ওঝার মৃত্যুদণ্ড কীভাবে কার্যকর করা হবে সে সিদ্ধান্তের ভার বাওয়াদের উপরই ছেড়ে দিলেন দেবদূত। নিজ থেকে কোন উপায় বাতলে দেয়া থেকে বিরত থাকলেন। এতেই বাওয়ারা তাঁর প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ল। তারা জানে, চাইলেই নৃশংস কোন পন্থায় ওঝার প্রাণদণ্ড কার্যকর করতে পারতেন দেবদূত, সে ক্ষমতা তাঁর আছে।
প্রবীণ বাওয়ারা একত্রিত হয়ে আলোচনায় বসল। বয়স নিতান্ত কম হলেও ভাবি সর্দার হিসেবে, কিকাও যোগ দিল তাতে। দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা শেষে সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন ভোরবেলায় কার্যকর করা হবে ওঝার দণ্ড। রাতে কাজটা করা যাবে না কিছুতেই। রাতের বেলা প্রাণী হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সাসাকোয়, যুগ- যুগ ধরে এই নিয়মই চলে আসছে এখানে।
বাওয়াদের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করলেন না দেবদূত। শাশ্বতকালের নিয়ম ভাঙার কোন প্রয়োজন নেই। একটা রাতের আয়ু না হয় বেশিই পেল ওঝা, কী আসে-যায় তাতে?
সবাই জানে, পালাবে না ওঝা, তবুও কড়া পাহারায় রাখা হলো তাকে। চারজন যোদ্ধার সশস্ত্র প্রহরায় বেঁধে রাখা হলো টামবারানের সামনে। এই টামবারানের ভিতরেই দেবদূতের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, তিনি নিজেই বেছে নিয়েছেন জায়গাটা। সাধারণ মানুষের পক্ষে কিছুতেই টামবারানের ভিতরে রাত কাটানো সম্ভব নয়, কিন্তু দেবরাজ জারালের দূতের তো আর প্রেতাত্মাদের ভয় নেই। বরঞ্চ প্রেতাত্মারাই আজ কেউ টামবারানের ছায়া মাড়ানোর সাহস করবে বলে মনে হয় না।
ভোরেই জেগে উঠল গোটা সাসাকো। আজ তাদের জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ আজ থেকেই শুরু হতে চলেছে শুদ্ধি অভিযান, অতীতের পাপকর্মের কালিমা মোচনের পালা। ওঝার মৃত্যুদণ্ডের মধ্য দিয়ে সূচনা হতে চলেছে সে প্রক্রিয়ার।
প্রথমটায় ঠিক হলো, লানু নদীতে ডুবিয়ে মারা হবে ওঝাকে। দু’জন শক্তিশালী বাওয়া যোদ্ধা সজোরে পানির তলায় চেপে ধরে রাখবে তাকে। ধরাধাম ত্যাগ করতে খুব একটা সময় লাগবে না ওঝার। পুরো ঘটনা ঘটবে জলের তলায়, তাই ওঝার মৃত্যুযন্ত্রণাও কারও চোখে পড়বে না।
প্রস্তাবটা প্রায় সবারই পছন্দ হলো। যন্ত্রণাক্লিষ্ট একটা মুখ, কারই বা দেখতে ইচ্ছে হয়?
ওঝা নিজেই গিয়ে নদীর জলে নামল। বুক পানিতে নেমে স্থির হয়ে দাঁড়াল। নিয়তি মেনে নিয়েছে সে, কোনরকম অস্থিরতা নেই তার মধ্যে। শান্ত, সৌম্য, মৃত্যুকে বরণ করে নেয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিন্তু বিপত্তি বাধল অন্যখানে। কোন যোদ্ধাই এগিয়ে গেল না ওঝাকে চেপে ধরার জন্য!
একে-একে শক্তিশালী যোদ্ধাদের প্রায় সবাইকেই ডাকল ওঝা, কিন্তু কেউই তার ডাকে সাড়া দিল না। কিকাও কাউকে আদেশ দিতে পারল না, কারণ আইনত এখনও সর্দার হয়নি সে। তাকে কুফলু পাখির পালকে গড়া মুকুটটা পরানোর সুযোগ পায়নি ওঝা। আর সর্দার ছাড়া অন্য কারও আদেশই মানতে বাধ্য নয় বাওয়ারা! নিজেকে নিজে ডুবিয়ে মারা যায় না। তাই খানিকক্ষণ বৃথা চেষ্টা করে গোমড়া মুখে নদী থেকে উঠে এল ওঝা। এবার নিজেই একটা প্রস্তাব রাখল সে। কোমর সমান গর্ত খুঁড়ে, মাটি চাপা দেয়া হোক তাকে। তারপর সবাই একযোগে পাথর ছুঁড়ে মারুক তার দিকে। এতে করে বিশেষ কেউ আর অপরাধবোধে ভুগবে না। কারণ সবারই সমান অংশগ্রহণ থাকবে পুরো প্রক্রিয়ায়।
যৌক্তিক প্রস্তাব, তাই ব্যাপারটা অনুমোদন করলেন দেবদূত। গর্ত খুঁড়তে সময় লাগল না, নিমিষেই কাজটা করে ফেলল শ্রমিক বাওয়ারা। ওঝা গিয়ে ওখানটায় দাঁড়ালে, কোমর পর্যন্ত মাটি চাপা দেয়া হলো তাকে। সবাই মাঝারি আকারের পাথর তুলে নিল হাতে, তারপর গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়াল ওঝার চারদিকে। দেবদূতের সংকেত পেলেই একযোগে পাথর ছুঁড়বে সবাই। এহেন প্রস্তরবৃষ্টি থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই ওঝার। যথাসময়ে সংকেত দিলেন দেবদূত।
একবার নয়, পরপর তিনবার!
কিন্তু দেখা গেল, একজন বাওয়াও পাথর ছোঁড়েনি! প্রত্যেকেই নিজ-নিজ জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে আছে। কারও-কারও চোখে টলমল করছে অশ্রুজল।
বলা বাহুল্য, এ পদ্ধতিতেও হত্যা করা সম্ভব হলো না ওঝাকে।
.
ভীষণ রেগে গেলেও খুব একটা চোটপাট করলেন না দেবদূত। বাওয়াদের আবেগের ব্যাপারটা বুঝতে মোটেও কষ্ট হচ্ছে না তাঁর। শেষটায় নিজেই একটা উপায় বাতলে দিলেন।
বাওয়ারা প্রত্যেকেই মনে-মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলো, এবার আর কিছুতেই প্রাণদণ্ড ঠেকানো যাবে না ওঝার। তবে এ পদ্ধতিতেই সম্ভবত তার মরণযন্ত্রণা সবচেয়ে কম হবে।
ঠিক হলো, বিষপ্রয়োগে মারা হবে ওঝাকে। তিতাম গাছের রস দিয়ে বানানো বিষ।
বাওয়ারা বড় কোন জানোয়ার শিকারে গেলে, এ বিষ সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কোনমতে শিকারকে কোণঠাসা করা সম্ভব না হলে, এই বিষ প্রয়োগ করা হয়। মোষ, গণ্ডার থেকে শুরু করে বিশালাকার ভ্যারল পর্যন্ত সহজেই কাবু হয়ে যায় তিতামের বিষে।
তিতাম গাছের তলায় প্রায়শই মৌমাছি, পোকামাকড় আর ছোট পাখি মরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তিতামের বর্ণিল ফুল থেকে মধু খেতে আসাটাই কাল হয় ওদের জন্য। মধুর সঙ্গে-সঙ্গে খানিকটা বিষও ওদেরকে উপহার দেয় তিতাম আর প্রাণ কেড়ে নিতে কেবলমাত্র একফোঁটা তিতামের বিষই যথেষ্ট।
অস্ত্রাগার থেকে আনা হলো তিতামের রস। পাকা বাঁশের মোটা নলের ভিতর রাখা হয় এই বিষ। সংগ্রহের পরপরই মুখে ছিপি এঁটে দেয়া হয়। রাখা হয় সাধারণের নাগালের বাইরে, অস্ত্রাগারের গোপন কুঠুরিতে। যেখানে কেবল যোদ্ধাদেরই প্রবেশাধিকার আছে।
