সমস্ত বাওয়া ওপারে পৌঁছনোর পর তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন দেবদূত। তারপর ভীষণ মোটা একখানা গাছের গুঁড়িতে আলতো করে হাত রাখলেন। দেখতে-দেখতে একপাশে হেলে পড়ল অতবড় গাছটা, তবে পুরোপুরি লুটিয়ে পড়ল না মাটিতে। গাছটার গোড়ার দিককার শিকড়বাকড়গুলো উঠে এসেছে জমিনের উপরে। আর সেখানেই একটা ফোকরমতন তৈরি হয়েছে।
ইশারায় সবাইকে পিছু নিতে বলে সেই ফোকরটার মধ্যে গিয়ে ঢুকলেন দেবদূত। তাঁর ঠিক পিছনেই আঠার মত সেঁটে রয়েছে কিকা। অন্যরাও একে- একে তাদের সর্দারকে অনুসরণ করল।
পাতালে নামতেই বাওয়াদের চোখগুলো বিস্ময়ে পুরোপুরি ছানাবড়া হয়ে গেল। এ কোথায় এসেছে ওরা? পৃথিবীতে এমন জায়গাও বুঝি থাকতে পারে!
তাদের চোখের সামনেই বিশাল একখানা পাথুরে দেয়াল। তবে পাথরের গড়নটা অদ্ভুত, স্বচ্ছ। কাচের মতই দেয়ালের ওপাশটা স্পষ্ট চোখে পড়ছে সবার। সেখানে নীরবে বয়ে চলেছে একটা শান্ত নদী!
মাথার বেশ খানিকটা উপরে মাটির ছাদ। সেখান থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল চুইয়ে পড়ছে। অস্পষ্ট হলেও, লানু নদীর বয়ে চলার শব্দটা ঠিকই কানে আসছে। নদীটার ঠিক নীচেই এখন আছে সবাই।
গমগমে গলায় কথা বলে উঠলেন দেবদূত। ‘নদী দেখাতে তোমাদেরকে এখানে আনিনি আমি। এনেছি বিশেষ একটা জিনিস দেখাতে। সবাই নদীটার তলার দিকে ভাল করে তাকাও।’
তাঁর আদেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করল বাওয়ারা। পাথুরে দেয়ালটার কাছাকাছি গিয়ে ভাল করে লক্ষ করল পাতাল নদীর তলদেশের দিকে। পরক্ষণেই ভীষণ চমকে উঠল।
শত-শত মানব কঙ্কালে বোঝাই হয়ে আছে জায়গাটা। রীতিমত হাড়ের স্তূপ। যতজন মানুষের হাড়গোড় পড়ে আছে এখানে, এর বিশ ভাগের একভাগ মানুষও এখন সাসাকোয় নেই।
সবার আঁতকে ওঠাটা আয়েশ করে উপভোগ করলেন দেবদূত। তাদের চোখের তারায় ফুটে ওঠা প্রশ্নবোধক চিহ্নটাও নজর এড়াল না তাঁর।
‘এরা তোমাদেরই পূর্বপুরুষ। বহুকাল আগে এরাই দাপিয়ে বেড়াত গোটা অঞ্চল, ঠিক তোমাদেরই মত। যতদিন না মালানিরা এদিকটায় সরে আসতে শুরু করে। যুগের পর যুগ মালানিদের সাথে লড়াইয়ের ফলাফল দেখতে পাচ্ছ তোমরা চোখের সামনে। এরা সবাই প্রাণ দিয়েছে সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে, যেন তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদে বসবাস করতে পারে। যেন মালানিদের হাত থেকে নিস্তার পায়।’
মালানিদের সঙ্গে দুই শতাব্দী ধরে চলা ভয়ঙ্কর যুদ্ধের কথা জানা আছে বাওয়াদের। এই যুদ্ধ নিয়ে প্রচুর কাহিনি শুনেছে ওরা বয়স্কদের মুখে।
মালানি, একরকমের বনমানুষ। বহুকাল আগে ওরা পৃথিবীর অন্য কোন কোণে বসবাস করত। সম্ভবত সপ্ত পাহাড়ের অন্য পাশে। কিন্তু খাবারে টান পড়ায় ধীরে-ধীরে ওরা সরে আসতে শুরু করল বাওয়া এলাকায়। স্বভাবতই শিকার নিয়ে ওদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বাওয়ারা। মালানিরাও ছেড়ে কথা বলার পাত্র ছিল না। তাই খণ্ড-খণ্ড সংঘর্ষ ধারাবাহিক যুদ্ধে রূপ নেয়। দেখতে-দেখতে জাতশত্রুতে পরিণত হয় বাওয়া এবং মালানিরা। সুযোগ পেলেই একে অন্যের কলোনিতে আক্রমণ করত। দু’শো বছর ধরে একনাগাড়ে চলে এই রক্তক্ষয়ী লড়াই। কখনও অবিরাম, কখনও বা সাময়িক বিরতি দিয়ে।
অবশেষে মালানিদের কোন এক আচরণে প্রচণ্ড বিরক্ত হন আলোর দেবতা অলুরাং। মালানিদের ক্ষমতা কমিয়ে দেন তিনি, ভাগ করে দেন বিভিন্ন উপদলে। সেই উপদলগুলোই পরবর্তীতে বানর, হনুমান, শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং বেবুনে পরিণত হয়।
বাওয়ারা জানত, সেই যুদ্ধে প্রচুর বীর যোদ্ধা প্রাণ দিয়েছিল। কিন্তু তাদের কঙ্কাল এভাবে কোথাও একত্রে জমা করা আছে, এটা তারা কখনও কল্পনাও করেনি। আজ চোখের সামনে ওগুলোকে দেখতে পেয়ে, যুগপৎ শ্রদ্ধায় এবং বিস্ময়ে পুরোপুরি নির্বাক হয়ে গেল ওরা।
‘এখানে তোমাদের পূর্বপুরুষদের প্রায় সবাই-ই আছে। শুধু একজন ছাড়া,’ বলে উঠলেন দেবদূত।
‘কে, হুজুর?’ মৃদুস্বরে জানতে চাইল কিকা
‘বীর যোদ্ধা, লাক্রা। তার কঙ্কালই তোমাকে এখানে ফিরিয়ে আনতে হবে, কিকা। এটাই তোমার প্রথম কর্তব্য।’
‘আমি অবশ্যই ফিরিয়ে আনব, হুজুর। কোথায় আছে সেটা?’
‘পবিত্র গুহায়।’
ছয়
সপ্ত পাহাড়ে দুটো কিম্ভূতকিমাকার শৈলশিরার ঠিক মাঝখানটায় পবিত্র গুহার অবস্থান। বন্ধুর পথ, ভয়ানক বিপদসংকুল। আদিমকাল থেকেই পবিত্র গুহা জয় করাটাকে বাওয়ারা বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে আসছে। তাই এযাবৎকালে ওপথে যাত্রা করা বাওয়া যোদ্ধাদের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয়। তবে তাদের বেশিরভাগই আর কখনও ফেরত আসেনি লোকালয়ে।
শুধু কয়েক যুগ আগে একজন শক্তিশালী বাওয়া সর্দার ফিরে আসতে পেরেছিল পবিত্র গুহা জয় করে। প্রয়াত সর্দার শাংকুর দাদা, কিকা তারই বংশধর। তার আনা পবিত্র গুহার বালি এখনও দেবতাদের পূজা-অর্চনায় ব্যবহার করা হয়। অজ্ঞাত কারণে এই বিশেষ বালি দেবতারা খুবই পছন্দ করেন।
শাংকুর দাদার কাছ থেকেই পবিত্র গুহার গমন পথের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরেছিল বাওয়ারা। তারপর থেকে কেউ আর পবিত্র গুহায় যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। খানিকটা বাড়তি সম্মান অর্জনের জন্য পৈত্রিক প্রাণটা খোয়াতে রাজি নয় কেউ।
কিন্তু কিকার এখন ওসব ভাবার সুযোগ নেই, তাকে যেতেই হবে। অন্য কোন পথ খোলা নেই তার সামনে। দেবতাদের নাম নিয়ে সপ্ত পাহাড়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল সে। দিনের আলো থাকতে-থাকতেই পৌঁছে যেতে চায় গন্তব্যে।
