বজ্রাহতের মতই ঠায় বসে রইল কিকা। এরচেয়ে বেশি বিস্ময়কর কিছু এ জীবনে শোনেনি সে। কোনমতে বলল, ‘কিন্তু সাসাকোয় আসার পর আজ অবধি একজন মানুষও খায়নি সে। ক’দিন খাবার ছাড়া কাটাতে পারে সে?’
‘কে বলেছে খায়নি? তোমাদের ওঝার লাশটা কোথায়?’
চট করে মনে পড়ল কিকার। ওঝার লাশটা নিজেই টামবারানের ভিতরে নিয়ে গিয়েছিল জাদুকর। আর রাতে টামবারানের ভিতরেই থাকে সে, একা।
ওঝার জন্য বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল কিকার। কী নিদারুণ কৌশলে তাকে খুন করিয়েছে রাক্ষসটা!
চট করে উঠে দাঁড়াল কিকা। রাগে বিষধর সাপের মতই ফুঁসছে সে।
‘নিজ হাতে শয়তানটাকে হত্যা করব আমি, জুরু। যদি ব্যর্থ হই, সবার সামনে তার মুখোশ উন্মোচন করার জন্য তুমি তো রইলে।’
ঘর থেকে বেরোতে উদ্যত হলো কিকা।
‘তাকে কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে মারতে পারবে না, কিকা,’ পিছন থেকে বলে উঠল বুড়ো।
কাঁধের উপর দিয়ে ফিরে তাকাল কিকা। ‘কেন?’
‘কারণ তার প্রাণ নিজের দেহপিঞ্জরে রাখে না রাক্ষসটা, ওটা বন্দি থাকে সাথের রঙিন খুলিটার ভিতর। ওটাই তার সমস্ত শক্তির আধার। তাকে মারতে হলে, ওটাকে নষ্ট করতে হবে তোমার।’
মুখে হাসি ফুটল কিকার। ‘অনেক ধন্যবাদ, জ্ঞানী বুড়ো। যে কোন মুশকিল কেবল জুরুই আসান করতে পারে।’
ও বেরিয়ে যাবার পর তার সুরক্ষার জন্য প্রার্থনায় বসল জুরু। ভাবছে, বাবার মতই সাহসী হয়েছে ছেলেটা।
দশ
টামবারানের দরজায় কোন হুড়কো থাকে না, তাই ঢুকতে কোন বেগ পেতে হলো না কিকার। নিশুতি রাত, পুরো সাসাকো গভীর ঘুমে অচেতন। অন্য সবার মত জাদুকরও বেঘোরে ঘুমোচ্ছে একটা পাটাতনে শুয়ে। টামবারানের এক কোণে একটা মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় ঘরের বেশিরভাগটাই আলোকিত হয়ে আছে। একপাশে থরে-থরে সাজানো খুলিগুলোর দিকে একপলক তাকাল কিকা পরক্ষণেই তাকাল ওঝার আধখাওয়া লাশটার দিকে। ইতোমধ্যেই অনেকখানি সাবাড় করে ফেলেছে রাক্ষসটা।
অবদমিত ক্রোধে শরীরটা বারকয়েক কেঁপে উঠল কিকার। চারপাশে তাকিয়ে রঙচঙে খুলিটা খুঁজতে শুরু করল সে।
সহজেই পাওয়া গেল ওটাকে, জাদুকরের মাথার কাছে একটা তাকিয়ার উপর বসে আছে। অশুভ একটা অবয়ব। দেখেই রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠল কিকার।
দ্রুতপায়ে ওটার দিকে এগিয়ে গেল সে। হাতে ধরে রেখেছে মস্ত একখানা পাথর। শেষবারের মত জাদুকরের মুখের দিকে একবার তাকাল কিকা। তারপর দেহের সর্বশক্তি দিয়ে পাথরটা নামিয়ে আনল খুলিটার উপর।
অনুভব করল, হাতের তলায় পুরোপুরি গুঁড়িয়ে গেছে ওটা। পাটাতনে শুয়ে থাকা জাদুকরের মাথাটাকেও একই সঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখে মনে অদ্ভুত এক শান্তি পেল কিকা।
শেষ অবধি রাক্ষসটাকে শাস্তি দিতে পেরেছে সে। অবসান হয়েছে হাজার বছর ধরে চলতে থাকা মানুষ শিকারের খেলা।
ভোরের আগেই একখানা নৌকায় চেপে সাসাকো ছাড়ল কিকা! গাঁয়ের সীমানা পেরোবার সময় হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল সে। বার-বার ফিরে-ফিরে তাকাল ঝাপসা চোখে।
প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই সাসাকো ছেড়ে পালাতে হচ্ছে তাকে। হাতেনাতে ধরতে পারলে নির্ঘাত তাকে প্রাণদণ্ড দেবে বাওয়ারা।
কারণ শাশ্বতকালের নিয়ম ভেঙেছে সে, রাতের বেলায় প্রাণী হত্যা করেছে সাসাকোর সীমানায়! এক্ষেত্রে শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ করে না বাওয়ারা। পরম শত্রুকে হত্যা করলেও বাঁচার কোন উপায় নেই। প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম।
যা গাঁয়ের সর্দারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
এটাই আইন।
এটাই রীতি।
.
হয়তো কোন এক সময় এই রীতিতে পরিবর্তন আসবে। বাস্তবতা বুঝতে শিখবে বাওয়ারা, শত্রু-মিত্র চিনতে শিখবে।
তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
সিংহ হৃদয়ের অধিকারী, অকুতোভয় কিকাকে ফেরারী হয়েই বাকি জীবনটা পার করতে হবে!
ক্ষুধানল
যে বয়সে বাচ্চারা নিত্য-নতুন খেলনার সাথে পরিচিত হয়, মানুকে সে বয়সে প্রতি পদে-পদে মোলাকাত করতে হয়েছে ‘অভাব’ নামের বিচ্ছিরি একটা বিষয়ের সাথে। যখন থেকে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকেই খেয়াল করেছে মানু, ত্রিভুবনে অভাবের চেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী আর দ্বিতীয়টি নেই!
কত বন্ধু-বান্ধব তাকে সামান্য ছুতোয় ছেড়ে চলে গেল, কতজন তাকে অস্পৃশ্য মনে করে দূরে-দূরে রইল, কিন্তু কোন অছিলায়ই এই অভাব তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একলা করেনি; নিতান্ত আপনজনের মত পরম মমতায় জড়িয়ে রেখেছে প্রতিটা ক্ষণ। মানুর আসল নাম মাঈনুদ্দীন, মাঈনুদ্দীন আহমেদ। কিন্তু লোকের মুখে-মুখে কখন যে নামটা মাঈনুদ্দীন থেকে মানু হয়ে গেছে, সেটা সে নিজেও জানে না।
ছোটলোকের ছেলেকে আসল নামে ডাকার জন্য কার এত ঠেকা পড়েছে? তার মা অবশ্য তাকে পুরো নামেই ডাকে, তবে তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি। লোকের কাছে মানু নামটাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, মাঈনুদ্দীন নয়।
তার বদ দাদীটা তো এমনকী মানুও ডাকে না তাকে; সে ডাকে-মাইন্যা! ‘কই গেলি, মাইন্যা? কনে গেলি রে, হারামির পুলা?’-বলে যখন চেঁচায় বুড়িটা, রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে যায় মানুর।
এমন করে কেউ কারও একমাত্র নাতিকে ডাকে?
মানু মাঝে-মাঝে ভাবে, হতচ্ছাড়া বুড়িটাকে মোড়ের আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে এলে কেমন হয়? দু’দিন পর-পর ময়লা নিতে আসে সিটি কর্পোরেশনের নোংরা ট্রাকটা। অন্য আবর্জনার সাথে ওরা যদি বুড়িকেও নিয়ে যেত, বেশ হত কিন্তু। বাড়ির সবাই তাহলে শান্তিমতন বাকি জীবনটা কাটাতে পারত।
