ওঝাকে একটা লম্বা পাটাতনে শোয়ানো হলো। পাতা দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো দু’চোখ।
বিষের পাত্র আর একখানা ধারাল ছুরি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল কিকা হাঁটু গেড়ে বসল তার পাশে। তারপর ওঝার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে আলতো করে ছুরি ছোঁয়াল তাতে।
ধারাল ফলার স্পর্শ পেতেই দ্বিখণ্ডিত হলো ত্বক, বেরিয়ে এল রক্তের ক্ষীণ ধারা। খুব সাবধানে তাতে ফোঁটায় ফোঁটায় বিষ ঢালল কিকা। তারপর হাতটা খানিকক্ষণ উপরেই ধরে রাখল, যেন রক্তের ফোঁটা মাটিতে না পড়ে। নিমিষেই শিরাপথে ওঝার দেহের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ল গরলের দল। আর ধরে রাখার প্রয়োজন নেই বুঝতে পেরে হাতটা ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে এল কিকা। বুকের ভিতরটা ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে তার। জানে, আর বেশিক্ষণ বাঁচবে না ওঝা। তিতামের বিষ ঠেকানোর সাধ্য নেই কোন মানুষের।
এই মানুষটাই তাকে শৈশবে হাত ধরে-ধরে শিখিয়েছে অনেক কিছু। সর্দারের ছেলের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ওঝা, এটাই বাওয়া সমাজের প্ৰথা। –
মুখ দিয়ে কোন আর্তনাদ বেরোল না ওঝার। শুধু বারকয়েক খিঁচুনি উঠল গোটা শরীরে। হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল তার, কুঁচকে গেল মুখের চামড়া। তারপর আচমকা পুরোপুরি নিথর হয়ে গেল তার দেহ, সব শেষ। কান্নায় ভেঙে পড়ল কিকা। তবে তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে গেল, না কেউ, যে যার জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সবাই। নিজের দুঃখ নিজেকেই বহন করতে হয় বাওয়াদের।
পাঁচ
শোকের প্রকোপটা খানিকটা লাঘব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন দেবদূত। তারপর মঞ্চে উঠে সবার দিকে তাকালেন তিনি। আবারও দৃঢ়চেতা ভাবভঙ্গি ফিরে এসেছে তাঁর, খানিক আগের সহনশীলতার লেশমাত্রও নেই এখন চেহারায়।
‘এবার তোমার পালা, কিকা। তুমি প্রস্তুত?’
‘আমি প্রস্তুত, হুজুর। বলুন কী শাস্তি অপেক্ষা করছে আমার জন্য,’ শান্তস্বরে . বলল কিকা।
‘শাস্তি নয়, প্রায়শ্চিত্ত। সর্দার হিসেবে অনেক ভুলই শোধরাতে হবে, যার জন্য চড়া মূল্যও দিতে হতে পারে তোমাকে। কাজগুলো তুমি নিজেও করতে পারো, চাইলে অন্য কাউকে প্রতিনিধি হিসেবেও পাঠাতে পারো। সর্দার হিসেবে এই অধিকার তোমার আছে।’
‘আমি নিজেই কাজগুলো করতে চাই, হুজুর। সাসাকোর মানুষের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিতেও কখনও দ্বিধা করব না আমি। যদিও এখনও সর্দার হইনি আমি, তবুও সর্দার হিসেবে আমার জীবন সবার মঙ্গলের জন্যই উৎসর্গ করা।’
সময়টা অন্যরকম হলে, সমগ্র সাসাকোবাসী চিৎকার করে তাদের সর্দারের প্রতি আনুগত্য জানাত। এটাও জানাত যে, আইনত সর্দার না হলেও, কিকাকে ওরা অনেক আগেই সর্দার হিসেবে নিজেদের অন্তরে স্থান দিয়েছে। তাই তার আদেশে যে কোন কাজই করতে প্রস্তুত ওরা।
কিন্তু এখন এই দুর্যোগঘন সময়ে, দেবদূতের সামনে, চিৎকার করার সাহস নেই কারও। তাই নীরবে মাথা দুলিয়েই কিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানাল বাওয়ারা।
সবই দেখলেন দেবদূত। কিছুই নজর এড়াল না তাঁর।
‘একজন যোগ্য সর্দারের মতই কথা বললে তুমি, কিকা। তবে তোমাকে কাজের মাধ্যমেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। সবাইকে দেখাতে হবে, জিভের মতই তোমার মাথা এবং পেশীগুলোও দ্রুত চলে।’
‘প্রাণ থাকতে আমি কোন কাজে পিছপা হব না, হুজুর।’
‘বেশ। আমিও সেটাই চাই। এখন সবাই এসো আমার সাথে।’
নদীর ঘাটের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন দেবদূত। পিছন পিছন চলল বাওয়ারা। প্রত্যেকেই খেয়াল রাখছে, তাদের পদশব্দ যেন বিরক্ত না করে দেবদূতকে। তাই এত বড় দলটা বলতে গেলে প্রায় নিঃশব্দেই নদীর ঘাটে পৌছে গেল।
পানির কিনারায় পৌছে থমকে দাঁড়ালেন দেবদূত। ঘুরে সমবেত জনতার মুখোমুখি হলেন। ‘তোমাদের কারও জানা আছে, লানু নদীর নীচ দিয়ে বয়ে চলা পাতাল নদীটার কথা?’
অস্ফুট শব্দ করে উঠল বাওয়ারা। চোখ বড়-বড় হয়ে গেছে সবার। মাটির তলায় আবার কেমন করে নদী থাকে? হাসলেন দেবদূত। তাঁর ঠিকই জানা ছিল, পাতাল নদী সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই বাওয়াদের। ‘চলো, তোমাদেরকে এমন কিছু দেখিয়ে আনি, যা এর আগে কখনও দেখনি তোমরা। আবার কখনও দেখতে পাবে, সে সম্ভাবনাও নেই।’
কথা শেষ করেই নদীর দিকে পা বাড়ালেন দেবদূত। হাঁটতে শুরু করলেন পানির উপর দিয়ে! আগের রাতেও তাঁকে ঠিক এভাবেই পানির উপর দিয়ে হাঁটতে দেখেছিল সবাই।
তবে অল্পক্ষণের মধ্যেই বাওয়ারা যা আবিষ্কার করল, তাতে তাদের বিস্ময় বাড়ল বৈ কমল না! দেবদূত পানির উপর দিয়ে হাঁটছেন না, তিনি হাঁটছেন এক দঙ্গল কুমিরের পিঠের উপর দিয়ে! শত-শত কুমির গায়ে গা ঠেকিয়ে আড়াআড়িভাবে নদী পারাপারের একটা অস্থায়ী সাঁকো তৈরি করেছে তাঁর জন্য! কুমিরগুলোর দেহের প্রায় সবটুকুই জলের আড়ালে থাকায়, চট করে চোখে পড়ে না। দিনের আলোতেই ঠাহর করতে কষ্ট হয়, রাতের আঁধারে ওদেরকে দেখতে পাওয়া রীতিমত অসম্ভব।
শ্রদ্ধায়, ভয়ে মাথা নত হয়ে এল বাওয়াদের। কেমন করে কুমিরদের বশ করলেন দেবদূত? তাঁর ক্ষমতার পরিসীমা আঁচ করতে পেরে নিজের অজান্তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল সবার।
বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই হুড়োহুড়ি করে যে যার নৌকায় চড়ে বসল বাওয়ারা। দেবদূত ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন নদীর ওপারে। নিশ্চয়ই তিনি বাওয়াদের জন্য অপেক্ষা করে থাকাটা উপভোগ করবেন না।
