খিটখিটে মেজাজের ওই বুড়ো-বুড়িও রাত-দিন হাড় জ্বালিয়ে মারে জাফরকে। একে-অন্যকে সান্ত্বনা দেয় মানু-জাফর, দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়।
দুটো আধপেটা গল্প ওদের অজান্তেই মিলেমিশে একাকার হয়ে ভরপেটা হয়ে যায়।
.
আপাতদৃষ্টিতে সাদামাঠা একটা সকাল, আচমকা ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠল জাফরের জীবনে। দীর্ঘকাল ক্ষয়রোগে ভুগে সেই সকালে মারা গেল তার বুড়ো থুথুড়ে নানী। মহিলার মানসিক অত্যাচার থেকে মুক্তিটাই যথেষ্ট ছিল জাফরের জন্য; উপরন্তু এই উপলক্ষে অভাবনীয় একটা উপহার পেল সে খাবার!
মরা বাড়িতে প্রথম চারদিন চুলা জ্বালানো নিষেধ, এমন একটা কুসংস্কার প্রচলিত আছে সমাজে। ওই দিনগুলোতে আশপাশের প্রতিবেশীরাই তিনবেলার খাবার পৌঁছে দেয় শোকসন্তপ্ত পরিবারটিতে।
মৃত্যুর মত বিশাল একটা ব্যাপারকে সামনে রেখে ক্ষুৎপিপাসা নিবারণের তুচ্ছ আয়োজনে ব্যস্ত থাকাটা মানায় না মৃতের স্বজনদের; এহেন একটা ধারণা থেকেই হয়তো গড়ে উঠেছে এই সামাজিক প্রথাটা।
সে যা-ই হোক, শোকের পরিবর্তে সুখের সাগরেই নিমজ্জিত হলো জাফরের পরিবারের সবক’টা মানুষ!
নিত্য যাদের অভুক্ত থাকতে হয়, তাদের যদি ভাল-মন্দ পদ দিয়ে তিনবেলার আহার জোটে, ব্যাপারটা কি আদতেই ভীষণ আনন্দের নয়?
তবে বাইরের মানুষজনের সামনে অবশ্য শোকের অভিনয়টাই অব্যাহত রাখল ওরা। কারণ অভিনয় করেই টিকে থাকতে হয় মানব-সমাজে। মানুষ সেটাই প্রকাশ করে, যা করা উচিত; সত্যিটা নয়।
চাকচিক্যময় এই সমাজ ব্যবস্থার পুরোটাই আসলে মেকি; ফাঁপা।
.
জীবনে প্রথমবারের মত বন্ধুর সৌভাগ্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠল মানু। ওদের মধ্যকার বন্ধুত্বের অটুট বন্ধনেও বুঝি খানিকটা ফাটল ধরল। রোজ-রোজ জাফরের মুখে সুস্বাদু খাবারের গল্প কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়?
বাড়ির বাইরে যাওয়া একরকম বন্ধই করে দিল মানু। দিনরাত ঘরের দাওয়ায় গোমড়া মুখে বসে থাকে, আর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাবেরা খাতুনের ঘরের দিকে। বুড়িটা এখনও মরে না কেন? বেঁচে থেকে কী লাভ হচ্ছে তার? কেন এখনও বুড়ো কচ্ছপের মত মাটি কামড়ে পড়ে আছে সে?
মানুর প্রতি ভয়টা আগের চেয়েও বহুগুণে বেড়ে গেছে সাবেরা খাতুনের। মানুকে দেখলেই সারা শরীর কেঁপে ওঠে তার। আগের মত কারণে-অকারণে আর মানুকে গালমন্দ করে না সে। তবে আপনমনে কী যেন বিড় বিড় করে সারাক্ষণ।
মানুর সাথে চোখাচোখি হলেই আঁতকে ওঠে, চটজলদি চোখ সরিয়ে নেয়। ছেলেটার চোখে রাজ্যের ক্ষুধা; তাকিয়ে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি লাগে।
আগে দিনের বেলায় অন্তত খানিকটা ঘুম হত তার, এখন আর সেটুকুও হয় না। সর্বক্ষণ অজানা একটা তীব্র আতঙ্ক গ্রাস করে রাখে তাকে।
জাফরের নানীর মৃত্যুটা, তার শক্ত ভিতের অনেকখানি নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায়ই এখন অদ্ভুত একটা আওয়াজ শুনতে পায় সে। ওপারের ডাক; কেউ যেন তার নাম ধরে ফিসফিস করে ডেকে চলেছে অনবরত।
ছাতের কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়েই এখন রাত পার করে সে। মাঝে-মাঝে তারস্বরে স্বামীকে ডাকে, ‘ওই, মোতালেব হারামজাদা। কই গেলি তুই? জানালাডা বন্ধ কইরা দিয়া যা কইলাম। ডর করে। তাগদা আয়, ডর করে আমার।
বারান্দায় কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে-থাকা মোতালেব মিয়া বিরক্ত মুখে এপাশ- ওপাশ করে। কিন্তু স্ত্রীর ডাকে সাড়া দেয় না।
সেই যে বিয়ের দিন থেকে সিন্দাবাদের রাক্ষসটার মত কাঁধে চড়ে বসেছে হারামজাদী, আজ অবধি আর নামানো যায়নি। কোন্ কুক্ষণে যে বিয়েটায় মত দিয়েছিল, এ নিয়ে আজও আফসোস হয় তার। এই দজ্জাল মহিলাকে বিয়ে না করলে, জীবনটা হয়তো অন্যরকম হতে পারত…
.
শেষতক অবশ্য সাবেরা খাতুনের সমস্ত সতর্কতা বিফলে যায়, বাস্তবতার কাছে হার মেনে নিতে হয় তাকে।
এক কাকডাকা ভোরে, মানুর মা’র বুকফাটা আর্তনাদে ভর করে খবর পৌঁছে যায় সবার কাছে, মারা গেছে সাবেরা খাতুন। কট্টর বুড়িটার চেঁচামেচি আর কখনও শোনা যাবে না এই মহল্লায়। দুপুর গড়ানোর আগেই শেষ হয়ে যায় দাফন-কাফনের সমস্ত ক্রিয়াকর্ম। যৎসামান্য যে কয়জন আত্মীয়-স্বজনের সমাগম হয়েছিল, বিকেল নাগাদ তারাও বিদায় নেয়। অনেক-অনেকদিন পর উপাদেয় তরিতরকারি দিয়ে সে রাতে ভাত জোটে মানুর কপালে।
বড়-বড় লোকমায় ভাত গেলে মানু, যেন দেরি করলেই যে কোন সময় হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে দুষ্প্রাপ্য খাবারগুলো! সস্নেহে টুনিকেও মুখে তুলে খাইয়ে দেয় সে।
মনে-মনে বলে, এত সহজ ভাত জোগাড় করা? এত্ত সহজ!
নিজেকে নিয়ে ভীষণ গর্ব হয় তার!
দাদীকে খুন করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি মানুকে! মুখে যতই চটাং- চটাং কথা বলুক না কেন, শরীরে একরত্তি শক্তিও ছিল না বুড়ির।
মুখের উপর বালিশ চাপা দিয়ে মেরেছে তাকে মানু। খানিকক্ষণ শুধু বাম দিকের হাত-পা নেড়ে তড়পেছে বুড়ি, তারপরই খেল খতম।
কেউ বুঝতেই পারেনি, কত সহজে ঘরের সবার জন্য অন্নের সংস্থান করেছে সে! কিন্তু দেখতে-দেখতেই কেটে যাবে সামনের চারটে দিন। তারপর তো আবারও সেই পুরনো ছকে ফিরে যেতে হবে। তাহলে?
বার কয়েক আড়চোখে মোতালেব মিয়ার দিকে তাকায় মানু।
মাঝে-মধ্যে একটা করে মিষ্টি চকোলেট, নাকি টানা চারদিন ভরপেট ভাত; সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সে!
