দাদীর গালাগাল তবু সহ্য হয়, কিন্তু দাদার গোমড়া মুখটা কিছুতেই সহ্য হয় না মানুর। কবে মরবে বুড়িটা? কবে?
বাতের ব্যথায় ঠিকমত ঘুমুতে পারে না সাবেরা খাতুন, প্রায় সারাটা রাতই জেগে কাটাতে হয় তাকে। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে ককায়, আর নিচুস্বরে একনাগাড়ে বিলাপ করে। কাকে যে গালাগাল দেয়, খোদা মালুম!
কখনও-কখনও মাঝরাতে প্রকৃতির ডাকে ঘুম ভেঙে গেলে, সন্তর্পণে দাদীর ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায় মানু। দেখতে চায়, অক্কা পেয়েছে কিনা বুড়িটা।
কিন্তু কী করে যেন প্রতিবারই ব্যাপারটা টের পেয়ে যায় সাবেরা খাতুন। মানুকে দেখেই আঁতকে ওঠে সে।
‘কী রে, হারামজাদা? এত রাইতে এইহানে কী করস্? খিদা লাগসে? খাইবি আমারে? খাইবি..?
‘তোর মা যেমুন কচি পুলাগুলারে চিবাইয়া-চিবাইয়া খায়, তেমুন কইরা তুইও কি খাইবার চাস আমারে?
‘নে, খা; খা কইলাম, হারামজাদা। ডাইন পাওডা আগে খা। কাইন্যা আঙুলডা দিয়া শুরু কর। নাকি বুইড়া আঙুলডা আগে খাইবি?
‘আইচ্ছা থাউক, পাও বাদ দে। ডাইন হাতড়া খা। কুড়মুড় কইরা হাড্ডিগুলান চিবাইয়া-চিবাইয়া খা। মজা পাইবি।
‘নাকি অইন্য মজা চাস? অইন্য কিছু খাইবি? কত বড় হইসস্ রে তুই, খা…র পুলা?’
কোন জবাব দেয় না মানু, এক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দাদীর দিকে। খোলা জানালা গলে অবাধে ঢুকে পড়া চাঁদের আলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিছানার একপাশে। গাছের পাতার দীর্ঘ ছায়াগুলো তির-তির করে কাঁপে মৃদু বাতাসে। কাছে-ধারে কোথাও অবিকল মানুষের গলায় কেঁদে ওঠে একটা রোমশ হুলো বেড়াল। অকারণেই গায়ে কাঁটা দেয় মানুর। কলিমের মায়ের কাছে শোনা ভয়ঙ্কর সব ভূতের গল্পগুলো বার-বার উঁকি দেয় মনের কোণে। শাঁকচুন্নি, পেত্নী, স্কন্ধকাটা…আরও কত জানা-অজানা অশরীরীরা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। যারা মড়া পছন্দ করে, আধমরা পছন্দ করে। ওদের কেউ যদি আসত একদিন, আর বজ্জাত দাদীটাকে মেরে রেখে যেত…
মানুর চোখের দিকে তাকিয়ে সাবেরা খাতুনের বুকটা ধক্ করে ওঠে। কীসের যেন অশুভ একটা ছায়া ছেলেটার দু’চোখে; বড্ড ভয় করে। নিরুপায় হয়ে উচ্চস্বরে চেঁচাতে শুরু করে সাবেরা, ‘ও, বউ…কই গেলি? কই গেলিরে, হারামজাদী? তোর লোচ্চা পুলারে লইয়া যা এইহান থাইকা। শিগির লইয়া যা কইলাম। অক্ষণ লইয়া যা। হারামজাদা আমারে খাইয়া ফালাইব। হাছাই একদিন খাইয়া ফালাইব আমারে বেজন্মাডা। লইয়া যা হেতেরে। লইয়া যা…’
চোখভরা কাঁচা ঘুম নিয়ে টলতে টলতে বিছানা ছেড়ে উঠে আসে মানুর মা। জোর করে মানুকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় আবার। কখনও-কখনও উপরি হিসেবে হালকা চড়-চাপড়ও জোটে মানুর কপালে। পিছন থেকে তীক্ষ্ণ বাণের মত ধেয়ে আসে সাবেরার চিৎকার, ‘অর চউখগুলার দিকে একবার চাইয়া দেখ, বউ। দুইন্যার খিদা হারামজাদার চউক্ষে। সবকিছু যেন গিল্যা খাইবার চায় হারামির পুলা।’
ছেলের চোখের দিকে তাকানোর কোন প্রবৃত্তি হয় না মানুর মা’র। ঘুমে তার নিজের চোখই ভেঙে আসছে; রাত-বিরেতে এসব হাঙ্গামা সহ্য হয়?
‘যন্ত্রণা দিয়েন না তো, আম্মা। ঘুমান। সারা জীবন বহুত যন্ত্রণা দিসেন, এইবার একটু ক্ষান্ত দেন। নিজেও শান্তিতে থাকেন, আমাগোরেও একটু শান্তিতে থাকবার দেন।’
সাবেরা খাতুন মোটেও চুপ থাকার বান্দা নয়। শান্ত হওয়ার বদলে উল্টো তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে সে। ‘দেমাগ দেহাইস না, মাগী। দেমাগ দেহাইস না আমার লগে। যন্ত্রণা দেই আমি, না? যন্ত্রণা দেই তোগোরে? তোর গতর বেচা টেকার কপালে উশটা মারি আমি। কাইল থাইকা আর খামুই না তোর ভাত। গুষ্টি কিলাই তোর দেমাগের।’
তার কথায় পাত্তা না দিয়ে একখানা তেল চিটচিটে বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে মানুর মা। তার ভালই জানা আছে, দুপুর গড়ানোর আগেই ভাতের’ জন্য চেঁচামেচি জুড়ে দেবে সাবেরা খাতুন।
.
শহরতলীর সবচেয়ে ঘিঞ্জি এলাকায় মানুদের বসবাস। গায়ে-গা ঠেকিয়ে সারিবদ্ধভাবে ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক। সীমানা প্রাচীর কিংবা আঙিনার বালাই নেই, ঘর থেকে বেরিয়ে দুটো কদম এগুলেই সদর রাস্তা।
একসারি কুঁড়েঘরের মধ্যেও দুটো ঘর বেশ আলাদা করেই চোখে পড়ে। দুঃখ-দারিদ্র্যের ছাপ বেশ প্রকট হয়ে ফুটে আছে ও দুটোর অবয়বে। বাইরের বেহাল দশা থেকেই ভিতরে বাসিন্দাদের শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থাটা স্পষ্ট ঠাহর করা যায়। অবধারিতভাবে এ দুটো ঘরের একটা মানুদের; অন্যটায় বসবাস করে মানুর প্রাণের বন্ধু জাফরের পরিবার।
জাফর, মানুর সমবয়সী; সব কাজের দোসর। দু’জনে সারাদিন একসঙ্গে ডাংগুলি কিংবা গোল্লাছুট খেলে; কখনওবা অদূরের শীর্ণ নোংরা খালটায় গিয়ে লাফ-ঝাঁপ দেয়। আর গুজুর-গুজুর গল্প করে; ভাতের গল্প, খেলনার গল্প।
জাফরেরও বাবা নেই। তবে মরেনি লোকটা, পালিয়ে গেছে। শহরে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করে আবার সংসার পেতেছে। উড়ো খবর পাওয়া যায়, নতুন সংসারে তার দুটো সন্তানও আছে।
সেই যে এক আশ্বিন মাসে গায়েব হয়ে গেল, এরপর আর একটিবারের জন্যও ফিরে আসেনি লোকটা। জাফররা বেঁচে আছে কি মারা গেছে, কিছুতেই যেন কিছু যায়-আসে না তার!
গার্মেন্টসে কাজ করে ছয় সদস্যের পরিবারের দেখভাল করে জাফরের মা। মানুর দাদা-দাদীর পরিবর্তে জাফরের আছে নানা-নানী। সম্পর্কটা আলাদা বটে, তবে চরিত্রগুলোর মধ্যে খুব একটা ফারাক চোখে পড়ে না।
