শেষ কবে আস্ত এক প্যাকেট বিড়ির মালিক ছিল, অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে ব্যর্থ হলো সে। অবশ্য এ নিয়ে তাকে খুব একটা দোষারোপেরও সুযোগ নেই; কারণ আদতে কখনওই তার পুরো এক প্যাকেট বিড়ি কেনার সৌভাগ্য হয়নি অতীতে।
আজও হত না, যদি না খুশির আতিশয্যে প্যাকেটটা তাকে উপহার দিত মতি চেয়ারম্যান! নির্দিষ্ট কোন বেতন পায় না সে, কাজ করে পেটে-ভাতে। চেয়ারম্যান বাড়ির একটা ঘুপচি ঘরে রাত কাটায়, নিজের বলতে গোটা কয়েক পুরনো কাপড় ছাড়া তেমন কিছুই নেই তার।
জ্ঞান হবার পর থেকে মতিকেই ভগবান মেনে এসেছে সে, যে কোন আদেশ পালন করেছে নির্দ্বিধায়।
শৈশবে গঞ্জের রাস্তায় ওকে কুড়িয়ে পেয়েছিল চেয়ারম্যান। কান্নারত নিষ্পাপ একটি বালককে অসহায়ের মত এখানে-ওখানে ঘুরতে দেখে তুলে এনেছিল নিজের বাড়িতে। তখনও চেয়ারম্যান হয়নি মতি, তবে মাস্তান হিসেবে ততদিনে বেশ নাম কামিয়ে ফেলেছিল সে।
টুকটাক ফুট-ফরমায়েশ খাটা, বিনিময়ে অন্ন-বস্ত্রের নিশ্চয়তা, কারও জন্যই হিসেবটা খুব একটা কঠিন ছিল না।
ধীরে-ধীরে লতিফ মিয়ার কাজের পরিধি বাড়তে থাকল, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল পাপ! সেদিনের সেই ছোট্ট লতিফ মিয়া কালক্রমে হয়ে উঠল, মতি চেয়ারম্যানের ডানহাত, ভাল-মন্দ সমস্ত কাজের দোসর।
লতিফ মিয়া মনে করতে পারে না কে তার বাবা-মা, কী তার বংশ পরিচয়। তবে এ নিয়ে কোন যাতনা অনুভব করে না সে। মতি চেয়ারম্যানকে অভিভাবক হিসেবে পাওয়াটা রীতিমত ভাগ্যের ব্যাপার। গ্রামের অনেকেই এটা নিয়ে ঈর্ষা করে তাকে। যদি কোনদিন লতিফ মিয়ার কিছু হয়ে যায়, জায়গাটা নেয়ার জন্য আগ্রহী প্রার্থীর অভাব হবে না চেয়ারম্যানের।
পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকাল লতিফ মিয়া। চট করে দূরে ছুঁড়ে ফেলল আধপোড়া চতুর্থ বিড়িটা। বেরিয়ে এসেছে মতি। ঘর্মাক্ত, পরিশ্রান্ত; তবে চেহারায় ফুটে আছে প্রচ্ছন্ন পরিতৃপ্তির ছাপ।
‘হারামজাদী মইরা গেছে রে, লতিপ্পা।’
কয়েক মুহূর্ত মূক পশুর মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল লতিফ মিয়া। মাথা কাজ করছে না তার। এইমাত্র যা শুনেছে, ঠিক শুনেছে তো? সত্যিই কি মরে গেছে মেয়েটা?
‘গরিবের মাইয়া এমুন কমজোরি হইব, কেডা জানত! পুরা মজাড়াই মাডি কইরা দিল খানকি।’
‘অহন…? অহন কী করুম, চেরম্যান সাব?’ কোনমতে বলল লতিফ মিয়া। এখনও বিহ্বলতা কাটেনি তার।
‘হেইডাই ভাবতাসি। খাড়া। একটু ভাববার দে,’ পুরোপুরি নিষ্কম্প শোনাল মতির কণ্ঠ। কারণে-অকারণে এযাবৎকালে বহু মানুষ মেরেছে সে; মৃত্যু তার কাছে বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন করে না। কেবলমাত্র নিজের জীবনই মূল্যবান তার কাছে, অন্যদের ব্যাপারে থোড়াই কেয়ার করে সে। পরম নির্ভরতায় তার দিকে তাকিয়ে রইল লতিফ মিয়া। তার জানা আছে, একটা না একটা বুদ্ধি ঠিকই বের করে ফেলবে মতি চেয়ারম্যান। বুদ্ধিতে তার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে, গোটা চৌহদ্দিতে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাধে তো আর পর-পর চারবার চেয়ারম্যান হয়নি লোকটা!
আচমকা তার দিকে ফিরে তাকাল মতি, জ্বলজ্বল করছে দু’চোখের তারা। ‘লাশটা মরাখালে ফালাইয়া দিলে কেমুন হয়? ভাইস্যা চইল্যা যাইব অন্য গেরামে। কেডায় চিনব? বেবাকতে তো আর দেহে নাই মাখইন্যার নয়া বউরে। কী কস?’
প্রভুভক্ত কুকুরের মত মাথা দোলায় লতিফ মিয়া। ‘ভালা বুদ্ধি, চেরম্যান সাব। জব্বর বুদ্ধি।’ কথা না বাড়িয়ে তড়িঘড়ি কাজে নেমে পড়ে সে। চেয়ারম্যানের সাহায্য ছাড়াই রোগা-পাতলা মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে বের করে আনে ঘরের বাইরে। তারপর দ্রুত এগিয়ে যায় মরাখালের দিকে।
.
রাত পোহাবার খুব বেশি বাকি নেই আর। তাই ভিতর-বাড়িতে না গিয়ে কাছারি ঘরেই কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে মতি।
বহুদিন বাদে সে রাতে খুব ভাল ঘুম হয় তার। কাছারি ঘরের শক্ত বিছানা আর পাতলা কাঁথার ওমটাকেই তার কাছে স্বর্গীয় মনে হয়, ছাড়া ছাড়া স্বপ্নও দেখে সে।
তবে নিজের ঘরে রাতের বাকি সময়টা নির্ঘুমই কাটে লতিফ মিয়ার। বিছানায় ক্রমাগত এপাশ-ওপাশ করে, দু’চোখের পাতা এক করতে ব্যর্থ হয় সে। তার কেবলই মনে হয়, কোথাও একটা ঘাপলা হয়ে গেছে!
খোলা জানালার গরাদের ফাঁকে চোখ রেখে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় থাকে সে।
তিন
সচরাচর সাতসকালেই লোকেদের আনাগোনা শুরু হয় চেয়ারম্যান বাড়িতে। নানা রকম তদবির, ছোট-বড় সালিশ; হাঙ্গামার কোন শেষ নেই।
আশপাশের দশ গাঁয়ের মাথা মতি চেয়ারম্যান, তার হুকুম ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ার সাহস পায় না এই তল্লাটে। লোক মন্দ হলেও, নিতান্ত বাধ্য হয়েই তার কাছে আসতে হয় সবাইকে।
তবে আজকের ভিড়টা অন্যান্যদিনের চেয়ে আলাদা, কয়েকগুণ বড়। দেখে মনে হচ্ছে একজনও আর নিজেদের ঘরে বসে নেই, পুরো গ্রামের সব ক’জন ছেলে-বুড়ো এসে জমায়েত হয়েছে চেয়ারম্যান বাড়ির আঙিনায়!
ভিতর বারান্দায় শীতল পাটিতে বসে আয়েশ করে গরুর গোশত আর যবের রুটি চিবুচ্ছিল মতি চেয়ারম্যান, হন্তদন্ত হয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হলো লতিফ মিয়া।
তার পাতিলের তলার মত কালো মুখটা দেখতেই মেজাজ খিঁচড়ে গেল মতির; দিনের শুরুতে কী দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে হারামজাদা!
