…ভীষণ একঘেয়ে হয়ে পড়েছিল সবকিছু।’
‘ও আচ্ছা। ভাল,’ নিরুত্তাপ গলায় বলল মালতি। ‘তা কীভাবে করতে চাচ্ছ কাজটা, শুনি?’
চওড়া হাসি ফুটল বিমলের চেহারায়। ‘দাদার লেখা একটা ডাইরি খুঁজে পেয়েছি। ওতেই বিশদভাবে লেখা আছে সমস্ত নিয়মকানুন। ‘
‘দাদা! তোমার দাদা?’ দ্রুত বলে উঠল মালতি। ‘আমি তো জানতাম, পাগল ছিলেন উনি।
নিমেষেই হাসি মুছে গেল বিমলের মুখ থেকে, চোখ-মুখ কঠিন হয়ে গেল। ‘ভুল জানতে। মোটেও পাগল ছিলেন না তিনি। লোকে খামোকাই তাঁর নামে ভুলভাল বলত। সত্যি বলতে, অনেক বড় একজন মূষিক-সাধক ছিলেন তিনি।’
‘কী ছিলেন?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল মালতি।
‘মূষিক…ইঁদুর, ইঁদুর। ইঁদুরের সাধনা করতেন তিনি।’
‘ইঁদুরের সাধনা!’ আপনমনে বিড়-বিড় করল মালতি। ‘তাহলে তো ঠিকই বলত লোকে! সত্যিই দেখছি বদ্ধ উন্মাদ ছিল লোকটা!’
