ভগ্নপ্রায় হৃদয় নিয়েই পাশের গ্রাম মারাকোর উদ্দেশে যাত্রা করল কিকা।
তাকে এবার মারাকোর সর্দার ভীমনাকে খুন করতে হবে!
নয়
মারাকোয় পৌঁছে ভীমনার কুঁড়েতে গেল না কিকা, গেল জুরু বুড়োর ডেরায়।
আশপাশের সমস্ত গাঁয়ের বাওয়ারা জুরুকে একনামে চেনে। সবার চোখে পরম সম্মানিত একজন মানুষ সে। জীবিত বাওয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, সবচেয়ে জ্ঞানী। যে কোন মুশকিল কেবল জুরুই আসান করতে পারে, বাওয়া সমাজে খুবই প্রচলিত একটা কথা এটা।
জুরুর সামনে গিয়ে জড়সড় হয়ে বসল কিকা, হাত রাখল বুড়োর পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে। বাওয়া সমাজে জ্ঞানীদেরকে এভাবেই সম্মান জানানো হয়।
‘কী হে, সর্দার? তোমার মাথার মুকুট কোথায়? সর্দারকে কি তার মুকুট ছাড়া মানায়?’
‘আমি এখনও সর্দার হইনি, জুরু। ভীষণ বিপদে পড়ে তোমার সাহায্য চাইতে এসেছি।’
‘অন্য কেউ সর্দার হতে চাইছে? কে সে? তোমাদের ওঝা কী বলে এই ব্যাপারে?’
‘ওসব কিছু নয়, অন্য ব্যাপার। আশা করি, তোমার কাছ থেকে সঠিক পরামর্শই পাব।’
‘তোমার সমস্যাটা আগে শুনতে তো দাও।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল কিকা। বুঝতে পারছে না ঠিক কীভাবে শুরু করবে। তারপর দ্বিধা কাটিয়ে উঠে বলতে শুরু করল।
‘মনে করো, পূর্বপুরুষদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার একটা সুযোগ এসেছে আমার সামনে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে নিজের জাতভাই কাউকে হত্যা করতে হবে আমার। এখন আমি যদি কাজটা না করে পালিয়ে যাই, পূর্বসুরিরা খুব কি অসন্তুষ্ট হবে আমার উপর? তাদের অভিশাপে আমাকে কি অনন্তকাল নরকের আগুনে জ্বলতে হবে?’
নড়েচড়ে বসল জুরু। তার চোখের তারায় স্পষ্ট আগ্রহ ফুটে আছে।
‘পুরো ঘটনাটা খুলে বলো, খোকা। কেন যেন মনে হচ্ছে, ভয়ানক কোন জালে জড়িয়ে পড়েছ তুমি।’
জুরুকে সবকথা বলতে কোন আপত্তি নেই কিকার। জানে, শতভাগ বিশ্বস্ত সামনের মানুষটা। সারাজীবন কারও বিশ্বাসের অমর্যাদা সে করেনি, কখনও করবেও না। কেবল নিজের চারিত্রিক গুণেই সমস্ত বাওয়াদের প্রিয় পাত্রে পরিণত হতে পেরেছে সে।
একে-একে তাকে সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করতে লাগল কিকা। দেবদূত আসার পর থেকে এ পর্যন্ত যা-যা হয়েছে, তার কোন কিছুই বাদ দিল না সে। শেষটায় যোগ করল মারাকোর সর্দার ভীমনাকে হত্যা করার আদেশের কথা।
বাওয়াদের ভবিষ্যৎ শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য ভীমনাকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখছেন দেবরাজ জারাল। দেবরাজের আরাধনা থেকে বাওয়াদের দূরে সরাতে ভীমনার পূর্বপুরুষরাই মূলত দায়ী, এটাও তাকে জানিয়েছেন দেবদূত। তাই দেবলোক থেকেই ঘোষণা করা হয়েছে ভীমনার মৃত্যুদণ্ড।
পুরোটা শুনতে-শুনতে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল জুরুর। বেশ কিছুক্ষণ চোখ মুদে রইল সে। ঘন-ঘন শ্বাস নিচ্ছে। প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছে বুড়ো, বাইরেও সেটা চাপা থাকছে না।
‘দেবদূতের কাঁধে দুটো কুফলু পাখির বাচ্চা আছে নাকি? দেখেছ কখনও?’ আচমকা জানতে চাইল জুরু।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছে তো। কিন্তু তুমি জানলে কেমন করে?’
বেশ অবাক হলো কিকা। দেবদূতের কোন বর্ণনা সে দেয়নি জুরুকে, ঘটনাগুলোই কেবল সবিস্তারে বলেছে এতক্ষণ।
‘চুল ধূসর? অনেক লম্বা?’
‘হ্যাঁ।’
‘দু’পায়ে সোনার বেড়ি পরা?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার কাছে রঙিন একটা খুলি আছে?’
‘আছে। কিন্তু তুমি এতসব কীভাবে বলতে পারছ? সাসাকো থেকে আমার আগে কেউ কি এসেছিল এখানে?’
আবারও চোখ বন্ধ করল জুরু। ‘কেউ আসেনি, কিকা। অনেক আগে থেকেই একে চিনি আমি। তবে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখিনি কখনও, কেবল তার গল্প শুনেছি।’
‘এই তাহলে ব্যাপার! দেবদূত সম্পর্কেও জ্ঞান রাখো তুমি! সত্যিই তুমি জ্ঞানের ভাণ্ডার, জুরু। এখন আমাকে বলে দাও, কী করা উচিত আমার। ভীমনাকে খুন করব? নাকি পালিয়ে যাব দূরে কোথাও?’
‘লোকটা কোন দেবদূত নয়, কিকা। ভয়ঙ্কর শক্তিশালী এক জাদুকর, একটা রাক্ষস!’
পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল কিকা। এ কী বলছে জুরু? নাকি শুনতে ভুল হলো তার?
আবারও মুখ খুলল জুরু, ‘কয়েকশো বছর পর-পর সে আসে বাওয়া অঞ্চলে। কেউ জানে না তার সত্যিকারের বয়স কত। হাজার হতে পারে, তারচেয়ে বেশিও হতে পারে। তার জাদুর ক্ষমতা অসীম। জাদুবলেই নিজেকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রাখার শক্তি পেয়েছে সে।
‘সে একটা রাক্ষস, কারণ কেবল মানুষকেই খাবার হিসেবে গণ্য করে সে, অন্য কিছু মুখে রোচে না তার। পাতাল নদীতে কিংবা পবিত্র গুহায়, যত নরকঙ্কাল তুমি দেখেছ, তার বেশিরভাগই সম্ভবত ওই পিশাচের হাতেই মারা পড়েছে।
‘কুফলুরা তার পোষা। কারণ ওদেরকে খাবারের জোগান দেয় সে-মানুষ! কুমিররাও একই কারণে তার আজ্ঞাবহ। আমাদের ধারণার চাইতেও অনেক- অনেক বেশি তার ক্ষমতার পরিধি।’
শূন্য দৃষ্টিতে জুরুর দিকে তাকিয়ে রইল কিকা। পুরোপুরি নির্বাক।
আবারও বলতে শুরু করল জুরু, ‘সাসাকোয় পা দিয়েই সে কৌশলে তোমাদের ওঝাকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিয়েছে। সরিয়ে দিতে চেয়েছিল তোমাকেও, পবিত্র গুহার বিপদসংকুল পথে একাকী পাঠিয়ে। কিন্তু দেবতাদের আশীর্বাদে বহাল তবিয়তে ফিরে এলে তুমি। বিফলে গেল তার পরিকল্পনা।
‘কিন্তু নতুন ছকে জাল ফেলল রাক্ষসটা। তোমাকে দিয়েই ভীমনাকে মারার পরিকল্পনা করল সে। অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মত। সুবিধামত সময়ে তোমাকেও কোন এক ছুতোয় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করত সে। তারপর অভিভাবকহীন দুটো গাঁয়ে নির্বিবাদে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করত। সবক’টা মানুষ খাওয়ার আগ পর্যন্ত নড়ার নামও মুখে আনত না।’
