বাওয়ারা কিছুতেই ভেবে পেল না, কেমন করে কুফলুদের পোষ মানাল লোকটা! পানির তলাতেই বা ছিল কেমন করে? শ্বাস আটকে আসেনি?
জলের উপর দিয়ে অবলীলায় তাকে হেঁটে আসতে দেখে সভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল বাওয়ারা। আঁতকে উঠে অস্পষ্ট অস্ফুট শব্দ করে উঠল কেউ-কেউ। শুধু ভাবি সর্দার কিকা আর ওঝা নিজেদের জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। দু’জনেই তাকিয়ে আছে আগন্তুকের আগমনী পথের দিকে। মনে একই প্রশ্ন খেলা করছে, কে এই অদ্ভুত লোকটা?
কাছে এসে ওদের মুখোমুখি দাঁড়াল অদ্ভুতদর্শন আগন্তুক। দু’চোখ ভয়ানক রাগে জ্বলজ্বল করছে তার। যেন চোখের আগুনে ভস্ম করে দেবে সামনে দাঁড়ানো সবক’টা মানুষকে! ভিতরকার দুর্বিনীত ক্ষোভ চাপা দেয়ার কোন চেষ্টাই নেই লোকটার। তার ভীতিকর চাহনির সামনে একেবারে কুঁকড়ে গেল ওঝা ও কিকা।
আচমকা লোকটা যখন মুখ খুলল, চারপাশটা রীতিমত গম-গম করে উঠল। যেন একসঙ্গে বেজে উঠেছে গোটা দশেক ঢাক! ‘দেবরাজ জারাল পাঠিয়েছেন আমাকে, যাঁর আদেশ তোমরা অমান্য করে চলেছ প্রতিনিয়ত। তোমাদের জন্য বয়ে এনেছি দুঃসংবাদ, শাস্তি, যা কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তোমরা নিজেরাই অর্জন করে নিয়েছ। বয়ে এনেছি সুসংবাদ, এই প্রায়শ্চিত্তের পর তোমরা প্রত্যেকেই হবে একেকজন নবজাতকের মত পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত। দেবরাজ জারাল ক্ষমা করে দেবেন সবাইকে।’
বাওয়ারা প্রত্যেকেই যে যার জায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অতিথিকে সম্মান জানানোর বহু প্রাচীন রীতি এটা। দেবদূতকে সম্মান জানানো মানেই পরোক্ষভাবে দেবতাকে সম্মান জানানো। জ্ঞাতসারে ছোট দেবতাদেরও যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে কার্পণ্য করে না বাওয়ারা। সেখানে দেবতাদের রাজা, দেবরাজ জারালকে অসম্মান করার তো প্রশ্নই আসে না।
তবে যে কারণেই হোক, তাদের উপর ঠিকই অসন্তুষ্ট হয়েছেন দেবরাজ। অন্যথায় কখনওই তিনি দেবদূত পাঠাতেন না মর্ত্যে। কী শাস্তি ভোগ করতে হবে, কে জানে! আতঙ্কে রীতিমত কাঁপতে শুরু করল বাওয়ারা। মাথা নিচু করে থাকা ভয়ার্ত মুখগুলোর দিকে কিছুক্ষণ পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন দেবদূত। তারপর ফিরলেন ওঝা এবং কিকার দিকে। অন্যদের মত ওরাও মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছে দেবদূতের সামনে, নড়ছে না একচুলও।
‘দেবরাজের পূজার জন্য কৃষ্ণপাথরের কোন বেদী নেই তোমাদের গ্রামে নেই দেবরাজের মন্দির। নেই মন্দিরের দোরগোড়ায় পঞ্চতোরণের প্রবেশপথ প্রতি পূর্ণিমার রাতে গাঁয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মোষটাকে বলি দেয়ার কথা ছিল তোমাদের। মোষের উষ্ণ রক্তের ঢল, পূর্ববর্তী ত্রিশদিনের পাপগুলোকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়।
‘কথা ছিল প্রতি ছয় চাঁদ পর-পর কুমারী কন্যার রক্তে ভেজানো হবে দেবরাজের বেদী। আর তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে পরবর্তী ছয় চাঁদের জন্য খাবারের বরাদ্দ দেন দেবরাজ জারাল।
‘কিন্তু তোমরা এর কিছুই করনি। দেবরাজকে ভুলে গিয়ে অন্য দেবতাদের তুষ্টিতে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছ সবসময়। কী কারণে এত বড় স্পর্ধা দেখালে তোমরা? জবাব দাও,’ একদমে কথাগুলো বলে থামলেন দেবদূত। ক্রুদ্ধ সাপের মতই ফোঁসফোঁস করে শ্বাস নিচ্ছেন তিনি, দৃষ্টিতে এখনও আগুন ঝরছে। ভীষণ ঘাবড়ে গেল কিকা। দেবরাজের আরাধনার ব্যাপারে যা-যা বললেন দেবদূত, এর কিছুই তার জানা ছিল না। অতীতের কোন ওঝা দূরে থাক, তার বাবা সর্দার শাংকুও এ ব্যাপারে কখনওই কিছু বলেনি। অথচ দেবতাদের ব্যাপারে সমস্ত রকম বিদ্যাশিক্ষা শৈশবেই দেয়া হয়েছে তাকে, সর্দার নিজেই দিয়েছে।
এতবড় বিষয়টা কী করে ভুলে গিয়েছিল বাবা? কিছুতেই ভেবে পেল না কিকা।
সে চিরকাল জেনে এসেছে, মর্ত্যের মানুষের আরাধনার প্রয়োজন নেই দেবরাজ জারালের। কারণ অন্য দেবতারাই দিনরাত তাঁর প্রার্থনায় মত্ত থাকেন। তাঁদের স্তুতিবাক্যেই সর্বদা বিগলিত থাকেন দেবরাজ। খুশি হয়ে যাঁর-যাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী ক্ষমতা বণ্টন করে দেন। যেন পৃথিবীর মানুষজনের দেখভাল করতে পারেন দেবতারা। তাহলে হঠাৎ কেন মানুষের পুজো পেতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন দেবরাজ? নাকি বরাবর ভুল জেনে এসেছে বাওয়ারা? হাজার বছরের পাপের প্রায়শ্চিত্ত কতটা কঠিন হবে?
ভয়ে-ভয়ে মুখ তুলে দেবদূতের দিকে তাকাল কিকা। দেবদূতের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তার। স্পষ্ট বুঝতে পারছে, জবাবটা সবার হয়ে তাকেই দিতে হবে। এটাই আশা করছেন দেবদূত, এটাই নিয়ম। কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করল, গলা দিয়ে স্বর বেরোতে চাচ্ছে না, নিজের উপর রীতিমত জোর খাটাতে হচ্ছে তাকে।
‘দেবরাজের পায়ে মাথা ঠেকাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই, হুজুর। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছুই আমাদের জানা ছিল না। কীভাবে দেবরাজ জারালের উপাসনা করতে হয়, কখন করতে হয়, এর সবটুকুই আমাদের অজানা। আমরা অথর্ব, অধম। আমাদের ক্ষমা করুন, হুজুর।’
গর্জে উঠলেন দেবদূত, ‘ক্ষমা? কখনওই না। শাস্তি তোমাদের পেতেই হবে।. এটাই দেবরাজের ইচ্ছা।’
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওঝার দিকে তাকালেন দেবদূত। ‘ওদেরকে জানানোর দায়িত্বটা তোমারই ছিল। তাই না? কীসের ওঝা তুমি?’
লজ্জায়, ভয়ে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে হলো ওঝার। মৃদুস্বরে বলল, ‘আমার নিজেরও এ ব্যাপারে কিছু জানা ছিল না, হুজুর।
