শুধু মানু একা নয়, ঘরের সবাইকেই ত্যক্ত করে বুড়িটা; কাউকে রেহাই দেয় না। সর্ব সাকল্যে জনা পাঁচেক মানুষ নিয়ে মানুর সংসার। মানু আর তার ছোটবোন টুনি, বুড়ো দাদা-দাদী আর মা।
বাবা নামের একজন মানুষও এককালে এই পরিবারের অংশ ছিল, সংসারে এখনকার মত অভাব ছিল না তখন; এসব কথা রূপকথা মনে হয় মানুর কাছে, বাস্তব নয়। তাকে অবশ্য এটা নিয়ে দোষারোপ করারও কোন উপায় নেই। শহরে কেরানীর কাজ করা তার বাবা মাসে কেবল একদিনই ছুটি পেত। ওই একদিনের স্মৃতি, ছোট একটা বাচ্চার মনে কতটুকুই বা আর দাগ কাটে?
রোড অ্যাক্সিডেন্টে লোকটা যখন মারা গেল, মানুর বয়স মোটে দেড়; টুনি তখনও তার মায়ের পেটে।
বাবার উপর প্রায়ই খুব অভিমান হয় মানুর। কেন লোকটা অকালে ওদেরকে ফেলে চলে গেল এভাবে? কেন তার জায়গাটা স্বেচ্ছায় দখল করে নিল ‘অভাব’? কেন প্রতিটা দিন এতটা কষ্টে কাটে তাদের?
নিজের পছন্দসই সালন দিয়ে ভরপেট ভাত খেয়েছে, নিকট অতীতে এমন কোন স্মৃতি নেই মানুর। রোজই একবেলা করে অভুক্ত থাকতে হয় ওদের সবাইকে। বাকি দুই বেলা যেটুকু খাবার একজনের ভাগে জোটে, সেটাও এক রকম না জোটার মতই।
অবশ্য পরের বাড়িতে ঝি-গিরি করে কতটুকুই বা আর রোজগার করতে পারে মা? পাঁচটা মুখে দিনের পর দিন অন্ন জোগানো কি সহজ কথা?
মা’কে লোকে মন্দ বলে। অসতী-ছিনাল বলে গালি দেয়।
শব্দগুলোর মানে বোঝে না মানু; তবে এটুকু ঠিকই বোঝে যে, ওই নিষ্ঠুর শব্দগুলো মায়ের অন্তরটাকে চিরে ফালা ফালা করে দেয়। না হলে কি আর রোজ রাতে লুকিয়ে-লুকিয়ে কাঁদত মা?
যে মানুষটা দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চারটে অসহায় প্রাণীকে বাঁচিয়ে রেখেছে, কেমন করে খারাপ মানুষ হয় সে? বোঝে না মানু।
মায়ের দুঃখে বুক ফেটে যায় তার। ইচ্ছে হয়…ইচ্ছে হয়, মরে যেতে। তাতে অন্তত একটা ক্ষুধার্ত মুখ তো কমবে, তাই না? মায়ের যন্ত্রণা কি কিছুটা হলেও লাঘব হবে না? সত্যি-সত্যিই বেশ কয়েকবার মরার চেষ্টা করেছে মানু। কতবার যে ওদের বাড়ির পাশের রেললাইনটায় গিয়ে আড়াআড়িভাবে শুয়ে থেকেছে ও, তার কোন ইয়ত্তা নেই। একটা ট্রেন তীব্র গতিতে এগিয়ে যাবে, সঙ্গে-সঙ্গে কাটা পড়বে মানুর শীর্ণ দেহটা। আর তাতেই এই পৃথিবীর তাবৎ দুঃখ-কষ্ট থেকে এক লহমায় মুক্তি মিলবে। ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করাটা যে কতটা কঠিন, সেটা কি আদতেই কেউ কখনও অনুধাবন করতে পারবে?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর লাইনের উপর শুয়ে থাকা হয় না মানুর। ট্রেনের হুইসেল শোনা মাত্রই বার-বার তড়িঘড়ি করে লাইন ছেড়ে পালিয়ে আসে সে।
ভয় হয়; মরণের পর যদি আরও বেশি কষ্ট ভোগ করতে হয়, তখন?
এখানে তো তাও মা আছে, টুনি আছে, দাদা আছে। ওপারে একা-একা কেমন করে দিন কাটাবে সে?
দাদা মোতালেব মিয়া ভীষণ ভালবাসে ওদের দু’জনকে। সকাল-সকাল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায় লোকটা। কোথায় যায়, কে জানে! হয়তো ভিক্ষেই করে সে। তবে চেনা ভিখারি বলে পয়সা-কড়ি খুব একটা মেলে না; দিতে চায় না লোকে।
তারপরও দিন শেষে যে কয়টা টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়েই সাধ্যমত সদাই- পাতি নিয়ে ফেরে সে। কখনও আধ সের চাল, কখনও চারটে মুলো, কখনওবা পাতলা পলিথিনে ভরে খানিকটা সয়াবিন তেল। খালি হাতে বাড়ি ফেরার কোন নজির নেই তার।
মাঝে-মধ্যে মানু-টুনির জন্য দুটো সস্তা লালরঙা চকোলেট আনে বুড়ো। ওতেই ভীষণ খুশি হয় ওরা, হল্লা করে গোটা বাড়ি মাথায় তোলে।
আর তাতেই মোতালেব মিয়ার উপহার আনার খবরটা ফাঁস হয়ে যায়; বুড়ি সাবেরা খাতুনের কাছেও আর সেটা গোপন থাকে না।
স্বামীর এই ব্যাপারটা একদমই পছন্দ করে না সাবেরা খাতুন। দু’বেলা যাদের কপালে ভাত জোটে না, নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায়; তাদের আবার কীসের মণ্ডা-মিঠাইয়ের বায়না?
শরীরের ডান পাশটা অবশ সাবেরার, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না সে। তবে দেহে জোরের ঘাটতি থাকলেও গলার জোরটা এখনও বহাল তবিয়তেই আছে। ক্যানক্যানে গলায় চেঁচাতে শুরু করে সে, ‘আরে ও, বুইড়া হারামি, আবার বুঝি তুই লজেস আনসস্? লজেস…? কই রে, মিনসে, আমার বাতের দুইডা বড়ি তো কোনদিন তোর হাতে ওড়ে না! ডেলি-ডেলি লজেস ওডে ক্যামনে? কম দিসিরে তোরে আমি? কোনদিন কম পাইসস্ আমার কাছ থাইকা?’ কাশির দমকে খানিকটা হয়তো বিরতি নিতে বাধ্য হয় সে, তারপর আবার নতুন উদ্যমে শুরু করে।
‘বয়সকালে তো রক্ত চুইষ্যা খাইসস্ আমার। অহন এত বিতিষ্ণা ক্যান? হারামি কোনহানকার…মরস না ক্যান তুই? আজরাইল তোরে চউক্ষে দেহে না? নাকি আমার মরণ নিজের চউক্ষে না দেখলে কইলজা ঠাণ্ডা হইব না তোর? মনের খায়েশ কিতা, খুইল্লা কস্ না ক্যারে, হারামজাদা?’
এরপরই উচ্চস্বরে বিলাপ শুরু করে সাবেরা খাতুন। তার বাবার বাড়ি থেকে এযাবৎকালে কী-কী এনেছে সে মোতালেবের সংসারে, পাড়া-প্রতিবেশী কারোরই আর জানার বাকি নেই সেটা। ইনিয়ে-বিনিয়ে সুরেলা কান্নায় বহুবার বলা কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করে সাবেরা।
চুপসানো মুখ নিয়ে ঘরের দাওয়ায় নিশ্চুপ বসে থাকে মোতালেব মিয়া, স্ত্রীর কথার কোন প্রতিবাদ করে না। কী লাভ?
বিনাবাক্যব্যয়ে কথাগুলো হজম করে নেয়াই মঙ্গলজনক। কিছু বলতে গিয়ে অযথা নিজের চোদ্দ গোষ্ঠীকে গাল খাওয়ানোর কোন মানে হয় না। সাবেরার সঙ্গে বচসা করে জিততে পারে, এমন মানুষ ইহজগতে খুঁজে পাওয়া ভার।
