‘চীনদেশে লোকে শূ নামে ডাকত ইঁদুরকে। ওরা বিশ্বাস করত, যে কয়টি প্রাণী সূর্য থেকে আলো বহন করে নিয়ে আসে মর্ত্যে, ইঁদুর তার মধ্যে অন্যতম। ইঁদুরকে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের রক্ষাকর্তাও ভাবত ওদের কেউ-কেউ।
‘মিসরে ওদেরকে ভাবা হত ধ্বংসের দেবতা। মিসরীয়রা বিশ্বাস করত, ইঁদুরদের অবাধে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সর্বময় ক্ষমতা দিয়েছেন ঈশ্বর।
‘আইরিশরা মনে করত, শিল্প-সাহিত্য সম্বন্ধে বেশ ভাল ধারণা রাখে ইঁদুরেরা। কোন চমৎকার কবিতা কিংবা সুরেলা গানের প্রতি সহজেই ওরা আকৃষ্ট হয়! তখন সম্মোহিত করে ওদের দিয়ে যে কোন কাজ করিয়ে নেয়া যায়। সম্ভবত এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই এককালে হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মত গল্পগুলো রচিত হয়েছিল।
‘রোমানদের বিশ্বাস ছিল, ইঁদুরেরা সৌভাগ্য বয়ে আনে। তবে খ্রীষ্টানদের কেউ-কেউ আজও শয়তানের প্রতীক হিসেবেই দেখে ইঁদুরকে।
‘জাপানে ওদেরকে বলা হত, নাজুমি। ভাবা হত, দেবতা দাইককুর বার্তাবাহক এই ইঁদুরেরা। জাপানীদের বিশ্বাস ছিল, নতুন বছরের কেক যদি ইঁদুরেরা স্বেচ্ছায় খেয়ে যায়, তাহলে সে বছর বেশ ভাল ফলন হবে।
‘কিছু-কিছু আফ্রিকান উপজাতি এখনও যুদ্ধের ময়দানে ইঁদুরের লোমের মুকুট পরে। তারা বিশ্বাস করে, এই মুকুট ওদেরকে সকল প্রকারের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবে। এমনকী শত্রুর ছোঁড়া তীর-বল্লমও ওদের গায়ে না লেগে পিছলে যাবে!
‘ইঁদুরদের নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না মায়ানদের। ইঁদুরের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখত ওরা। শত্রুর হাত থেকে বাঁচার পরিখা, মাটির নীচে সুরঙ্গ খোঁড়া, এসবকিছু সম্ভবত ইঁদুরদের কাছ থেকেই শিখেছিল মায়ানরা। এমনকী প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে ইঁদুরদের দেখাদেখি মাটির নীচে সম্পূর্ণ শহরও গড়ে তুলেছিল ওরা। শহরগুলোয় ঢোকার মুখে যে ধাতুর তোরণ থাকত, প্রায়শই সেটায় আঁকা থাকত বিশাল কোন ইঁদুরের ছবি। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ প্রায়ই ইঁদুরদের জন্য ভোজসভার আয়োজন করত মায়ানরা!
‘ইঁদুর আকৃতির বিশাল-বিশাল সব মূর্তি শহরে স্থাপন করেছিল অ্যাজটেকরা। আপাতদৃষ্টিতে নিরেট মনে হলেও, এর বেশিরভাগই ছিল পুরোপুরি ফাঁপা। নগর রক্ষকের দল অনায়াসে ওগুলোর ভিতরে লুকিয়ে থাকতে পারত। শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে যুদ্ধের ময়দানেও ব্যবহার করা হত এসব ইঁদুরের মূর্তি।
‘সুমেরীয়দের বিশ্বাস ছিল, ইঁদুরেরা মূলত চাঁদে বসবাস করে। আর চাঁদের গায়ের কৃষ্ণ গহ্বরগুলো আসলে ওদেরই সৃষ্টি!
‘আপাতত আর এসব নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না, নয়তো এগুলো বলতে বলতেই এই পুস্তকের সবক’টি পাতা ফুরিয়ে যাবে। তুমি নিজেই বরঞ্চ ইঁদুরদের সম্পর্কে খানিকটা পড়াশুনা করে নাও। তারপরও যদি এই ব্যাপারে তোমার আগ্রহ অব্যাহত থাকে, তবেই কেবল পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে অগ্রসর হবে। সেখানে আমি তোমাকে মূষিক-সাধনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাব। তোমাকে শেখাব, কী করে এই মহা ধুরন্ধর প্রাণীকুলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। কীভাবে ওদেরকে তোমার আজ্ঞাবহ করতে হয় এবং কেমন করে ওদের সাহায্যে খুঁজে পেতে হয় নরকের দরজা! আপাতত, বিদায়!’
চার
অসুস্থতার দোহাই দিয়ে অফিস থেকে দিন কয়েকের ছুটি নিল বিমল। আবেদন করা মাত্রই ছুটি মঞ্জুর হয়েছে তার, কোনরকম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। দীর্ঘকালের চাকরি জীবনে ইতিপূর্বে একদিনের জন্যও অফিস কামাই দেয়নি সে!
ইঁদুর বিষয়ক কিতাবের খোঁজে পুরো শহর চষে বেড়াল বিমল। সদ্য প্রকাশিত ঝকঝকে বই থেকে শুরু করে প্রাচীন আমলের রদ্দিমাল, যেখানে যা পেল, খুঁজে-খুঁজে জড় করল। তারপর নাওয়া-খাওয়া শিকেয় তুলে একনাগাড়ে পড়তে শুরু করল।
মালতি বুঝল, কোথাও কোন একটা গণ্ডগোল হয়েছে; কিন্তু পরোয়া করল না সে। উচ্ছন্নে যাক ব্যাটা, কী আসে যায়?
তবে আগের তুলনায় কাজের পরিমাণ খানিকটা বেড়েছে তার, এক বেলার পরিবর্তে এখন দু’বেলার খাবার রাঁধতে হয় তাকে। তবে বেশিরভাগ সময় দিনে একবারই কেবল খাবার খায় বিমল, সেটাও একেবারে ভর সন্ধ্যায়। বাকিটা সময় মুখ গুঁজে থাকে বইয়ের পাতায়।
মালতিকে দেখেও যেন দেখে না সে; সবসময় চোখে-মুখে কীসের যেন একটা ঘোরলাগা দৃষ্টি তার! বিমলের চোখের দিকে চোখ পড়লে খানিকটা অস্বস্তিতে ভোগে মালতি; পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো লোকটা?
অবশেষে সপ্তাহ খানেক বাদে মূষিক সম্বন্ধীয় জ্ঞান আহরণ শেষ হলো বিমলের। অনেকটা সময় নিয়ে স্নান সারল সে, তারপর ভরপেট ভাত খেল। মালতির দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসিও দিল; গত কয়েক বছরে যে কাজটা একবারও করেনি সে!
নিজেকে ভীষণ হালকা লাগছে তার; শেষতক খুঁজে পেয়েছে নিজের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। দাদার মত মূষিক সাধক হবে সে, জানবে অন্ধকার জগতের নানা খুঁটিনাটি। সাধারণ একঘেয়ে জীবনের প্রতি ঘেন্না ধরে গেছে তার। কী লাভ এভাবে অহেতুক দিনের পর দিন শ্বাস নিয়ে?
যতদিন বাঁচবে, জীবনটাকে পুরোদমে উপভোগ করবে সে। জীবিত মানুষ হিসেবে নরক পরিদর্শনের সুবর্ণ সুযোগটা হেলায় হারানোর কোন ইচ্ছেই নেই তার। বিফল হলেও ক্ষতি নেই তেমন; মাঝখানের উত্তেজনাটাই বা কম কীসে?
সেই সন্ধ্যায় আবারও দাদার ডাইরিটা পড়তে শুরু করল বিমল। একে-একে জানতে লাগল মূষিক-সাধনার যাবতীয় নিয়ম কানুন। কিছু-কিছু বিবরণ এতটাই বীভৎস যে, পড়তে গিয়েই শরীরের সবক’টা লোম দাঁড়িয়ে গেল তার; চোখ-মুখ কুঁচকে গেল।
