একটা মাঝারি আকারের প্রান্তরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে, যার পুরোটাই ঢেকে আছে গনগনে লাভায়! ফুটন্ত পানির মতই টগবগ করে ফুটছে ওগুলো, কালচে ধোঁয়ারও কোন কমতি নেই। সেই সঙ্গে গোটা জায়গাটা ঘিরে আছে তীব্র ঝাঁঝাল এক বিচ্ছিরি গন্ধ। শ্বাস টানতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে।
প্রচণ্ড উত্তাপে পাগল হওয়ার জোগাড় হলো কিকার। ভেবেই পেল না, কী করে পার হবে জায়গাটা। উদ্ভ্রান্তের মত এদিক-ওদিক তাকাল সে। কিন্তু বিকল্প কোন পথই তার নজরে পড়ল না। এতদূর এসে খালি হাতে ফিরতে হবে, এটা ভাবতেই বুকটা হু-হু করে উঠল তার। সেখানেই বসে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। বারকয়েক চিৎকার করে দেবতাদের ডাকল সে, পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলল তার আহাজারি। কিন্তু কোন জবাব মিলল না।
তবে শেষমেশ দেবতারা বোধকরি তার ডাক ঠিকই শুনলেন। আচমকা একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস এসে হাজির হলো ওখানটায়। উত্তাপ কমে গেল অনেকখানি, শ্বাস নেয়ার কষ্টটাও আর রইল না। সেই সঙ্গে দূর হলো বাষ্পের ভারী পর্দা। আর তাতেই প্রান্তরটা পেরোবার একটা উপায় খুঁজে পেল কিকা!
তরল লাভার এখানে-ওখানে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত মাথা তুলে আছে কিছু পাথরের চাঁই। চেষ্টা করলে হয়তো ওগুলোর উপর দিয়ে লাফিয়ে-লাফিয়ে প্রান্তরটা পেরোনো যাবে।
চট করে উঠে পড়ল কিকা। সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই, যে কোন মুহূর্তে ভারী বাষ্প আর কালচে ধোঁয়ায় আবারও ঢেকে যেতে পারে পাথরগুলো। ঠাণ্ডা বাতাস খুব বেশি সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে না। গাছের ছাল-বাকল দিয়ে মোজামতন তৈরি করে পায়ে জড়িয়ে নিল কিকা। কোন সন্দেহ নেই, ভয়ানক গরম হয়ে আছে সবক’টা পাথর। খালি পায়ে দাঁড়ানো মাত্রই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে পায়ের পাতা। বাধ্য হয়েই তখন উত্তপ্ত লাভায় আত্মাহুতি দিতে হবে।
একপলক পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা সরলরৈখিক পথ ঠিক করে নিল সে। তারপর ছুটতে শুরু করল। লাফিয়ে-লাফিয়ে এগোচ্ছে, কোন পাথরেই দাঁড়াচ্ছে না। একবার ক্ষণিকের জন্য পিছলে গেল পা, ধপাস করে আছড়ে পড়ল সে পাথরের উপর। পরক্ষণেই হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে দাঁড়াল সে। ততক্ষণে তার শরীরের এখানে-ওখানে ফোসকা পড়ে গেছে। গরম পাথরের ছোঁয়া লেগেছে জায়গাগুলোয়।
পাথরটা আকারে বিশাল ছিল বলেই এযাত্রা প্রাণে বেঁচে গেল সে। অন্যথায় লাভা সরোবরেই অক্কা পেতে হত তাকে।
অবশেষে গুহামুখে যখন পৌঁছল ও, সূর্য ততক্ষণে বিদায় নেবার তোড়জোড় করছে। পাহাড়ের উপরে বলে এখনও খানিকটা আলো পাওয়া যাচ্ছে, নীচের দিকে ইতোমধ্যেই সাঁঝ ঘনিয়ে গেছে। গুহামুখের আশপাশে প্রচুর কুফলু পাখির পালক পড়ে থাকতে দেখল কিকা। কিন্তু একটা পাখিকেও দেখা গেল না কোথাও।
প্রায়ই কি পবিত্র গুহায় আসে কুফলুরা? কেন আসে?
গাছের মোটা একটা ডাল দিয়ে, চটজলদি ছোট একটা মশাল বানিয়ে নিল কিকা। আলো ছাড়া পবিত্র গুহায় ঢোকার কোন মানে হয় না। ততক্ষণে পুরোপুরি নেমে এসেছে আঁধারের চাদর, কয়েক হাত দূরের জিনিস ঠাহর করাও কষ্টকর এখন।
দুরু-দুরু বুকে পবিত্র গুহার দিকে পা বাড়াল কিকা। উত্তেজনায় কাঁপছে তার গোটা শরীর। অবশেষে পৌঁছতে পেরেছে সে পবিত্র গুহায়, বাওয়াদের সবচেয়ে আরাধ্য জায়গায়। কত বীর যোদ্ধা এখানে আসতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে, তার খবর কে বলতে পারে!
মশালের আলোয় গুহার ভিতরকার জমাট আঁধার দূর হতেই তীব্র আতঙ্কে পুরোপুরি জমে গেল কিকা! শীতল শিহরণ বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে। নিজের চোখজোড়াকেও অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। পবিত্র গুহার দেয়ালে- দেয়ালে অসংখ্য আঙটা গাঁথা। তার একটাও খালি নেই, প্রত্যেকটাতেই ঝুলছে কোন না কোন নরকঙ্কাল! সবক’টা বহুদিনের পুরানো, ক্ষয়া।
দেয়ালগুলোয় কালচে রঙের কালিতে বিজাতীয় ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। অক্ষরজ্ঞান নেই কিকার, তাই লিপিগুলোর মর্ম উদ্ধার করা সম্ভব হলো না তার পক্ষে। তবে এটুকু ঠিকই বুঝতে পারল, তাজা রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছিল কথাগুলো। কালের আবর্তে এখন কালচে হয়ে গেছে রঙ।
ঝকঝকে-তকতকে গুহার প্রতিটি দেয়াল, যেন নিয়মিত ঝাঁট দেয় কেউ! কোথাও একরত্তি মাকড়সার ঝুলও নেই। বদ্ধ গুমট বাতাস এতটাই ভারী, যেন হাতের মুঠোয় ধরা যাবে ওগুলোকে!
পুরো ব্যাপারটাই ভয়ানক অশুভ। প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে কিকা। ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় জানান দিচ্ছে তাকে, পালিয়ে যাও এখান থেকে, জলদি পালাও।
কিকা ভেবেছিল রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিয়ে সাতসকালে ফিরতি পথ ধরবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হলো সে। যত দ্রুত এখান থেকে পালানো যায়, ততই মঙ্গল।
পবিত্র গুহার বালির আলাদা কদর আছে, তাই দ্রুতহাতে কিছু বালি থলেতে পুরে কোমরে বেঁধে নিল সে। দেবতাদের উপাসনায় কাজে দেবে।
পরক্ষণেই একটা সমস্যা প্রকট হয়ে ধরা পড়ল তার মাথায়।
কোটা বীর যোদ্ধা লাক্রার কঙ্কাল? এতগুলো কঙ্কালের ভিতর থেকে কেমন করে খুঁজে বের করবে সে ওটাকে? অনেক ভেবেচিন্তে গুহামুখের সবচেয়ে কাছের কঙ্কালটাকে তুলে নিল সে। মন বলছে, এটাই হবে। যদি না হয়, আর কী-ই বা করার আছে তার?
কঙ্কালটাকে কষে নিজের পিঠের সঙ্গে বেঁধে নিল কিকা। অনেক জায়গাতেই ছুটতে হবে তাকে, হাতে বহন করা সম্ভব নয় ওটাকে।
