‘হে, শিষ্য, তোমাকে অভিনন্দন। আজ থেকে সজ্ঞানে রোমাঞ্চকর এক নয়া জীবন বেছে নিয়েছ তুমি। এই সাধক জীবন বড় বিচিত্র, বড্ড আনন্দময়। তোমাকে আশীর্বাদ করছি, নিশ্চয়ই তুমি সফলকাম হবে।
‘শুধু একটা বিষয় মাথায় রাখবে, তোমাকে ধারাবাহিকভাবে পড়তে হবে এই পুস্তক। ভুলেও কখনও এক পৃষ্ঠার কাজ সমাপ্ত না করে অন্য পৃষ্ঠায় যাওয়া চলবে না। তাহলে সমস্ত সাধনাই বৃথা যাবে।
‘দেবতারা আকাশে থাকেন, দানবেরা পাতালে। আর আমরা মানুষ জাতি, এই দুয়ের মধ্যখানে অসহায়ের মত আটকে আছি।
‘লক্ষ-কোটি বছর আগে দেবতাদের সঙ্গে দানবেরা এক মরণপণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। তার পরপরই নিজেদের সুবিধামত এলাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছিল ওরা। স্বর্গ স্থাপন করা হয় অন্তরীক্ষে আর নরকের ঠাঁই হয় পাতালে।
‘নভোমণ্ডলের পরিধি অসীম, তবে পাতালের ব্যাপ্তি অসীম নয়। তাই স্বৰ্গ দর্শন মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব হলেও, নরকের খোঁজ পাওয়া ততটা কঠিন নয়।
‘মানুষের খুব কাছাকাছি বসবাস করে, আবার পাতালের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ আছে, এমন কোন প্রাণীর কথা কি মনে পড়ে তোমার? পড়ছে না?
‘আমিই বলে দিচ্ছি তাহলে; মূষিক। যাকে আমরা সচরাচর ইঁদুর বলে ডাকি। মাটির ওপরে ওদের নিত্য আনাগোনা, তবে মাটির নীচেই ওদের স্থায়ী বসবাস।
‘আমাদের চোখের আড়ালে সুরঙ্গ খুঁড়ে বিশ্বের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে চলে যেতে পারে ওরা। বিনা বাধায় চষে বেড়াতে পারে গোটা পৃথিবী।
‘পাতালপুরী সম্পর্কে ওদের চেয়ে বেশি জ্ঞান আর কারোরই নেই। এই জ্ঞান ওরা পেয়েছে বংশানুক্রমে; সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে। একজোড়া ইঁদুরকে ঠিকঠাক বংশ বিস্তার করতে দিলে বছর শেষে সংখ্যাটা সর্ব সাকল্যে প্রায় হাজারে গিয়ে ঠেকবে। বুঝতে পারছ, আমাদের অগোচরে কত লক্ষ-কোটি ইঁদুর ছড়িয়ে আছে এই বিশ্বজগতে?
‘হাজার-হাজার বছর ধরে পাতালপুরী সম্পর্কিত জ্ঞান আহরণ করেছে ইঁদুরেরা, লুকিয়ে রেখেছে নিজেদের ভিতরে। অন্য কোন প্রাণীর সঙ্গে ভাগাভাগি করেনি, মানুষের সাথে তো নয়ই।
‘তবুও বুদ্ধিমান মানুষ ঠিকই জেনেছে ওদের বিভিন্ন ক্ষমতার কথা। যুগে- যুগে এর উপযুক্ত সম্মান দিতেও কখনও কার্পণ্য করেনি। তবে আজও তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতাটার কথা গোপন রয়ে গেছে সিংহভাগ মানুষের কাছে।
‘মানুষ জানে না, নিয়মিতই নরকে আসা-যাওয়া করে ইঁদুরেরা; ওরাই নরকের আসল পাহারাদার!
‘আজ আমরা যাকে আগ্নেয়গিরি বলি, সেগুলো আর কিছুই নয়, নরকের একেকটা খোলা মুখ। মানুষকে শায়েস্তা করার জন্যই ইঁদুরেরা কালে-কালে খুলে দিয়েছে ওগুলো। লাভার উদ্গিরণ শেষে এমনভাবে বন্ধ হয়ে যায় পথগুলো যে, ওপথে আর নরকের হদিস মেলে না। কিংবা হয়তো গোটা নরকটাকেই সরিয়ে ফেলা হয় ওখান থেকে। কেবলমাত্র ইঁদুরেরাই জানে নরকের সঠিক অবস্থান এবং ঠিক কীভাবে ওখানে যেতে হয়।
‘ইঁদুরেরা ক্ষমতাবান, ভীষণ ক্ষমতাবান। যুগে-যুগে পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা লোকগাথায় ওদের সামর্থ্যের বয়ান আমরা পেয়েছি।
‘ক্ষমতা এবং উন্নয়নের দেবতা গণেশ। লোকে বিদ্যার দেবী সরস্বতী কিংবা সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর চেয়ে তাঁর পুজো কোন অংশে কম করে না। তিনি যে একটা ইঁদুরের পিঠে চড়ে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে ঘুরে বেড়াতেন, সেটা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়। কিন্তু এটা কি জানো, ওই বাহন ইঁদুরটা আদতে কী ছিল?
‘গণেশ পুরাণের মতে, দেবতা ইন্দ্রের দরবারে একজন সঙ্গীতজ্ঞের নাম ছিল, ক্রাঞ্চা। একদিন ভুলক্রমে মুনি ভামাদেভাকে অপমান করে ফেলেন তিনি। অভিশাপ দেয়া হয় তাঁকে; শেষটায় একটা ইঁদুরে পরিণত হন তিনি।
‘কিন্তু তাঁর ছিল প্রচণ্ড রাগ আর সেই সঙ্গে দানবীয় শারীরিক কাঠামো। ক্রোধান্বিত হয়ে ঋষি পরোশারার আশ্রমে হামলা চালান তিনি, তছনছ করে দেন গোটা আশ্রম। নিরুপায় ঋষি গণেশের দরবারে আর্জি জানান; তাঁর ডাকে সাড়া দেন গণেশ। বিশাল শুঁড় দিয়ে তিনি চেপে ধরেন ক্রাঞ্চার গলা; সিদ্ধান্ত নেন, এখন থেকে ওই ইঁদুরের পিঠেই সওয়ার হবেন।
‘কিন্তু গণেশের বিশালকায় দেহের ভার বহন করার সামর্থ্য ছিল না ওই ইঁদুরটার। তাই গণেশ পিঠে চড়া মাত্রই ব্যথায় ককিয়ে ওঠে ওটা। এতে গণেশের মনে দয়ার উদ্রেক হয়, তাই নিজেকে অনেকটা হালকা করে নেন তিনি। এরপর থেকে আর তাঁকে বইতে কোনরকম সমস্যা হয়নি বাহক ইঁদুরটার।
‘একজন মহা পরাক্রমশালী দেবতা হয়েও সামান্য একটা ইঁদুরের পিঠে সওয়ার হতে কুণ্ঠাবোধ করেননি গণেশ; উল্টো ইঁদুরটাকে প্রাপ্য সম্মান দিয়েছিলেন তিনি। নিজের ভাগের লাড্ডু খেতে দিতেন ওটাকে, ওটার এঁটো করা খাবারও খেয়ে নিতেন নির্দ্বিধায়। সর্বদাই একান্ত একজন বন্ধুর মতন আচরণ করতেন প্রাণীটার সঙ্গে।
‘গণেশের শরীর ছিল প্রকাণ্ড, মাথা ছিল হাতির। যতই তিনি নিজেকে হালকা করুন না কেন, অতবড় একখানা পাহাড়সম দেহ বইতে পারাটা, ইঁদুরটার শারীরিক সামর্থ্যেরই প্রমাণ। পরবর্তীতে গণেশের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতারই প্রতীক হয়ে উঠেছিল ইঁদুরটা। আপাতদৃষ্টিতে সামান্য একটা ইঁদুর আদতে কতখানি গুরুত্ব বহন করে, সবাইকে সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন গণেশ। অবশ্য হিন্দুদের কেউ-কেউ ইঁদুরকে অপদেবতা কিংবা শয়তানের প্রতিমূর্তি হিসেবেও বিবেচনা করে থাকে।
