‘অডিট আসছে। বাড়তি কাজ করতে হবে। উপায় নেই।’
‘দাদা, আজ আমার শালীর জন্মদিন। না গেলেই নয়। আমার কাজগুলো একটু করে দেবেন, প্লিজ?’
‘ছোট ছেলেটাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাব। চারটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আপনি যদি একটু সাহায্য করেন, তাহলে তিনটায় অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তে পারি, দাদা। ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে ছেলেটা।’
‘ভাইয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাব। আজ একটু জলদি ফিরতেই হবে, দাদা। আমার এই দুটো ফাইল কিন্তু আপনাকে দেখে দিতে হবে আজ। না বললে শুনব না কিন্তু, দাদা।’
‘আপনার ভাবীকে নিয়ে শপিঙে যেতে হবে। জানেনই তো, সংসারে কাদের রাজত্ব চলে। আজ একটু সাহায্য করতে হয় যে, দাদা। এই জীবন আর ভাল লাগে না একদম।’
‘রানু পিসিটা হঠাৎ করে মরে গেল! আপনি যদি একটু সাহায্য করেন আমাকে, মরামুখটা দেখার সৌভাগ্য হবে আমার।’
এভাবেই আসে একের পর এক আবদার, কাউকেই মানা করে না বিমল। নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে লোকের ফাইলগুলো নেয় সে, অনেক রাত অবধি বেগার খেটে কাজগুলো ঠিকঠাক করেও দেয়।
সবার জন্য এত করে, তবুও কারও প্রিয় মানুষের তালিকায় বিমলের নামটা খুঁজে পাওয়া যায় না! কেন যেন কেউই বিশেষ পছন্দ করে না তাকে।
প্রায়ই বিভিন্ন উপলক্ষে কারও না কারও বাড়িতে ছোটবড় পার্টি হয়। অফিসের প্রায় সবাই সেখানে নিমন্তন্ন পেলেও, বিমল কখনও পায় না!
যদিও এ নিয়ে কাউকে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করেনি সে, তবুও মাঝেমধ্যে নিজ থেকেই তাকে কৈফিয়ত দেয় লোকজন। চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, নাকি? সময়ে-অসময়ে প্রায় সবারই তো উপকারে আসে মানুষটা।
অবশ্য অজুহাতগুলোর সবই ভীষণ খেলো ধরনের; কোন বৈচিত্র্য নেই!
‘একেবারে তাড়াহুড়োর মধ্যে হয়েছে পুরো আয়োজনটা। হুলস্থুলের ভিতরে কী থেকে যে কী হয়ে গেল! আপনাকে বলা হয়নি! লজ্জায় একেবারে মরে যাচ্ছি, দাদা।’
‘ছোট আয়োজন। পরিবার আর খুব কাছের কিছু মানুষজন ছাড়া বলতে গেলে আর তেমন কেউই ছিল না।’
‘আপনাকে তো, দাদা, ফোনে পাওয়াই যায় না। কতবার বললাম, অপারেটর পাল্টান। আপনি তো কানেও তোলেন না আমাদের কথা!’
মুখে মৃদু হাসি নিয়ে সমানে দু’হাত চালাতে-চালাতে লোকজনের মিথ্যে অজুহাতগুলো শোনে বিমল, কখনও কোন প্রতিবাদ করে না। কী লাভ?
পাহাড় প্রমাণ কাজ করেও দিন শেষে তার প্রাপ্তির খাতাটা প্রায় শূন্যই বলা চলে। চার বছর হতে চলল, প্রমোশনের শিকেটা এখনও ছিঁড়ল না তার ভাগ্যে।
তার অনেক পরে জয়েন করা একেকজন ফাঁকিবাজ জুনিয়র, কেবল তেলবাজির জোরে পদোন্নতি পেয়ে-পেয়ে বড় অফিসার বনে গেল। কিন্তু এখনও ঠিক আগের চেয়ারেই বহাল রয়েছে বিমল।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবশ্য প্রতি সপ্তাহেই আশ্বাসের বাণী শোনায় তাকে; তার ধৈর্যের প্রশংসা করে।
‘হবে, হবে। এবারে আপনারটা হবেই হবে। মন্ত্রণালয় থেকে ফাইনাল কাগজটা এই এল বলে…’
দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস পেরিয়ে নতুন বছর চলে আসে। রোজ শত-শত সরকারী আদেশ-নিষেধও আসে; বিমলের পদোন্নতির নির্দেশটাই কেবল আসে না!
বিমলের নিজের অবশ্য এ নিয়ে তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। একমনে নিজের কাজ করতেই অভ্যস্ত সে। প্রমোশনের জন্য আজকাল যে আর কেবল কাজ করাই যথেষ্ট নয়; খানিকটা ছোটাছুটি, খানিকটা তেলবাজিও যে করতে হয়, এটা তাকে কে বোঝাবে!
অবশ্য একেবারেই যে এ নিয়ে কেউ কিছু বলেনি তাকে, ব্যাপারটা ঠিক তেমনও নয়। সহানুভূতিশীল হয়ে কেউ-কেউ আকারে-ইঙ্গিতে বিষয়টা খোলসা করেছে তাকে। কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। এক বাক্যে জানিয়ে দিয়েছে বিমল, এসব কাজ সে কস্মিনকালেও করতে পারবে না; এগুলো তার ধাতেই নেই।
এরপর আর কী-ই বা বলার থাকে? হতাশ হয়েই হাল ছেড়ে দিয়েছে লোকে যার প্রয়োজন, তারই যদি গরজ না থাকে, অন্য কারও সেটা নিয়ে ভাববার কী এমন ঠেকা পড়েছে?
কেবল সহকর্মীরাই নয়, অফিসের পিয়ন রাঘবও ভীষণ বিরক্ত বিমলের ওপর। অন্য কেউ ডাকলে চিতার বেগে ছুটে যায় সে। অথচ বিমল ডাকলে শুনেও না শোনার ভান করে থাকে, জায়গা ছেড়ে এক চুলও নড়ে না।
অনেকক্ষণ হাঁকডাকের পর যা-ও বা যায়, অনাগ্রহের স্পষ্ট ছাপ থাকে তার চেহারায়। হয় উদাসীন হয়ে ছাতের দিকে তাকিয়ে থাকে সে, নয়তো গোমড়া মুখে নোংরা নখ দিয়ে ফাইলের কোনা ছেঁড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে! বিমল কী বলে না বলে, সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপই থাকে না তার।
রাঘবের তখনকার হাবভাব দেখলে মনে হয়, বিমল কর সাধারণ একজন পিয়ন আর সে নিজেই বুঝি মস্ত কোন অফিসার!
প্রায়ই বড় স্যরের বিভিন্ন কাজের অজুহাত দেখিয়ে রিমলের দেয়া কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় সে। যদিও তখন তার হাতে কোন কাজই থাকে না!
বিষয়টা বিমলের নিজেরও জানা আছে, তবুও এটা নিয়ে কখনও কোন উচ্চবাচ্য করে না সে। রাঘবকে সবসময় নম্র স্বরেই অনুরোধ করতে অভ্যস্ত সে।
সুযোগটার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে রাঘব; যতভাবে পারে হেনস্তা করে বিমলকে। সিঙ্গাড়া আনতে বললে আনে চমচম, জুস আনতে বললে আনে কোক! তবে তাতে বিশেষ কোন লাভ হয় না। নির্লিপ্তই থাকে বিমল, রাগে না।
সারাদিন সর্ব সাকল্যে একবেলা মালতির হাতের রান্না খাওয়ার সৌভাগ্য হয় বিমলের; রাতে। তবে খাবারটা তাকে একা-একাই খেতে হয়, মালতি কখনও তাকে সঙ্গ দেয় না। অমল মরার পর থেকেই এই ব্যবস্থা।
