ইনফার্নো
এক
নিতান্ত সাদাসিধে ধরনের মানুষ বিমল কর; সাত চড়েও রা করে না। জগৎ- সংসার সম্পর্কে এতটা নির্লিপ্ত মানুষ কদাচিৎই চোখে পড়ে।
ভিতরে অনুভূতি যেমনই হোক না কেন, বাইরে তার চেহারা সারাক্ষণই ভাবলেশহীন। জাগতিক কোন ব্যাপারে চোখে পড়ার মতন কোন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিমল, এমনটা কেউ কখনও দাবি করতে পারবে না।
তীব্র আনন্দ কিংবা তীব্র বেদনায়, একই রকম নির্বিকার লোকটা। মানুষ হয়েও আদতে একটা রোবট-জীবন যাপন করে চলেছে সে।
সকালে ঘুম ভাঙার পর বাড়িতে কোন নাস্তা জোটে না বিমলের। স্ত্রী মালতি দু’চোখে দেখতে পারে না তাকে। সাতসকালে বিমলের জন্য নাস্তা বানানোর কথা কল্পনাও করতে পারে না মহিলা।
এর নেপথ্যের কারণ হিসেবে অবশ্য বছর কয়েক আগে ঘটে যাওয়া একটা দুর্ঘটনাকে দায়ী করে লোকে। তবে কেবল মালতিই জানে, এই সীমাহীন বিতৃষ্ণার পিছনে ওই ঘটনাটার চাইতেও বড় আরেকটা কারণ রয়েছে।
এক সকালে একমাত্র ছেলে অমলকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল বিমল। ছেলেকে স্কুলে পৌছে দিয়ে তবেই অফিসে যায় সে। মোটর সাইকেল থাকায়, পথের যানজট খুব একটা বড় বাধা ছিল না ওদের জন্য।
তবে আদতেই সেদিন বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল, কেবল মিনিট পাঁচেকই বাকি ছিল অমলের অ্যাসেম্বলি শুরু হওয়ার। নিতান্ত বাধ্য হয়েই অন্যান্য দিনের তুলনায় খানিকটা জোরে বাইক ছুটিয়েছিল সেদিন বিমল। তবে তার জানা ছিল না, বিধাতা ঠিক কী লিখে রেখেছিল তার ভাগ্য লিপিতে!
বড় রাস্তার মোড়ে পৌছতেই সিগন্যাল ভাঙা একটা ট্রাক বেপরোয়া গতিতে ছুটে এল ওদের দিকে। চোখের পলকে ওটার তলায় চাপা পড়ে গেল ছোট্ট বাইকটা।
ট্রাকের দানবীয় চাকায় পিষে গেল অমলের ছোট্ট দেহটা, প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মারা গেল সে।
তবে উপস্থিত সবার চক্ষু চড়কগাছ করে দিয়ে, প্রায় বহাল তবিয়তে ট্রাকের তলা থেকে বেরিয়ে এল বিমল! এখানে-ওখানে খানিকটা কেটে-ছড়ে গেছে বটে, তবে বলার মত বড় ধরনের কোন চোট পায়নি সে।
একমাত্র সন্তানের রক্তাক্ত মৃতদেহ সহ্য করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোন মায়েরই নেই; মালতিও তার ব্যতিক্রম নয়। গগনবিদারী আর্তনাদ করে সেদিন ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিল সে।
তীব্র যাতনার মধ্যেও হতবাক হয়ে লক্ষ করেছিল, চোখে এক ফোঁটা জল নেই বিমলের; নিস্পৃহ চেহারা নিয়ে ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা!
লোকটা কি সত্যিই মানুষ? নাকি আস্ত একটা পিশাচ?
সন্তান হারানোর ক্ষতে সময়ের প্রলেপ পড়ল ঠিকই, তবে সেদিনের সেই নির্লিপ্ততার জন্য বিমলকে কোনদিনও আর ক্ষমা করতে পারল না মালতি। তবে কেবল অমলের জন্যই এখনও লোকটার ঘর করছে সে। নাহয় বহু আগেই বিমলের কপালে লাথি মেরে যেদিকে দু’চোখ যায়, সেদিকে চলে যেত মালতি।
মহল্লার এক কোণে একটা কানাগলির মুখে আবুল মিয়ার চায়ের দোকান। চা-বিড়ির পাশাপাশি সেদ্ধ ডিম আর গুলগুলাও বিক্রি করে আবুল।
রোজ সকালে অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে ওই দোকানে গিয়ে হাজির হয় বিমল। দোকানের লাগোয়া একটা বাঁশের বেঞ্চিতে জুত করে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আবুলের দিকে।
তার দিকে এক পলকের জন্য তাকায় বটে আবুল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মুখ ফিরিয়ে নেয় সে। ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্যান্য খদ্দেরদের সঙ্গে বেচাকিনি নিয়ে। দোকান একেবারে খালি হওয়ার আগ পর্যন্ত আর একটিবারের জন্যও বিমলের দিকে দৃষ্টি ফেরায় না সে।
নিয়মিত কাস্টোমার হওয়া সত্ত্বেও বিমলকে ভীষণ অপছন্দ করে আবুল। সে চায় না যে লোকটা রোজ-রোজ তার দোকানে আসুক। একারণেই এতটা অবহেলা করে সে। চায়, লোকটা বিরক্ত হোক; মানে-মানে কেটে পড়ুক এখান থেকে।
অন্য কিছু নয়, মানুষটার মূক পশুর মত আচরণটাই অসহ্য লাগে আবুলের। সকাল-সকাল এমন একটা পাথুরে মুখ দেখতে কারই বা মন চায়?
কিন্তু কখনওই আবুলের এই মনোবাসনাটা পূরণ করেন না বিধাতা; শত লাঞ্ছনার পরও ঠিকই রোজ সকালে এসে উপস্থিত হয় বিমল!
বিরস বদনে তাকে দু’খানা টোস্ট বিস্কিট আর এক কাপ চা এগিয়ে দিতে হয় আবুলকে। ওই দিয়েই নাস্তা সারে বিমল। তারপর বিনাবাক্যব্যয়ে দাম মিটিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বড় রাস্তার উদ্দেশে; অফিসগামী বাস ধরার জন্য।
পিছন থেকে অস্ফুটে খিস্তি আওড়ায় আবুল। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বিমলের অপসৃয়মাণ অবয়বটার দিকে। কেবল দৃষ্টি দিয়ে কাউকে ভস্ম করে দেয়া সম্ভব হলে, অনেক আগেই অঙ্গার বনে যেত বিমল কর!
দুই
রোজ অফিসে ঢুকতেই নিজের টেবিলে রাখা বিশাল একখানা ফাইলের স্তূপের সাথে মোলাকাত হয় বিমলের। তার মাঝারি আকারের দেহটা রীতিমত হারিয়ে যায় ওগুলোর আড়ালে; চট করে বোঝা যায় না, আদৌ ওখানটায় কেউ আছে নাকি নেই!
দর্শনার্থীদেরকে কথা বলতে হয় জিরাফের মত গলা বাড়িয়ে, নইলে বিমলের চেহারা দেখার সৌভাগ্য হয় না ওদের।
এতখানি কাজ করার কথা নয় বিমলের; তবুও তাকে করতে হয়। বলা ভাল, নিতান্ত বাধ্য হয়েই করতে হয়। কখনওবা বসের নির্দেশ, কখনওবা সহকর্মীদের অনুরোধ!
‘আজকের মধ্যে ফাইলগুলো দেখে দিন, বিমল বাবু…’
‘আজ একটু দেরি করে বাসায় ফিরলে কোন সমস্যা হবে আপনার?’
