মন্ত্র জপা বন্ধ করল ওঝা। আপাতত তার কাজ শেষ। ঘেমে নেয়ে একাকার তার গোটা শরীর, যেন সদ্যই লানু নদীতে ডুব দিয়ে এসেছে সে।
ধীর পায়ে টামবারানের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল কিকা। মাথা নিচু করে রেখেছে। ভয়ে রীতিমত কাঁপছে তার গোটা শরীর। তার মনে হচ্ছে, যে কোন মুহূর্তে হুড়মুড় করে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে সে। পাজোড়া দেহের ভার বইতে অক্ষমতা জানাচ্ছে বারংবার।
শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা নিয়ে কিকার দিকে তাকিয়ে আছে বাওয়ারা। জানে, কিকার ভাগ্য এখন একটা সুতোর উপর ঝুলছে। যে কোন মুহূর্তে সে তার প্রাণ পর্যন্ত হারাতে পারে। সর্দারকে প্রেতাত্মাদের পছন্দ হলে, খুশি মনে বিদায় নেবে ওরা। কিন্তু পছন্দ না হলে, কী করে বসবে তার কোন্ ঠিক-ঠিকানা নেই। সবই নির্ভর করছে অশরীরীদের মেজাজ-মর্জির উপর।
ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল টামবারানের দরজাটা। একঝলক দমকা হাওয়া বেরিয়ে এল ভিতর থেকে। শোঁ-শোঁ শব্দে বাতাসটা গিয়ে হামলে পড়ল আরাধনার অগ্নিকুণ্ডটার উপর। মুহূর্তেই নরক গুলজার হয়ে উঠল জায়গাটায়। আগুন-বাতাস, দুই চিরশত্রুর লড়াই বেধে গেল নিমেষেই, কে জিতবে বলা মুশকিল।
নিজের অজান্তেই যার-যার জায়গা ছেড়ে এক কদম পিছিয়ে গেল বাওয়ারা। বিস্ফারিত নেত্রে দুই দানবের লড়াই দেখছে সবাই। এহেন অভূতপূর্ব ঘটনা এর আগে কেউই দেখেনি ওরা, শোনেওনি।
যেমনভাবে শুরু হয়েছিল, চোখের পলকে ঠিক তেমনিভাবে শেষ হয়ে গেল ব্যাপারটা। রসগোল্লার মত বড়-বড় চোখ নিয়ে সাসাকোবাসী আবিষ্কার করল, আগুনটা নিভে গেছে! পবন দানবও উধাও হয়ে গেছে; তার টিকিটাও দেখা যাচ্ছে না কোথাও।
সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে চারদিকে, খানিক আগে যেন কিছুই ঘটেনি এখানে!
পরক্ষণেই একযোগে হুল্লোড় করে উঠল সমবেত জনতা। সন্তুষ্ট চিত্তে প্রস্থান করেছে প্রেতাত্মারা, নতুন সর্দারকে পছন্দ হয়েছে ওদের।
উৎসাহের আতিশয্যে কেউ-কেউ দৌড়ে গেল কিকার দিকে। উত্তেজনার রেশ কাটতেই ভীষণ দুর্বল হয়ে মাটির উপর বসে পড়েছে নতুন সর্দার।
নিজেকে ফিরে পেতে খুব একটা সময় লাগল না কিকার। উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত একখানা হরিণের ছাল কোমরে জড়িয়ে নিল সে। প্রেতাত্মাদের সামনে দিগম্বর হয়ে দাঁড়ানোর রেওয়াজটা পালন করেছে সে। তাই বলে সবার সামনে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ানোর কোন মানে হয় না।
কিকাকে মঞ্চের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল ওঝা। আর মাত্র একটা কাজই বাকি এখন। কুফলু পাখির পালকে তৈরি মুকুটটা মাথায় পরা। তাহলেই আনুষ্ঠানিকভাবে সাসাকোর সর্দার হয়ে যাবে কিকা।
কুফলু পাখিরা কেবল আভিজাত্যের নয়, ভয়ঙ্কর ক্ষমতারও প্রতীক। তাই কুফলুর পালকে তৈরি মুকুট কেবল সর্দারই পরতে পারে, অন্য কেউ নয়।
কুফলুরা মাংসাশী, থাকে পর্বতের চূড়ায়। আকারে বিশাল, ডানা ছড়ালে সূর্যকেও ঢেকে দিতে পারে অনায়াসে। যে কোন বড় জানোয়ারই খায় ওরা, খুব একটা বাছ-বিচার করে না। তবে মানুষকে বাগে পেলে অন্য খাবারে আগ্রহ হারায়
একা কেউ কুফলুদের কবলে পড়লে, বেঁচে ফিরে আসতে পারে না কখনওই। ফি-বছর অন্তত জনা দশেক বাওয়া প্রাণ হারায় ওদের হাতে। বাওয়া শিশুদের প্রথম যে ভয়ের সবকটা দেয়া হয়, তার নাম-কুফলু। তবে স্বভাবে ওরা যতই হিংস্র হোক না কেন, দেখতে ভারি সুন্দর। পালকে সাদার উপর গোলাপি রঙের প্রলেপ দেয়া, এখানে-ওখানে ছোপ-ছোপ নীল রঙ।
বাওয়ারা বিশ্বাস করে, ঘরে কুফলুর পালক রাখলে, দৈবশক্তির অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই সর্দারের মুকুট তৈরির জন্য কুফলুর পালককেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করে ওরা।
তিন
কম্পনটা শুরু হলো খুব মৃদুভাবে। যেন অদূরের পাহাড়শ্রেণীর কোথাও বড় কোন পাথরের স্থানচ্যুতি ঘটেছে। আর তাতেই কেঁপে উঠছে পায়ের তলার জমিন আর সেই সঙ্গে ভেসে আসছে দূরাগত মেঘের আবছা গর্জন। প্রথমটায় বাওয়াদের কেউই আসল ঘটনা আঁচ করতে পারল না। সবাই কেমন যেন হকচকিয়ে গেল। কম্পনের প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে তাদের বিহ্বলতার পরিমাণ বাড়ল বৈ কমল না। ভূমিকম্পে অভ্যস্ত নয় বাওয়ারা। আচমকা লানু নদীর মধ্যখানটায় প্রচণ্ড রকমের আলোড়ন উঠল। টনকে টন জল ফোয়ারার মত দিগ্বিদিক্ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। যেন প্রকাণ্ড কোন দানব সীমাহীন আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নদীর জলের উপর। বহুদিনের পুষে রাখা ক্ষোভ, আজ সুদে-আসলে উসুল করা চাই তার।
তবে অল্পক্ষণ পরে জল ফুঁড়ে যে আকৃতিটা বেরিয়ে এল, সেটা মানুষেরই, কোন দানবের নয়। যদিও সাধারণ মানুষের গড়নের চেয়ে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দুটোই ঢের বেশি তার। গায়ের রঙ বাওয়াদের মত ঘোর কৃষ্ণবর্ণের নয়, অনেকটাই ফর্সা। আর সেই ত্বকের নীচে কিলবিল করতে থাকা মাংসপেশীগুলো যে অমিত শক্তির আধার, এটা বুঝতে দিব্যদৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে না।
কোমরে একখানা কালো জাগুয়ারের চামড়া জড়ানো, দু’পায়ে দু’খানা সোনার বেড়ি। কালের আবর্তে উজ্জ্বল সোনালি রঙ বিলুপ্ত হয়ে খানিকটা কালচে হয়ে গেছে।
মাথাভর্তি ধূসর চুল, প্রায় নিতম্ব ছুঁই-ছুঁই করছে। দু’কাঁধে দুটো কুফলু পাখি বসে আছে, বাচ্চা, পূর্ণবয়স্ক হতে এখনও ঢের দেরি। তবে কুফলুদের স্বভাবসুলভ চপলতা অনুপস্থিত ওদের মধ্যে।
