চেনা নদীপথ, ঘন জঙ্গল, বেশ সহজেই পেরিয়ে গেল সে। তেমন কোন বিপদ-আপদের সম্মুখীন হতে হলো না তাকে।
একটা দাঁতাল মাদী শুয়োর অবশ্য অনেকদূর পর্যন্ত তাড়া করেছিল তাকে। তবে চিতার গতিতে ছুটতে পারা কিকার টিকিটা ছোঁয়ারও সাধ্য হয়নি ওটার। চাইলেই ওটাকে মেরে ফেলতে পারত কিকা। তাতে অহেতুক দৌড়নোর ঝক্কিটা এড়ানো যেত। কিন্তু শুয়োরটার ছোট দুটো বাচ্চা দেখেছে সে। বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্যই প্রাণ বাজি রেখে কিকাকে তাড়া করেছিল ওটা। একটা স্নেহবৎসল মাকে মারতে মন সায় দেয়নি তার। ওটাকে মারলে, কয়েকদিনের মধ্যে বাচ্চাগুলোও মরে যেত নির্ঘাত।
সপ্ত পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছে প্রথম বিপদটার মুখোমুখি হলো কিকা। খুব সরু একটা পিচ্ছিল গিরিপথ পাড়ি দিতে হবে তাকে, যার দু’পাশেই গভীর খাদ। একবার পা ফসকালেই আর দেখতে হবে না, এক লহমায় কম্ম কাবার। পথটা এতটাই সরু যে, পাশাপাশি দুটো পা রেখেও দাঁড়ানো যায় না, আগুপিছু করে এগোতে হয়। সেই পথও আবার নিরবচ্ছিন্ন নয়, এখানে-ওখানে মস্ত ফাটল। ওগুলোতে পা পড়লেও খেল খতম, টুক করে হারিয়ে যেতে হবে মাটির গভীরে।
কিছুদূর চলার পরই হাড়ে হাড়ে টের পেল কিকা, এভাবে এগোলে পুরো পথ পাড়ি দেয়া কিছুতেই সম্ভব হবে না তার পক্ষে। ধীরে চললে শরীর বেশি হেলে পড়ে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুতলয়ে ছুটতে শুরু করল সে। তীক্ষ্ণ নজর রাখল, ঠিক কোথায় পা ফেলছে। কদম ছোট-বড় করে আলগা নুড়ি এবং ফাটলগুলো এড়িয়ে চলার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে। তবুও বেশ কয়েকবারই পা হড়কাল তার। কোনমতে পড়তে-পড়তে বাঁচল। তবে শেষ অবধি পথটা পেরোতে পারল সে, মোটামুটি অক্ষত অবস্থায়ই। পরের বিপদটা এল অতর্কিতে, কোনরকম সতর্ক বার্তা ছাড়া। একটা তীক্ষ্ণ বাঁক ঘুরতেই একপাল বানরের মুখোমুখি হতে হলো তাকে। এখানে-ওখানে, গাছের ডালে, পাথরে, শত- শত বানর। এক নজরেই বুঝতে পারল কিকা, এটাই ওদের আবাসস্থল। ওদের বাড়ির উঠন চিরেই এগিয়ে গেছে পথটা।
কিকাকে দেখামাত্রই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল বানরের দল। নিজের বাসায় অনাহূত অতিথির অনুপ্রবেশ, কে-ই বা পছন্দ করে?
নেতৃস্থানীয় গোটা কয়েক বানর এগিয়ে এল কিকার দিকে। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বিকট ভেংচি কাটছে ওগুলো। বাকিরাও নিশ্চুপ নেই, যে যার জায়গায় বসে থেকেই ভয়ানক চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে সবক’টা মিলে। ওদের সম্মিলিত চিৎকারে কানের পর্দা ফাটার জোগাড় হলো কিকার। প্রচণ্ড ভয় পেলেও মাথা ঠাণ্ডা রাখল সে। জানে, একটামাত্র ভুল পদক্ষেপই মুহূর্তের ব্যবধানে লাশে পরিণত করবে তাকে। একপাল ক্রুদ্ধ বানর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লে, মাংসের দলায় পরিণত হতে খুব একটা সময় লাগবে না।
আগুয়ান বানরগুলোর চোখে-চোখে তাকাল কিকা। সে ভয় পেয়েছে, এটা যেন ওরা কিছুতেই বুঝতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখল। শিকার ভয় পেয়েছে · বুঝতে পারলে, অতি উৎসাহী হয়ে সময়ের আগেই আক্রমণ করে বসতে পারে দলের কোন অনভিজ্ঞ তরুণ। আর একবার ব্যাপারটা শুরু হয়ে গেলে বাকিরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।
খুব ধীরে-ধীরে চার হাতপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বসল কিকা। বারদুয়েক চোখ বুজে দেবতাদের স্মরণ করতেও ভুলল না। মুখ খুলে লম্বা দম নিতে শুরু করল সে, যতটা সম্ভব বাতাস ভরে নিতে চায় ফুসফুসে। যে একমাত্র অস্ত্রটা প্রয়োগ করতে চলেছে সে, তাতে দেবতাদের অনুগ্রহের পাশাপাশি বুক ভরা বাতাসও তার খুবই দরকার। আচমকা গলা ফাটিয়ে ভয়ঙ্কর গর্জন করে উঠল কিকা! চিতাবাঘের ডাক নকল করছে সে। অনেক পশুপাখির ডাকই অনুকরণ করতে পারে বাওয়ারা, শিকারের সময় কাজে লাগে। আজ নিজে শিকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচতেও হয়তো কাজে লাগতে পারে বিদ্যাটা।
চিতাবাঘকে যমের মত ভয় পায় বানরেরা। কারণ তাদের মত গাছে চড়ার বিদ্যাটা চিতাবাঘেরও জানা আছে। চট করে গাছের মগডালে চড়ে অন্য শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচা সম্ভব হলেও, চিতাবাঘের হাত থেকে নিস্তার পায় না ওরা। এহেন শত্রুকে ভয় না পেয়ে উপায় কী?
এক লহমায় থেমে গেল বানরের দলের চেঁচামেচি। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওরা কিকার দিকে। অন্তরের অন্তস্তল থেকে অনুভব করছে, ভয় পাওয়া উচিত। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো প্রাণীটাকে ঠিক চিতাবাঘের মত লাগছে না ওদের কাছে, তাই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।
সুযোগটা কাজে লাগল কিকা। গর্জন করতে-করতে এক কদম সামনে বাড়ল। সেই সঙ্গে ডানহাতের থাবাটা সজোরে নামিয়ে আনল মাটির উপর। যেন ভয়ানক রেগে গেছে সে!
আর কোন দ্বিধা রইল না বানরদের। পড়িমরি করে ছুট লাগল। চোখের নিমিষে লুকিয়ে পড়ল ঘন পাতার আড়ালে, সন্দেহের বশবর্তী হয়ে প্রাণ খোয়াতে রাজি নয় কেউ।
চটজলদি জায়গাটা পেরিয়ে গেল কিকা। জানা আছে, যে কোন মুহূর্তে সাহস সঞ্চয় করে ফিরে আসতে পারে বানরের দল। দ্বিতীয়বার একই কৌশল খাটবে না ওদের উপর।
কিছুদূর এগোনোর পর দস্তুরমতন ঘামতে শুরু করল কিকা। প্রথমটায় ভাবল, খানিকক্ষণ আগের উত্তেজনার কারণেই এমনটা হচ্ছে। মনের উপর দিয়ে ধকলটা তো আর কম যায়নি! তবে অল্পক্ষণের মধ্যেই ভুলটা ভাঙল তার।
