লানু নদীর কোল ঘেঁষে ছোট একখানা মঞ্চ বানানো হয়েছে। মাঝখানে সর্দারের বসার জন্য তাকিয়ামতন একখানা আসন।
মঞ্চের সামনের দিকটায় ভাকরা গাছের ডাল দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে বিশাল চত্বর। বাওয়ারা সবাই এখানেই বসবে, যাবতীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক প্রথাগুলো এখানেই পালন করা হবে।
মঞ্চের পিছনেই বাওয়াদের ঘাট। তাতে হরেক রকমের সারি-সারি নৌকা বাঁধা। গত এক সপ্তাহ ধরে ওগুলো ওখানেই ঠায় পড়ে আছে, ব্যবহার করেনি কেউ। তবে বাওয়াদের জানা নেই, শীঘ্রিই ওগুলো ব্যবহারের দরকার পড়বে ওদের!
দুই
সাঁঝ ঘনাতেই ঢাক বেজে উঠল। বাওয়া যুবকেরা প্রায় সবাই একখানা করে ভাগে পেয়েছে আজ। প্রত্যেকেই চেষ্টা করছে, অন্যদের চেয়ে জোরে বাজাতে। কেউ কারও চেয়ে পিছিয়ে থাকতে রাজি নয়। মশালের আলোয় ঘর্মাক্ত রঙচঙে মুখগুলো রীতিমত ভয়ঙ্কর লাগছে। যদিও মানুষ হিসেবে বাওয়ারা মোটেও হিংস্র নয়।
চত্বরের একপাশে চলছে ভূরিভোজের আয়োজন। আগুনের উপর ঝুলছে আস্ত এক দাঁতাল শুয়োর। ছোট বাচ্চাদের বেশ ভিড় ওখানটায়। বাদুড় আর চামচিকা দিয়ে তৈরি হরেক রকম পদ শোভা পাচ্ছে তার পাশেই। বেশ কয়েকটা ছোট বানরকে কাঠিতে পুড়িয়ে মচমচে করা হয়েছে। মূল খাবারের পর বাওয়াদের হাতে-হাতে ঘুরবে ওগুলো। যার-যার পছন্দমত অংশ ভেঙে ভেঙে খাবে। এতে একে অপরের সঙ্গে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায় বলেই বাওয়াদের বিশ্বাস। প্রিয় মানুষকে আস্ত বানরপোড়া উপহার দেয়ার রীতিও প্রচলিত আছে বাওয়া সমাজে। ফালি- ফালি করে কাটা হয়েছে হরিণের মাংস। বাহারি মশলায় মাখানো টুকরোগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি চমৎকার।
সাপ, ব্যাঙ, গিরগিটি, গুইসাপ থেকে শুরু করে অজগর অবধি সবই আছে। কিছুই বাদ পড়েনি ভোজের তালিকা থেকে।
সর্দারের জন্য বিশেষ খাবার হিসেবে তৈরি করা হয়েছে পুপার রোস্ট। পুপা একজাতের ছোট হরিণ, খুবই বিরল। আকারে বিড়ালের চেয়ে সামান্য বড়, তবে গতিতে চিতাকেও হার মানাতে পারে এরা। গভীর বনে লুকিয়ে থাকে, ক্ষণে-ক্ষণে চামড়ার রঙ বদলায়। তাই ওদের দেখতে পাওয়া যতটা কঠিন, ধরা তার চেয়েও দুষ্কর।
তবে সর্দারের জন্য মূল্যবান উপহার না আনলে চলবে কেন? তাই নিজেদের তাগিদেই কষ্টসাধ্য কাজটা করেছে বাওয়ারা। জোগাড় করেছে একজোড়া মধ্যবয়স্ক পুপা।
ভাবি সর্দার কিকা দাঁড়িয়ে আছে ওঝার পাশে। পুরোদস্তুর নগ্ন হয়ে। গায়ে বিচিত্র রঙের আঁকিবুকি। মুখেও আঁকা হয়েছে বাহারী নকশা। এই নকশার মাধ্যমেই সমগ্র বাওয়া ইতিহাস শরীরে ধারণ করেছে সে। ওঝার সাজপোশাকও কম বিচিত্র নয়। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত হলেও, কোমরে একখানা নেকড়ের ছাল জড়িয়েছে সে। গলায় হাড়ের মালা, লকেট হিসেবে শোভা পাচ্ছে ছোট একখানা খুলি। মানুষের নয়, হনুমানের। মাথায় কাঁটার মুকুট। কপালের এখান-ওখান থেকে হালকা রক্ত ঝরছে তার। তবে চেহারায় যন্ত্রণার কোন ছাপ নেই। বাওয়ারা ভাবে, চাইলেই ব্যথা বেদনার ঊর্ধ্বে চলে যেতে পারে ওঝারা! তা নইলে আর তারা ওঝা কেন? কালবিলম্ব না করে অনুষ্ঠান শুরু করল ওঝা। প্রথমেই করা হবে পূর্বপুরুষদের আরাধনা। তাঁদের আত্মারা অসীম শক্তির উৎস। বংশের সাফল্য- ব্যর্থতা মূলত ওঁরাই নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরাই তৈরি করেন বীর যোদ্ধা, আবার যোদ্ধাদের মরণও ডেকে আনেন তাঁরাই! তাই এসব কায়াহীনদের সন্তুষ্ট রাখাটা বাওয়াদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। বাওয়ারা চিরকাল সেটাই করে এসেছে।
টামবারানের সামনে বিশাল একখানা অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়েছে। জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পালান কাঠের লাকড়ি। এই বিশেষ কাঠ পোড়ার সময় তীব্র সুগন্ধ উৎপন্ন করে। পূর্বপুরুষ-পূজার এটাও একটা বিশেষ অনুষঙ্গ।
ওরা দু’জন আগুনের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই থেমে গেল সবক’টা ঢাকের আওয়াজ। বাওয়ারা সবাই যে যার জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে পড়ল। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করেও কথা বলছে না কেউ। বাচ্চারাও কুলুপ এঁটে দিয়েছে নিজেদের মুখে।
মাথা ঘুরিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে সন্তুষ্ট হলো ওঝা। পরক্ষণেই বিড়বিড় করে মন্ত্র জপতে শুরু করল সে। প্রথমটায় নিচু স্বরে শুরু করলেও, ধীরে-ধীরে স্বরটা উঁচু হতে থাকল তার। একেবারে শেষ মাথায় দাঁড়ানো বাওয়া মানুষটাও এখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তার কথা।
একরত্তি অর্থ বুঝতে না পারলেও, ওঝার কণ্ঠের আকুতি অনুধাবন করতে কষ্ট হচ্ছে না কারও। জানে, পূর্বপুরুষদের আত্মাকে ডাকছে ওঝা। অতীতেও এহেন দৃশ্য চাক্ষুষ করেছে বাওয়ারা।
ধীরে-ধীরে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। সবাই স্পষ্ট বুঝতে পারল, এসে গেছে অতিথিরা। চোখে যদিও কোন কিছুই দেখতে পেল না কেউ।
কণ্ঠের সবটুকু জোর কাজে লাগিয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে ওঝা। একটু পর-পরই হাতের মুঠো থেকে আগুনে বালি ছিটিয়ে চলেছে সে। সাধারণ কোন বালি নয়, পবিত্র গুহার বালি। বহু বছর আগে এক বাওয়া সর্দার এনেছিল ওগুলো।
আচমকাই টামবারানের ভিতর থেকে ভেসে এল খুলিতে-খুলিতে ঠোকাঠুকির শব্দ! সেই সঙ্গে পিলে চমকানো সম্মিলিত হাসি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমানো বীর পুরুষদের খুলিতে আবারও ফিরে এসেছে প্রেতাত্মারা। বংশধরদের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেনি।
