একই বাড়িতে একই ছাদের নীচে বসবাসরত এই দুটো প্রাণীর মধ্যে লোক দেখানো সামাজিক সম্পর্কটা ছাড়া, আদতে আর কোন সম্পর্কই নেই। না শারীরিক, না মানসিক।
ওই দুর্ঘটনাটার পর থেকে আজ অবধি মালতিকে কখনও ছুঁয়েও দেখেনি বিমল। মালতির মধ্যেও ঘনিষ্ঠ হওয়ার কোনরকম আগ্রহ প্রকাশ পায়নি।
লোকে ভাবে, ওদের বর্তমান সম্পর্কটা খানিকটা শীতল বটে, তবে অচিরেই এই অচল অবস্থা পাল্টে যাবে। সংসারে আবার ছেলেপুলে এলেই ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু। আবারও সুখের সুবাসে ভরে উঠবে ঘর-বাড়ি।
তবে সন্তান জন্মদানের প্রাকৃতিক উপায়টা থেকে যে তারা দু’জন যোজন- যোজন দূরে সরে আছে, এটা কারও কল্পনাতেও নেই।
মাথাব্যথার ব্যারাম আছে মালতির। অতি অল্প শব্দেই চট করে মাথা ধরে যায় তার। টিভির দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না; চোখ জ্বলে। তাই টিভি বলতে গেলে দেখেই না সে।
তবে রাতের আহার পর্ব সমাপ্ত হলে টিভিতে খানিকক্ষণ খবর দেখে বিমল সেটাও অবশ্য পুরোপুরি শব্দহীনভাবে, যেন মালতির কোন অসুবিধে না হয়।
এভাবে নিঃশব্দে টিভি দেখতে-দেখতে লিপ রিডিঙে অনেকখানি দক্ষ হয়ে উঠেছে বিমল। বহু দূর থেকেও কেবল ঠোঁট নাড়ানো দেখে মানুষজনের কথোপকথন বুঝতে পারে সে।
তার অফিসের কলিগদের কারও ধারণাও নেই যে, ওদের প্রত্যেকের কত- শত হাঁড়ির খবর জানা আছে বিমলের!
তিন
এক ছুটির দিনের সকালে বিমল করের নিস্তরঙ্গ জীবনটা হঠাৎ করেই আমূল বদলে গেল। ভোরবেলায় চোখ মেলা মাত্রই তার মনে হলো, এভাবে সবার অপছন্দের পাত্র হয়ে গোটা জীবনটা পার করে দেয়ার কোন মানেই হয় না!
সর্বজনবিদিত বাইরের মেকী খোলসটা ভাঙতে হবে তাকে; পুরোপুরি পাল্টে ফেলতে হবে নিজেকে। অন্য কারও জন্য নয়, কেবল নিজের জন্যই বাঁচতে হবে তাকে।
জীবন যদি রোমাঞ্চকরই না হয়, অহেতুক অক্সিজেনের অপচয় করে কী লাভ?
স্টোর রুমের আবর্জনার দঙ্গল ঘেঁটে মান্ধাতা আমলের একটা সিন্দুক বের করল বিমল। খুব একটা বড় নয় জিনিসটা; বহুদিন সেঁতসেঁতে জায়গায় পড়ে থাকার কারণে ডালার এখানে-ওখানে রঙ চটে গেছে।
সিন্দুকটা ওর দাদার সম্পত্তি, উত্তরাধিকার সূত্রে ওটার মালিক হয়েছে বিমল। দাদার নিজের হাতে লেখা একটা জরাজীর্ণ ডাইরি ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই ওটার ভিতরে। বোতাম আকৃতির ছোট-ছোট কিছু পাথর অবশ্য আছে; তবে ওগুলো যে ঠিক কী কাজে লাগে, খোদা মালুম!
বিমলের দাদাকে লোকে পাগল বলত। ঘর-সংসার বাদ দিয়ে অদ্ভুতুড়ে সব কাজে মেতে থাকত লোকটা।
তন্ত্র-মন্ত্রর চর্চা করত; বেশ কয়েকবার বহুদিনের জন্য গায়েবও হয়ে গিয়েছিল সে। কোথায় যেত, কী করত, সেটা কখনও কাউকে খোলসা করেনি সে।
এমন মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানো যায় না। তাই বাধ্য হয়েই তার দাদীকে আবারও বিয়ে দিয়েছিল তার ভাইয়েরা। ততদিনে অবশ্য বিমলের বাবা বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল।
মায়ের নতুন সংসারে উপদ্রব হতে চায়নি বলে অর্ধ-উন্মাদ বাবার সঙ্গেই রয়ে গিয়েছিল সে। তবে বাবার কোন প্রভাব নিজের ওপর পড়তে দেয়নি লোকটা, অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতই ঘরকন্না সামলেছে সে।
স্বভাবতই বাবার সিন্দুক কিংবা ডাইরির প্রতি কোনরকম আগ্রহ ছিল না তার। কেবল পূর্বপুরুষদের আত্মাকে কষ্ট দিতে চায়নি বলেই সিন্দুকটাকে ঘরে রেখে দিয়েছিল সে, নাহয় বহু আগেই আঁস্তাকুড়ে ঠাঁই পেত ওটা।
ডাইরিটা বগলদাবা করে বৈঠকখানায় চলে এল বিমল। সোফায় আয়েশ করে বসে পড়তে শুরু করল।
(মূল ডাইরিটাতে সবকিছু সাধু ভাষায় থাকলেও, বোঝার সুবিধার্থে এখানে চলিত ভাষা ব্যবহার করা হলো।)
দাদার হাতের লেখা চমৎকার, একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার। পড়তে কোন অসুবিধাই হলো না বিমলের।
প্রথম পাতাতেই গোটা-গোটা অক্ষরে লেখা
‘হে, আমার প্রাণপ্রিয় বংশধর, তোমাকে আজ এক রহস্যময় পথের সন্ধান দিতে চলেছি আমি। তবে আগে বাড়ার পূর্বে তোমাকে সতর্ক করছি, কোনরকম পিছুটান থাকলে এখনই পঠনে ইস্তফা দাও; এই পথ তোমার জন্য নয়। ডাইরিটা রেখে দাও যথাস্থানে, সংসার বিবাগী অন্য কোন সাধকের জন্য; যে একদিন আমার এই সাধনার অংশ হবে।
‘একবার এই পথে পা বাড়ালে, পিছিয়ে আসার আর কোন পথ থাকবে না। এলে ভয়াবহ অভিশাপ নেমে আসবে তোমার ওপরে।
‘অতএব, ভেবেচিন্তে অগ্রসর হও। জাদুর নেশা, এ পৃথিবীর সবচাইতে বড় নেশা। একবার এই নেশায় মজলে, সাধারণ জীবন অর্থহীন মনে হবে।
‘সচেতন অনুসারীই কাম্য আমার, পথহারা পথিক নয়। তোমাকে শুভেচ্ছা।’ ডাইরিটা পাশে রেখে চোখ মুদে খানিকক্ষণ ভাবল বিমল। সত্যিই কি তার কোন পিছুটান আছে?
না। নেই।
দিন কয়েকের জন্য সে বেমালুম গায়েব হয়ে গেলে কিছুই যাবে-আসবে না মালতির। এমনকী চিরকালের জন্যও যদি গুম হয়ে যায় বিমল, একরত্তি দুঃখও পাবে না সে; উল্টো মুক্তি দেয়ার জন্য দিনরাত মনে-মনে তাকে ধন্যবাদ দেবে!
আচ্ছা, তার বাবা কি দাদার লেখা এই ডাইরিটা পড়েছিল? মনে হয়, পড়েনি। যদিও বা কখনও হাতে নিয়ে থাকে, নিশ্চয়ই এই প্রথম পাতাটা পড়েই ক্ষান্ত দিয়েছিল সে।
সংসারী মানুষ ছিল বাবা, বৈরাগী হওয়ার কোন খায়েশ ছিল না তার। চারিত্রিক নির্লিপ্ততার অনেকখানি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে বিমল।
সাতপাঁচ ভেবে আবার ডাইরিটা হাতে তুলে নিল বিমল। মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল।
