কাজ শেষে জ্বলন্ত মশাল হাতে বাইরে বেরিয়ে এল কিকা। ফিরতি পথে রওনা দেয়ার জন্য মানসিকভাবে তৈরি।
তবে বাইরের পরিস্থিতি ততক্ষণে আমূল বদলে গেছে। কিকাকে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করছে একদল শিকারি!
ওদের উপর চোখ পড়তেই পিলে চমকে উঠল কিকার! বাঁচার আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিল সে। অসংখ্য কুফলু পাখি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে চারপাশে। গুহার ভিতরে থাকায়, তাদের আগমনের ব্যাপারটা এতটুকুও টের পায়নি কিকা।
কুফলুরা এমনিতেই নিঃশব্দে চলাচল করে। তার উপর নিজের ভাবনা-চিন্তায় এতটাই মজে ছিল কিকা, বাইরের মৃদু শব্দগুলো সহজেই তার কান এড়িয়ে গেছে।
ওকে দেখতে পেয়ে কুফলুদের প্রায় সবার চোখেই তীব্র আগ্রহ দেখা দিল। যদিও ভরপেট খাবার খেয়েই ঘরে ফিরেছে সবাই, তবে বাড়তি ডেজার্ট হিসেবে কিকাকে খেতে মোটেও আপত্তি নেই ওদের। মানুষ কি আর রোজ-রোজ মেলে?
বিড়ালের মত মৃদু গর-গর শব্দ বেরিয়ে আসছে কুফলুদের গলার গভীর থেকে। ধীরে-ধীরে কিকার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করল ওরা।
পিছিয়ে যেতে চাইল কিকা, আপাতত গুহাতেই আবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে তার।
কিন্তু বিধি বাম। হঠাৎই খেয়াল করল, পিছন দিক থেকেও এগিয়ে আসছে কুফলুরা, গুহায় ফিরে যাওয়ার কোন উপায়ই নেই তার।
আদতে বিশাল একখানা বৃত্তের মতই তাকে ঘিরে ফেলেছে কুফলুরা। এখন আস্তে-ধীরে বৃত্তের পরিধিটা গুটিয়ে আনছে।
প্রাণভয়ে এদিক-ওদিক বারকয়েক তাকাল কিকা, যদি মুক্তির কোন উপায় মেলে। ঠিক তখনই বৃত্তের ছোট একটা ফাঁক আবিষ্কার করতে পারল তার অনুসন্ধানী চোখ। ওদিকটায় নিচু পাথরের দেয়াল, তার ওপাশে বিশাল খাদ। উপর থেকে তাকালে তল পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছয় না, এতটাই গভীর।
কিন্তু আচমকা ওদিকেই দৌড়তে শুরু করল কিকা, প্রবল বেগে ছুটে গেল নিচু দেয়ালটার দিকে। প্রয়োজনে পাথরে থেঁতলে মরবে, তবুও কুফলুদের খাবার হতে রাজি নয় সে।
শিকারিরা সতর্ক হওয়ার আগেই ফাঁকটা পেরিয়ে গেল কিকা। দেয়ালটা টপকে অন্ধের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল উল্টোপাশে।
অনন্তকাল শূন্যে ভাসার পর গাছের ডালের উপর পতনের তীব্র যন্ত্রণাটা ঠিকই অনুভব করল সে, তারপর আর কিছু মনে নেই তার।
সাত
জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে একটা খাঁড়ির বালিয়াড়িতে আবিষ্কার করল কিকা। ততক্ষণে বিশ্রাম শেষে ঊর্ধ্বগগনে ফিরে এসেছে ভোরের সূর্য, আলো বিলাতে শুরু করেছে। বুকে-পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছে কিকা, হাড় ভেঙেছে কি না কে জানে!
গোটা শরীরের এমন কোন জায়গা নেই, যেখানটায় কাঁটা-ঝোপের আঁচড় লাগেনি। পাহাড়ের উপর থেকে গড়িয়ে পড়ার সময় জঙ্গলের কাছ থেকে ওগুলো উপহার পেয়েছে সে।
কেমন করে লানু নদীতে ভাসতে ভাসতে এই খাঁড়িতে এসে পৌঁছেছে, এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই তার। প্রাণে বেঁচে গেছে, এতেই খুশি সে। সে-ই সম্ভবত প্রথম বাওয়া মানুষ, একদল কুফলুর সামনে পড়েও যে বেঁচে ফিরে এসেছে!
তার খুশির সীমাটা মাত্রা ছাড়াল, যখন সে আবিষ্কার করল, পিঠে বাঁধা কঙ্কালটা এখনও যথাস্থানেই আছে! এত ঝক্কির পরও স্থানচ্যুত হয়নি ওটা! কয়েকটা হাড় অবশ্য ভেঙে গেছে, তবে বেশিরভাগটাই এখনও অক্ষত। খাঁড়িটা কিকার চেনা। এখান থেকে সাসাকো ঘণ্টা দুয়েকের পথ। তবে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটাপথ পরিহার করে, নদীপথেই গাঁয়ে ফিরবে বলে ঠিক করল সে। এতে সময় খানিকটা বেশি লাগবে, তবে শরীরের উপর দিয়ে ধকলটা অনেকখানি কমে যাবে। সারা দেহে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে, বুনো পথে হাঁটার ইচ্ছে মোটেও নেই তার। পাকা বাঁশ দিয়ে কোনমতে চলনসই একটা ভেলা বানাল কিকা। পেটের খিদে মেটাল বুনো জাম দিয়ে। তারপর আয়েশ করে নদীর জলে ভেলা ভাসাল। ভাটির পথ, পরিশ্রম বলতে গেলে নেই-ই। হালটা কেবল ধরে রাখতে হবে তাকে।
সাসাকোয় ফিরে বাওয়াদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হলো কিকা। দেবদূত নিজেও তাকে অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে এলেন। তাঁকে দেখে মনে হলো, ভীষণ অবাক হয়েছেন। সত্যি-সত্যিই পবিত্র গুহা থেকে কঙ্কালটা উদ্ধার করতে পারবে কিকা, এতটা বোধকরি কখনওই আশা করেননি তিনি। পথের বিপদগুলো সম্পর্কে অন্য যে কারও চেয়ে তাঁর জ্ঞান বেশি বৈ কম নয়।
দেবদূতের নির্দেশে মাটির উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সাসাকোর সব মহিলা ও শিশুরা। গায়ে গা ঠেকিয়ে পাশাপাশি শুয়েছে সবাই, তৈরি করেছে একধরনের মানব গালিচা। এর উপর দিয়েই টামবারানের দরজা পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে কিকাকে, সমর্পণ করতে হবে বয়ে আনা পূর্বপুরুষের দেহপিঞ্জর। এটা বিশেষ একধরনের সম্মান। মৃতের জন্য এবং কিকার নিজের জন্য। ·
মন সায় না দিলেও প্রথাটা পালন করতে হবে তাকে, প্রত্যাখ্যানের কোন সুযোগ নেই।
যথাসম্ভব দ্রুত গালিচাটা অতিক্রম করল কিকা। শিশুদের শরীর এড়িয়ে গেছে সে, কেবল মহিলাদের দেহেই পা রেখেছে। এখনও পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হয়ে ওঠেনি সে, ওজনও খুব একটা বেশি নয়। তাই মহিলাদের খুব বেশি কষ্ট হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না।
আট
সেদিন বিকেলে পরবর্তী কাজ বুঝিয়ে দেয়ার জন্য কিকাকে কাছে ডাকলেন দেবদূত। শান্তস্বরে জানালেন, কী করতে হবে তাকে।
শুনতে-শুনতে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল কিকা। কোন ফল পাবে না জেনেও, অনেক কাকুতি-মিনতি করল দেবদূতের কাছে। সমস্তটাই শেষমেশ অরণ্যে রোদন হলো, সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন না দেবদূত।
