‘হইসেডা কিতা? সকাল-সকাল চেহারাডা কাউয়ার পুটকির মত কইরা রাখসস কিল্লাইগ্যা?’ খেঁকিয়ে উঠল চেয়ারম্যান।
ধমক খেয়ে লতিফ মিয়ার মুখের অন্ধকার বাড়ল বৈ কমল না। ইতস্তত করে বলল, ‘একটা লাশ পাওয়া গেছে, চেরম্যান সাব। মাখন মাঝির বউয়ের লাশ।’
‘কস কী!’ নিজের অজান্তেই চেঁচিয়ে উঠল মতি। হতভম্ব হয়ে লতিফ মিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে সে।
‘মাইনষে আফনের লগে কথা কইতে চায়। সবতে আইছে কাছারি ঘরের সামনে।’
নিজেকে ফিরে পেতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল মতির। সদ্য মুখে দেয়া অচর্বিত গো’মাংস-রুটি কোঁৎ করে গিলে নিল সে। তারপর গ্লাসের পুরো পানিটুকু গলায় চালান করে দিয়ে সটান উঠে দাঁড়াল।
কাছেপিঠেই ছিল চেয়ারম্যানের বড় বউ রাহেলা। লতিফ মিয়ার কথাগুলো স্পষ্টই শুনতে পেয়েছে সে। পর্দার আড়াল থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘ঘটনা কী, লতিফ মিয়া? ক্যামনে মরসে মাইয়াডা?’
চট করে একবার চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়েই চকিতে চোখ নামিয়ে নিল লতিফ মিয়া। নিচু গলায় বলল, ‘কইতে পারি না, আম্মা। লাশ পাওয়া গেসে মরাখালে। মীর্জা বাড়ির ঘাড়ে।’
দ্রুত পা চালিয়ে কাছারি ঘরের দিকে রওনা হলো মতি চেয়ারম্যান। বিনাবাক্যব্যয়ে তাকে অনুসরণ করল লতিফ মিয়া। আপাতত রাহেলার আর কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে না বলে যারপরনাই খুশি সে।
রাহেলাকে অজ্ঞাত কারণে ভীষণ ভয় পায় সে। অথচ আজ অবধি তার সঙ্গে কখনও উচ্চস্বরে কথা বলেনি রাহেলা, ধমক দেয়া তো পরের ব্যাপার।
লোকে বলে, চেয়ারম্যানের বড় বউ সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। কেবল তার দিকে তাকিয়েই খোদা এখনও গজব ফেলেনি চেয়ারম্যানের উপর!
লতিফ মিয়া খেয়াল করে দেখেছে, রাহেলার সামনে চেয়ারম্যান সাহেবও কেমন যেন গুটিয়ে থাকে, হয়তো খানিকটা ভয়ও পায়। আর সেই ভয়টাই হয়তো স্থানান্তরিত হয়েছে লতিফ মিয়ার মনে। স্বয়ং গুরু যেখানে ভীত, শিষ্যর সেক্ষেত্রে কী-ই বা আর করার আছে!
.
কাছারি ঘরের সামনে বিশাল একটা জামগাছ আছে। দু’জন মানুষ মিলেও বেড় পাওয়া যায় না, এমনই গুঁড়ির গড়ন। অনেকদূর অবধি ছড়ানো-ছিটানো ডালপালার কারণে প্রখর রোদেও জায়গাটায় ছায়া পাওয়া যায়। সভা-সালিশের কাজগুলো সাধারণত এখানেই করে মতি চেয়ারম্যান।
তাকে হন্তদন্ত হয়ে মজলিশে ঢুকতে দেখে জমায়েতের মধ্যে স্থূল একটা পরিবর্তন হলো। নিমিষেই থেমে গেল সমস্ত কানাকানি-ফিসফাস, সবাই একযোগে তাকিয়ে রইল চেয়ারম্যানের দিকে।
বারান্দায় গদিআঁটা একখানা বেতের চেয়ার শোভা পাচ্ছে। ধীরেসুস্থে ওটায় আয়েশ করে বসল মতি। তারপর অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল অপেক্ষমাণ মুখগুলোর দিকে।
পুরো আঙিনা জুড়ে হোগলা বিছানো, তাতেই আসন পেতে বসেছে সবাই। অপেক্ষাকৃত বয়স্করা বসেছে সামনের সারিতে, চেয়ারম্যানের মুখোমুখি; এটাই নিয়ম।
‘ঘটনা কিতা? খুইল্যা কও দেহি,’ গম্ভীর’ কণ্ঠে বলল মতি। পুরোপুরি শান্ত দেখাচ্ছে তাকে। সামনের সারিতে বসা একজন বুড়োমতন লোক নড়েচড়ে বসল। মাথার চুলের বেশিরভাগই গত হয়েছে তার, যে কয় গাছি এখনও লড়াই করে টিকে আছে সেগুলোও ধবধবে সাদা। মুখের বলিরেখা গুণতে বসলে বেলা পড়ে যাবে, তবুও কাজটা শেষ হবে কিনা সন্দেহ আছে।
চরম উৎসাহে নিজের বয়ান দিতে শুরু করল লোকটা।
‘জগইন্য একখান ঘটনা হইসে, চেরম্যান সাব। মাখনলালের নয়া বউডার লাশ ভাইস্যা ওঠসে মরাখালে। মীর্জা বাড়ির ঘাড়ে ডোল কলমির দঙ্গলের লগে আটকাইয়া আছিল হেতির লাশটা। গতরে কোন কাফর নাই। এক্কেরে ল্যাংটা। শইলের জায়গায়-জায়গায় গর্ত হইয়া গেসে। কীয়ে খুবলাইয়া খাইয়া ফালাইসে কেডা জানে! মাখইন্যা তো নাও লইয়া চইলা গেছে গঞ্জে, হেতিরে কেডা মারসে খোদা মালুম! কেউই কিছু কইতে পারে না, চেরম্যান সাব।’
চেয়ারে নড়েচড়ে বসল মতি। বেশ অবাক হয়েছে সে। পরনে ব্লাউজ- পেটিকোট ছিল না সত্যি, কিন্তু শাড়িটা ভালমত শরীরে পেঁচিয়েই মেয়েটাকে মরাখালে ফেলা হয়েছে, উলঙ্গ ফেলা হয়নি। কাপড়টা খুলল কীভাবে?
তাছাড়া হিসেব মত লাশটা ভেসে যাওয়ার কথা খালিশপুরের দিকে; স্রোত ওদিকেই বইছিল। অথচ ওটাকে কিনা পাওয়া গেল সম্পূর্ণ উল্টোদিকে, মীর্জা বাড়ির ঘাটে!
এত তাড়াতাড়ি মেয়েটার মাংসই বা খেল কীসে? শিয়াল? ওরা কি পানিতে নেমেও লাশ খায় নাকি?
‘কী আজিব কারবার! পুরা আচানক হইয়া গেলাম। লাশটা অহন কই?’ চেহারায় গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে মতি, গলার স্বরও কঠিন
‘মীর্জা বাড়ির উড়ানে রাইখ্যা আইছি। পুরান একটা কাফর দিয়া ঢাইক্যা দিসি। দুইন্নার বেড়িরা হেতিরে দেহনের লাইগ্যা মীর্জা বাড়িত জড় হইসে। হের লাইগ্যা জয়নাইল্যারে রাইখ্যা আইছি, ভিড় সামলাইব হেতে।’
‘কেডা পাইসে লাশটা? প্রথমে দেখসে কেডা?’
‘আই দেখসি, চেরম্যান সাব,’ কিন্নর কণ্ঠের জবাব এল জমায়েতের পিছন দিক থেকে। ধীরে-ধীরে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল এক কিশোর। খালি গা, পরনে আধছেঁড়া ময়লা একটা লুঙ্গি। নাক দিয়ে সিকনি ঝরছে, দেখলেই গা গুলিয়ে আসে। গলায় কালো সুতো দিয়ে বাঁধা মস্ত একখানা পিতলের তাবিজ।
‘খালের ধারে হাগতে গেসিলাম, চেরম্যান সাব। পরথমে বুইজতে পারি নাই জিনিসটা কিতা। ভাল কইরা দেহনের লাইগা কাছে আগাইয়া গেসিলাম। দেইখ্যা কিন্তুক বহুত ডরাইসি। গলা ফাডাইয়া এমুন এক চিক্কুর দিসি, হেই চিক্কুর হুইন্যা হগলে দৌড়াইয়া ঘাডে আইয়া পড়সে,’ দাঁত কেলিয়ে হাসতে-হাসতে কৃতকর্মের বর্ণনা দিল ছেলেটা।
