ভীষণ অবাক হলেন দেবদূত। একজন ওঝা কেমন করে দেবরাজের আরাধনার নিয়ম না জানতে পারে? এসব নিয়েই তো ওঝাদের কারবার। ‘তোমার আগে সাসাকোর ওঝা কে ছিল?’
‘আমার বাবা, হুজুর।’
‘তার আগে?’
‘আমার দাদা।’’
‘তারও আগে?’
‘আমার পরদাদা, হুজুর।’
‘এরা কেউই তোমাদের দেবরাজের উপাসনার ব্যাপারে কিছু বলেনি?’
‘জী না, হুজুর।’
‘কলিকাল, ঘোর কলিকাল,’ গর্জাতে-গর্জাতে বললেন দেবদূত। ছোট পরিসরে পায়চারি করছেন তিনি। কিছু একটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে ওঝার দিকে তাকালেন দেবদূত। চোখ-মুখ উজ্জ্বল, যেন কঠিন কোন সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছেন।
‘পুরো ব্যাপারটাতে তোমার বংশের দোষই সবচেয়ে বেশি দেখতে পাচ্ছি আমি। দেবরাজের কথা সবাইকে জানানোর দায়িত্বটা তোমাদেরই ছিল। তোমরা অপরাধী, ভয়াবহ অপরাধ করেছ। স্বীকার করো এটা?’
‘স্বীকার করি, হুজুর। আমরা অপরাধী।’
‘অপরাধের শাস্তি পেতে হবে তোমাকে। তোমার নিজের অপরাধের জন্য তো বটেই, পূর্বসুরিদের কৃতকর্মের শাস্তিও তোমাকেই ভোগ করতে হবে।’
‘আমি প্রস্তুত, হুজুর। যে কোন শাস্তি মাথা পেতে নেব। আমায় সাজা দিন।’
‘উঠে দাঁড়াও,’ ওঝার দিকে তাকিয়ে বললেন দেবদূত। তারপর ফিরলেন কিকার দিকে। ‘তুমিও।
চট করে উঠে দাঁড়াল দু’জনেই। এখনও অধোবদন হয়ে আছে। নীরব, চিন্তিত। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান। জানা নেই, কতটা ভয়াবহ শাস্তির সম্মুখীন হতে চলেছে।
নিজের পিছন দিকটায় হাত বাড়িয়ে, ছোট একটা মাটির পাত্র আর একখানা রঙচঙে খুলি বের করে আনলেন দেবদূত। তাঁর পিঠের ঝোলাটা দীঘল চুলের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে, ইতিপূর্বে কেউই সেটা লক্ষ করেনি। দেবদূতের নির্দেশে লানু নদী থেকে পাত্রটায় পানি ভরে নিয়ে এল ওঝা। রঙিন খুলিটা রাখা হয়েছে মঞ্চের তাকিয়ার উপর। বড্ড জীবন্ত মনে হচ্ছে ওটাকে। একনজরে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, গায়ে কাঁটা দেয়। মাটির পাত্রটা ওটার পাশে রাখলেন দেবদূত। তারপর এক কদম পিছনে সরে এলেন। তাঁর দেখাদেখি ওঝা এবং কিকাও খানিকটা পিছিয়ে গেল। বাওয়ারা যে যার জায়গায় ঠায় বসে আছে এখনও, একচুলও নড়েনি কেউ। যতদূর সম্ভব দু’হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়ালেন দেবদূত। তারপর নিচু গলায় প্রার্থনা শুরু করলেন। দেবরাজ জারালকে ডাকছেন তিনি।
ধীরে-ধীরে মৃদু ধোঁয়া উঠতে শুরু করল পাত্রের পানি থেকে! যেন অদৃশ্য কোন আগুন জ্বলছে ওটার নীচে, আর তাতেই উত্তাপ পাচ্ছে পাত্রের তরল।
দেবদূত মোটেও গলা চড়ালেন না। কিন্তু ধোঁয়ার পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে লাগল। একসময় রীতিমত ফুটতে শুরু করল পাত্রের জল। ছলকে পড়তে লাগল পাশে রাখা খুলিটার উপর।
প্রার্থনায় ক্ষান্ত দিলেন দেবদূত। ওঝা এবং কিকাকে ইশারা করে এগিয়ে গেলেন পাত্রটার দিকে। দু’হাত নাড়িয়ে সরিয়ে দিলেন উপরে জমে থাকা ধোঁয়ার ভারী আস্তরণ।
ভিতরে তাকিয়ে অস্ফুট শব্দ করে উঠল ওঝা এবং কিকা। ভীষণ চমকে গেছে দু’জনেই।
পাত্রের পানির উপর অস্পষ্ট কিছু খণ্ডচিত্র দেখতে পাচ্ছে ওরা। প্রাচীন কিছু বাওয়া মানুষের ছবি, যারা বহুকাল আগে এই সাসাকোতেই বসবাস করত। অন্তরের অন্তস্তল থেকে উপলব্ধি করল ওরা, মানুষগুলো অপরিচিত নয়, তাদেরই পূর্বপুরুষ।
প্রত্যেককেই দেখা গেল বিচিত্র ধরনের আরাধনায় মগ্ন। দেবদূত যেমনটা বলেছিলেন, অনেকটা সেরকমই তাঁদের কার্যকলাপ। মনে হচ্ছে, দেবরাজ জারালের পূজা অর্চনাতেই ব্যস্ত সবাই। একসময় সত্যিই তাহলে দেবরাজের উপাসনা হত সাসাকোয়! কালের আবর্তে বাওয়ারা সেটা ভুলে গেছে। অকারণে রাগেননি দেবরাজ জারাল। আচমকা আবারও ফুটতে শুরু করল পাত্রের পানি, নিমিষেই মিলিয়ে গেল ছবিগুলো। সে জায়গা আবারও দখল করে নিল সফেদ ধোঁয়ার দঙ্গল।
সবাইকে চমকে দিয়ে নড়ে উঠল খুলিটা। তারপর সবার চোখের সামনেই শূন্যে ভাসতে শুরু করল! ফুটখানেক উপরে উঠে থামল ওটা, স্থির হয়ে রইল ওখানেই।
প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাতজোড় করলেন দেবদূত, চোখ মুদলেন। ‘ওঝার শাস্তি কী হবে, প্রভু?’
বহুক্ষণ ধরে প্রশ্নের জবাব দিল না কেউ। একমাত্র দেবদূতই চোখ বন্ধ করে আছেন, বাকি সবাই ছানাবড়া চোখ নিয়ে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শূন্যে ভাসমান খুলিটার দিকে।
তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার ঠিক আগমুহূর্তে শীতল একটা কণ্ঠ ভেসে এল খুলিটার ভিতর থেকে। ‘মৃত্যুদণ্ড।’
চার
ওঝার মৃত্যুদণ্ড রদ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করল কিকা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তার সমস্ত কাকুতি-মিনতি বৃথা গেল, খুলির মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না দেবরাজ জারাল। রায় ঘোষণার পর-পরই আগের অবস্থানে নেমে এসেছে ওটা। অনড় পড়ে রয়েছে মাটির পাত্রটার পাশে।
প্রচণ্ড এক ধমকে কিকাকে নিবৃত্ত করলেন দেবদূত। না হয় সারা রাতই দেবরাজের কাছে ওঝার প্রাণভিক্ষা চাইত সে। তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, বিরক্ত হতে পারেন দেবরাজ। এটাই বাওয়াদেরকে বুঝিয়ে বললেন দেবদূত।
দেবরাজের সামনে অন্য দেবতারাই যেখানে কথা বলার সাহস পায় না, সেখানে তুচ্ছ এক বাওয়া সর্দারের বাড়াবাড়ি না করাটাই মঙ্গলজনক।
বুঝল কিকা। অদৃষ্টের লিখন, না যায় খণ্ডন।
